মিজবাহ উদ্দীন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা/ পদবী : চাকরি,প্রশাসনিক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
৫
জন্ম ও শৈশবকাল
মিজবাহ উদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন ২০০৫ সালের ১লা জানুয়ারি,চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামে। গ্রামীণ নিসর্গের কোলে বেড়ে ওঠা এই সাহসী তরুণ শৈশব থেকেই ছিলেন আত্মচিন্তায় পরিপূর্ণ,বিচক্ষণ এবং সচেতন। গ্রামের সরল জীবনধারা,পারিবারিক শৃঙ্খলা এবং সামাজিক মূল্যবোধ তাঁর মানসিক গঠনে রেখেছে গভীর প্রভাব। ছোটবেলা থেকেই তার মাঝে ছিল এক স্বতন্ত্র উপলব্ধি- নিজেকে শুধু নিজের জন্য নয়,সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার গভীর তাগিদ।
পারিবারিক বিবরণ
মিছবাহ উদ্দীনের পরিবার ছিল স্নেহ,ত্যাগ ও মূল্যবোধে গঠিত এক আদর্শ সামাজিক বন্ধন। তার পিতা,ইরফানুল হক (৪৮),একজন প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত থেকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁর নিঃস্বার্থ শ্রম ও আত্মত্যাগ পরিবারের ভিত্তিকে করেছে দৃঢ় ও সহনশীল।অপরদিকে,মা মনজুরা বেগ(৪২) ছিলেন একজন দায়িত্বশীলা গৃহিণী,যিনি সন্তানদের মমতা,নৈতিকতা ও আদর্শের আলোয় গড়ে তুলেছেন নিঃস্বার্থ ভালবাসায়।মিজবাহ উদ্দীন এই পরিবারে তৃতীয় সন্তান। তার ছোট ভাই মিজানুর রহমান একজন শিক্ষার্থী,যিনি এখনো অধ্যয়নের পথে এগিয়ে চলেছেন। তিন বোনের মধ্যে বড় বোন এবং মিছবাহের নিচের বোন-এই দুইজন বিবাহিত। কনিষ্ঠ বোন ইশফাতুল জান্নাত(১৫),কওমি মাদ্রাসার জামায়াতুল উলা শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।বর্তমানে মিজবাহ উদ্দীন চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট এলাকায় একটি ছাত্রাবাসে (মেসে) বসবাস করছেন। শহরের কোলাহলের মাঝেও তিনি তার আদর্শিক সংগ্রাম ও ছাত্রজীবনকে ধরে রেখেছেন পারিবারিক অনুশাসন ও ভালোবাসার ভিতর থেকে পাওয়া সাহস ও অনুপ্রেরণায়।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন
মিজবাহ উদ্দীন উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি,চট্টগ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তবে শুধু একাডেমিক অর্জনে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন এক দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে ওঠেন। সমাজের অসংগতি,শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার মন বিদ্রোহ করত। বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী,নির্ভীক এবং নেতৃত্বগুণে বলীয়ান একজন তরুণ। তিনি বিশ্বাস করতেন-শিক্ষা মানেই শুধু ডিগ্রি নয়, বরং সমাজের কাছে নিজের দায়িত্ববোধের স্বীকৃতি।
সংগ্রামী জীবন ও আত্মত্যাগ
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন ছিল মিজবাহ উদ্দিনের সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ফ্যাসিস্ট দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যখন সারাদেশ উত্তাল,তখন মিছবাহ রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন অগ্রভাগে। শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি,হামলা,গ্রেপ্তারের ভয় কিংবা মৃত্যু-কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তার প্রতিবাদ ছিল সরব,স্পষ্ট ও আপসহীন। গলায় ছিল স্লোগান,হাতে ছিল পতাকা,হৃদয়ে ছিল বিপ্লবের দীপ্তি। তিনি রক্ত ও সাহসে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য সংগ্রামী পথচলা,যা আজকের প্রজন্মের কাছে এক গৌরবময় অনুপ্রেরণা। তাঁর আত্মত্যাগ শুধু একজন ব্যক্তির নয়-তা এক পুরো প্রজন্মের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন -এক বীরের বাণী
আমি মিজবাহ উদ্দীন-একজন ছাত্র,একজন সংগ্রামী তরুণ,আর ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই অভ্যুত্থানের একজন জীবিত সাক্ষ্য। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই,চট্টগ্রাম শহরে আমরা শরিক হয়েছিলাম এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে-সেই মিছিলে ছিলেন শহীদ ওয়াসিম আকরাম,যার নাম আজ শহীদের তালিকায় অমর হয়ে আছে। আমি ছিলাম তার পাশেই, হাতে ছিল প্রতিবাদের স্লোগান,বুকে ছিল সাহসের আগুন। হঠাৎ করেই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের উপর। তারা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে। আমি গুরুতর আহত হই। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে কোনোমতে সুস্থ হয়ে উঠি।
কিন্তু শত্রুরা জানতো না,আমাকে রক্তাক্ত করা যাবে,তবে দমিয়ে রাখা যাবে না। তাই আবারও ৪ আগস্ট ২০২৪-এক নতুন সকাল,নতুন প্রতিবাদ,নতুন প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমরা নেমে পড়ি পথে। বাঁশখালীর চাম্বল এলাকায় আয়োজন করি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন। ৩ আগস্ট থেকেই আমরা গোপনে পরিকল্পনা করি,কোথা থেকে যাব,কীভাবে যাব,কারা নেতৃত্ব দেবে। ৪ তারিখ যোহরের নামাজ শেষে আমরা ৯ নম্বর গণ্ডামারা ইউনিয়ন থেকে নিজের খরচে পারসোনাল গাড়ি ভাড়া করে রওনা হই চাম্বলের দিকে।
আমরা যখন মিছিলসহ অগ্রসর হচ্ছিলাম-গলায় ছিল “বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ো”,“গণতন্ত্র ফেরাও” ইত্যাদি স্লোগান-ঠিক সেই সময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোনো রকম উসকানি ছাড়াই তারা গুলি চালায়-এক রাউন্ড নয়,দুই রাউন্ড নয়,একে একে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে আমাদের দিকেই। গুলির শব্দে আকাশ ভারি হয়ে ওঠে,বাতাসে মিশে যায় রক্তের গন্ধ।
আমি শরীরের ভার রাখতে পারিনি। একের পর এক চারটি গুলি বিদ্ধ হয় আমার দেহে--দুটি পায়ে,দুটি হাঁটুর ওপর। মুহূর্তেই আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমার চারপাশে শুধু রক্ত,আর সহযোদ্ধাদের আর্তনাদ। সেই সময় আমার সাথের ভাইয়েরা আমাকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও সন্ত্রাসীরা আমাদের ঘিরে রাখে-আমাকে নেওয়া তো দূরের কথা,তারা বাঁচানোর চেষ্টাটুকুও করতে দেয়নি।শেষ পর্যন্ত,কোনো রকমে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের এক পল্লী চিকিৎসক ডাক্তার আশেক-এর কাছে। সেখানে আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়-কিন্তু যে ক্ষত তারা করেছে,তা শুধু রক্তে নয়,জাতির মননে।
ঘটনার স্থান
চাম্বল বাজার,বাঁশখালী
আক্রমণকারী ও আঘাতকারীর সুনির্দিষ্ট নাম ও তথ্য (যদি থাকে)
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ এর সন্ত্রাসী রবিউল আলম এর নেতৃত্বে।
আহত হওয়ার সময়কাল
১৬ জুলাই সকাল ১১.০০টা এবং ৪ আগস্ট , ২০২৪, বিকাল ৪.০০টার দিকে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকাল ১১টার দিকে আমি প্রথমবারের মতো আহত হই,যখন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বর্বর লাঠিচার্জের শিকার হই আন্দোলনের মিছিলে। সে সময় কিছুদিন চিকিৎসা গ্রহণ করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠি। তবে শারীরিক ক্ষত সারলেও,মানসিক যন্ত্রণা ও প্রতিজ্ঞা ছিল আরও গভীর।কিন্তু তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর-৪ আগস্ট ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাম্বল এলাকায় যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেই,তখন ফের ঘটে আরেক ভয়াবহ ঘটনা। ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের মিছিল লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি চালায়,এবং আমি সরাসরি গুলিবিদ্ধ হই। চারটি গুলি বিদ্ধ হয় আমার দেহে-দুটি পায়ে, এবং দুটি হাঁটুর ওপর। মুহূর্তের মধ্যেই আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি,চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত,আতঙ্ক আর হাহাকার।আহত অবস্থায় আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তারা কোনো হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে আমাকে দ্রুত স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসক-ডাক্তার আশেক এর কাছে নিয়ে যান। তিনি সাধ্যমতো আমার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমাকে বাঁশখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়,সেখানে আমার পায়ের ও হাটুর গুলি বের করা হয় এবং আমি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করি। এখনো পুরোপুরি সুস্থ নই, তবে দেশ,অধিকার এবং সত্যের জন্য লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার যে গর্ব,তা এই ক্ষতগুলোকেও অহংকারে পরিণত করেছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখন সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ ।
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেনঃ
ছাত্র,ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি,চট্টগ্রাম (৫ম সেমিস্টার)
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনাঃ
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা,চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ,পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে মিজবাহ উদ্দীন
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মিজবাহ উদ্দীন
জন্ম তারিখ : ০১-০১-২০০৫
জন্মস্থান : বাঁশখালী,চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবী : চাকরি,প্রশাসনিক কর্মকর্তা
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম।
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম:পশ্চিম বড়ঘোনা, ইউনিয়ন: বড়ঘোনা,থানা: বাঁশখালী,জেলা:চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : এরফানুল হক
পিতার পেশা ও বয়স : প্রবাসী,৪৮
মায়ের নাম : মনজুরা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী,৪২
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ২৫০০০/=
আয়ের উৎস : রেমিটেন্স
বাড়ী : সেমিপাকা বাড়ি
সম্পদ : ৪গণ্ডা পরিমাণ জায়গা আছে।
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭জন
জন্ম ও শৈশবকাল
মিজবাহ উদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন ২০০৫ সালের ১লা জানুয়ারি,চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামে। গ্রামীণ নিসর্গের কোলে বেড়ে ওঠা এই সাহসী তরুণ শৈশব থেকেই ছিলেন আত্মচিন্তায় পরিপূর্ণ,বিচক্ষণ এবং সচেতন। গ্রামের সরল জীবনধারা,পারিবারিক শৃঙ্খলা এবং সামাজিক মূল্যবোধ তাঁর মানসিক গঠনে রেখেছে গভীর প্রভাব। ছোটবেলা থেকেই তার মাঝে ছিল এক স্বতন্ত্র উপলব্ধি- নিজেকে শুধু নিজের জন্য নয়,সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার গভীর তাগিদ।
পারিবারিক বিবরণ
মিছবাহ উদ্দীনের পরিবার ছিল স্নেহ,ত্যাগ ও মূল্যবোধে গঠিত এক আদর্শ সামাজিক বন্ধন। তার পিতা,ইরফানুল হক (৪৮),একজন প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত থেকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁর নিঃস্বার্থ শ্রম ও আত্মত্যাগ পরিবারের ভিত্তিকে করেছে দৃঢ় ও সহনশীল।অপরদিকে,মা মনজুরা বেগ(৪২) ছিলেন একজন দায়িত্বশীলা গৃহিণী,যিনি সন্তানদের মমতা,নৈতিকতা ও আদর্শের আলোয় গড়ে তুলেছেন নিঃস্বার্থ ভালবাসায়।মিজবাহ উদ্দীন এই পরিবারে তৃতীয় সন্তান। তার ছোট ভাই মিজানুর রহমান একজন শিক্ষার্থী,যিনি এখনো অধ্যয়নের পথে এগিয়ে চলেছেন। তিন বোনের মধ্যে বড় বোন এবং মিছবাহের নিচের বোন-এই দুইজন বিবাহিত। কনিষ্ঠ বোন ইশফাতুল জান্নাত(১৫),কওমি মাদ্রাসার জামায়াতুল উলা শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।বর্তমানে মিজবাহ উদ্দীন চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট এলাকায় একটি ছাত্রাবাসে (মেসে) বসবাস করছেন। শহরের কোলাহলের মাঝেও তিনি তার আদর্শিক সংগ্রাম ও ছাত্রজীবনকে ধরে রেখেছেন পারিবারিক অনুশাসন ও ভালোবাসার ভিতর থেকে পাওয়া সাহস ও অনুপ্রেরণায়।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন
মিজবাহ উদ্দীন উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি,চট্টগ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তবে শুধু একাডেমিক অর্জনে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন এক দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে ওঠেন। সমাজের অসংগতি,শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার মন বিদ্রোহ করত। বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী,নির্ভীক এবং নেতৃত্বগুণে বলীয়ান একজন তরুণ। তিনি বিশ্বাস করতেন-শিক্ষা মানেই শুধু ডিগ্রি নয়, বরং সমাজের কাছে নিজের দায়িত্ববোধের স্বীকৃতি।
সংগ্রামী জীবন ও আত্মত্যাগ
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন ছিল মিজবাহ উদ্দিনের সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ফ্যাসিস্ট দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যখন সারাদেশ উত্তাল,তখন মিছবাহ রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন অগ্রভাগে। শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি,হামলা,গ্রেপ্তারের ভয় কিংবা মৃত্যু-কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তার প্রতিবাদ ছিল সরব,স্পষ্ট ও আপসহীন। গলায় ছিল স্লোগান,হাতে ছিল পতাকা,হৃদয়ে ছিল বিপ্লবের দীপ্তি। তিনি রক্ত ও সাহসে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য সংগ্রামী পথচলা,যা আজকের প্রজন্মের কাছে এক গৌরবময় অনুপ্রেরণা। তাঁর আত্মত্যাগ শুধু একজন ব্যক্তির নয়-তা এক পুরো প্রজন্মের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন -এক বীরের বাণী
আমি মিজবাহ উদ্দীন-একজন ছাত্র,একজন সংগ্রামী তরুণ,আর ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই অভ্যুত্থানের একজন জীবিত সাক্ষ্য। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই,চট্টগ্রাম শহরে আমরা শরিক হয়েছিলাম এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে-সেই মিছিলে ছিলেন শহীদ ওয়াসিম আকরাম,যার নাম আজ শহীদের তালিকায় অমর হয়ে আছে। আমি ছিলাম তার পাশেই, হাতে ছিল প্রতিবাদের স্লোগান,বুকে ছিল সাহসের আগুন। হঠাৎ করেই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের উপর। তারা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে। আমি গুরুতর আহত হই। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে কোনোমতে সুস্থ হয়ে উঠি।
কিন্তু শত্রুরা জানতো না,আমাকে রক্তাক্ত করা যাবে,তবে দমিয়ে রাখা যাবে না। তাই আবারও ৪ আগস্ট ২০২৪-এক নতুন সকাল,নতুন প্রতিবাদ,নতুন প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমরা নেমে পড়ি পথে। বাঁশখালীর চাম্বল এলাকায় আয়োজন করি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন। ৩ আগস্ট থেকেই আমরা গোপনে পরিকল্পনা করি,কোথা থেকে যাব,কীভাবে যাব,কারা নেতৃত্ব দেবে। ৪ তারিখ যোহরের নামাজ শেষে আমরা ৯ নম্বর গণ্ডামারা ইউনিয়ন থেকে নিজের খরচে পারসোনাল গাড়ি ভাড়া করে রওনা হই চাম্বলের দিকে।
আমরা যখন মিছিলসহ অগ্রসর হচ্ছিলাম-গলায় ছিল “বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ো”,“গণতন্ত্র ফেরাও” ইত্যাদি স্লোগান-ঠিক সেই সময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোনো রকম উসকানি ছাড়াই তারা গুলি চালায়-এক রাউন্ড নয়,দুই রাউন্ড নয়,একে একে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে আমাদের দিকেই। গুলির শব্দে আকাশ ভারি হয়ে ওঠে,বাতাসে মিশে যায় রক্তের গন্ধ।
আমি শরীরের ভার রাখতে পারিনি। একের পর এক চারটি গুলি বিদ্ধ হয় আমার দেহে--দুটি পায়ে,দুটি হাঁটুর ওপর। মুহূর্তেই আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমার চারপাশে শুধু রক্ত,আর সহযোদ্ধাদের আর্তনাদ। সেই সময় আমার সাথের ভাইয়েরা আমাকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও সন্ত্রাসীরা আমাদের ঘিরে রাখে-আমাকে নেওয়া তো দূরের কথা,তারা বাঁচানোর চেষ্টাটুকুও করতে দেয়নি।শেষ পর্যন্ত,কোনো রকমে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের এক পল্লী চিকিৎসক ডাক্তার আশেক-এর কাছে। সেখানে আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়-কিন্তু যে ক্ষত তারা করেছে,তা শুধু রক্তে নয়,জাতির মননে।
ঘটনার স্থান
চাম্বল বাজার,বাঁশখালী
আক্রমণকারী ও আঘাতকারীর সুনির্দিষ্ট নাম ও তথ্য (যদি থাকে)
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ এর সন্ত্রাসী রবিউল আলম এর নেতৃত্বে।
আহত হওয়ার সময়কাল
১৬ জুলাই সকাল ১১.০০টা এবং ৪ আগস্ট , ২০২৪, বিকাল ৪.০০টার দিকে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকাল ১১টার দিকে আমি প্রথমবারের মতো আহত হই,যখন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বর্বর লাঠিচার্জের শিকার হই আন্দোলনের মিছিলে। সে সময় কিছুদিন চিকিৎসা গ্রহণ করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠি। তবে শারীরিক ক্ষত সারলেও,মানসিক যন্ত্রণা ও প্রতিজ্ঞা ছিল আরও গভীর।কিন্তু তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর-৪ আগস্ট ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাম্বল এলাকায় যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেই,তখন ফের ঘটে আরেক ভয়াবহ ঘটনা। ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের মিছিল লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি চালায়,এবং আমি সরাসরি গুলিবিদ্ধ হই। চারটি গুলি বিদ্ধ হয় আমার দেহে-দুটি পায়ে, এবং দুটি হাঁটুর ওপর। মুহূর্তের মধ্যেই আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি,চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত,আতঙ্ক আর হাহাকার।আহত অবস্থায় আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তারা কোনো হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে আমাকে দ্রুত স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসক-ডাক্তার আশেক এর কাছে নিয়ে যান। তিনি সাধ্যমতো আমার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমাকে বাঁশখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়,সেখানে আমার পায়ের ও হাটুর গুলি বের করা হয় এবং আমি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করি। এখনো পুরোপুরি সুস্থ নই, তবে দেশ,অধিকার এবং সত্যের জন্য লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার যে গর্ব,তা এই ক্ষতগুলোকেও অহংকারে পরিণত করেছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখন সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ ।
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেনঃ
ছাত্র,ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি,চট্টগ্রাম (৫ম সেমিস্টার)
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনাঃ
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা,চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ,পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে মিজবাহ উদ্দীন
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মিজবাহ উদ্দীন
জন্ম তারিখ : ০১-০১-২০০৫
জন্মস্থান : বাঁশখালী,চট্টগ্রাম
পেশা/ পদবী : চাকরি,প্রশাসনিক কর্মকর্তা
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম।
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম:পশ্চিম বড়ঘোনা, ইউনিয়ন: বড়ঘোনা,থানা: বাঁশখালী,জেলা:চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : এরফানুল হক
পিতার পেশা ও বয়স : প্রবাসী,৪৮
মায়ের নাম : মনজুরা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী,৪২
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ২৫০০০/=
আয়ের উৎস : রেমিটেন্স
বাড়ী : সেমিপাকা বাড়ি
সম্পদ : ৪গণ্ডা পরিমাণ জায়গা আছে।
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭জন
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍