মো: ইসতিয়াক হোসেন অভি
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা: ছাত্র,সরকারি মুজিব কলেজ
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাই২৪: একটি আত্মত্যাগী প্রজন্মের অভ্যুত্থানের ইতিহাস
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক বাঁক রচনা করে। এই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি হয়ে ওঠে এক আত্মত্যাগী প্রজন্মের গণঅভ্যুত্থান, যা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে এক গর্বিত জাতিগত প্রতিরোধে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো তরুণ-তরুণী যখন বৈষম্য, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করতে শুরু হয় রাষ্ট্রের বর্বর দমন-পীড়ন। শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলো রূপ নেয় সংঘর্ষে, কারণ তাদের ওপর চালানো হয় রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস, এমনকি প্রাণঘাতী গুলি। বহু তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন; কারও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায় চিরতরে, কেউ চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যান।
ঐতিহাসিক পটভূমি
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষা ও চাকরিতে বৈষম্য এবং নাগরিক অধিকার হরণের মতো বিষয়গুলো চরম আকার ধারণ করে। সরকারবিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে ক্রমবর্ধমান দমননীতি চালু হয়, যার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের মধ্যে জমে ওঠে চাপা ক্ষোভ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরির কোটাব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এসব পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানিয়ে জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে।
আন্দোলনের বিস্তার ও গতি
আন্দোলন শুরু হয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস থেকে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীসহ গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম,রংপুর, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি শহরে। মিছিল, বিক্ষোভ , অবস্থান কর্মসূচি, এবং অনশন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি তুলে ধরে।
কিন্তু সরকার এই আন্দোলনকে শক্ত হাতে দমন করতে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করে।ক্যাম্পাসে ঢুকে নিরাপরাধ শিক্ষার্থীদের উপর চালানো হয় হামলা, রাতে তুলে নেওয়া হয় সংগঠকদের, এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন হয় নিরাপত্তা বাহিনী। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সহিংসতা ও উসকানির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
মানবিক বিপর্যয় ও জাতিগত সাড়া
এই দমনপীড়ন দেশজুড়ে সৃষ্টি করে এক অভূতপূর্ব আবেগের ঢেউ। হাসপাতালের বারান্দায় রক্তাক্ত যুবকের আর্তনাদ, রাস্তায় পড়ে থাকা ব্যাগ-জুতো, মা-বাবার কান্না সব মিলিয়ে গোটা জাতি যেন থমকে দাঁড়ায়। একদিকে ভয়ে কেউ ঘরে লুকিয়ে পড়ে, অন্যদিকে সাহসী তরুণেরা রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
এই সময় বহু শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী,মাদরাসার মুফতি,সামাজিক বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
#জুলাই_আন্দোলন,
#গণঅভ্যুত্থান_২০২৪,
#শহীদ_শিক্ষার্থী,
#Step down Hasina ইত্যাদি হ্যাশট্যাগে ভরে যায়।
অভি-র জন্ম ও শৈশব পরিচিতি-
ছেলেটির নাম ইসতিয়াক হোসেন অভি,সে একজন নির্ভীক জুলাই যোদ্ধা।অভি ২১ জুন ২০০৬ সালে ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলাধীন রামানন্দপুর গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।গ্রামে বেড়ে ওঠা একটি ছেলের শৈশব সাধারণত সরলতা, নির্ভেজাল আনন্দ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটে। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, গাছের ছায়া আর মাটির গন্ধে ভরা সেই শৈশব অনেকটা ভিন্ন শহুরে জীবনের থেকে। সকালে পাখির ডাক শোনা, স্কুলে যাওয়ার আগে খালি পায়ে দৌড়ে পুকুর ঘাটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে গাছের ডালে চড়া কিংবা কাদায় খেলাধুলা সবই তার শৈশবের অংশ। বিকেলে খেলার মাঠ না থাকলেও, গ্রামীণ মাটির রাস্তা, পুকুর পাড়, ধানের ক্ষেত কিংবা খোলা আকাশের নিচে খেলার আনন্দ অন্যরকম।তেমনি বৈচিত্রময় শৈশব ছিলো অভি-র। অভির বাবার নাম মোঃ জাকের হোসেন আলমগীর,তিনি পেশায় একজন ওয়ার্কশপ ওয়ার্কার।সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দৈনন্দিন।আর প্রাণপ্রিয় মা জাহানারা আলমগীর ঝরনা একজন গৃহিণী,যিনি অসীম মমতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের যত্নসহকারে লালন-পালন করেছেন। সংসারের হাল ধরে সন্তানদের মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন অভির মা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে অভি মেজো,বড় ভাই মোঃ ইমতিয়াজ হোসেন একজন স্নাতক শ্রেনীতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী আর ছোট বোন জান্নাতুল তাসমিয়া আফরা ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী।তাদের পরিবারটি সুন্দর পরিপাটি ও গোছানো সুখী-সমৃদ্ধ পরিবার।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
রক্তে রঞ্জিত এক আত্মত্যাগের গল্প
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দেশব্যাপী এক নতুন মোড় নেয়। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় অবস্থান করছিল। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম-শহর পর্যন্ত আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা তখন নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ৫ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে আমি ফেনীর মহিপালে আসি। সেদিনও আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছিলাম। আমাদের ছাত্রবন্ধুরা এ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল; ব্যানার-ফেস্টুন হাতে, স্লোগানে স্লোগানে তারা ন্যায়সংগত দাবিগুলোকে তুলে ধরছিল।
প্রায় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আমরা নামাজ শেষ করি। নামাজ শেষে আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক তখনই ট্রাংক রোডের দিক থেকে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র, বোমা, নামদা বন্দুক ও অন্যান্য প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালায়। শান্তিপূর্ণ অবস্থানকারীদের ওপর হঠাৎ এই আক্রমণ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। আমরা মহিপালে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আন্দোলনের মিছিল, ব্যানার আর স্লোগানের ভেতর হঠাৎ গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। এতে ছাত্রদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অনেকেই আহত হয়, আর অনেকে প্রাণ রক্ষার জন্য আশেপাশের দোকানপাট ও রাস্তার ধারে আশ্রয় নেয়।
জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ ঘটনাটি আরেকবার প্রমাণ করে যে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি দমাতে একাধিক জায়গায় পরিকল্পিতভাবে সহিংস হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের সংঘাতে জড়াতে চাননি; তারা শুধু শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
অভির জবানিতে-
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দেশব্যাপী যে অগ্নিঝরা বাস্তবতার সৃষ্টি করেছিল, তার অংশ হিসেবে ৫ই আগস্ট ফেনীর মহিপালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। সেদিন আমরা সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি চালাচ্ছিলাম। ছাত্রবন্ধুরা ব্যানার হাতে স্লোগান দিচ্ছিল, চারপাশে ছিল ন্যায়বিচারের দাবি। নামাজ শেষে দুপুরের দিকে যখন আমরা আবার কর্মসূচি চালু করি, ঠিক তখনই ট্রাংক রোড থেকে সশস্ত্র হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র, বোমা, নামদা বন্দুক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা নির্বিচারে গুলি চালালে আমরা প্রাণ বাঁচাতে মহিপালে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে আমি গুরুতর আহত হয়ে পড়ি।
আহতের পর আমাকে দ্রুত ফেনীর আল বারাকা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার পায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকরা প্রথমে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন, পরে ক্ষতস্থানে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দেন। আমি প্রায় দুই মাস ধরে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। প্রতিদিন ব্যান্ডেজ পরিবর্তন, ওষুধ সেবন, ফিজিওথেরাপি সব মিলিয়ে দিনগুলো ছিল কষ্টকর। পরিবার ও সহপাঠীরা পাশে না থাকলে হয়তো এ দীর্ঘ চিকিৎসা-প্রক্রিয়া সহ্য করাও কঠিন হয়ে যেত।
চিকিৎসার দিনগুলোতে শুধু শারীরিক ব্যথাই নয়, মানসিক দুঃখও আমাকে ঘিরে রাখত। আন্দোলনের মতো ন্যায্য দাবির সংগ্রামে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও অস্ত্রধারীদের হামলায় আহত হতে হয়েছিল এ সত্যটি মানা সহজ ছিল না। আমার পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকালেও আজও তার চিহ্ন রয়ে গেছে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো মাথার সমস্যা। সেদিনের হামলার সময় প্রচণ্ড ধাক্কা ও আঘাত পাওয়ার কারণে এখনও মাঝেমধ্যে মাথাব্যথায় ভুগি। চিকিৎসকেরা এ ব্যথাকে “পোস্ট-ট্রমাটিক হেডেক” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। দীর্ঘ চিকিৎসা নেওয়ার পরও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি, এখনো ওষুধ চলমান।
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেবল আমার নয়, অনেক ছাত্র-জনতারই রক্তক্ষরণ ও ত্যাগের কাহিনি বহন করে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম, কিন্তু সহিংসতা ও গুলিবর্ষণের কারণে অসংখ্য তরুণের শরীরে ও মনে ক্ষত তৈরি হয়েছে। আমার পায়ের অপারেশন ও দীর্ঘ দুই মাসের চিকিৎসা তারই একটি বাস্তব চিত্র।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আমি আল বারাকা হাসপাতালে সকল চিকিৎসা নিই এখন আমার মাথার আঘাতের জন্য এখনও চিকিৎসা প্রয়োজন।
একনজরে মোঃ ইসতিয়াক হোসেন অভি-
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মোঃ ইসতিয়াক হোসেন অভি
জন্ম তারিখ :২১-০৬-২০০৬
জন্মস্থান : রামানন্দপুর
পেশা/ পদবী : ছাত্র
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা : এলাকা:সুলতান আহম্মদ বাড়ী,ইউনিয়নঃ রামানন্দপুর, থানাঃ দাগানভূঞা, জেলাঃ ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : মোঃ জাকের হোসেন আলমগীর
পিতার পেশা : ওয়ার্কশপ ওয়ার্কার
মায়ের নাম : জাহানারা আলমগীর ঝরনা
মায়ের পেশা : গৃহিণী
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় :২০০০০/=
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬জন
আয়ের উৎস : বাবার আয়
ভাই/বোনের তথ্য-
১. বড় ভাইয়ের নাম : মোঃ ইমতিয়াজ হোসেন(২১), অনার্স-এর শিক্ষার্থী
২. ছোট বোনের নাম : জান্নাতুল তাসমিয়া আফরা(১০), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী
ঘটনার স্থান : মহিপাল ফল বিতানের সামনে,ফেনী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসী ও আওয়ামী মদদপুষ্ট পুলিশ কর্তৃক
আহত হওয়ার সময়কাল : ৫ আগষ্ট, দুপুর ২ টা
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক বাঁক রচনা করে। এই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি হয়ে ওঠে এক আত্মত্যাগী প্রজন্মের গণঅভ্যুত্থান, যা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে এক গর্বিত জাতিগত প্রতিরোধে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো তরুণ-তরুণী যখন বৈষম্য, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করতে শুরু হয় রাষ্ট্রের বর্বর দমন-পীড়ন। শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলো রূপ নেয় সংঘর্ষে, কারণ তাদের ওপর চালানো হয় রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস, এমনকি প্রাণঘাতী গুলি। বহু তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন; কারও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায় চিরতরে, কেউ চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যান।
ঐতিহাসিক পটভূমি
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষা ও চাকরিতে বৈষম্য এবং নাগরিক অধিকার হরণের মতো বিষয়গুলো চরম আকার ধারণ করে। সরকারবিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে ক্রমবর্ধমান দমননীতি চালু হয়, যার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের মধ্যে জমে ওঠে চাপা ক্ষোভ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরির কোটাব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এসব পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানিয়ে জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে।
আন্দোলনের বিস্তার ও গতি
আন্দোলন শুরু হয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস থেকে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীসহ গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম,রংপুর, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি শহরে। মিছিল, বিক্ষোভ , অবস্থান কর্মসূচি, এবং অনশন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি তুলে ধরে।
কিন্তু সরকার এই আন্দোলনকে শক্ত হাতে দমন করতে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করে।ক্যাম্পাসে ঢুকে নিরাপরাধ শিক্ষার্থীদের উপর চালানো হয় হামলা, রাতে তুলে নেওয়া হয় সংগঠকদের, এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন হয় নিরাপত্তা বাহিনী। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সহিংসতা ও উসকানির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
মানবিক বিপর্যয় ও জাতিগত সাড়া
এই দমনপীড়ন দেশজুড়ে সৃষ্টি করে এক অভূতপূর্ব আবেগের ঢেউ। হাসপাতালের বারান্দায় রক্তাক্ত যুবকের আর্তনাদ, রাস্তায় পড়ে থাকা ব্যাগ-জুতো, মা-বাবার কান্না সব মিলিয়ে গোটা জাতি যেন থমকে দাঁড়ায়। একদিকে ভয়ে কেউ ঘরে লুকিয়ে পড়ে, অন্যদিকে সাহসী তরুণেরা রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
এই সময় বহু শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী,মাদরাসার মুফতি,সামাজিক বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
#জুলাই_আন্দোলন,
#গণঅভ্যুত্থান_২০২৪,
#শহীদ_শিক্ষার্থী,
#Step down Hasina ইত্যাদি হ্যাশট্যাগে ভরে যায়।
অভি-র জন্ম ও শৈশব পরিচিতি-
ছেলেটির নাম ইসতিয়াক হোসেন অভি,সে একজন নির্ভীক জুলাই যোদ্ধা।অভি ২১ জুন ২০০৬ সালে ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলাধীন রামানন্দপুর গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।গ্রামে বেড়ে ওঠা একটি ছেলের শৈশব সাধারণত সরলতা, নির্ভেজাল আনন্দ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটে। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, গাছের ছায়া আর মাটির গন্ধে ভরা সেই শৈশব অনেকটা ভিন্ন শহুরে জীবনের থেকে। সকালে পাখির ডাক শোনা, স্কুলে যাওয়ার আগে খালি পায়ে দৌড়ে পুকুর ঘাটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে গাছের ডালে চড়া কিংবা কাদায় খেলাধুলা সবই তার শৈশবের অংশ। বিকেলে খেলার মাঠ না থাকলেও, গ্রামীণ মাটির রাস্তা, পুকুর পাড়, ধানের ক্ষেত কিংবা খোলা আকাশের নিচে খেলার আনন্দ অন্যরকম।তেমনি বৈচিত্রময় শৈশব ছিলো অভি-র। অভির বাবার নাম মোঃ জাকের হোসেন আলমগীর,তিনি পেশায় একজন ওয়ার্কশপ ওয়ার্কার।সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দৈনন্দিন।আর প্রাণপ্রিয় মা জাহানারা আলমগীর ঝরনা একজন গৃহিণী,যিনি অসীম মমতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের যত্নসহকারে লালন-পালন করেছেন। সংসারের হাল ধরে সন্তানদের মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন অভির মা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে অভি মেজো,বড় ভাই মোঃ ইমতিয়াজ হোসেন একজন স্নাতক শ্রেনীতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী আর ছোট বোন জান্নাতুল তাসমিয়া আফরা ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী।তাদের পরিবারটি সুন্দর পরিপাটি ও গোছানো সুখী-সমৃদ্ধ পরিবার।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
রক্তে রঞ্জিত এক আত্মত্যাগের গল্প
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দেশব্যাপী এক নতুন মোড় নেয়। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় অবস্থান করছিল। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম-শহর পর্যন্ত আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা তখন নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ৫ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে আমি ফেনীর মহিপালে আসি। সেদিনও আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছিলাম। আমাদের ছাত্রবন্ধুরা এ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল; ব্যানার-ফেস্টুন হাতে, স্লোগানে স্লোগানে তারা ন্যায়সংগত দাবিগুলোকে তুলে ধরছিল।
প্রায় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আমরা নামাজ শেষ করি। নামাজ শেষে আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক তখনই ট্রাংক রোডের দিক থেকে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র, বোমা, নামদা বন্দুক ও অন্যান্য প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালায়। শান্তিপূর্ণ অবস্থানকারীদের ওপর হঠাৎ এই আক্রমণ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। আমরা মহিপালে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আন্দোলনের মিছিল, ব্যানার আর স্লোগানের ভেতর হঠাৎ গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। এতে ছাত্রদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অনেকেই আহত হয়, আর অনেকে প্রাণ রক্ষার জন্য আশেপাশের দোকানপাট ও রাস্তার ধারে আশ্রয় নেয়।
জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ ঘটনাটি আরেকবার প্রমাণ করে যে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি দমাতে একাধিক জায়গায় পরিকল্পিতভাবে সহিংস হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের সংঘাতে জড়াতে চাননি; তারা শুধু শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
অভির জবানিতে-
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দেশব্যাপী যে অগ্নিঝরা বাস্তবতার সৃষ্টি করেছিল, তার অংশ হিসেবে ৫ই আগস্ট ফেনীর মহিপালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। সেদিন আমরা সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি চালাচ্ছিলাম। ছাত্রবন্ধুরা ব্যানার হাতে স্লোগান দিচ্ছিল, চারপাশে ছিল ন্যায়বিচারের দাবি। নামাজ শেষে দুপুরের দিকে যখন আমরা আবার কর্মসূচি চালু করি, ঠিক তখনই ট্রাংক রোড থেকে সশস্ত্র হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র, বোমা, নামদা বন্দুক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা নির্বিচারে গুলি চালালে আমরা প্রাণ বাঁচাতে মহিপালে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে আমি গুরুতর আহত হয়ে পড়ি।
আহতের পর আমাকে দ্রুত ফেনীর আল বারাকা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার পায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকরা প্রথমে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন, পরে ক্ষতস্থানে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দেন। আমি প্রায় দুই মাস ধরে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। প্রতিদিন ব্যান্ডেজ পরিবর্তন, ওষুধ সেবন, ফিজিওথেরাপি সব মিলিয়ে দিনগুলো ছিল কষ্টকর। পরিবার ও সহপাঠীরা পাশে না থাকলে হয়তো এ দীর্ঘ চিকিৎসা-প্রক্রিয়া সহ্য করাও কঠিন হয়ে যেত।
চিকিৎসার দিনগুলোতে শুধু শারীরিক ব্যথাই নয়, মানসিক দুঃখও আমাকে ঘিরে রাখত। আন্দোলনের মতো ন্যায্য দাবির সংগ্রামে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও অস্ত্রধারীদের হামলায় আহত হতে হয়েছিল এ সত্যটি মানা সহজ ছিল না। আমার পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকালেও আজও তার চিহ্ন রয়ে গেছে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো মাথার সমস্যা। সেদিনের হামলার সময় প্রচণ্ড ধাক্কা ও আঘাত পাওয়ার কারণে এখনও মাঝেমধ্যে মাথাব্যথায় ভুগি। চিকিৎসকেরা এ ব্যথাকে “পোস্ট-ট্রমাটিক হেডেক” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। দীর্ঘ চিকিৎসা নেওয়ার পরও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি, এখনো ওষুধ চলমান।
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেবল আমার নয়, অনেক ছাত্র-জনতারই রক্তক্ষরণ ও ত্যাগের কাহিনি বহন করে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম, কিন্তু সহিংসতা ও গুলিবর্ষণের কারণে অসংখ্য তরুণের শরীরে ও মনে ক্ষত তৈরি হয়েছে। আমার পায়ের অপারেশন ও দীর্ঘ দুই মাসের চিকিৎসা তারই একটি বাস্তব চিত্র।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আমি আল বারাকা হাসপাতালে সকল চিকিৎসা নিই এখন আমার মাথার আঘাতের জন্য এখনও চিকিৎসা প্রয়োজন।
একনজরে মোঃ ইসতিয়াক হোসেন অভি-
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মোঃ ইসতিয়াক হোসেন অভি
জন্ম তারিখ :২১-০৬-২০০৬
জন্মস্থান : রামানন্দপুর
পেশা/ পদবী : ছাত্র
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা : এলাকা:সুলতান আহম্মদ বাড়ী,ইউনিয়নঃ রামানন্দপুর, থানাঃ দাগানভূঞা, জেলাঃ ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : মোঃ জাকের হোসেন আলমগীর
পিতার পেশা : ওয়ার্কশপ ওয়ার্কার
মায়ের নাম : জাহানারা আলমগীর ঝরনা
মায়ের পেশা : গৃহিণী
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় :২০০০০/=
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬জন
আয়ের উৎস : বাবার আয়
ভাই/বোনের তথ্য-
১. বড় ভাইয়ের নাম : মোঃ ইমতিয়াজ হোসেন(২১), অনার্স-এর শিক্ষার্থী
২. ছোট বোনের নাম : জান্নাতুল তাসমিয়া আফরা(১০), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী
ঘটনার স্থান : মহিপাল ফল বিতানের সামনে,ফেনী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসী ও আওয়ামী মদদপুষ্ট পুলিশ কর্তৃক
আহত হওয়ার সময়কাল : ৫ আগষ্ট, দুপুর ২ টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍