হোম / আহতদের তালিকা / এ. এ. এম. তাওহীদ
এ. এ. এম. তাওহীদ

এ. এ. এম. তাওহীদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: শিক্ষার্থী, উত্তর চন্ডিপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয়
আগুনের ভিতর দিয়ে হাঁটা এক কিশোর
ফেনীর পইয়াকুবপুরের এক নিরীহ গ্রাম থেকে উঠে আসা এক নাম এ. এ. এম. তাওহীদ। জন্ম ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি, দাগনভূঞাঁর শান্ত জনপদে। পিতা মুহাম্মদ আইউব আলী একজন সাধারণ শিক্ষক, মাসে আয় মাত্র দশ হাজার টাকা; মা বিবি খাদিজা ঘরের শান্ত ছায়া। তিন ভাই-বোনের পরিবারে তাওহীদ ছোট হলেও চিন্তায় ছিল বড়, আর মননে ছিল দেশপ্রেম আর ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস।
সে পড়ে উত্তর চন্ডিপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায়। জীবন ছিল সরল কিন্তু সমাজ যখন হয়ে পড়ে অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন সেই সরল জীবন আর নিরবতা ধরে রাখা যায় না। ১৫ বছরের শাসন, ভোটবিহীন রাতের নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর দমনের বিরুদ্ধে যখন সারাদেশের কিশোর-তরুণ রাস্তায় নামে, তখন তাওহীদও চুপ করে থাকতে পারেনি।

আন্দোলনে অংশগ্রহন ও অবদান
সকাল থেকেই মহিপাল মোড়ে উত্তেজনার ঢেউ। প্ল্যাকার্ড হাতে, কণ্ঠে শ্লোগান, চোখে আগামীর স্বপ্ন। তাওহীদ সেদিন আর পাঁচজন সাধারণ তরুণের মতোই দাঁড়িয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আওয়ামী নিপীড়নের বিরুদ্ধে। ১৫ বছরের ভোটবিহীন শাসনের ভারে ভারাক্রান্ত দেশ যেন এক নতুন ভোরের খোঁজে রাস্তায় নেমেছিল, আর তাওহীদ সেই ভোরের সৈনিক।
যোহরের পরেই হঠাৎ শুরু হয় হুলুস্থুল। ট্রাংক রোডের দিক থেকে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বহর আসে। হাতে ছিলো আগ্নেয়াস্ত্র, মুখে ছিলো দম্ভ, আর চোখে ছিলো হিংস্রতা। মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয় প্রতিবাদকারীরা। তাওহীদ বাঁচার জন্য সঙ্গীদের নিয়ে ছুটে চলে দাগনভূঞাঁর দিকে। কিন্তু পথ তাকে রক্ষা করেনি। বেকের বাজারের মামুন চেয়ারম্যান, একসময় যাকে সবাই চিনতো একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে, সেই সেদিন তাওহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে ধরে এনে, রাস্তার মাঝখানে বেধড়ক মারধর করে। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় জনতা হোটেলের একটি অন্ধকার কামরায় যেখানে তাকে বন্দি করে রাখা হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত।
দিনশেষে, বাবা এসে হাজির হন। সন্তানের মুক্তির আশায় পিতার চোখে তখন আতঙ্ক, ক্লান্তি আর অপমানের কান্না। কিন্তু সেখানেও থেমে থাকেনি নির্যাতন। বাবাকে গালিগালাজ, অপমান করে একরকম দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাওহীদকে। কিন্তু শরীরী মুক্তির সাথে সাথে আরও একরকম শেকল পড়ে তার মনে ফ্যাসিবাদী শাসনের লাঞ্ছনা আর আওয়ামী দানবীয় চোখ রাঙানির চিহ্ন।
এই ঘটনা কেবল তাওহীদের ব্যক্তিগত বেদনা নয় এ এক জাতির ঘুম ভাঙার গল্প। জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোয় “এক দফা এক দাবি, হাসিনা কবে যাবি” এই স্লোগান ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, ছিল আত্মার চিৎকার। তাওহীদের মতো সাহসী তরুণরাই সেই চিৎকারকে রাজপথে রক্ত দিয়ে জীবন্ত করেছিল।

চিকিৎসা
তাওহীদের ওপর ঘটে যাওয়া আওয়ামী বর্বর আক্রমণের পর শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও ছিল অসহ্য যন্ত্রণা। মারধরের পর যখন জ্ঞান হারিয়ে জনতা হোটেলের অন্ধকার কক্ষে ফেলে রাখা হয়েছিল, তখন শরীরটা ছিল ক্লান্ত, আহত ও রক্তাক্ত। মুক্তির পর সবার আগে প্রয়োজন ছিল চিকিৎসা। স্থানীয় এক মানবিক ডাক্তার, যিনি তাদের ইউনিয়নের একজন সাধারণ চিকিৎসক, তিনি প্রথম তাওহীদের গায়ে ও মাথায় হাত রাখেন। তাঁর কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া হয়। পেটের ব্যথা, ফুলে যাওয়া গাল, মাথার রক্ত জমাট অংশ। সবই সুরক্ষিত করার চেষ্টায় প্রাথমিক ব্যান্ডেজ ও ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু অবস্থার জটিলতা দেখে পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে নিয়ে যান দাগনভূঞাঁর পপুলার হাসপাতাল-এ। সেখানে শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি চলতে থাকে পর্যবেক্ষণ, ব্যথানাশক, এন্টিবায়োটিক ও মানসিক সাপোর্ট।

চিকিৎসকেরা জানান, দীর্ঘমেয়াদি বিশ্রাম প্রয়োজন হবে, কারণ তাওহীদের শরীরে যে ঘা পড়েছে তা শুধু হাড়ে-মাংসে নয়, হৃদয়ে ও সাহসে।

প্রস্তাবনা
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে যে তাওহীদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিল, সেই তাওহীদ এখনো একজন শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখছে এক আলোকিত ভবিষ্যতের। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। সীমিত পারিবারিক আয়ের মধ্যে চিকিৎসা ও পড়াশোনার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। তাওহীদ চান লেখাপড়া চালিয়ে যেতে, দেশের জন্য কিছু করতে, নিজের জায়গা থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকতে।

এমতাবস্থায়, একটি স্কলারশিপ বা শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ তাওহীদের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা নয়। এটি হবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সিঁড়ি, তার জীবনের পথচলায় এক শক্তিশালী সহযাত্রীর ভূমিকা।

একনজরে
নাম: এ. এ. এম. তাওহীদ
জন্মতারিখ: ৩/১/২০০৭
জন্মস্থানঃ পইয়াকুবপুর , দাগনভূঞাঁ,ফেনী
পেশা: শিক্ষার্থী,ছাত্র,
উত্তর চন্ডিপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানাঃ উত্তর চন্ডিপুর,৫ নং ইয়াকুবপুর, ফেনী
পিতাঃ মুহাম্মদ আইউব আলী (শিক্ষকতা, ৪৬)
মাতা: বিবি খাদিজা (গৃহিণী, ৩৯)
আয়: প্রায় ১০,০০০ টাকা (শিক্ষকতা)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ০৫
বোন: তাসলিমা আক্তার (২৪,শিক্ষার্থী)
ভাই: এ. এইচ. এম. মুজাহিদ (২০, শিক্ষার্থী)
ঘটনার স্থান: বেকের বাজার , জনতা হোটেল
আক্রমণকারীঃ আওয়ামীলীগ ও পুলিশ বাহীনি
আহত হওয়ার: ৪ আগস্ট বিকেল ৩টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍