হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ হাছিব খন্দকার
 মোঃ হাছিব খন্দকার

মোঃ হাছিব খন্দকার

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে চাঁদপুর জেলার তরপুরচন্ডী গ্রামে জন্ম নেয় মোঃ হাছিব খন্দকার। গ্রামের সরল পরিবেশ, নদী-খাল, সবুজ মাঠ এবং মানুষের আন্তরিকতা এই সবকিছুই তার শৈশবকে গড়েছিল। তার পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত। পিতা, মোঃ লিটন খন্দকার, একজন পরিশ্রমী শ্রমিক, দিনের আলো ছড়িয়ে শ্রম করে পরিবারকে সচল রাখতেন। মা, হোসনে আরা বেগম, গৃহিণী হিসেবে ঘরের কাজ সামলাতেন এবং সন্তানদের পড়াশোনায় সাহায্য করতেন। হাসিবের বড় হওয়ার সময় পরিবারের মধ্যে তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। ছোট ভাই মোঃ সিয়াম খন্দকার তখন ১৮ বছর বয়সী এবং মোঃ সাহিফ খন্দকার ১৩ বছর বয়সী। হাসিব ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল ছিলেন।

গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করতে গিয়ে তার মাঝে শৃঙ্খলা, সাহস ও সহমর্মিতার গুণাবলি জন্ম নেয়। গ্রামে অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মতো খেলার মধ্য দিয়ে জীবনকে আনন্দময় করার চেষ্টা করতেন, তবে তার মধ্যে সবসময় কিছু দায়িত্ববোধ কাজ করত। শৈশবের দিনগুলো ছিল সরল অথচ দুঃসাহসিক। গ্রামের ছোট খাল পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া, মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, গ্রামের বয়স্কদের থেকে জীবন জ্ঞান নেওয়া এই সব মিলিয়ে তার চরিত্র গড়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে পারে, জীবনে কষ্ট রয়েছে, তবে পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সব কিছু অর্জন সম্ভব। পারিবারিক দারিদ্র্যের কষাঘাতে পরে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন নি। তাই হাসিব ব্যবসার দিকে মনোযোগী হয়, কারণ তিনি পরিবারের জন্য দ্রুত আয়ের প্রয়োজন বোধ করতেন।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালে ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা। তারা চেয়েছিলেন ৫৬% কোটা সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা হোক। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার তাদের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানায়। বরং পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীদের ধৈর্য, সাহস এবং একতা আন্দোলনকে জোরদার করে। তখন সরকার সাময়িকভাবে এটার সমাধান দিলেও স্থায়ী কোন সমাধান দেননি। যার কারনে ২০২৪ সালে পুনরায় নতুন করে কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়। সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার গুরুত্ব নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থী, যুবক এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়। মোঃ হাসিব, একজন ব্যবসায়ী হলেও, এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। তিনি মনে করতেন যারা অধ্যবসায় করে পড়াশোনা করে, তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। আন্দোলনের পরিবেশ ছিল উত্তপ্ত, সড়ক ও মার্কেটে হাজারো মানুষ সমবেত হয়ে ন্যায়ের জন্য দাবি তুলছিল। চাঁদপুরে, ফয়সাল মার্কেট এলাকায় অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনের অংশ নিত। হাসিবও তার ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা ন্যায়ের দাবিতে কতটা সাহসীভাবে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই আন্দোলন ঝুঁকিপূর্ণও ছিল।
আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, সকাল ১১:৪৫ মিনিটে চাঁদপুরের ফয়সাল মার্কেট এলাকায় হাসিব উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী, লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালাতে শুরু করে। হাসিব লক্ষ্য করল, নিরাপদভাবে সরে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব হয়ে গেছে। তাঁর ওপর একযোগে আঘাত শুরু হয়। লাঠি ও বাঁশ দিয়ে বুকে আঘাত করা হয়। মুহূর্তে প্রচণ্ড ব্যথায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে আতঙ্ক, চিৎকার আর রক্তাক্ত শরীরের চিত্র সবকিছু এক সঙ্গে তার চোখে ভেসে ওঠে। আশেপাশের সাধারণ মানুষও আক্রমণের শিকার হয়। হাসিবের মনে ভয় ও দুঃখের সঙ্গে এক ধরনের অপ্রতিরোধ্য রাগও কাজ করে যে তিনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তার জন্যই তাকে এমন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কিছু সাহসী সহযোদ্ধা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। পথে, আঘাতের তীব্রতা এবং রক্তক্ষরণের কারণে তার প্রাণ সংকটে ছিল। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয়। এক্স-রে করা হয় এবং নিশ্চিত হয় যে হাতের হাড় ভেঙেছে। বুকে পাওয়া আঘাত এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা হাসিবের জীবন রক্ষা করে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয়। হাতে ও শরীরে ভাঙা ও আঘাতের জায়গাগুলো ঠিক করা হয়। ডাক্তাররা সতর্কভাবে তার আঘাতের প্রকৃতি যাচাই করেন। কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়। আঘাতের পরে হাসিবকে কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল। রক্তক্ষরণ ও ব্যথা কমে যাওয়ার পর তিনি ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার শারীরিক শক্তি ফিরে পান। আঘাতের স্মৃতি এখনও তার মনে থেকে যায়, তবে সে শিখেছে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কখনো বৃথা যায় না। আলহামদুলিল্লাহ, আজ হাসিব সুস্থ এবং পুনরায় ব্যবসা চালাচ্ছেন। তার পরিবার, সহপাঠী এবং বন্ধুদের সহায়তায় তিনি মানসিক শক্তিও ফিরে পেয়েছেন। তবে আন্দোলনের স্মৃতি এবং আহত হওয়ার মুহূর্তগুলো তাকে জীবনের প্রতি আরও দৃষ্টিপূর্ণ ও সতর্ক করে তুলেছে। তার এই কাহিনী এখন গ্রামীণ যুবকদের মধ্যে সাহস ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর উদাহরণ হয়ে আছে।

নাম : মোঃ হাসিব খন্দকার
জন্ম তারিখ : ১৭/০২/২০০৩
জন্মস্থান : তরপুরচন্ডী
পেশা : ব্যবসা
প্রতিষ্ঠান : ব্যবসা
নিজ জেলা : চাঁদপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম: তরপুরচন্ডী
ইউনিয়ন: তরপুরচন্ডী
থানা: সদর
জেলা: চাঁদপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মোঃ লিটন খন্দকার
মায়ের নাম: হোসনে আরা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স: শ্রমিক, ৪৮ বছর
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৩৮ বছর
আয়ের উৎস: শ্রমিক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫
ভাইবোনের বিবরণ:
১. মোঃ সিয়াম খন্দকার, বয়স: ১৮, পেশা:ছাত্র,সম্পর্ক: ভাই
২. মোঃ সাহিফ খন্দকার, বয়স: ১৩, পেশা:ছাত্র,সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান: ফয়সাল মার্কেটের সামনে, চাঁদপুর
আহত হওয়ার সময়কাল: সকাল ১১:৪৫ মিনিট, ৪ আগস্ট ২০২৪ ইং
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍