হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ হাসিব প্রধানিয়া
মোঃ হাসিব প্রধানিয়া

মোঃ হাসিব প্রধানিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : দোকান কর্মচারী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মোঃ হাসিব প্রধানিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৭ ডিসেম্বর ২০০২ সালে চাঁদপুরের আঁশিকাটি গ্রামে। তার পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত, যেখানে বাবা মোঃ শফিকুল ইসলাম ফার্নিচার মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন এবং মা রেশমা বেগম গৃহিণী। হাসিবের ছোটবেলা খুবই সাধারণ পরিবেশে কাটে। পরিবারের ৮ সদস্যের মধ্যে দুই ভাই-বোন, বাবা-মা ছিলেন। ছোট ভাই মোঃ রবিউল গনি ছিল তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। শৈশব থেকেই হাসিব ছিলেন কর্মঠ ও দায়িত্ববান।
তার বাবা-মার কঠোর পরিশ্রম ও আদর্শ তার জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। স্কুল জীবনে দারিদ্রতার জন্য খুব একটা পড়াশোনা করতে পারেননি। অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয় তার। তবুও হাসিব কখনো হতাশ হননি। তিনি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সে তার পরিবারের জন্য ভালো জীবন নিশ্চিত করবে।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশি ভালো না হলেও হাসিবের শৈশব ছিল ভালোবাসা ও স্নেহময়। তিনি খেলাধুলা পছন্দ করতেন এবং গ্রামের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটাতে আনন্দ পেত। তার জীবন ছিল সাধারণ গ্রামের ছেলের জীবন—কষ্ট আছে, পরিশ্রম আছে, কিন্তু স্বপ্নও আছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু করে। শিক্ষার্থীরা দাবী করে, সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং অযাচিত কোটার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি রোধ করতে হবে। আন্দোলনের সময় পুলিশি নির্যাতন এবং কঠোর দমননীতি শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হলেও তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। ২০২৪ সালে এই আন্দোলন নতুন আকারে ফিরে আসে। দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একযোগে সড়কে নামে। তাদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা। হাসিবও তখন সাভারে দোকান কর্মচারী থাকলেও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। তার বিশ্বাস ছিল, শিক্ষার্থীরা সমাজে তাদের ন্যায্য স্থান পাবে। হাসিব জানত, এই আন্দোলন শুধু তার নয়, বরং দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী এবং যুবক-যুবতীর ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিকেলের সময় যখন অন্যান্য কর্মে ব্যস্ত থাকে, হাসিব আন্দোলনের জন্য সময় বের করত। তিনি বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে সমন্বয় করে সাভার বাজার রোডে অবস্থান নিত।
আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
২০ জুলাই ২০২৪, বিকাল প্রায় ৫.৩০ মিনিট। হাসিব বাজার রোডে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ পুলিশ তৎপর হয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায়। পুলিশি লাঠি ও ধাক্কায় হাসিব গুরুতর আহত হন। তার শরীরের একাধিক অংশে আঘাত লাগে এবং প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন।
স্থানীয় সহযোদ্ধারা তাকে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত অবস্থায় হাসিবকে দেখতে যে কেউ হতবাক হতো তবে তার চোখে ছিল দৃঢ়তা। আহত হওয়া সত্ত্বেও হাসিব আন্দোলনের প্রতি তার বিশ্বাস হারায়নি। সে জানত, এই সংগ্রাম তার জন্য না হলেও অন্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রমের সময় তার পরিবার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, হাসিবের এই আহত হওয়া শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং মানসিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জও আনবে। তবে হাসিব ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।
চিকিৎসা
আহত হওয়ার পর হাসিবকে প্রথমে সাভার এনাম মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে, যেমন ঢাকা মেডিকেল, পঙ্গু হাসপাতাল এবং সর্বশেষ সি.এম.এইচ-এ চিকিৎসা চালানো হয়। ডাক্তারদের পরামর্শ ছিল, তাকে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। পরিবারের জন্য এটি ছিল কঠিন সময়। মাসিক আয় কম হওয়ায় চিকিৎসার খরচ বহন করা সহজ ছিল না। হাসিবের পরিবার চিকিৎসা, ওষুধ এবং শারীরিক পুনর্বাসনের জন্য পরিশ্রম করতে থাকে। হাসিবও তার চিকিৎসা সহ্য করার সময় ধৈর্য ও সাহস দেখায়। চিকিৎসার প্রক্রিয়ায় হাসিব শারীরিক ও মানসিকভাবে দৃঢ় হয়ে ওঠে। সে জানে, এই সময়ের সংগ্রাম তার জীবনের একটি অংশ, যা তাকে আরও মজবুত করবে। ডাক্তারদের পরামর্শ অনুসারে সে পুনর্বাসন কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নেয়। চিকিৎসার পাশাপাশি সে তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প রাখে।
পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ
হাসিবের চিকিৎসা চলাকালীন তার পরিবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়। তবে তাদের সমর্থন ও হাসিবের দৃঢ় মনোবল তাকে নতুন শক্তি যোগায়। তার পুনর্বাসন ধীরে ধীরে সম্পন্ন হয় এবং সে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা শুরু করে। হাসিবের জীবনে এই ঘটনা শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং মানসিক শক্তি ও দৃঢ় সংকল্পের পরিচয়ও হয়ে দাঁড়ায়। সে জানে, তার সংগ্রাম অন্যদের জন্য উদাহরণ স্থাপন করবে। ভবিষ্যতে সে নিজের স্বপ্ন ও পরিবারের জন্য কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাবে।

একনজরে
নাম : মোঃ হাসিব প্রধানিয়া
জন্ম তারিখ : ১৭/১২/২০০২
জন্মস্থান : আঁশিকাটি
পেশা : দোকান কর্মচারী
প্রতিষ্ঠান : সোহাগ মশারী স্টোর, সাভার
নিজ জেলা : চাঁদপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম: সথয়ী গ্রাম
ইউনিয়ন: আঁশিকাটি
থানা: চাঁদপুর সদর
জেলা: চাঁদপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মোঃ শফিকুল ইসলাম
মাতার নাম: রেশমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স: ফার্নিচার মিস্ত্রি, ৫০ বছর
মাতার পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৩৮ বছর
মাসিক আয়: ১৫,০০০ টাকা
আয়ের উৎস: ফার্নিচার মিস্ত্রি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৮
ভাইবোনের বিবরণ
১. মোঃ রবিউল গনি, বয়স: ১৫, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান: বাজার রোড, সাভার
আহত হওয়ার সময়কাল: ২০/০৭/২০২৪ বিকাল ৫.৩০ মিনিটের পরে
আক্রমণকারী: পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍