হোম / আহতদের তালিকা / মো: হেফাজ উদ্দীন
মো: হেফাজ উদ্দীন

মো: হেফাজ উদ্দীন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ব্যবসা, মুদি দোকান

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আগষ্টের বিকেলে প্রতিবাদের গর্জন ও রক্তাক্ত বাস্তবতা

৪ আগস্ট, ২০২৪। বিকেল তখন ঠিক পাঁচটা। দাবিদাওয়া ছিল একটিই একদফা, অবিচল সরকার পতনের দাবি। আমরা কয়েকজন প্রত্যয়ে দৃঢ়, হৃদয়ে আগুন জ্বেলে, হাতে পতাকা তুলে সেই গণআন্দোলনে শরিক হই। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে, অথচ আমাদের চোখে ছিল এক নতুন ভোরের স্বপ্ন। স্লোগানে মুখরিত চারদিক, আমরা মিছিল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম পশ্চিম চাম্বল মুখের দিকে। হঠাৎ, যেন বজ্রপাতের মতো আচমকা নেমে এলো নিপীড়নের খড়গ। পুলিশের দল তাণ্ডব শুরু করল আকাশে ছুটে উঠল টিয়ারশেলের ধোঁয়া, সাথে সাথে কান ফাটানো শব্দে ছুটল রাবার বুলেট ও গুলি। মুহূর্তেই বদলে গেল দৃশ্যপট, যেন আন্দোলনের মাটিতে নেমে এলো যুদ্ধের বিভীষিকা।

এই হঠাৎ আক্রমণের মাঝে, আমি দেখতে পেলাম বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ হতে, কান্না আর চিৎকারে ভরে উঠলো আকাশ-বাতাস। এক পর্যায়ে, আমার দেহে এসে আঘাত হানে রাবার বুলেট একটি আমার হাতে, একটি পায়ে, আর একটি বুকে বিদ্ধ হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমার চারপাশ ঘোলাটে হয়ে উঠল। পায়ের নিচে মাটি যেন সরে গেল, আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম সেই রক্তিম রাস্তায়, যেখানে একটু আগেও আমরা ন্যায়ের গান গাইছিলাম।

কিন্তু আমি একা ছিলাম না। আমার সহযোদ্ধারা, আমার ভাইয়ের মতো বন্ধুরা আমাকে ধরাধরি করে তুলল। আহত দেহটিকে টেনে হিঁচড়ে তারা পৌঁছে দিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ধুলোমাখা প্রতিবাদী শরীর নিথর হলেও, মন তখনও জেগে ছিল এক নতুন ভোরের আশায়।

স্বৈরাচারের দোসর
আওয়ামী ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মুখোশে লুকিয়ে থাকা এক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপর চালানো হয় গুম,খুন,হয়রানি ও মিথ্যা মামলার ধারাবাহিক হামলা। সরকারের সমালোচক, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এমনকি সাধারণ জনগণও পরিণত হয় নজরদারির শিকার। এই ভয়ের রাজনীতি ধীরে ধীরে দেশকে পরিণত করে একটি নতজানু করদরাজ্যে, যেখানে জনগণ আর রাষ্ট্রের মালিক নয় বরং একটি দমনযন্ত্রের নিঃশব্দ ভুক্তভোগী মাত্র। মানুষ তখন কথা বলা ভুলে যায়,প্রতিবাদ করা শিখে নেয় চাপা কান্নার ভিতর দিয়ে।

পাথরের আঘাতে থেমে যাওয়া বিকেল
৪ আগস্ট, ২০২৪। বিকেল ঠিক পাঁচটা। শহরের বাতাস ছিল ভারী, যেন ঘনিয়ে আসছে কিছু একটার পূর্বাভাস। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম একদফা দাবিতে চলমান সরকার পতনের আন্দোলনে যোগ দিতে যাচ্ছি। বুকভরা আশা আর কণ্ঠে স্লোগানের জ্বালাময় আগুন নিয়ে রওনা হলাম পশ্চিম চাম্বল মুখের দিকে। মিছিলের ধ্বনি চারপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। শহরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মানুষের ইচ্ছা, প্রতিবাদ আর অপেক্ষার সুর। সবার কণ্ঠে ছিল একই আহ্বান এক দুঃশাসনের পতন। কিন্তু এই স্বপ্নযাত্রা বেশি দূর এগোয়নি। আমরা যখন পশ্চিম চাম্বল এলাকায় পৌঁছালাম, তখনই আকাশ যেন ছিঁড়ে পড়ল। আচমকা শুরু হল পুলিশের বর্বর হামলা। চারদিকে ছুটে বেড়াতে লাগল টিয়ারসেলের ধোঁয়া, রাবার বুলেট আর গুলির শব্দ। মানুষ দৌড়াচ্ছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, কেউ বাঁচার চেষ্টায় ছুটছে, কেউ রাস্তার ওপর পড়ে আছে নিথর। আমি সামনে এগোনোর চেষ্টায় ছিলাম, ঠিক তখনই, না-চিনে আসা এক পাথর সজোরে এসে আঘাত করল আমার মাথায়।

সেই মুহূর্তটা যেন থেমে গেল। চারপাশের শব্দ এক নিমেষে দূরে সরে গেল। চোখের সামনে অন্ধকার, কানে কেবল একটানা একটা ঝি ঝি শব্দ। মাথা ঘুরে উঠল, ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। পাথরের আঘাত থেকে রক্ত ঝরছে, গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। শরীরের আরেক পাশে তখন রাবার বুলেটের আঘাত হাত, পা, বুকে জ্বালাময় যন্ত্রণা। আমি কিছু বলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু কণ্ঠ যেন আটকে যাচ্ছিল রক্তে আর ধোঁয়ায়। এরপর শুধু মনে আছে, আমার সহযোদ্ধারা ছুটে এলো। কেউ মাথা তুলছে, কেউ কাপড় ছিঁড়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে। কারও মুখে আতঙ্ক, কারও মুখে দৃঢ়তা "তোর কিছু হবে না ভাই, ধৈর্য ধর!"

তারা আমাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে চোখ বুঁজে ফেলেছিলাম, কিন্তু মনের ভিতরে তখনও বাজছিল সেই স্লোগান “এক দফা, এক দাবি সরকারের পতন চাই!”

শেষ কথা
সেদিনের সেই পাথরের আঘাত আমার মাথায় দাগ রেখেছে, কিন্তু হৃদয়ের সাহস আরও পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেছে। আমি জানি, এই রক্ত কোনোদিন বৃথা যাবে না। এই লড়াই একদিন ফল দেবে, ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে।

চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আহত অবস্থায় তখন পরিস্থিতি তখন এতটাই বিপজ্জনক যে সহযোদ্ধারা আমাকে সরাসরি চট্টগ্রাম নয়—প্রথমে বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে আমার মাথার আঘাত ও শরীরের ক্ষত প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা করা হয়। স্যালাইন চলে, রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা চলে। হাসপাতালের সাদা আলোয় চোখ খুললে বারবার মনে হচ্ছিল, এ কি সত্যিই ঘটছে?
সেখান থেকে পরে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের সদস্যরা সব ছেড়ে আমার পাশে দাঁড়ায়। চিকিৎসা চলতে থাকে বাসাতেই।

একনজরে মোহাম্মদ হেফাজ উদ্দীন
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মোহাম্মদ হেফাজ উদ্দীন
জন্ম তারিখ : ০১-০১-২০০০
জন্মস্থান : মুন্সিখীল,চাম্বল
পেশা : ব্যবসায়ী
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: মুন্সিখীল, ইউনিয়ন: চাম্বল, থানা: বাঁশখালী, জেলা: চট্টগ্রাম

পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মোহাম্মদ ছৈয়দুল ইসলাম
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসায়ী (৫৫)
মায়ের নাম : দেলোয়ারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, (৪৫)
পারিবারিক অবস্থা : নিম্নবিত্ত
আয়ের উৎস : ব্যবসা
বাড়ী : টিনের বেড়ার বাড়ি
সম্পদ : ১০ শতক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭জন
ভাই নাম : আজগর (৩৫)
বোন নাম : হালিমা (৩০) , গৃহিণী

ঘটনার স্থান: পশ্চিম চাম্বল, বাঁশখালী
আক্রমণকারী: পুলিশ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী সন্ত্রাসী-হারুন চেয়ারম্যান ও তার সহযোগী উল্লেখযোগ্য
আহত হওয়ার সময়কাল: ৪ আগস্ট, ২০২৪ বিকাল ৫.০০

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍