আব্দুল হাই লাভলু
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী (এল.এল.বি)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্মপরিচয়
১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর সদর উপজেলার পূর্ব শ্রীরামদী গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন আব্দুল হাই লাভলু। তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামের উঠোনে খেলা আর মায়ের স্নেহে। বাবা মোঃ সেলিম বেপারি বয়সের ভারে এখন আর কাজ করতে পারেন না, অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন পরিবারের অন্যদের উপর। মা খুরশিদা বেগম সংসারের ভার সামলাতে দিন কাটান নীরব ত্যাগে। সংসারের খরচ মূলত বড় ভাইয়ের উপার্জনের উপর নির্ভর করে, যার মাসিক আয় প্রায় ২০,০০০ টাকা। পরিবারটি বেশ বড়- মোট সদস্য সংখ্যা ৮ জন।
তাদের মধ্যে ছোটরা স্কুলে পড়ে। ভাইপো সাদ আব্দুল্লাহ দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র, বয়স মাত্র ৭ বছর। আবার ভাইগ্না আবিদা রহমান বয়সে মাত্র ৫, পড়ছে প্রথম শ্রেণিতে। এই ছোট্ট সংসার হাসি-কান্না, আশা-নিরাশার মিশেলে চলছে।
আব্দুল হাই ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। স্বপ্ন ছিল আইন শিখে একদিন সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি ভর্তি হন চাঁদপুর ল কলেজে এবং বর্তমানে এল.এল.বি পড়াশোনায় ব্যস্ত। স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে হলেও এখন তিনি থাকেন পুরান বাজার এলাকায়, পড়াশোনা ও নানা কাজে সহজ হওয়ার জন্য।কেবল পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি মাঠে নেমেছেন। সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়, আব্দুল হাই তখনও সেই আন্দোলনের সাথে ছিলেন। তাঁর চোখে একটিই লক্ষ্য— বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ে তোলা।
আন্দলনে অংশগ্রহণ
সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের ভেতরে ছিল অগ্নিশিখা। আমি, আব্দুল হাই, সেদিন চাঁদপুর পৌর বাসস্ট্যান্ডের ফয়সাল শপিং কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম হাজারো ছাত্র জনতার সাথে। হাতে ব্যানার, কণ্ঠে একটাই স্লোগান—“এক দফা, একটাই দফা—খুনি হাসিনার পদত্যাগ!” সকাল ৯টা থেকেই আমরা স্লোগান আর বক্তৃতার মাধ্যমে বাতাস কাঁপিয়ে তুলছিলাম। মনে হচ্ছিল চাঁদপুর শহরের প্রতিটি ইট-পাথর যেন আমাদের সাথে মিলিত হয়ে আওয়াজ তুলছে।কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সহ্য হলো না। বেলা ১১টার দিকে চাঁদপুর স্টেডিয়াম রোড, রোজ ক্যাফে, ঝিল হোটেল আর ইলিশ চত্তরের দিক থেকে ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী এগিয়ে আসতে শুরু করল। তারা প্রতিবাদ সভার নামে জড়ো হয়েছিল, অথচ উদ্দেশ্য ছিল আমাদের রক্ত ঝরানো। মুহূর্তেই আমাদের দিকে ইট-পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। কয়েকজন ভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, রক্ত ঝরতে লাগল তাদের মাথা থেকে। আমরা নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ অবস্থানে ছিলাম। তবু চোখের সামনে ভাইদের রক্ত দেখে আমরা চুপ করে থাকতে পারিনি। আমরা বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললাম। কিন্তু বেলা ১২টার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন শুধু ছাত্রলীগ নয়, তাদের সাথে যুক্ত হলো সন্ত্রাসী যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, মহিলা লীগ—সবাই। তারা হাতে তুলে নিল দেশীয় অস্ত্র—রামদা, চাপাতি, লোহার রড, হকস্টিক, বগী—এবং ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর।
ঘাতক বাহিনী নিরীহ ছাত্রদের ওপর এমন নৃশংসতা চালাল যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। রক্তে ভিজে গেল চাঁদপুর শহরের রাস্তাঘাট। কেউ মাথায় আঘাত পেল, কেউ পিঠে, কারও হাতে-পায়ে গভীর ক্ষত। মেয়েদের চিৎকার, আহতদের আর্তনাদ, ভাঙা কাঁচ আর লোহার আঘাতে শহরটি তখন রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
বছরের পর বছর ধরে ঘাতক হাসিনা সরকার দমন-পীড়ন চালিয়েছে ছাত্র-জনতার ওপর। গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, কারফিউ আর ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করেছে। শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে। আর ছাত্রদের ‘রাজাকার এর বাচ্চা’ বলে অপমান করে সে আমাদের হৃদয়ে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।এই অন্যায়-অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পতাকা হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের দাবি ছিল স্পষ্ট—সমান অধিকার, ন্যায়বিচার এবং খুনি হাসিনা সরকারের পদত্যাগ।
সেদিন চাঁদপুরে আমরা রক্ত দিলাম, ত্যাগ স্বীকার করলাম। কিন্তু ঘাতক সরকারের ভয়ে পিছিয়ে আসিনি। বরং আন্দোলন আরও বেগবান হলো। “আগামীকাল থেকে সারা দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে।”৪ আগস্টের রক্তাক্ত রবিবার আমার জীবনে এক স্থায়ী দাগ কেটে দিয়েছে। সেই দাগ শুধু আমার নয়, প্রতিটি ছাত্রের হৃদয়ে। আমরা বিশ্বাস করি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বিবরণ
৪ আগস্টের আন্দোলনে ঘাতক বাহিনীর নৃশংস হামলায় আমি মারাত্মকভাবে আহত হই। প্রথমে আমাকে দ্রুত চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং মাথার গভীর ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে নিরাপত্তার স্বার্থে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে প্রাইভেট আল-আমিন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ার কারণে আমার মুখ ও নাক দিয়ে দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ হতে থাকে। চিকিৎসকেরা মাথার সিটি স্ক্যান ও বিভিন্ন প্রকার অন্যান্য মেডিকেল টেস্ট করান। একটানা প্রায় তিন মাস আমাকে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন করতে হয়েছে। এই সময়টাতে আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারিনি। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর কারণে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়েছে, বিশেষ করে টেস্ট ও ওষুধ বাবদ খরচ ছিল অনেক বেশি।
চিকিৎসার প্রস্তাবনা হিসেবে আমি মনে করি—যারা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি, তাদের জন্য চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের চিকিৎসায় যাদের উন্নতি হচ্ছে না, তাদের জন্য বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।
আমি একজন ছাত্র হিসেবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। আমাদের মতো আহত ছাত্রদের জন্য শুধু চিকিৎসাই নয়, ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকারও নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। তাই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাব করছি—আহত ব্যক্তিদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে পুরনো দিনের মতো আর কোনো বৈষম্য তৈরি না হয়।
অন্যদিকে, যেসব আহত ব্যক্তি ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদেরকে একটি ভালো অঙ্কের মূলধন দিয়ে সহায়তা করতে হবে, যাতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে নতুন করে দাঁড়াতে পারেন।
একনজর প্রফাইল
নাম : আব্দুল হাই লাভলু
জন্মতারিখ : ০১-০২-১৯৯৫
জন্মস্থান : পূর্ব শ্রীরামদী, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (এল.এল.বি)
প্রতিষ্ঠান : চাঁদপুর ল কলেজ, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর
স্থায়ী ঠিকানা
গ্রাম: পূর্ব শ্রীরামদী
ইউনিয়ন: চাঁদপুর পৌরসভা
থানা: চাঁদপুর সদর
জেলা: চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানা
এলাকা: পুরান বাজার, পূর্ব শ্রীরামদী
থানা: চাঁদপুর সদর
জেলা: চাঁদপুর
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম: মোঃ সেলিম বেপারি (পেশা: বৃদ্ধ, বেকার)
মাতার নাম: খুরশিদা বেগম (পেশা: গৃহিণী)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৮ জন
ভাইপো: সাদ আব্দুল্লাহ (৭ বছর, ২য় শ্রেণি)
ভাইগ্নি: আবিদা রহমান (৫ বছর, ১ম শ্রেণি)
মাসিক আয়: ২০,০০০ টাকা (উৎস: বড় ভাই)
ঘটনার স্থান: চাঁদপুর পৌর বাসস্ট্যান্ড (ফয়সাল শপিং কমপ্লেক্সের সামনে)
ঘটনার তারিখ ও সময়: ০৪-০৮-২০২৪, সকাল ৯টা ু দুপুর ১২টা
আহত হওয়ার কারণ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা
আহতের ধরন: মাথায় গুরুতর আঘাত, মুখ ও নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, গভীর ক্ষত (সেলাইপ্রাপ্ত), দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
আহত শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
যারা ব্যবসা করতে চান তাদের পর্যাপ্ত মূলধন সহায়তা প্রদান
যাতে করে ভবিষ্যতে আর বৈষম্যের শিকার হতে না হয়।
১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর সদর উপজেলার পূর্ব শ্রীরামদী গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন আব্দুল হাই লাভলু। তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামের উঠোনে খেলা আর মায়ের স্নেহে। বাবা মোঃ সেলিম বেপারি বয়সের ভারে এখন আর কাজ করতে পারেন না, অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন পরিবারের অন্যদের উপর। মা খুরশিদা বেগম সংসারের ভার সামলাতে দিন কাটান নীরব ত্যাগে। সংসারের খরচ মূলত বড় ভাইয়ের উপার্জনের উপর নির্ভর করে, যার মাসিক আয় প্রায় ২০,০০০ টাকা। পরিবারটি বেশ বড়- মোট সদস্য সংখ্যা ৮ জন।
তাদের মধ্যে ছোটরা স্কুলে পড়ে। ভাইপো সাদ আব্দুল্লাহ দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র, বয়স মাত্র ৭ বছর। আবার ভাইগ্না আবিদা রহমান বয়সে মাত্র ৫, পড়ছে প্রথম শ্রেণিতে। এই ছোট্ট সংসার হাসি-কান্না, আশা-নিরাশার মিশেলে চলছে।
আব্দুল হাই ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। স্বপ্ন ছিল আইন শিখে একদিন সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি ভর্তি হন চাঁদপুর ল কলেজে এবং বর্তমানে এল.এল.বি পড়াশোনায় ব্যস্ত। স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে হলেও এখন তিনি থাকেন পুরান বাজার এলাকায়, পড়াশোনা ও নানা কাজে সহজ হওয়ার জন্য।কেবল পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি মাঠে নেমেছেন। সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়, আব্দুল হাই তখনও সেই আন্দোলনের সাথে ছিলেন। তাঁর চোখে একটিই লক্ষ্য— বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ে তোলা।
আন্দলনে অংশগ্রহণ
সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের ভেতরে ছিল অগ্নিশিখা। আমি, আব্দুল হাই, সেদিন চাঁদপুর পৌর বাসস্ট্যান্ডের ফয়সাল শপিং কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম হাজারো ছাত্র জনতার সাথে। হাতে ব্যানার, কণ্ঠে একটাই স্লোগান—“এক দফা, একটাই দফা—খুনি হাসিনার পদত্যাগ!” সকাল ৯টা থেকেই আমরা স্লোগান আর বক্তৃতার মাধ্যমে বাতাস কাঁপিয়ে তুলছিলাম। মনে হচ্ছিল চাঁদপুর শহরের প্রতিটি ইট-পাথর যেন আমাদের সাথে মিলিত হয়ে আওয়াজ তুলছে।কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সহ্য হলো না। বেলা ১১টার দিকে চাঁদপুর স্টেডিয়াম রোড, রোজ ক্যাফে, ঝিল হোটেল আর ইলিশ চত্তরের দিক থেকে ছাত্রলীগের সশস্ত্র বাহিনী এগিয়ে আসতে শুরু করল। তারা প্রতিবাদ সভার নামে জড়ো হয়েছিল, অথচ উদ্দেশ্য ছিল আমাদের রক্ত ঝরানো। মুহূর্তেই আমাদের দিকে ইট-পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। কয়েকজন ভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, রক্ত ঝরতে লাগল তাদের মাথা থেকে। আমরা নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ অবস্থানে ছিলাম। তবু চোখের সামনে ভাইদের রক্ত দেখে আমরা চুপ করে থাকতে পারিনি। আমরা বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললাম। কিন্তু বেলা ১২টার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন শুধু ছাত্রলীগ নয়, তাদের সাথে যুক্ত হলো সন্ত্রাসী যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, মহিলা লীগ—সবাই। তারা হাতে তুলে নিল দেশীয় অস্ত্র—রামদা, চাপাতি, লোহার রড, হকস্টিক, বগী—এবং ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর।
ঘাতক বাহিনী নিরীহ ছাত্রদের ওপর এমন নৃশংসতা চালাল যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। রক্তে ভিজে গেল চাঁদপুর শহরের রাস্তাঘাট। কেউ মাথায় আঘাত পেল, কেউ পিঠে, কারও হাতে-পায়ে গভীর ক্ষত। মেয়েদের চিৎকার, আহতদের আর্তনাদ, ভাঙা কাঁচ আর লোহার আঘাতে শহরটি তখন রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
বছরের পর বছর ধরে ঘাতক হাসিনা সরকার দমন-পীড়ন চালিয়েছে ছাত্র-জনতার ওপর। গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, কারফিউ আর ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করেছে। শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে। আর ছাত্রদের ‘রাজাকার এর বাচ্চা’ বলে অপমান করে সে আমাদের হৃদয়ে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।এই অন্যায়-অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পতাকা হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের দাবি ছিল স্পষ্ট—সমান অধিকার, ন্যায়বিচার এবং খুনি হাসিনা সরকারের পদত্যাগ।
সেদিন চাঁদপুরে আমরা রক্ত দিলাম, ত্যাগ স্বীকার করলাম। কিন্তু ঘাতক সরকারের ভয়ে পিছিয়ে আসিনি। বরং আন্দোলন আরও বেগবান হলো। “আগামীকাল থেকে সারা দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে।”৪ আগস্টের রক্তাক্ত রবিবার আমার জীবনে এক স্থায়ী দাগ কেটে দিয়েছে। সেই দাগ শুধু আমার নয়, প্রতিটি ছাত্রের হৃদয়ে। আমরা বিশ্বাস করি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বিবরণ
৪ আগস্টের আন্দোলনে ঘাতক বাহিনীর নৃশংস হামলায় আমি মারাত্মকভাবে আহত হই। প্রথমে আমাকে দ্রুত চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং মাথার গভীর ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে নিরাপত্তার স্বার্থে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে প্রাইভেট আল-আমিন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ার কারণে আমার মুখ ও নাক দিয়ে দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ হতে থাকে। চিকিৎসকেরা মাথার সিটি স্ক্যান ও বিভিন্ন প্রকার অন্যান্য মেডিকেল টেস্ট করান। একটানা প্রায় তিন মাস আমাকে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন করতে হয়েছে। এই সময়টাতে আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারিনি। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর কারণে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়েছে, বিশেষ করে টেস্ট ও ওষুধ বাবদ খরচ ছিল অনেক বেশি।
চিকিৎসার প্রস্তাবনা হিসেবে আমি মনে করি—যারা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি, তাদের জন্য চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের চিকিৎসায় যাদের উন্নতি হচ্ছে না, তাদের জন্য বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।
আমি একজন ছাত্র হিসেবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। আমাদের মতো আহত ছাত্রদের জন্য শুধু চিকিৎসাই নয়, ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকারও নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। তাই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাব করছি—আহত ব্যক্তিদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে পুরনো দিনের মতো আর কোনো বৈষম্য তৈরি না হয়।
অন্যদিকে, যেসব আহত ব্যক্তি ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদেরকে একটি ভালো অঙ্কের মূলধন দিয়ে সহায়তা করতে হবে, যাতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে নতুন করে দাঁড়াতে পারেন।
একনজর প্রফাইল
নাম : আব্দুল হাই লাভলু
জন্মতারিখ : ০১-০২-১৯৯৫
জন্মস্থান : পূর্ব শ্রীরামদী, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (এল.এল.বি)
প্রতিষ্ঠান : চাঁদপুর ল কলেজ, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর
স্থায়ী ঠিকানা
গ্রাম: পূর্ব শ্রীরামদী
ইউনিয়ন: চাঁদপুর পৌরসভা
থানা: চাঁদপুর সদর
জেলা: চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানা
এলাকা: পুরান বাজার, পূর্ব শ্রীরামদী
থানা: চাঁদপুর সদর
জেলা: চাঁদপুর
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম: মোঃ সেলিম বেপারি (পেশা: বৃদ্ধ, বেকার)
মাতার নাম: খুরশিদা বেগম (পেশা: গৃহিণী)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৮ জন
ভাইপো: সাদ আব্দুল্লাহ (৭ বছর, ২য় শ্রেণি)
ভাইগ্নি: আবিদা রহমান (৫ বছর, ১ম শ্রেণি)
মাসিক আয়: ২০,০০০ টাকা (উৎস: বড় ভাই)
ঘটনার স্থান: চাঁদপুর পৌর বাসস্ট্যান্ড (ফয়সাল শপিং কমপ্লেক্সের সামনে)
ঘটনার তারিখ ও সময়: ০৪-০৮-২০২৪, সকাল ৯টা ু দুপুর ১২টা
আহত হওয়ার কারণ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা
আহতের ধরন: মাথায় গুরুতর আঘাত, মুখ ও নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, গভীর ক্ষত (সেলাইপ্রাপ্ত), দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
আহত শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
যারা ব্যবসা করতে চান তাদের পর্যাপ্ত মূলধন সহায়তা প্রদান
যাতে করে ভবিষ্যতে আর বৈষম্যের শিকার হতে না হয়।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍