হোম / আহতদের তালিকা / আল আমিন ফাহিম
 আল আমিন ফাহিম

আল আমিন ফাহিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
২০০৬ সালের ১১ মে। খাগড়াছড়ির শান্ত পাহাড়ি পরিবেশে, কলাবাগান নামের ছোট্ট এক গ্রামে জন্ম নেয় আল আমিন ফাহিম। পাহাড় ঘেরা এই এলাকা প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও জীবনযাত্রা সহজ ছিল না। পরিবারে ছিল স্বল্প আয়ের চাপে টিকে থাকার লড়াই। ফাহিমের বাবা আনোয়ার হোসেন একজন অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি করতেন, মাসিক আয় ছিল সীমিত। মা আফরোজা আক্তার ছিলেন গৃহিনী, সংসারের সকল দায়িত্ব তার কাঁধে। ছোটবেলা থেকেই ফাহিম ছিল মেধাবী ও কৌতূহলী।

গ্রামের কাঁচা রাস্তা, পাহাড়ি ঝর্ণা আর সবুজ প্রকৃতির মাঝে বড় হতে হতে তার ভেতর জন্ম নেয় দৃঢ় মনোবল। পড়াশোনায় সবসময় ভালো করলেও সংসারের অভাব তাকে শিখিয়েছে কষ্টের সাথে মানিয়ে নিতে। ভাই আল মাহমুদের সঙ্গে ফাহিমের সম্পর্ক ছিল খুব ঘনিষ্ঠ। দুই ভাই প্রায়ই মাঠে ফুটবল খেলত, কখনো বা বই পড়ে স্বপ্ন দেখত বড় কিছু করার। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে বলতেন ফাহিম একদিন সমাজে পরিবর্তনের কণ্ঠ হবে।তার বন্ধুদের কাছেও সে ছিল সৎ, সহানুভূতিশীল এবং সাহসী। খাগড়াছড়ির মতো প্রত্যন্ত এলাকায় থেকেও ফাহিম খবর রাখত দেশের রাজনীতি আর আন্দোলনের। কিশোর বয়স থেকেই সে বুঝতে শুরু করেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, নীরব থাকলে চলবে না।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বহুদিন ধরেই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রথম এই আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে। তখন ফাহিম কেবল এক কিশোর, কিন্তু টেলিভিশন আর পত্রিকার খবর দেখে তার ভেতরে জন্ম নেয় প্রশ্ন কেন যোগ্যতার বদলে প্রাপ্য সুযোগ কেবল কয়েকজনের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে?২০২৪ সালে যখন নতুন করে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়, তখন ফাহিম কলেজের ছাত্র। এবার সে আর দর্শক হয়ে থাকেনি। খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় গড়ে ওঠা মিছিল, সমাবেশে সে সরাসরি অংশ নিতে শুরু করে। বন্ধুদের সঙ্গে প্ল্যাকার্ড লিখত, স্লোগান দিত। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকার বরাবরের মতো শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে। বরং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বাহিনীকে ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের দমন করা শুরু করে। পুলিশও নিরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।
তবু ভয় না পেয়ে ফাহিম দৃঢ় কণ্ঠে বলত আমরা ন্যায্য অধিকার চাই, দয়া নয়। এই অবস্থান তাকে খাগড়াছড়ির তরুণদের কাছে সাহসী ছাত্রনেতার মতো করে তোলে।
আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট সকাল। খাগড়াছড়ি সদর কোর্ট বিল্ডিং এর সামনে শিক্ষার্থীদের বিশাল মিছিল হয়। ফাহিম হাতে মাইক নিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল মেধার মূল্যায়ন চাই, অন্যায় বন্ধ হোক। মিছিল এগোতে থাকলে হঠাৎ জেলা আওয়ামী লীগ অফিস থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একদল সন্ত্রাসী লাঠি, রড, ইট নিয়ে বের হয়ে আসে।প্রথমে তারা ভয় দেখিয়ে মিছিল ভাঙ্গার চেষ্টা করে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো প্রতিরোধ করে না। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সবাই দৌড়াতে থাকে, ফাহিমও ভাঙ্গা ব্রিজের দিকে ছুটে যায়। সেখানে গিয়ে হঠাৎ একটি ইট এসে তার পেটে আঘাত করে। প্রথমে সে ভেবেছিল আঘাতটা তেমন গুরুতর নয়, কিন্তু কয়েকদিন পর গলা দিয়ে রক্ত আসা শুরু হয়। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে পড়ে যায় অসুস্থ হয়ে। তখনো সে ভাবছিল এটা আমার লড়াইয়ের মূল্য, পিছু হটার জন্য নয়।সেদিনের সেই আক্রমণে বহু ছাত্র আহত হয়েছিল। আর ফাহিম হয়ে ওঠে খাগড়াছড়ির আন্দোলনকারীদের চোখে সাহস আর ত্যাগের প্রতীক।
চিকিৎসা ও পরবর্তী সংগ্রাম
আঘাত পাওয়ার পর ফাহিমকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে সেভরন হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তাররা জানায় তার টনসিল ও পাশ্ববর্তী জায়গায় গুরুতর সমস্যা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু অর্থের সংকটে পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। পরে তাকে খাগড়াছড়ি ঈগঐ হয়ে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ইনজেকশন ও ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা চলে। বিশেষত ইনজেকশন না নিলে প্রচণ্ড ব্যথা আর বমি হতো। পড়াশোনাও বাধাগ্রস্ত হয়, তবুও সে পড়াশোনা ছাড়েনি। বর্তমানে ফাহিম চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও স্বপ্ন দেখে একদিন সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনা শেষ করবে এবং দেশের জন্য কাজ করবে। সে বলে আমরা লড়েছি সবার অধিকার আদায়ের জন্য। হয়তো আমার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু মনোবল নয়।তার পরিবার এখনো অর্থকষ্টে দিন কাটায়। মাসিক আয়ের বেশিরভাগই চলে যায় চিকিৎসার পেছনে। তারা আশা করে একদিন ফাহিম উন্নত চিকিৎসা পাবে, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। ‎আল আমিন ফাহিম কেবল একজন আহত ছাত্র নয়, বরং বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের এক সাহসী মুখ। তার শৈশবের সংগ্রাম, আন্দোলনের অংশগ্রহণ, আঘাত পাওয়া আর চিকিৎসার লড়াই সবকিছুই প্রমাণ করে যে তরুণ প্রজন্ম ন্যায়ের জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখতে দ্বিধা করে না।

একনজর প্রফাইল
নাম : আল আমিন ফাহিম
জন্ম তারিখ : ১১-০৫-২০০৬
জন্মস্থান : কলাবাগান, খাগড়াছড়ি
পেশা : ছাত্র
প্রতিষ্ঠান : খাগড়াছড়ি ক্যাডেটমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ
নিজ জেলা : খাগড়াছড়ি
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম : কলাবাগান
ইউনিয়ন : পৌর খাগড়াছড়ি সদর
থানা : খাগড়াছড়ি সদর
জেলা : খাগড়াছড়ি
বর্তমান ঠিকানা : হোল্ডিং নং ০৫৪০-০০, বালাবাগান, কলাবাগান, খাগড়াছড়ি সদর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : আনোয়ার হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : অফিস সহায়ক / ৫২ বছর
মায়ের নাম : আফরোজা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিনী / ৪০ বছর
মাসিক আয় : ২০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : অফিস কর্মকর্তা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫জন
ভাইবোনদের বিবরণ
১. আল মাহমুদ, বয়স ১৬, ছাত্র, ১০ম শ্রেণি, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : ভাঙ্গা ব্রিজ, খাগড়াছড়ি
আহত হওয়ার সময়কাল : ০৪-০৮-২০২৪, সকাল ১০.০০ ু দুপুর ১২.০০
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍