হোম / আহতদের তালিকা / মো: লাবীব হাসান
মো: লাবীব হাসান

মো: লাবীব হাসান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মো: লাবীব হাসান শেরপুরের মালোজিকান্দা গ্রামের নিভৃত সুধায় ২০১৩ সালের ৪ মে জন্ম নেওয়া এক নিষ্পাপ শিশু। যার পরিচয় শুধু একজন স্কুলছাত্র। দিনমজুর বাবার ঘামে আর মায়ের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা তার ছোট্ট পৃথিবীটি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ভেঙে পড়ে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে, যখন ব্যাগ কাঁধে বাড়ি ফিরছিল সে। গুলিবিদ্ধ দেহ, থমকে যাওয়া পড়াশোনা আর ভয়াবহ মানসিক আঘাত আজো তাকে তাড়া করে, যেন শিশুকালের রঙ হারিয়ে গেছে যন্ত্রণার অন্ধকারে। তবু লাবীবের জীবন এক প্রশ্নের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি রাষ্ট্রের অস্ত্র কি কখনও একটি শিশুর স্বপ্নকে নিভিয়ে দিতে পারে?

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

নিষ্পাপ ফুলের গুলিবিদ্ধ হাহাকার
মো: লাবীব হাসান
ক্রমিক: ০৫১
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫১
জন্ম
মো: লাবীব হাসান ২০১৩ সালের ৪ মে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি থানার মালোজিকান্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। দশ বছর বয়সী এই শিশু বর্তমানে হাজী মনির হোসেন স্কুলের ছাত্র হিসেবে লেখাপড়া করছিল। তার বাবা মো: আব্দুল খালেক একজন দিনমজুর, পেশায় রাজমিস্ত্রি; মা নূরজাহান বেগম একজন গৃহিণী হলেও বাসাবাড়িতে কাজ করে আয়-রোজগার করতেন। পরিবারে পাঁচজন সদস্য, মাসিক আয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এই আয়ে তিন সন্তানসহ পাঁচ জনের সংসার চালানো এক অলৌকিক চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান বসবাস ও পারিবারিক অবস্থা
অভাব-অনটনের চাপে পরিবারটি গ্রাম ছেড়ে এখন ঢাকায় যাত্রাবাড়ী থানার রায়েরবাগের মাতুয়াইল হাশেম রোড এলাকায় বসবাস করছে। এলাকার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে একটি ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে দিন কাটায়। বড় দুই বোন খাদিজা ও লায়লা, যথাক্রমে ১৭ ও ১৪ বছরের, দু'জনেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে নিম্নবিত্ত চাকরিতে যোগ দিয়েছে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র তৃতীয় শ্রেণী। অভাবের তাড়নায় এক একটি সম্ভাবনা হারিয়ে গেছে অপুষ্টির মতো।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহ মুহূর্ত
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে লাবীব তার স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরছিল। সে তখন ব্যাগ কাঁধে হেঁটে রায়েরবাগের রাস্তায় চলছিল। কিন্তু হঠাৎ শুরু হয় পুলিশের গুলি-বর্ষণ। কোনোরূপ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বেপরোয়া গুলিতে শিশু লাবিবকে গুলিবিদ্ধ করে। গুলিটি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। ছোট্ট দেহে গুলির তীব্র আঘাত সহ্য করতে না পেরে সে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। একটি নিষ্পাপ শিশুর উপর এভাবে রাষ্ট্রীয় অস্ত্র প্রয়োগ ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়!
চিকিৎসার ধাক্কা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
রায়েরবাগ থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় গুরুতর অবস্থায় লাবিবকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা চলে বেশ কয়েকদিন। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় থাকা লাবীব অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যায়। গুলি অপসারণ, ক্ষতস্থান সেলাই, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ এবং চিকিৎসা সামগ্রীর বিপুল খরচ এসব কিছু সামলানো তার দিনমজুর পিতার জন্য একরকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
পিতার অসহায়তা ও পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম
আব্দুল খালেক, বয়স ৪৩, দিনমজুর হিসেবে কাজ করে কোনোমতে পরিবারের খাবার জোগান দিতেন। এখন ছেলের চিকিৎসার খরচে তিনি চূড়ান্ত বিপর্যস্ত। কখনো মানুষের কাছ থেকে ধার করে, কখনো বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য চেয়ে তিনি লাবীবের চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। মা নুরজাহান বেগমও মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে কিছু টাকা রোজগার করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। শিশু লাবীবের বর্তমান অবস্থা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে লাবীবের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। সে আগের মতো হাঁটতে পারে না, খেলতে পারে না, দীর্ঘ সময় বসতেও পারে না। তার পড়ালেখাও থেমে গেছে, স্কুলে যাওয়া এখন কষ্টকর। মাঝে মাঝে ব্যথায় কেঁদে উঠে এই ছোট্ট শিশুটি। তার জীবনের সবচেয়ে রঙিন সময়টাতে সে আজ যন্ত্রণার মধ্যে বন্দি।
মানসিক আঘাত ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
শিশু বয়সেই গুলিবিদ্ধ হওয়ার যে মানসিক ভয়, তা লাবীবের মধ্যে স্থায়ী হয়ে গেছে। সে এখন মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলে, পুলিশের সাইরেন শুনলেই ভয়ে কাঁপে। পরিবারও চুপসে গেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে করুণা আর রাষ্ট্রের উদাসীনতা এই পরিবারকে একপ্রকার সমাজচ্যুত করে তুলেছে।
পুনর্বাসন ও সহায়তার চরম প্রয়োজন
লাবিবের পরিবার বর্তমানে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। চিকিৎসা, পুষ্টি, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা বঞ্চনার শিকার। তাই রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে এই শিশুর চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া উচিত। তাকে মানসিক কাউন্সেলিং এবং বিশেষায়িত শিশু পুনর্বাসন সহায়তা দিতে হবে।
একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধের দৃষ্টান্ত
একজন স্কুলগামী শিশু যখন পুলিশের গুলিতে আহত হয়, তখন তা নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বর্বরতা। কোনো বিচার না হওয়া, দোষীদের শাস্তি না হওয়া এবং সহায়তার অভাব প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র নিজের ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতিও দায়িত্বজ্ঞানহীন।
লেখক কথন
মো: লাবিব হাসানের গুলিবিদ্ধ শরীর এক রাষ্ট্রীয় অমানবিকতার নীরব সাক্ষী। আমরা যদি এখনই তার পাশে না দাঁড়াই, তবে কেবল একটি শিশুই হারিয়ে যাবে না, হারাবে একটি জাতির বিবেক। তাই সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ের উচিত, লাবিবের জীবনের ক্ষত সারিয়ে তাকে নতুন করে বাঁচার সুযোগ দেয়া ও খুনী হাসিনার পেটোয়াদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা।
করণীয় ও প্রস্তাবনা
১. লাবীব হাসানের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
২. তার পরিবারকে একটি পুনর্বাসন সহায়তা প্যাকেজ দিতে হবে, যাতে বাবা-মা আয় উপার্জনে সক্ষম হয়।
৩. দুই বোনের শিক্ষাগত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তাদের শিক্ষাবৃত্তি দিতে হবে।
৪. শিশু নির্যাতনের বিচার ও দোষীদের শান্তি নিশ্চিত করতে। হবে।
৫. আহত শিশুদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

এক নজরে মো: লাবীব হাসান
নাম: মো: লাবীব হাসান
জন্ম তারিখ: ০৪-০৫-২০১৩
জন্মস্থান: শেরপুর
পেশা: ছাত্র, হাজী মনির হোসেন স্কুল
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: মালোজিকান্দা, ইউনিয়ন: ঝিনাইগাতি, থানা: ঝিনাইগাতি, জেলা: শেরপুর
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: রায়েরবাগ, ৬৫ নাম্বার ওয়ার্ড, মাতুয়াইল হাশেম রোড, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মো: আব্দুল খালেক, পিতার পেশা: রাজমিস্ত্রী (দিনমজুর), বয়স: ৪৩ বছর
মায়ের নাম: নুরজাহান বেগম, মায়ের পেশা: গৃহিণী, বয়স: ৩৮ বছর
মাসিক আয়: ১৫,০০০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস: রাজমিস্ত্রী (দিনমজুর)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
ভাই-বোনদের পরিচয়
১. নাম: খাদিজা, বয়স: ১৭, পেশা: চাকরি
২. নাম: লায়লা, বয়স: ১৪, পেশা: চাকরি
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময়: ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍