মো: আব্দুল আজিজ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
এক সংগ্রামী যুবকের আর্তনাদ
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা গ্রাম, বাংলার অন্য যেকোনো গ্রামের মতোই একটি নিরব, সরল জনপদ। এখানেই ১৯৯৯ সালের ১৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল আজিজ, এক তরুণ যার গল্প যেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রেরই প্রতিচ্ছবি। আজিজের জীবনের শুরুর দিকেই ছায়া নেমে আসে তার পরিবারের ওপর। পিতা জনাব আবুল হোসেন, যিনি পরিবারের একমাত্র অভিভাবক ছিলেন, বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেন। জীবনের দায়িত্ব এসে পড়ে একজন নারীর কাঁধে-তার মা মাছুদা বেগমের। নিঃশব্দে, পরিশ্রমে, চোখের জলে আর স্নেহভরা হাতে তিনি বড় করেন তার দুই পুত্রকে: বড় ছেলে আব্দুল আলিম এবং ছোট ছেলে আব্দুল আজিজ।
জীবনযুদ্ধে একটি থমকে থাকা অধ্যায়
বড় ভাই আলিম আজ ২৯ বছরের এক প্রাপ্তবয়স্ক যুবক, যিনি সংসারের হাল ধরেছেন। পিতৃহীন পরিবারে তিনি কেবল ভাই নন, একাধারে পিতা, সহচর ও ভরসাও। মা মাছুদা বেগমের বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দেহের ভার বহন করছেন তিনিই। আর আব্দুল আজিজ; ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ, চোখে ছিল স্বপ্ন, হাতে ছিল শিক্ষার চূড়ান্ত সনদ, কিন্তু আজও বেকার।
পড়াশোনা শেষ করার পর থেকে আজিজ একাধিক চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিয়োগ পদ্ধতির অসম নীতিমালার কারণে তার মতো হাজার হাজার মেধাবী তরুণের জীবন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অবিচারের বেড়াজাল: কোটানীতির করাল ছায়া
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি তীব্র অসাম্য বিদ্যমান। ৫৬% কোটানীতির মাধ্যমে একটি বড় অংশ বরাদ্দ ছিল রাজনৈতিক ও বিশেষ শ্রেণির জন্য। আওয়ামী লীগ সরকার প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করেছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। আব্দুল আজিজও ছিলেন সেই নিপীড়িত মেধাবীদের একজন। চাকরির নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্যানেল ভিত্তিক প্রার্থী নির্ধারণ, এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় যোগ্যতা উপেক্ষা করে নিয়োগ ছিল যেন অলিখিত নিয়ম। সরকারি চাকরির অল্পসংখ্যক আসনের জন্য যে প্রতিযোগিতা হতো, তাতেও আজিজের মতো যোগ্য প্রার্থীরা সুযোগ পেত না শুধুমাত্র “দলীয় সুদৃষ্টি”র অভাবে।
বিদ্রোহের জন্ম: জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
এ অবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রসমাজের অন্তরালে জমা হওয়া প্রতিবাদ জ্বলন্ত দাবিতে রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের পৈশাচিক হামলা ছিল সেই দাবানলের স্ফুলিঙ্গ। যে দাবানলে জ্বলে ওঠে গোটা জাতি। এটি ছিল কেবল একটি আন্দোলন নয়, বরং একটি প্রজন্মের আর্তনাদ, যা বলে উঠেছিল: “বৈষম্যের বিরুদ্ধে, আগুন জ্বালাও একসাথে”, “ফ্যাসিবাদের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও।”
আব্দুল আজিজ, যিনি নিজের জীবনের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের জন্য ও পরবর্তী প্রজন্মকে কোটা নীতির এই জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের সরব প্রতিনিধি—যিনি ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমেছেন, আহত হয়েছেন কিন্তু হৃদয়ে রেখেছেন মুক্ত বাংলাদেশের শপথ।
ছাত্রলীগ যুবলীগ অতর্কিত হামলা চালায়
সারাদেশ তখন উত্তাল। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা তখন রক্ত পিপাসু হায়েনার মতো শিক্ষার্থীদের খুজঁছে। সামনে যাকে সন্দেহ হচ্ছে তার মোবাইল ফোন চেক করছে। ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা ভাবে খুঁজে দেখার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষ, ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, মহিলা কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এই পরিস্থিতি আন্দোলনকারী কাউকে পেয়ে গেলে হয় তাকে পিটিয়ে মেরা ফেলা হতো নয়তো ভাগ্য ভালো হলে কোনো মতে জানে বেঁচে যেত। ৪ই আগস্ট আব্দুল আজিজ জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে কেরানীহাটের উত্তরে গরুর বাজার এলাকায় সহযোদ্ধাদের সাথে মিলিত হয়। সেখানেই তাদের সংঘর্ষ বাঁধে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের সাথে। তারা তখনও পুলিশকে পুলিশলীগ-ই মনে করতো। তার চোখের সামনেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাউকে কাউকে কোপাচ্ছিল কিংবা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছিল। এসব দেখে শিক্ষার্থীরা ভড়কে যায়নি বরং দ্বিগুণ উৎসাহ দিয়ে স্লোগান ধরেছে- “আসছে ফাগুন আমরা হবো দ্বিগুণ”, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”। আর তাদের সাথে আব্দুল আজিজও ছিল অন্যতম। কেরানীহাটে আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বিনা উষ্কানীতের ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা। আওয়ামী লীগের দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশ ছিল রাস্তায় যাকে পাওয়া যাবে তাকে শুইয়ে দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ৪ই আগস্ট বিকাল তখন ৩ টা বেজে ৪০ মিনিট। কেরানীহাটের উত্তরে গরুর বাজারে আব্দুল আজিজের উপর অতর্কিতে হামলা ও আক্রমণ করে ছাত্রলীগ। প্রথমে তাকে লাঠি দিয়ে পেটানো শুরু করে। একসময় মাথায় আঘাত লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায় সে। তার আর গোঙানির আওয়াজ পাওয়া যায়নি। পড়ে গেলেও তার উপর হায়েনাদের আক্রমণ থেমে থাকেনি। তাকে জানে মেরা ফেলার জন্য পায়ে, শরীরে ও যেখানে পারছিল সেখাই বেদম পেটাচ্ছিল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। অবস্থা এমন হয় যে তারা ভাবে আব্দুল আজিজ হয়তো মরেই গেছে। তারপর ফেলে রেখে চলে যায়।
চুপিসারে নেওয়া হয় হাসপাতালে
আব্দুল আজিজকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে তার সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসে। কোনো মতে তাকে নিয়ে সাতকানিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। পথে পথে ছাত্রলীগের হামলার আশংকার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পুরো রাস্তা। কিন্তু হাসপাতালেও ছিল আক্রান্ত হওয়ার ভয়। কোনোমতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসে আব্দুল আজিজ। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। এদিকে সরকারি হাসপাতালে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অবস্থায় সে ভর্তি হয় কেরানীহাটের আশ শেফা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানেই কিছুদিন চিকিৎসা নেয় আব্দুল আজিজ।
নিঃশব্দ সংগ্রাম: একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
আজিজের জীবন এক করুণ কাব্য। তাঁর পরিবার, তাঁর বড় ভাইয়ের শ্রম ও মায়ের প্রার্থনা—সব মিলিয়ে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল নিজ পায়ে, সে আজ দাঁড়িয়ে আছে বেকারত্বের অন্ধকারে।
তাঁর মা এখনো ভোরে উঠে সন্তানদের জন্য দোয়া করেন। তাঁর ভাই দিনরাত খেটে সংসারের খরচ চালান। আর আব্দুল আজিজ—তিনি প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফলে খোঁজেন আশা, খোঁজেন ন্যায্যতা। কিন্তু রাষ্ট্রের শীতল দেয়ালে তিনি প্রতিবারই ফিরে পান ‘অসমতা’র নিষ্ঠুর ছায়া।
আহত হওয়ার পর এখনো তারা পুরো শরীর জুড়ে ব্যাথা। উন্নত চিকিৎসা অতি প্রয়োজন থাকলেও পারিবারিক আর্থিক অনটনের কারণে উন্নত চিকিৎসা করানো প্রায় অসম্ভব।
আব্দুল আজিজের মতো তরুণরা আজ হাজারে হাজারে। তারা আমাদের শ্রেণিকক্ষে সহপাঠী ছিল, লাইব্রেরিতে পাশের চেয়ারে বসে বই পড়ত, আন্দোলনের মিছিলেও ছিল কেউ একজন। আজ তারা কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ কেউ আহত, আবার কেউ কেউ; আব্দুল আজিজের মতো-পড়ে আছেন নির্বাকভাবে।
তাদের পুনর্গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমরা যদি সত্যি বিশ্বাস করি যে একটি দেশের উন্নয়ন তার তরুণদের উপর নির্ভর করে, তবে এই তরুণদের ন্যায্যতা দিতে হবে, চাকরি, নিরাপত্তা, এবং আত্মমর্যাদার সুযোগ দিতে হবে।
উপসংহার
আব্দুল আজিজ কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি সম্ভাবনার প্রতীক, যে সম্ভাবনা অবরুদ্ধ হয়েছে এক ভ্রান্ত নীতির কাছে। আজিজেরা প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা চুপ করে আছি। রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার সামনে এখনো সময় আছে, এই মেধাবীদের পাশে দাঁড়াবার, তাদের হাতে তুলে দেবার সেই যন্ত্র যা দিয়ে তারা আবার গড়তে পারবে তাদের জীবন। একটি চাকরি, একটি মানবিক দৃষ্টি, একটি সমান সুযোগ, এটাই আব্দুল আজিজের মতো একজন তরুণের একমাত্র চাওয়া।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আব্দুল আজিজ
জন্ম তারিখ : ১৫/০৪/১৯৯৯
জন্মস্থান : পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা, ইউনিয়ন-এওচিয়া, থানা-সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
স্থায়ী ঠিকানা : পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা, এওচিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
বর্তমান ঠিকানা : পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা, এওচিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
পিতা : মৃত আবুল হোসেন
মাতা : মাছুদা বেগম/গৃহিণী/বয়স-৫৫
মাসিক আয় : ২৫ হাজার টাকা
বাড়ি : টিনের বাড়ি ও ২ গন্ডা পরিমাণ ভিটা জমি।
পরিবারের সদস্য : ০৩ জন
ভাই-বোন/সন্তানদের পরিচয়
১. আব্দুল আলিম, সম্পর্ক-ভাই, পেশা-বেসরকারি চাকরি, বয়স-২৯
ঘটনাস্থল ও আক্রমণকারী
চট্টগ্রামের কেরানীহাটের উত্তরে গরুর বাজার এলাকায় শিক্ষার্থীদের উপর সংঘবদ্ধ আক্রমণ করে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং পুলিশ। তাদের হাতে ছিল উন্নত মারণাস্ত্র, রামদা, চাপাতি, লাঠিসহ ইট-পাটকেল।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা।
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহয়তা কার্ড চালু।
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভূক্তকরণ।
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা গ্রাম, বাংলার অন্য যেকোনো গ্রামের মতোই একটি নিরব, সরল জনপদ। এখানেই ১৯৯৯ সালের ১৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল আজিজ, এক তরুণ যার গল্প যেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রেরই প্রতিচ্ছবি। আজিজের জীবনের শুরুর দিকেই ছায়া নেমে আসে তার পরিবারের ওপর। পিতা জনাব আবুল হোসেন, যিনি পরিবারের একমাত্র অভিভাবক ছিলেন, বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেন। জীবনের দায়িত্ব এসে পড়ে একজন নারীর কাঁধে-তার মা মাছুদা বেগমের। নিঃশব্দে, পরিশ্রমে, চোখের জলে আর স্নেহভরা হাতে তিনি বড় করেন তার দুই পুত্রকে: বড় ছেলে আব্দুল আলিম এবং ছোট ছেলে আব্দুল আজিজ।
জীবনযুদ্ধে একটি থমকে থাকা অধ্যায়
বড় ভাই আলিম আজ ২৯ বছরের এক প্রাপ্তবয়স্ক যুবক, যিনি সংসারের হাল ধরেছেন। পিতৃহীন পরিবারে তিনি কেবল ভাই নন, একাধারে পিতা, সহচর ও ভরসাও। মা মাছুদা বেগমের বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দেহের ভার বহন করছেন তিনিই। আর আব্দুল আজিজ; ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ, চোখে ছিল স্বপ্ন, হাতে ছিল শিক্ষার চূড়ান্ত সনদ, কিন্তু আজও বেকার।
পড়াশোনা শেষ করার পর থেকে আজিজ একাধিক চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিয়োগ পদ্ধতির অসম নীতিমালার কারণে তার মতো হাজার হাজার মেধাবী তরুণের জীবন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অবিচারের বেড়াজাল: কোটানীতির করাল ছায়া
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি তীব্র অসাম্য বিদ্যমান। ৫৬% কোটানীতির মাধ্যমে একটি বড় অংশ বরাদ্দ ছিল রাজনৈতিক ও বিশেষ শ্রেণির জন্য। আওয়ামী লীগ সরকার প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করেছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। আব্দুল আজিজও ছিলেন সেই নিপীড়িত মেধাবীদের একজন। চাকরির নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্যানেল ভিত্তিক প্রার্থী নির্ধারণ, এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় যোগ্যতা উপেক্ষা করে নিয়োগ ছিল যেন অলিখিত নিয়ম। সরকারি চাকরির অল্পসংখ্যক আসনের জন্য যে প্রতিযোগিতা হতো, তাতেও আজিজের মতো যোগ্য প্রার্থীরা সুযোগ পেত না শুধুমাত্র “দলীয় সুদৃষ্টি”র অভাবে।
বিদ্রোহের জন্ম: জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
এ অবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রসমাজের অন্তরালে জমা হওয়া প্রতিবাদ জ্বলন্ত দাবিতে রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের পৈশাচিক হামলা ছিল সেই দাবানলের স্ফুলিঙ্গ। যে দাবানলে জ্বলে ওঠে গোটা জাতি। এটি ছিল কেবল একটি আন্দোলন নয়, বরং একটি প্রজন্মের আর্তনাদ, যা বলে উঠেছিল: “বৈষম্যের বিরুদ্ধে, আগুন জ্বালাও একসাথে”, “ফ্যাসিবাদের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও।”
আব্দুল আজিজ, যিনি নিজের জীবনের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের জন্য ও পরবর্তী প্রজন্মকে কোটা নীতির এই জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের সরব প্রতিনিধি—যিনি ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমেছেন, আহত হয়েছেন কিন্তু হৃদয়ে রেখেছেন মুক্ত বাংলাদেশের শপথ।
ছাত্রলীগ যুবলীগ অতর্কিত হামলা চালায়
সারাদেশ তখন উত্তাল। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা তখন রক্ত পিপাসু হায়েনার মতো শিক্ষার্থীদের খুজঁছে। সামনে যাকে সন্দেহ হচ্ছে তার মোবাইল ফোন চেক করছে। ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা ভাবে খুঁজে দেখার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষ, ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, মহিলা কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এই পরিস্থিতি আন্দোলনকারী কাউকে পেয়ে গেলে হয় তাকে পিটিয়ে মেরা ফেলা হতো নয়তো ভাগ্য ভালো হলে কোনো মতে জানে বেঁচে যেত। ৪ই আগস্ট আব্দুল আজিজ জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে কেরানীহাটের উত্তরে গরুর বাজার এলাকায় সহযোদ্ধাদের সাথে মিলিত হয়। সেখানেই তাদের সংঘর্ষ বাঁধে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের সাথে। তারা তখনও পুলিশকে পুলিশলীগ-ই মনে করতো। তার চোখের সামনেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাউকে কাউকে কোপাচ্ছিল কিংবা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছিল। এসব দেখে শিক্ষার্থীরা ভড়কে যায়নি বরং দ্বিগুণ উৎসাহ দিয়ে স্লোগান ধরেছে- “আসছে ফাগুন আমরা হবো দ্বিগুণ”, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”। আর তাদের সাথে আব্দুল আজিজও ছিল অন্যতম। কেরানীহাটে আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বিনা উষ্কানীতের ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা। আওয়ামী লীগের দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশ ছিল রাস্তায় যাকে পাওয়া যাবে তাকে শুইয়ে দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ৪ই আগস্ট বিকাল তখন ৩ টা বেজে ৪০ মিনিট। কেরানীহাটের উত্তরে গরুর বাজারে আব্দুল আজিজের উপর অতর্কিতে হামলা ও আক্রমণ করে ছাত্রলীগ। প্রথমে তাকে লাঠি দিয়ে পেটানো শুরু করে। একসময় মাথায় আঘাত লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায় সে। তার আর গোঙানির আওয়াজ পাওয়া যায়নি। পড়ে গেলেও তার উপর হায়েনাদের আক্রমণ থেমে থাকেনি। তাকে জানে মেরা ফেলার জন্য পায়ে, শরীরে ও যেখানে পারছিল সেখাই বেদম পেটাচ্ছিল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। অবস্থা এমন হয় যে তারা ভাবে আব্দুল আজিজ হয়তো মরেই গেছে। তারপর ফেলে রেখে চলে যায়।
চুপিসারে নেওয়া হয় হাসপাতালে
আব্দুল আজিজকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে তার সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসে। কোনো মতে তাকে নিয়ে সাতকানিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। পথে পথে ছাত্রলীগের হামলার আশংকার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পুরো রাস্তা। কিন্তু হাসপাতালেও ছিল আক্রান্ত হওয়ার ভয়। কোনোমতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসে আব্দুল আজিজ। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। এদিকে সরকারি হাসপাতালে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অবস্থায় সে ভর্তি হয় কেরানীহাটের আশ শেফা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানেই কিছুদিন চিকিৎসা নেয় আব্দুল আজিজ।
নিঃশব্দ সংগ্রাম: একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
আজিজের জীবন এক করুণ কাব্য। তাঁর পরিবার, তাঁর বড় ভাইয়ের শ্রম ও মায়ের প্রার্থনা—সব মিলিয়ে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল নিজ পায়ে, সে আজ দাঁড়িয়ে আছে বেকারত্বের অন্ধকারে।
তাঁর মা এখনো ভোরে উঠে সন্তানদের জন্য দোয়া করেন। তাঁর ভাই দিনরাত খেটে সংসারের খরচ চালান। আর আব্দুল আজিজ—তিনি প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফলে খোঁজেন আশা, খোঁজেন ন্যায্যতা। কিন্তু রাষ্ট্রের শীতল দেয়ালে তিনি প্রতিবারই ফিরে পান ‘অসমতা’র নিষ্ঠুর ছায়া।
আহত হওয়ার পর এখনো তারা পুরো শরীর জুড়ে ব্যাথা। উন্নত চিকিৎসা অতি প্রয়োজন থাকলেও পারিবারিক আর্থিক অনটনের কারণে উন্নত চিকিৎসা করানো প্রায় অসম্ভব।
আব্দুল আজিজের মতো তরুণরা আজ হাজারে হাজারে। তারা আমাদের শ্রেণিকক্ষে সহপাঠী ছিল, লাইব্রেরিতে পাশের চেয়ারে বসে বই পড়ত, আন্দোলনের মিছিলেও ছিল কেউ একজন। আজ তারা কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ কেউ আহত, আবার কেউ কেউ; আব্দুল আজিজের মতো-পড়ে আছেন নির্বাকভাবে।
তাদের পুনর্গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমরা যদি সত্যি বিশ্বাস করি যে একটি দেশের উন্নয়ন তার তরুণদের উপর নির্ভর করে, তবে এই তরুণদের ন্যায্যতা দিতে হবে, চাকরি, নিরাপত্তা, এবং আত্মমর্যাদার সুযোগ দিতে হবে।
উপসংহার
আব্দুল আজিজ কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি সম্ভাবনার প্রতীক, যে সম্ভাবনা অবরুদ্ধ হয়েছে এক ভ্রান্ত নীতির কাছে। আজিজেরা প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা চুপ করে আছি। রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার সামনে এখনো সময় আছে, এই মেধাবীদের পাশে দাঁড়াবার, তাদের হাতে তুলে দেবার সেই যন্ত্র যা দিয়ে তারা আবার গড়তে পারবে তাদের জীবন। একটি চাকরি, একটি মানবিক দৃষ্টি, একটি সমান সুযোগ, এটাই আব্দুল আজিজের মতো একজন তরুণের একমাত্র চাওয়া।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আব্দুল আজিজ
জন্ম তারিখ : ১৫/০৪/১৯৯৯
জন্মস্থান : পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা, ইউনিয়ন-এওচিয়া, থানা-সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
স্থায়ী ঠিকানা : পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা, এওচিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
বর্তমান ঠিকানা : পশ্চিম সাটিয়াভাঙ্গা, এওচিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
পিতা : মৃত আবুল হোসেন
মাতা : মাছুদা বেগম/গৃহিণী/বয়স-৫৫
মাসিক আয় : ২৫ হাজার টাকা
বাড়ি : টিনের বাড়ি ও ২ গন্ডা পরিমাণ ভিটা জমি।
পরিবারের সদস্য : ০৩ জন
ভাই-বোন/সন্তানদের পরিচয়
১. আব্দুল আলিম, সম্পর্ক-ভাই, পেশা-বেসরকারি চাকরি, বয়স-২৯
ঘটনাস্থল ও আক্রমণকারী
চট্টগ্রামের কেরানীহাটের উত্তরে গরুর বাজার এলাকায় শিক্ষার্থীদের উপর সংঘবদ্ধ আক্রমণ করে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং পুলিশ। তাদের হাতে ছিল উন্নত মারণাস্ত্র, রামদা, চাপাতি, লাঠিসহ ইট-পাটকেল।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা।
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহয়তা কার্ড চালু।
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভূক্তকরণ।
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍