হোম / আহতদের তালিকা / মো: শহিদুল ইসলাম
মো: শহিদুল ইসলাম

মো: শহিদুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সিরাজগঞ্জের দৌলতপুরে ১৯৮৩ সালের ৬ জুন জন্ম নেওয়া মো: শহিদুল ইসলাম জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে শিখেছেন পরিশ্রমই মানুষের সম্মান। ঢাকার রাস্তায় ফেরি করে মাঠা বিক্রি করে পরিবার চালালেও তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদায় অটল, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নেই দিন কাটত তাঁর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর আন্দোলন মুহূর্তে পুলিশের গুলি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হলে থেমে যায় কর্মজীবনের তাল, শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও সংগ্রামের পথ। বহু হাসপাতাল ঘুরে আজও পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি, তবুও মনোবল হারাননি পরিবারের জন্য লড়াইয়ের সংকল্পে। শহিদুল ইসলাম শুধু এক আহত ফেরিওয়ালা নন তিনি ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষায় অটুট এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

পুলিশের গুলিটি তার শরীরের বুকে এসে বিদ্ধ হয়
মো: শহিদুল ইসলাম
ক্রমিক: ০৫২
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫২
পরিচিতি
তিনি কোনোদিন কারো কাছে হাত পাতেননি, বরং গরমে রোদে ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মো: শহিদুল ইসলামের জন্ম ১৯৮৩ সালের ৬ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার দৌলতপুর গ্রামে। বাবা হাজী হাবিবুর রহমান এখন মৃত, আর মা মোছা: তোতা বানু বর্তমানে জীবিত, বয়স ৮৩ বছর। শহিদুলের বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত এক গ্রামীণ বাস্তবতায়, যেখানে পরিশ্রম ছিল জীবনের নিত্যসঙ্গী। একান্নবর্তী পরিবারে ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন আত্মত্মনির্ভরশীল। শিক্ষা না পেলেও জীবনের বাস্তবতা থেকে শিখেছেন হাল না ছাড়ার সাহস। বর্তমানেও তিনি তার বৃদ্ধা মাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে বসবাস করেন।
পেশা ও জীবন সংগ্রাম
শহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ফেরি করে মাঠা (দইয়ের পানীয়) বিক্রি করেন। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায়, বিশেষ করে গণপরিবহন ও বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় তিনি তার মাঠা বিক্রি করে সংসার চালান। তার মাসিক আয় ৩০-৩৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে নয় সদস্যের পরিবার চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তিনি কোনোদিন কারো কাছে হাত পাতেননি, বরং গরমে রোদে ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার পেশা সমাজে বড় কিছু মনে না হলেও, এটি ছিল তার আত্মসম্মান ও জীবিকার অবলম্বন।
পরিবার ও সন্তানেরা
শহিদুল ইসলামের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৯ জন। তার তিন সন্তান হাফেজ মো: নাফিজ (১৮), মোছা: সুমাইয়া খাতুন (১৬), এবং সাবিহা খাতুন (৫)। বড় ছেলে হাফেজ নাফিজ জাবালে নূর মসজিদ মাদ্রাসার ছাত্র, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়েরা ইসলামিয়া। মহিলা মাদ্রাসায় পড়ে, একজন অষ্টম শ্রেণিতে, অন্যজন প্লে-গ্রুপে। তিনি সন্তানদের আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন এবং সে লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। তার ইচ্ছা, সন্তানরা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে, দেশের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যাত্রাবাড়ী এলাকায় যখন হাজারো মানুষ ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামে, শহিদুল ইসলামও নিজেকে শামিল করেন। তিনি ছিলেন নীরব সমর্থক, তবে সেদিন মাঠে ছিলেন দৃশ্যমান প্রতিবাদকারী। সেই দুপুরে পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। গুলিটি শরীরের নিচের দিকে বিদ্ধ হয়, তাৎক্ষণিক রক্তপাত হয়। স্থানীয়রা তাকে তুলে নিয়ে যায় ইসলামিয়া হাসপাতালে। সেখান। থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ চিকিৎসা ও ভোগান্তির যাত্রা।
চিকিৎসা সংক্রান্ত সংগ্রাম
আহত হওয়ার পর প্রথমে তাকে ইসলামিয়া হাসপাতালে নেয়া হয়, কিন্তু সেখানে চিকিৎসা উপেক্ষিত হয়। এরপর মুগদা মেডিকেলে নেয়া হলেও তেমন সাড়া মেলেনি। অবশেষে পি জি হাসপাতালে (বার্ন ইউনিট) ভর্তি করানো হয়, যেখানে টানা ৭মাস ভর্তি ছিলেন শহিদুল। সেখানে সামান্য উন্নতি হয়, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হননি। তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তার পরিবার ন্যূনতম ১,৭০,০০০ টাকা খরচ করে। এখনো তিনি সঠিকভাবে হাঁটতে পারেন না, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
চিকিৎসার খরচ, ব্যবসা বন্ধ থাকা, ঘর ভাড়া, খাবার ও শিশুদের পড়ালেখার খরচ মেটাতে গিয়ে শহিদুল ইসলামের পরিবার চরম সংকটে পড়েছে। যাত্রাবাড়ীর মতো জায়গায় বসবাস করতে গেলে মাসিক খরচ অনেক বেশি। আবার মাঠা বিক্রির মতো পেশায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা তিনি আর পারেন না। ফলে আয় কমে গেছে। একসময় যে ব্যবসা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, এখন তা বন্ধের পথে। পুরো পরিবারে হতাশা আর উদ্বেগের ছায়া।
রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও সহায়তার অভাব
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে শহিদুল ইসলাম রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পাননি। বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের অভাবে উপেক্ষিত থেকেছেন। কোনো চিকিৎসা ফান্ড, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বা মানবিক সহায়তা তার কপালে জোটেনি। এমনকি কেউ খোঁজও নেয়নি তার অবস্থা জানতে। অথচ তিনি একজন গুলিবিদ্ধ নাগরিক, যার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পাওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
লেখক কথন
মো: শহিদুল ইসলামের জীবন কেবল একটি গুলির আঘাত নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্র ও সমাজের পরীক্ষার আয়না। তার শরীর রক্তাক্ত হলেও মন এখনো বেঁচে থাকতে চায়, বাঁচাতে চায় পরিবারকে। সমাজ যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তবে তিনি আবার হাঁটবেন, কাজ করবেন, সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে লড়বেন। শহিদুল ইসলাম শুধু একজন মাঠা বিক্রেতা নন, তিনি একজন প্রতিবাদী মানুষ, একজন আহত যোদ্ধা।
সহায়তা ও পুনর্বাসনের প্রস্তাব
১. চিকিৎসা খরচ বাবদ ২ লক্ষ টাকা এককালীন অনুদান
২. ব্যবসা পুনরায় শুরু করতে ৫০,০০০ টাকা মূলধন সহায়তা

এক নজরে মো: শহিদুল ইসলাম
নাম: মো: শহিদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ: ০৬-০৬-১৯৮৩
জন্মস্থান: দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জ
পেশা: ব্যবসা (ফেরী করে মাঠা বিক্রি করেন)
নিজ জেলা: সিরাজগঞ্জ
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: দৌলতপুর, ইউনিয়ন: দৌলতপুর, থানা: বেলকুচি, জেলা: সিরাজগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: যাত্রাবাড়ী ৪৮নং ওয়ার্ড, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: হাজী হাবিবুর রহমান (মৃত)
মায়ের নাম: মোছা: তোতা বানু, বয়স: ৮৩
মাসিক আয়: ৩০-৩৫ হাজার
আয়ের উৎস: ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:
৯ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. নাম: হাফেজ মো: নাফিজ, বয়স: ১৮, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: অষ্টম, প্রতিষ্ঠান: জাবালে নূর মসজিদ মাদ্রাসা
২. নাম: মোছা: সুমাইয়া খাতুন, বয়স: ১৬, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: অষ্টম, প্রতিষ্ঠান: ইসলামিয়া মহিলা মাদ্রাসা
৩. নাম: সাবিহা খাতুন, বয়স ৫. পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: প্লে,
প্রতিষ্ঠান: ইসলামিয়া মহিলা মাদ্রাসা
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান: যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ : ৫ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍