তাজবিরুল হাসান
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা: ছাত্র, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম
২০১০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাজবিরুল হাসানের জন্ম বাঁশখালী উপজেলার নাপোড়া গ্রামের রুস্তমকাটা এলাকায়। তার জন্ম হয় এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে, যেখানে প্রকৃতি আর সংগ্রাম পাশাপাশি চলে। গ্রামের মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা এই শিশুটি ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও সংবেদনশীল। পরিবারটি আট সদস্যবিশিষ্ট, যার পিতা নাছির উদ্দীন ৫২ বছর বয়সে একজন কৃষক, আর মাতা হামিদা আক্তার ৪০ বছর বয়সে একজন গৃহিণী। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র ৯ হাজার টাকা এবং সংসারের ভরসা বলতে কৃষিজমি মাত্র ৮ শতক। এই অনুন্নত পারিপার্শ্বিকতায়ও তাজবির হার মানে না। সে নিয়মিত কুরআন শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষায় মনোনিবেশ করে। তার বড় ভাইরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, যাদের অনুসরণ করেই সে নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। তার জন্ম যেন এক প্রতীক সংগ্রামের মধ্যেও সম্ভাবনার আলো।
কর্ম
তাজবিরুল হাসান বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার নিয়মিত ছাত্র। সে একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের কনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে দিন কাটায় পাঠ্যবই, ধর্মীয় শিক্ষা আর আদর্শিক চেতনায়। তাজবির শুধুমাত্র বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তার চিন্তার বিস্তৃতি সমাজ, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও ধর্মীয় শুদ্ধতার দিকে প্রসারিত। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব তার মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে। তার পাঠশালায় অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার জন্য সে শিক্ষকদের প্রিয়। পড়ালেখার পাশাপাশি সমাজের অবস্থা ও ইতিহাস তাকে ভাবায়। বড় ভাইদের সফলতা দেখে সে প্রেরণা পায়। তাজবিরের স্বপ্ন, সে বড় হয়ে একজন আদর্শ নাগরিক হবে, সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আবার সুস্থ হয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া।
পারিবারিক বর্ণনা
তাজবির একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, যেখানে দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। বাবা নাছির উদ্দীন কৃষিজমিতে কাজ করেন, মা হামিদা গৃহিণী। তাদের আট সদস্যের সংসারে শিক্ষিত ভাইয়েরা তাদের অভিভাবকস্বরূপ। বড় ভাই ইমরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, রাকিব মাস্টার্সে, তানবির ডুয়েটে পড়ে, কামরুল এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ভাই আবরার এখনো নুরানীতে পড়ে। পরিবারে বিদ্যমান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও ধর্মীয় অনুশীলন তাজবিরকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। বাড়িটি টিনের, ছোট, কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ। প্রতিদিন তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তা নেই, তবে আশা ও সাহসে ঘাটতি নেই। এমন পরিবেশেই বেড়ে উঠেছে তাজবির সংগ্রামী, অথচ স্বপ্নবাজ এক কিশোর। তার জীবনযাপন অত্যন্ত সাদামাটা, তবুও সে আদর্শিক ও সামাজিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। পরিবারের সদস্যরা তাকে ভালবাসে এবং তার প্রতি গর্ব অনুভব করে। তারা বিশ্বাস করে, একদিন তাজবিরও তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয় এক অনিয়মিত, নিপীড়িত, দমন-পীড়নের বাস্তবতায়। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ও ছাত্ররা আওয়ামী শাসনের অধীনে ভুগছিল। শিক্ষা, চাকরি, ন্যায়বিচার সব জায়গায় বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ হয়, গণমাধ্যম হয় নিয়ন্ত্রিত। শহীদদের বিচার হয় না, বরং প্রতিবাদ করলেই হয় নির্যাতন। এই প্রেক্ষাপটে সারাদেশজুড়ে ছাত্ররা সংগঠিত হয়। মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক কণ্ঠে উচ্চারণ করে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। তাজবিরও এই সময়েই রাজনৈতিক চেতনায় সম্পৃক্ত হয়। তার কাছে আন্দোলন মানে শুধুমাত্র রাজনীতি নয়, এটি এক নৈতিক দায়িত্ব, এক বিশ্বাসের প্রকাশ। গণবিরোধী সরকারের পতন ও শহীদদের বিচার চেয়ে সে যুক্ত হয় এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে। শেখেরখীল-চাম্বল রোডে অনুষ্ঠিত মিছিল ছিল সেই চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
আন্দোলনে যোগদান
তাজবির ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে স্থানীয় মিছিলে অংশ নেয়, শেখেরখীল থেকে চাম্বল বাজার পর্যন্ত মিছিল চলে। তার চোখে ছিল স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল সাহস। মিছিলে হাজারো মানুষ, ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ নারী-পুরুষ প্রতিবাদের কণ্ঠে সোচ্চার হয়। হঠাৎ মিছিলের উপর চড়াও হয় ছাত্রলীগের ক্যাডার ও পুলিশ। চাম্বল ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবের নেতৃত্বে ইট, লাঠি, গুলি দিয়ে হামলা হয়। পুলিশের রাবার বুলেট তাজবিরের শরীরে বিদ্ধ হয় সে মুহূর্তে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বন্ধুরা তাকে টেনে সরিয়ে নেয়। প্রথমে তাকে নেওয়া হয় স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে, পরে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে সময় তার সারা শরীর অচল হয়ে পড়ে, ব্যথায় কাতরাতে থাকে। তবে সে ভয় পায় না, জানে সে একটি সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে আহত হয়েছে। তার এই প্রতিরোধ এখনো চলমান।
আহত পরবর্তী জীবন
আহত হওয়ার পর তাজবিরের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। মিছিলের দিন থেকে সে আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারে না। সারা শরীরে ব্যথা, ফুলে যায় বিভিন্ন জায়গা। চিকিৎসকরা বলে শরীরের ভেতরে বুলেট রয়ে গেছে, যা অপারেশন ছাড়া সম্ভব নয়। পড়ালেখা থমকে যায়, মাদ্রাসায় অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এক সময় যেই ছেলেটি ছিল প্রাণবন্ত, সাহসী সে এখন ব্যথার মধ্যে দিন কাটায়। পরিবারও বিপর্যস্ত; চিকিৎসার খরচ বহন করতে হিমশিম খায়। তবুও তাজবির হার মানে না। তার মনোজগতে এখনো আন্দোলনের সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে, শহীদ ভাইদের মুখ মনে পড়ে। প্রতিবাদের সেই চেতনা আজও তার হৃদয়ে জ্বলছে। সে এখন শুধু সুস্থ হতে চায়, যেন আবার পড়ালেখায় ফিরে যেতে পারে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজের জন্য কিছু করতে চায়। শরীর হয়তো দুর্বল, কিন্তু তার মন অটল, সাহস অদম্য।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
আহত হওয়ার পর তাজবির প্রাথমিক চিকিৎসা নেয় চাম্বল জেনারেল হাসপাতালে। গ্রাম্য ডাক্তার বুলেটের গর্ত সেলাই করে, ওষুধ দেয়, কিন্তু ব্যথা কমে না। পরে তাকে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। সেখানে এক্স-রে করে দেখা যায় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর জখম। চিকিৎসকরা সন্দেহ করে, শরীরে রাবার বুলেট রয়ে গেছে। এখনো তার শরীর ফুলে যায়, ব্যথা বাড়ে। পরিবারের পক্ষে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। অপারেশনের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সামর্থ্য নেই। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ছাড়া সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না। সরকার বা সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য মেলেনি। তাজবির এখন অপেক্ষায় কবে কোনো সহৃদয় মানুষ তার পাশে দাঁড়াবে। তার মতো একজন কিশোর যদি সময়মতো চিকিৎসা না পায়, তবে তা এক জাতিগত ব্যর্থতা হয়ে থাকবে।
আহত ব্যক্তির পরিচিতি
আহত ব্যক্তির পুরো নাম : তাজবিরুল হাসান
জন্ম তারিখ: ১০-০৯-২০১০
জন্মস্থান বাঁশখালী
পেশা: ছাত্র, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নাপোড়া, রুস্তমকাটা, ইউনিয়ন: পুইছড়ী, থানা বাঁশখালী, জেলা চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা: মহল্লা : নূর উল্লাহ, এলাকা: বানিয়াটিলা, থানা: কোতোয়ালি, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম নাছির উদ্দীন
পিতার পেশা ও বয়স কৃষক, ৫২
মায়ের নাম হামিদা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় ৯,০০০
আয়ের উৎস কৃষি
বাড়ি: টিনের ঘর
সম্পদ: ৮ শতাংশ জমি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৮
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. ইমরুল হাসান, বয়স: ২৬, ছাত্র, শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- সিলেট
২. রাকিবুল ইসলাম, বয়স: ২৫, ছাত্র: মাস্টার্স
৩. তানবিরুল ইসলাম, বয়স: ২৩, ছাত্র: ডুয়েট, ১ম সেমিস্টার
৪. কামরুল হাসান: বয়স: ১৬, ছাত্র: এসএসসি
৫. আবরার, বয়স: ০৭, নুরানী
ঘটনার স্থান : শেখেরখীল মেইন রোড, চাম্বল সংলগ্ন
আক্রমণকারী: পুলিশ, ছাত্রলীগ কর্মী ফখরুল ইসলাম ফাহিম
আহত হওয়ার সময়কাল: ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
প্রস্তাবনা
১. তাজবিরুল হাসানের শরীরে থাকা রাবার বুলেট অপসারণের জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
২. তার পরীক্ষার খরচ, অপারেশন এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার জন্য একটি বিশেষ চিকিৎসা তহবিল গঠন করা জরুরি।
৩. ভবিষ্যতে সে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য তার উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সম্পূর্ণ খরচ রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের মাধ্যমে বহন করা উচিত।
২০১০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাজবিরুল হাসানের জন্ম বাঁশখালী উপজেলার নাপোড়া গ্রামের রুস্তমকাটা এলাকায়। তার জন্ম হয় এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে, যেখানে প্রকৃতি আর সংগ্রাম পাশাপাশি চলে। গ্রামের মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা এই শিশুটি ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও সংবেদনশীল। পরিবারটি আট সদস্যবিশিষ্ট, যার পিতা নাছির উদ্দীন ৫২ বছর বয়সে একজন কৃষক, আর মাতা হামিদা আক্তার ৪০ বছর বয়সে একজন গৃহিণী। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র ৯ হাজার টাকা এবং সংসারের ভরসা বলতে কৃষিজমি মাত্র ৮ শতক। এই অনুন্নত পারিপার্শ্বিকতায়ও তাজবির হার মানে না। সে নিয়মিত কুরআন শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষায় মনোনিবেশ করে। তার বড় ভাইরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, যাদের অনুসরণ করেই সে নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। তার জন্ম যেন এক প্রতীক সংগ্রামের মধ্যেও সম্ভাবনার আলো।
কর্ম
তাজবিরুল হাসান বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার নিয়মিত ছাত্র। সে একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের কনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে দিন কাটায় পাঠ্যবই, ধর্মীয় শিক্ষা আর আদর্শিক চেতনায়। তাজবির শুধুমাত্র বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তার চিন্তার বিস্তৃতি সমাজ, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও ধর্মীয় শুদ্ধতার দিকে প্রসারিত। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব তার মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে। তার পাঠশালায় অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার জন্য সে শিক্ষকদের প্রিয়। পড়ালেখার পাশাপাশি সমাজের অবস্থা ও ইতিহাস তাকে ভাবায়। বড় ভাইদের সফলতা দেখে সে প্রেরণা পায়। তাজবিরের স্বপ্ন, সে বড় হয়ে একজন আদর্শ নাগরিক হবে, সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আবার সুস্থ হয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া।
পারিবারিক বর্ণনা
তাজবির একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, যেখানে দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। বাবা নাছির উদ্দীন কৃষিজমিতে কাজ করেন, মা হামিদা গৃহিণী। তাদের আট সদস্যের সংসারে শিক্ষিত ভাইয়েরা তাদের অভিভাবকস্বরূপ। বড় ভাই ইমরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, রাকিব মাস্টার্সে, তানবির ডুয়েটে পড়ে, কামরুল এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ভাই আবরার এখনো নুরানীতে পড়ে। পরিবারে বিদ্যমান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও ধর্মীয় অনুশীলন তাজবিরকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। বাড়িটি টিনের, ছোট, কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ। প্রতিদিন তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তা নেই, তবে আশা ও সাহসে ঘাটতি নেই। এমন পরিবেশেই বেড়ে উঠেছে তাজবির সংগ্রামী, অথচ স্বপ্নবাজ এক কিশোর। তার জীবনযাপন অত্যন্ত সাদামাটা, তবুও সে আদর্শিক ও সামাজিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। পরিবারের সদস্যরা তাকে ভালবাসে এবং তার প্রতি গর্ব অনুভব করে। তারা বিশ্বাস করে, একদিন তাজবিরও তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয় এক অনিয়মিত, নিপীড়িত, দমন-পীড়নের বাস্তবতায়। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ও ছাত্ররা আওয়ামী শাসনের অধীনে ভুগছিল। শিক্ষা, চাকরি, ন্যায়বিচার সব জায়গায় বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ হয়, গণমাধ্যম হয় নিয়ন্ত্রিত। শহীদদের বিচার হয় না, বরং প্রতিবাদ করলেই হয় নির্যাতন। এই প্রেক্ষাপটে সারাদেশজুড়ে ছাত্ররা সংগঠিত হয়। মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক কণ্ঠে উচ্চারণ করে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। তাজবিরও এই সময়েই রাজনৈতিক চেতনায় সম্পৃক্ত হয়। তার কাছে আন্দোলন মানে শুধুমাত্র রাজনীতি নয়, এটি এক নৈতিক দায়িত্ব, এক বিশ্বাসের প্রকাশ। গণবিরোধী সরকারের পতন ও শহীদদের বিচার চেয়ে সে যুক্ত হয় এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে। শেখেরখীল-চাম্বল রোডে অনুষ্ঠিত মিছিল ছিল সেই চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
আন্দোলনে যোগদান
তাজবির ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে স্থানীয় মিছিলে অংশ নেয়, শেখেরখীল থেকে চাম্বল বাজার পর্যন্ত মিছিল চলে। তার চোখে ছিল স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল সাহস। মিছিলে হাজারো মানুষ, ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ নারী-পুরুষ প্রতিবাদের কণ্ঠে সোচ্চার হয়। হঠাৎ মিছিলের উপর চড়াও হয় ছাত্রলীগের ক্যাডার ও পুলিশ। চাম্বল ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবের নেতৃত্বে ইট, লাঠি, গুলি দিয়ে হামলা হয়। পুলিশের রাবার বুলেট তাজবিরের শরীরে বিদ্ধ হয় সে মুহূর্তে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বন্ধুরা তাকে টেনে সরিয়ে নেয়। প্রথমে তাকে নেওয়া হয় স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে, পরে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে সময় তার সারা শরীর অচল হয়ে পড়ে, ব্যথায় কাতরাতে থাকে। তবে সে ভয় পায় না, জানে সে একটি সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে আহত হয়েছে। তার এই প্রতিরোধ এখনো চলমান।
আহত পরবর্তী জীবন
আহত হওয়ার পর তাজবিরের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। মিছিলের দিন থেকে সে আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারে না। সারা শরীরে ব্যথা, ফুলে যায় বিভিন্ন জায়গা। চিকিৎসকরা বলে শরীরের ভেতরে বুলেট রয়ে গেছে, যা অপারেশন ছাড়া সম্ভব নয়। পড়ালেখা থমকে যায়, মাদ্রাসায় অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এক সময় যেই ছেলেটি ছিল প্রাণবন্ত, সাহসী সে এখন ব্যথার মধ্যে দিন কাটায়। পরিবারও বিপর্যস্ত; চিকিৎসার খরচ বহন করতে হিমশিম খায়। তবুও তাজবির হার মানে না। তার মনোজগতে এখনো আন্দোলনের সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে, শহীদ ভাইদের মুখ মনে পড়ে। প্রতিবাদের সেই চেতনা আজও তার হৃদয়ে জ্বলছে। সে এখন শুধু সুস্থ হতে চায়, যেন আবার পড়ালেখায় ফিরে যেতে পারে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজের জন্য কিছু করতে চায়। শরীর হয়তো দুর্বল, কিন্তু তার মন অটল, সাহস অদম্য।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
আহত হওয়ার পর তাজবির প্রাথমিক চিকিৎসা নেয় চাম্বল জেনারেল হাসপাতালে। গ্রাম্য ডাক্তার বুলেটের গর্ত সেলাই করে, ওষুধ দেয়, কিন্তু ব্যথা কমে না। পরে তাকে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। সেখানে এক্স-রে করে দেখা যায় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর জখম। চিকিৎসকরা সন্দেহ করে, শরীরে রাবার বুলেট রয়ে গেছে। এখনো তার শরীর ফুলে যায়, ব্যথা বাড়ে। পরিবারের পক্ষে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। অপারেশনের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সামর্থ্য নেই। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ছাড়া সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না। সরকার বা সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য মেলেনি। তাজবির এখন অপেক্ষায় কবে কোনো সহৃদয় মানুষ তার পাশে দাঁড়াবে। তার মতো একজন কিশোর যদি সময়মতো চিকিৎসা না পায়, তবে তা এক জাতিগত ব্যর্থতা হয়ে থাকবে।
আহত ব্যক্তির পরিচিতি
আহত ব্যক্তির পুরো নাম : তাজবিরুল হাসান
জন্ম তারিখ: ১০-০৯-২০১০
জন্মস্থান বাঁশখালী
পেশা: ছাত্র, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নাপোড়া, রুস্তমকাটা, ইউনিয়ন: পুইছড়ী, থানা বাঁশখালী, জেলা চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা: মহল্লা : নূর উল্লাহ, এলাকা: বানিয়াটিলা, থানা: কোতোয়ালি, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম নাছির উদ্দীন
পিতার পেশা ও বয়স কৃষক, ৫২
মায়ের নাম হামিদা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় ৯,০০০
আয়ের উৎস কৃষি
বাড়ি: টিনের ঘর
সম্পদ: ৮ শতাংশ জমি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৮
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. ইমরুল হাসান, বয়স: ২৬, ছাত্র, শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- সিলেট
২. রাকিবুল ইসলাম, বয়স: ২৫, ছাত্র: মাস্টার্স
৩. তানবিরুল ইসলাম, বয়স: ২৩, ছাত্র: ডুয়েট, ১ম সেমিস্টার
৪. কামরুল হাসান: বয়স: ১৬, ছাত্র: এসএসসি
৫. আবরার, বয়স: ০৭, নুরানী
ঘটনার স্থান : শেখেরখীল মেইন রোড, চাম্বল সংলগ্ন
আক্রমণকারী: পুলিশ, ছাত্রলীগ কর্মী ফখরুল ইসলাম ফাহিম
আহত হওয়ার সময়কাল: ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
প্রস্তাবনা
১. তাজবিরুল হাসানের শরীরে থাকা রাবার বুলেট অপসারণের জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
২. তার পরীক্ষার খরচ, অপারেশন এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার জন্য একটি বিশেষ চিকিৎসা তহবিল গঠন করা জরুরি।
৩. ভবিষ্যতে সে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য তার উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সম্পূর্ণ খরচ রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের মাধ্যমে বহন করা উচিত।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍