হোম / আহতদের তালিকা / আনোয়ার
আনোয়ার

আনোয়ার

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আনোয়ার ১৯৮১ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে জন্মানো এক নীরব শ্রমজীবী মানুষ। হোটেলের সাধারণ কাজই ছিল যার জীবনের অবলম্বন। পরিশ্রম ও মানবিকতায় পরিচিত এই হোটেল কর্মচারিই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে এসে নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হন, হারান তাঁর একটি চোখের দৃষ্টি। জুলাই আন্দোলনে আান্দোলনকারীদের প্রতি সহমর্মিতাই হয়ে ওঠে তাঁর অপরাধ। সংগ্রামমুখর জীবনে পরিবারই ছিল তাঁর শক্তি। বর্তমানে যার জীবনে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও পুনর্বাসন অপরিহার্য এক মানবিক আহ্বান।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

হোটেল কর্মচারির গুলিবিদ্ধ জীবন
স্বৈরাচারী হাসিনার নিপীড়নের এক নির্মম দলিল
আনোয়ার
পেশা: চাকরি (হোটেল বয়)
ক্রমিক: ০৫৩
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৩
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
আনোয়ার ১৯৮১ সালের ২০ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার পশ্চিম দামোদরদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৃত কাহার উদ্দিন এবং মা সূর্যবান, যিনি এখন ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধা। শৈশব থেকে অভাবের মধ্যে বড় হলেও আনোয়ার ছিলেন দৃঢ়চেতা। পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে শুরু করেন নানা ধরনের কাজ। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন সংগ্রামের ভিতর দিয়েই।
পেশা ও কর্মজীবন
আনোয়ার রায়েরবাগে অবস্থিত মা রেস্তোঁরা ও হোটেলে একজন হোটেল বয় হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যেখানে তার মাসিক বেতন ছিল ১৯,০০০ টাকা। হোটেল কর্মচারি হিসেবে তিনি পরিশ্রম, সততা এবং সৌজন্যবোধের জন্য পরিচিত ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করেই তিনি পরিবারকে টিকিয়ে রাখছিলেন। সারা দিন খেটে যা পেতেন, তা দিয়েই চালাতেন সংসার।
পরিবার ও সন্তানদের শিক্ষাজীবন
আনোয়ারের পরিবারে রয়েছে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী শাহনাজ আক্তার (যিনি দাওরা পাশ করেছেন), এবং তিন সন্তান। বড় ছেলে আনাস মাহমুদ (১৪) সানাবিয়াহ (৭ম শ্রেণি) পর্যায়ে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। দ্বিতীয় ছেলে আদিল মাহমুদ (১০) হিফজ পড়ছে। ছোট মেয়ে সাফা মারওয়া (৭) এখন হিফজ বিভাগে ভর্তি। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, বৃদ্ধা মা ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে আনোয়ার ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা।
আন্দোলনের সহমর্মী হয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাত ১১:৩০টার দিকে আনোয়ার রায়েরবাগের মা রেস্তোঁরা থেকে হোটেল বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন। এর আগের দিন আন্দোলনরত ছাত্ররা তার হোটেল থেকে বারবার পানি চেয়েছিল, আর তিনি বারবার তাদের পানি দিয়েছেন। ছাত্রদের প্রতি এই মানবিক সহানুভূতি থেকেই তাদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলা। এ অবস্থায় তিনি চুপ থাকতে পারেননি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানোর কারণে কদমতলী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন।
চোখে গুলির আঘাত ও চিকিৎসা যন্ত্রণা
আঘাত পাওয়ার পর প্রথমে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। হয়। পরে সরকারি পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক)-এ চিকিৎসা গ্রহণ করেন। চিকিৎসা চলেছে দীর্ঘ ৯ মাস, এর মধ্যে ৭ মাস তিনি ঢামেকে ভর্তি ছিলেন। মাঝে মাঝে অন্য হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিটি হয়েছে তার চোখে। বাম চোখের পেছনের দিকে গুলির ছিটা থেকে যায়, যা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। বাম চোখে এখন একেবারেই দেখতে পান না, আর ডান চোখে ঝাপসা দেখেন। প্রতিদিনের জীবন এখন অন্ধকার আর নির্ভরতার বোঝা হয়ে উঠেছে।
সংসার এখন স্ত্রীর কাঁধে
চিকিৎসা চলাকালীন সঞ্চয় যা ছিল তা শেষ হয়ে যায়। এখন আনোয়ার কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই সংসারের পুরো দায়িত্ব উঠে গেছে তার স্ত্রীর কাঁধে। শহানাজ আক্তার একটি প্রাইভেট মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন, তার মাসিক আয় মাত্র ৮,০০০ টাকা। এই আয়ে ছয় সদস্যের পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। বাড়ি ভাড়া, খাবার, ওষুধ, স্কুল ফি সবকিছুই এখন অনিশ্চিত।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকট
প্রতিবাদে অংশগ্রহণের কারণে এখন আনোয়ার অচল। যে মানুষটা পরিবার চালাতেন, এখন নিজেই পরিবারের বোঝা হয়ে গেছেন। তার দৃষ্টিশক্তি হারানো মানে তার জন্য শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং আত্মমর্যাদাহীন জীবনের শুরু। এখন রাষ্ট্র বা সমাজের কাছ থেকে বিন্দুমাত্র সহায়তা পান না তিনি। অথচ তার পরিস্থিতি সহানুভূতির দাবি রাখে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রস্তাবনা
১. চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩ লক্ষ টাকা অনুদান, প্রয়োজনে বিদেশে।
২. মাসিক অন্তত ১২,০০০ টাকা ভাতা (১ বছর)
৩. তিন সন্তানের জন্য শিক্ষা সহায়তা ও বই-খাতা ভাতা
৪. বৃদ্ধা মায়ের জন্য মাসিক স্বাস্থ্যভাতা ও ওষুধ সহায়তা
৫. আন্দোলনে আহত হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন

এক নজরে আনোয়ার
নাম: আনোয়ার
জন্ম তারিখ: ২০-০৩-১৯৮১
জন্মস্থান: নারায়ণগঞ্জ
পেশা: চাকরি (হোটেল বয়)
প্রতিষ্ঠান: মা রেস্তোঁরা এন্ড হোটেল, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: পশ্চিম দামোদরদী, ইউনিয়ন: আনন্দ বাজার, থানা: সোনারগাঁও, জেলা: নারায়ণগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: কামরুল মিয়ার বাড়ি, মেরাজ নগর, রায়েরবাগ, থানা: যাত্রাবাড়ি, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মৃত, কাহার উদ্দিন
মায়ের নাম: সূর্যবান
মায়ের পেশা: গৃহিণী (বৃদ্ধা), বয়স: ৯০
মাসিক আয়: শাহানাজ আক্তার (দাওরা পাশ)
আয়ের উৎস: ৮০০০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: স্ত্রীর চাকরি (প্রাইভেট মাদ্রাসার শিক্ষিকা): ৬ জন (মা, স্ত্রী ও তিন সন্তান)
সন্তানদের বিবরণ
১. নাম: আনাস মাহমুদ, বয়স: ১৪, শ্রেণি: সানাবিয়‍্যাহ (৭ম শ্রেণি), প্রতিষ্ঠান: সাইনবোর্ড কওমী মাদ্রাসা
২. নাম: আদিল মাহমুদ, বয়স: ১০, শ্রেণি: হিফজ (চলমান)
৩. নাম: সাফা মারওয়া, বয়স: ০৭, শ্রেণি: হিফজ (চলমান)
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান: কদমতলী থানার সামনে, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়:
১৯ জুলাই ২০২৪, সময়: রাত ১১:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী: কদমতলী থানার পুলিশ সদস্য (ওসি রিয়াজ, বাশার, মহসিন) ও (ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী মিলন, আকাশ, বাবলা, সোহাগ, রনি)

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍