হোম / আহতদের তালিকা / মো. আবু সাইয়িদ
মো. আবু সাইয়িদ

মো. আবু সাইয়িদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা :চাকরি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়ঃ
নাম মো. আবু সাইয়িদ। তাঁর জন্ম ১৯৯৮ সালের ১লা জানুয়ারি ফেনী জেলার লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়াজপুর গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সৎ, নীতিবান ও পরিশ্রমী। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা মো. আবু সকইয়িদ ছোটবেলা থেকেই মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং সততার পথে চলতে নিজেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেন। বর্তমানে তিনি পেশায় একজন চাকরিজীবী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে পরিবার ও সমাজের প্রতি তাঁর কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে চলেছেন।
তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ফেনী জেলার ফেনী থানার অন্তর্গত লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়াজপুর গ্রাম হলেও বর্তমানে তিনি ফেনী সদর উপজেলার নেয়াজপুর লেমুয়ার বসর মেম্বার বাড়িতে বসবাস করছেন। পারিবারিকভাবে তিনি মৃত আবু তাহেরের পুত্র এবং মাতা বিবি রহিমার সন্তান। পিতার সততা ও কর্মনিষ্ঠা এবং মায়ের ভালোবাসা ও স্নেহ তাঁকে দৃঢ় চরিত্র ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ করেছে। পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক আদর্শ তাঁকে গড়ে তুলেছে একজন নীতিনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে।
মো. আবু সকইয়িদ সর্বদা ন্যায়ের পথে অটল ছিলেন। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় রুখে দাঁড়াতেন এবং সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপোষ করেননি। তাঁর এই নৈতিক দৃঢ়তা ও সাহসী মনোভাবের জন্য তিনি এলাকায় একজন সৎ, সাহসী ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মনোভাব এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার তাঁকে অন্যদের কাছে প্রিয় করে তুলেছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, সততা ও নৈতিকতা মানুষকে প্রকৃত অর্থে মহান করে তোলে। সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে তিনি নিজ জীবনে সততার চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর জীবনের লক্ষ্য সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে সমাজে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। মো. আবু সকইয়িদ আজও তাঁর দৃঢ় নীতি, মানবিক গুণাবলি এবং পরিশ্রমী মানসিকতার জন্য সবার কাছে একজন অনুকরণীয় মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ:
দেশ যখন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের এক দফার আন্দোলনে উত্তাল, তখন রাজপথে গর্জে ওঠে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। স্বাধীনতা, ন্যায় ও গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলার আকাশ-মাটি মুখরিত হয়ে ওঠে মুক্তির শ্লোগানে। সর্বস্তরের মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নামে, তখন তাঁদের কাতারে সাহসিকতার সঙ্গে যোগ দেন মোঃ আবু সাইয়িদ। রাজপথে তাঁর অটল অবস্থান ছিল সত্য ও ন্যায়ের প্রতি এক অবিচল অঙ্গীকার। ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল এলাকায় যোহরের নামাজ শেষে আন্দোলনকারীরা যখন নতুন উদ্দীপনায় শ্লোগান দিচ্ছিল, তখনই শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। হঠাৎ করেই রাজপথ কেঁপে ওঠে গুলির শব্দে। নিরস্ত্র মানুষের মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সন্ত্রাসী বাহিনী—আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে হামলা চালায়। অমানবিক এই আক্রমণ ছিল আওয়ামী স্বৈরশাসনের নৃশংসতা ও গণতন্ত্রবিরোধী মনোভাবের এক নগ্ন প্রকাশ।
নিরস্ত্র জনতা জীবন বাজি রেখে ইট-পাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চালালেও, সশস্ত্র হামলাকারীদের সামনে তাঁদের সেই প্রতিরোধ ছিল অনেক দুর্বল। এই রক্তাক্ত সংঘর্ষের মধ্যেই মো. আবু সকইয়িদের শরীরে প্রবেশ করে দু’টি গুলি—যার একটি তাঁর পেটের ডান পাশে গেঁথে যায়। মুহূর্তেই তিনি রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বুকভরা সাহস থাকলেও শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা তাঁকে নিস্তেজ করে দেয়। তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাজপথেই কষ্ট সহ্য করেন, আর চারদিকে তখন শোনা যাচ্ছিল আহত মানুষের আর্তচিৎকার ও গুলির শব্দ। শেষপর্যন্ত তাঁর এক সাহসী সহযোদ্ধা, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই, তাঁকে কাঁধে তুলে উদ্ধার করেন।
প্রথমে তাঁকে নেওয়া হয় ফেনী সদর হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও জরুরি মুহূর্তে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় তাঁকে দ্রুত স্থানান্তর করা হয় ডা. হায়দার ক্লিনিকে। সেখানে তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে জীবন ফিরে পান। এই ঘটনাটি কেবল একজন আন্দোলনকারীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে আওয়ামী স্বৈরশাসন গণআন্দোলন দমন করতে কী ভয়াবহ বর্বরতা চালাতে সক্ষম।
রক্তাক্ত মহিপাল যেন হয়ে ওঠে নৃশংসতার প্রতীক। নিরস্ত্র মানুষের বুক চিরে ছিটকে আসা রক্ত মিশে যায় রাজপথে, আর সেই রক্তের দাগ আজও সাক্ষ্য দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের। মো. আবু সকইয়িদের মতো অগণিত আন্দোলনকারী তাঁদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সত্যকে দমন করা যায় না, ন্যায়কে থামানো যায় না। তাঁদের তাজা রক্তে সিক্ত রাজপথই একদিন স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। আওয়ামী নৃশংসতার সেই রক্তাক্ত অধ্যায় ইতিহাসে চিরকাল এক কলঙ্কিত স্মৃতি হয়ে থাকবে, আর আহত ও শহীদ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ হয়ে উঠবে গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামের অমর প্রেরণা।
চিকিৎসা:
ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর আমাকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় ডাক্তার না থাকা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ায় সেদিন রাতেই আমাকে ডা. হায়দার ক্লিনিকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক আমার অবস্থা গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করেন। ডাক্তার আমাকে শারীরিক বিশ্রাম, নিয়মিত পরিচর্যা ও ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন এবং বিস্তারিত প্রিসক্রিপশন লিখে দেন। তাঁর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করে আমি ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে অগ্রসর হতে থাকি। এই চিকিৎসা-পর্ব আমার জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার আশার সঞ্চার করে এবং সংগ্রামী জীবনের পথচলায় আমাকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আমার জীবন নতুন এক সংকটে পতিত হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা চালানোর মতো পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা আমার হাতে ছিল না। তার উপর হঠাৎ করেই আমার চাকরিটিও চলে যায়, ফলে আমি একেবারেই দিশাহারা হয়ে পড়ি। সংসারের দায়-দায়িত্ব, মায়ের দেখভাল এবং নিজের চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে আমি গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে যাই। বর্তমানে যদি আমাকে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তবে আমি স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারব। নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করাও আমার পক্ষে সম্ভব হবে। এ ধরনের একটি সুযোগ শুধু আমাকে নয়, আমার পুরো পরিবারকেও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করবে।


একনজরে:
নাম : মো. আবু সাইয়িদ
জন্মতারিখ ১/১/১৯৯৮
জন্মস্থান : নেয়াজপুর,ফেনী
পেশা :চাকরি
স্থায়ী ঠিকানা:
গ্রাম : নেয়াজপুর
ইউনিয়ন : লেমুয়া
থানা :ফেনী
জেলা : ফেনী
বর্তমান ঠিকানা :
গ্রাম : বসর মেম্বার বাড়ী
এলাকা: নেয়াজপুর লেমুয়া
থানা :ফেনী সদর
জেলা : ফেনী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আবু তাহের
মায়ের নাম :বিবি রহিমা
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী,৪৫
মাসিক আয়: ১২০০০ টাকা
ভাই ও বোনের নাম: আবু তালেব, ফাতেমা আক্তার
যোগাযোগ:০১৮১৯৫৯৯১৮৩

ঘটনার স্থান : মহিপাল
আহত হওয়ার সময়কাল : ৪ আগস্ট ২০২৪ ,বেলা ২টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍