মো: মেহেদী হাসান শুভ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ঝালকাঠির নৈকেঠি গ্রামে ২০০৬ সালে জন্ম নেওয়া মো: মেহেদী হাসান শুভ ছিলেন এক পরিশ্রমী ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, যাঁর হাতের কাজই ছিল পরিবারের ভরসা। ঢাকায় দিনমজুর জীবনের সংগ্রাম সামলাতে সামলাতে গড়েছিলেন নিজের স্বপ্নের পথ। কিন্তু ১৯ জুলাই ২০২৪ যাত্রাবাড়ীর বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশি গুলিতে তাঁর পায়ের হাড় চূর্ণ হয়ে যায়, থেমে যায় জীবন-জীবিকার গতিপথ। তবু শুভ আজ দুঃখের প্রতীক নন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তরুণ প্রজন্মের সাহস, যে বেদনার মূল্যেও স্বাধীনতার নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছে। তাঁর ক্ষত আমাদের সমাজের বিবেককে জাগিয়ে রাখার নীরব শপথ।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
পুলিশি গুলিতে ভেঙে গেছে পায়ের হাঁড়
অর্জিত হয়েছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা
মো: মেহেদী হাসান শুভ
ক্রমিক: ০৫৫
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৫
জন্ম, পরিবার ও পেশাগত জীবন
মোঃ মেহেদী হাসান শুভ একজন পরিশ্রমী তরুণ, যিনি জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার নৈকেঠি গ্রামে। ঢাকায় বসবাস করছেন উত্তর মুরাদপুরে। হোল্ডিং নম্বর ৮৭/১, হাজী লাল মিয়া সরকার রোড, ওয়ার্ড নং ৫২, কদমতলী থানার অন্তর্গত এলাকায়। শুভ-এর পিতা, আব্দুল গনি হাওলাদার, একজন রাজমিস্ত্রীর যোগালি হিসেবে কাজ করে পরিবারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৬০ বছর। তাঁর মা, মিনারা বেগম, একজন গৃহিণী; বয়স ৪০ বছর। পরিবারে ইয়াসমিন আক্তার তন্নী নামে একটি ছোট বোন আছে। যিনি ঘরের কাজ সামলান। অল্পবয়সেই মেহেদী শুভ পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ বেছে নেন। শহরের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ, লাইন মেরামত ও ইনস্টলেশনের মতো পরিশ্রমী কাজ করে তিনি পরিবারকে সাপোর্ট দিয়ে আসছিলেন।
আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা
১৯ জুলাই ২০২৪, সকাল ১১টায় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মেহেদী শুভঅংশগ্রহণ করেন। জনগণের ন্যায্য অধিকার ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। শুভ সে সময় উপস্থিত ছিলেন যাত্রাবাড়ীর প্রধান সড়কে। আন্দোলনের মাঝপথেই পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই নৃশংস হামলায় শুভ সরাসরি গুলিবিদ্ধ হন। গুলি তাঁর পায়ে লাগে এবং এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলিতে হাড় ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
চিকিৎসা ও শারীরিক পরিস্থিতি
গুলিবিদ্ধ হবার পর আশেপাশের আন্দোলনকারী ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর পায়ে "ইলিজারোভ" নামক জটিল অপারেশন করা হয়, যা হাড় পুনর্গঠনের জন্য ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘসময় পায়ে ইলিজারোভ বসানো ছিল। অপারেশনের পর তা খুলে ফেলা হয় এবং বর্তমানে প্লাস্টার করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসা খরচ প্রায় ১ লক্ষ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌছেছে। শুধু অপারেশন ব্যয় সরকারিভাবে সহায়তা হিসেবে বিনামূল্যে করা হয়েছে, বাকী সমস্ত ওষুধ, ব্যান্ডেজ, সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদি তিনি নিজের খরচেই সংগ্রহ করেছেন। প্রতি সপ্তাহে তাঁর ওষুধ খরচ গড়ে ৩০০০ টাকা করে হচ্ছে, যা তাঁর মতো একজন শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক বিশাল বোঝা। বর্তমানে তিনি কর্মক্ষম অবস্থায় নেই, ফলে উপার্জনের কোনো পথও নেই। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও নাজুক, কারণ বাবা একটি দিনমজুরির কাজ করেন এবং মা গৃহিণী।
সমাজচিত্র ও পটভূমি
মেহেদী হাসান শুভ যে সমাজব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছেন, তা একেবারেই সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির। তাঁর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও পরিশ্রমী ও আত্মত্মসম্মানবোধে দৃঢ়। রাজধানী ঢাকার কদমতলী এলাকার একটি ছোট্ট বাসায় তাঁর বর্তমান বসবাস। এই এলাকাটি দিনমজুর, রিকশাচালক, মিস্ত্রী ও ছোট ব্যবসায়ীদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। শুভ এখানে থেকে প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হতেন। পরিবারকে সাহায্য করতে পেরে তিনি গর্ববোধ করতেন। জীবনের ছোট ছোট চাহিদা পূরণই ছিল তাঁর বড় স্বপ্ন।
আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
শুভ কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী না হলেও, বৈষম্যের বিরুদ্ধে হওয়া ২০২৪ সালের আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও নৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সমাজে বিদ্যমান অবিচার ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সাধারণ মানুষের দাবি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার জন্য হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে রাস্তায় নেমে পড়েন। পুলিশি গুলিবর্ষণের সময় তিনি পেছনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তবুও তাঁর গায়ে গুলি লাগে, যা রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক নির্মম উদাহরণ।
মানসিক অবস্থা ও যন্ত্রণার বিবরণ
শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি শুভ ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন, স্বাধীন চলাফেরা, উপার্জনের শক্তি, সব কিছু যেন থেমে গেছে। তিনি প্রায়শই হতাশায় ভুগেন, কারণ পায়ের অবস্থার কারণে তিনি এখন নিজের কাজ করতে অক্ষম। নিজের অসহায়তা ও পরিবারের চোখে কষ্টের ছাপ পড়তে দেখে তাঁর হৃদয় ভেঙে যায়। প্রতিদিন ব্যথা, ওষুধের বোঝা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁকে এক ভয়ানক মানসিক চাপে ফেলে। দিয়েছে।
পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট
শুভ-এর চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে তাঁর পরিবার নিঃস্ব প্রায়। একজন যোগালির সামান্য আয় দিয়ে এত বড় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা ধার দেনা করে ওষুধ কিনেছেন, ডাক্তার দেখিয়েছেন। শুভ কর্মক্ষম না থাকায় পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে কেবল তাঁর বৃদ্ধ পিতা। বোন ইয়াসমিন গৃহিণী এবং মা গৃহস্থালির কাজ করেন। অর্থাৎ পুরো পরিবার বর্তমানে এক ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা
মেহেদী হাসান শুভ রাষ্ট্রের কাছে কোনো বিলাসী দাবি রাখেন না। তিনি শুধু চান, যেন সরকার তাঁর পুনর্বাসনের দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাঁকে যেন একটি স্থায়ী চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করা হয় এবং অন্তত ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি ক্ষুদ্র অনুদান ও চলাচলের উপকরণ (যেমন: হুইল চেয়ার, ক্রাচ, রিকভারির জন্য থেরাপি) দেয়া হয়। তিনি চান, ভবিষ্যতে কেউ যেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার না হন।
শুভর জীবনের বার্তা
মেহেদী হাসান শুভর জীবন কেবল একটি আহত তরুণের গল্প নয়, বরং এটি এক অসাম্য সমাজে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এক সাহসী কর্মীর দলিল। তাঁর ক্ষত শুধু শরীরের নয়। এই ক্ষত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের পীড়নের বাস্তব রূপ। শুভ-এর মতো হাজারো তরুণ আজ অসহায়, আহত ও পঙ্গু হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন। তাঁদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা
১. চলমান চিকিৎসা সহায়তা: মো: মেহেদী হাসান শুভ বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩,০০০ টাকা ব্যয়ে ওষুধ ও চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই ব্যয় বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। মাসিক অন্তত ১২,০০০ টাকা চিকিৎসা সহায়তা প্রদান জরুরি।
২. পুনর্বাসন খরচ: পায়ে ইলিজারোভ অপারেশনশেষে এখন প্লাস্টার অবস্থায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে ফিজিওথেরাপি ও হাড়ের জোড়া লাগানোর জন্য নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন। এজন্য এককালীন ১,০০,০০০ টাকার পুনর্বাসন তহবিল প্রয়োজন।
৩. ভরণ-পোষণ সহায়তা: আহতের উপার্জন বন্ধ হওয়ায়
পরিবারে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী, বোন গৃহস্থালি কাজ করেন। পরিবারকে চলমান রাখতে কমপক্ষে মাসিক ১০,০০০ টাকা ভরণ-পোষণ ভাতা নির্ধারণ করা আবশ্যক।
৪. দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান: শুভ পূর্বের কাজ (ইলেকট্রিক মিস্ত্রী) এখন আর করতে পারছেন না। তাই তাঁকে প্রশিক্ষণভিত্তিক বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়া যেতে পারে।
যেমন: মোবাইল মেরামতের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র দোকান স্থাপন। এক্ষেত্রে ১,৫০,০০০ টাকা মূলধন সহায়তা জরুরি।
৫. চিকিৎসা ও বাসস্থানের অনুদান: চিকিৎসা চলাকালীন বাসা ভাড়া ও যাতায়াতের জন্য অন্তত এককালীন অনুদান প্রয়োজন, যাতে পরিবারটি ঢাকায় থাকতে পারে এবং চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে।
এক নজরে মো: মেহেদী হাসান শুভ
নাম: মো: মেহেদী হাসান শুভ
জন্ম তারিখ: ২১-০১-২০০৬
পেশা: ইলেকট্রিক মিস্ত্রি
বর্তমান ঠিকানা: হোল্ডিং নাম্বার ৮৭/১, উত্তর মুরাদপুর, হাজী লাল মিয়া, সরকার রোড
ওয়ার্ড নং ৫২, থানা কদমতলী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: নৈকেঠি, রাজাপুর, ঝালকাঠি
পারিবারিক তথ্য
পিতা: আব্দুল গনি হাওলাদার
পিতার পেশা ও বয়স: রাজমিস্ত্রীর যোগালি, ৬০
মাতা: মিনারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৪০
বোনের নাম: ইয়াসমিন আক্তার তন্নি, গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান: যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়:১৯ জুলাই ২০২৪, সকাল ১১.০০টা
আক্রমণকারী: পুলিশ
অর্জিত হয়েছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা
মো: মেহেদী হাসান শুভ
ক্রমিক: ০৫৫
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৫
জন্ম, পরিবার ও পেশাগত জীবন
মোঃ মেহেদী হাসান শুভ একজন পরিশ্রমী তরুণ, যিনি জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার নৈকেঠি গ্রামে। ঢাকায় বসবাস করছেন উত্তর মুরাদপুরে। হোল্ডিং নম্বর ৮৭/১, হাজী লাল মিয়া সরকার রোড, ওয়ার্ড নং ৫২, কদমতলী থানার অন্তর্গত এলাকায়। শুভ-এর পিতা, আব্দুল গনি হাওলাদার, একজন রাজমিস্ত্রীর যোগালি হিসেবে কাজ করে পরিবারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৬০ বছর। তাঁর মা, মিনারা বেগম, একজন গৃহিণী; বয়স ৪০ বছর। পরিবারে ইয়াসমিন আক্তার তন্নী নামে একটি ছোট বোন আছে। যিনি ঘরের কাজ সামলান। অল্পবয়সেই মেহেদী শুভ পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ বেছে নেন। শহরের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ, লাইন মেরামত ও ইনস্টলেশনের মতো পরিশ্রমী কাজ করে তিনি পরিবারকে সাপোর্ট দিয়ে আসছিলেন।
আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা
১৯ জুলাই ২০২৪, সকাল ১১টায় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মেহেদী শুভঅংশগ্রহণ করেন। জনগণের ন্যায্য অধিকার ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। শুভ সে সময় উপস্থিত ছিলেন যাত্রাবাড়ীর প্রধান সড়কে। আন্দোলনের মাঝপথেই পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই নৃশংস হামলায় শুভ সরাসরি গুলিবিদ্ধ হন। গুলি তাঁর পায়ে লাগে এবং এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলিতে হাড় ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
চিকিৎসা ও শারীরিক পরিস্থিতি
গুলিবিদ্ধ হবার পর আশেপাশের আন্দোলনকারী ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর পায়ে "ইলিজারোভ" নামক জটিল অপারেশন করা হয়, যা হাড় পুনর্গঠনের জন্য ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘসময় পায়ে ইলিজারোভ বসানো ছিল। অপারেশনের পর তা খুলে ফেলা হয় এবং বর্তমানে প্লাস্টার করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসা খরচ প্রায় ১ লক্ষ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌছেছে। শুধু অপারেশন ব্যয় সরকারিভাবে সহায়তা হিসেবে বিনামূল্যে করা হয়েছে, বাকী সমস্ত ওষুধ, ব্যান্ডেজ, সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদি তিনি নিজের খরচেই সংগ্রহ করেছেন। প্রতি সপ্তাহে তাঁর ওষুধ খরচ গড়ে ৩০০০ টাকা করে হচ্ছে, যা তাঁর মতো একজন শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক বিশাল বোঝা। বর্তমানে তিনি কর্মক্ষম অবস্থায় নেই, ফলে উপার্জনের কোনো পথও নেই। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও নাজুক, কারণ বাবা একটি দিনমজুরির কাজ করেন এবং মা গৃহিণী।
সমাজচিত্র ও পটভূমি
মেহেদী হাসান শুভ যে সমাজব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছেন, তা একেবারেই সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির। তাঁর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও পরিশ্রমী ও আত্মত্মসম্মানবোধে দৃঢ়। রাজধানী ঢাকার কদমতলী এলাকার একটি ছোট্ট বাসায় তাঁর বর্তমান বসবাস। এই এলাকাটি দিনমজুর, রিকশাচালক, মিস্ত্রী ও ছোট ব্যবসায়ীদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। শুভ এখানে থেকে প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হতেন। পরিবারকে সাহায্য করতে পেরে তিনি গর্ববোধ করতেন। জীবনের ছোট ছোট চাহিদা পূরণই ছিল তাঁর বড় স্বপ্ন।
আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
শুভ কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী না হলেও, বৈষম্যের বিরুদ্ধে হওয়া ২০২৪ সালের আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও নৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সমাজে বিদ্যমান অবিচার ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সাধারণ মানুষের দাবি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার জন্য হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে রাস্তায় নেমে পড়েন। পুলিশি গুলিবর্ষণের সময় তিনি পেছনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তবুও তাঁর গায়ে গুলি লাগে, যা রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক নির্মম উদাহরণ।
মানসিক অবস্থা ও যন্ত্রণার বিবরণ
শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি শুভ ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন, স্বাধীন চলাফেরা, উপার্জনের শক্তি, সব কিছু যেন থেমে গেছে। তিনি প্রায়শই হতাশায় ভুগেন, কারণ পায়ের অবস্থার কারণে তিনি এখন নিজের কাজ করতে অক্ষম। নিজের অসহায়তা ও পরিবারের চোখে কষ্টের ছাপ পড়তে দেখে তাঁর হৃদয় ভেঙে যায়। প্রতিদিন ব্যথা, ওষুধের বোঝা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁকে এক ভয়ানক মানসিক চাপে ফেলে। দিয়েছে।
পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট
শুভ-এর চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে তাঁর পরিবার নিঃস্ব প্রায়। একজন যোগালির সামান্য আয় দিয়ে এত বড় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা ধার দেনা করে ওষুধ কিনেছেন, ডাক্তার দেখিয়েছেন। শুভ কর্মক্ষম না থাকায় পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে কেবল তাঁর বৃদ্ধ পিতা। বোন ইয়াসমিন গৃহিণী এবং মা গৃহস্থালির কাজ করেন। অর্থাৎ পুরো পরিবার বর্তমানে এক ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা
মেহেদী হাসান শুভ রাষ্ট্রের কাছে কোনো বিলাসী দাবি রাখেন না। তিনি শুধু চান, যেন সরকার তাঁর পুনর্বাসনের দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাঁকে যেন একটি স্থায়ী চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করা হয় এবং অন্তত ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি ক্ষুদ্র অনুদান ও চলাচলের উপকরণ (যেমন: হুইল চেয়ার, ক্রাচ, রিকভারির জন্য থেরাপি) দেয়া হয়। তিনি চান, ভবিষ্যতে কেউ যেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার না হন।
শুভর জীবনের বার্তা
মেহেদী হাসান শুভর জীবন কেবল একটি আহত তরুণের গল্প নয়, বরং এটি এক অসাম্য সমাজে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এক সাহসী কর্মীর দলিল। তাঁর ক্ষত শুধু শরীরের নয়। এই ক্ষত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের পীড়নের বাস্তব রূপ। শুভ-এর মতো হাজারো তরুণ আজ অসহায়, আহত ও পঙ্গু হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন। তাঁদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা
১. চলমান চিকিৎসা সহায়তা: মো: মেহেদী হাসান শুভ বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩,০০০ টাকা ব্যয়ে ওষুধ ও চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই ব্যয় বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। মাসিক অন্তত ১২,০০০ টাকা চিকিৎসা সহায়তা প্রদান জরুরি।
২. পুনর্বাসন খরচ: পায়ে ইলিজারোভ অপারেশনশেষে এখন প্লাস্টার অবস্থায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে ফিজিওথেরাপি ও হাড়ের জোড়া লাগানোর জন্য নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন। এজন্য এককালীন ১,০০,০০০ টাকার পুনর্বাসন তহবিল প্রয়োজন।
৩. ভরণ-পোষণ সহায়তা: আহতের উপার্জন বন্ধ হওয়ায়
পরিবারে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী, বোন গৃহস্থালি কাজ করেন। পরিবারকে চলমান রাখতে কমপক্ষে মাসিক ১০,০০০ টাকা ভরণ-পোষণ ভাতা নির্ধারণ করা আবশ্যক।
৪. দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান: শুভ পূর্বের কাজ (ইলেকট্রিক মিস্ত্রী) এখন আর করতে পারছেন না। তাই তাঁকে প্রশিক্ষণভিত্তিক বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়া যেতে পারে।
যেমন: মোবাইল মেরামতের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র দোকান স্থাপন। এক্ষেত্রে ১,৫০,০০০ টাকা মূলধন সহায়তা জরুরি।
৫. চিকিৎসা ও বাসস্থানের অনুদান: চিকিৎসা চলাকালীন বাসা ভাড়া ও যাতায়াতের জন্য অন্তত এককালীন অনুদান প্রয়োজন, যাতে পরিবারটি ঢাকায় থাকতে পারে এবং চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে।
এক নজরে মো: মেহেদী হাসান শুভ
নাম: মো: মেহেদী হাসান শুভ
জন্ম তারিখ: ২১-০১-২০০৬
পেশা: ইলেকট্রিক মিস্ত্রি
বর্তমান ঠিকানা: হোল্ডিং নাম্বার ৮৭/১, উত্তর মুরাদপুর, হাজী লাল মিয়া, সরকার রোড
ওয়ার্ড নং ৫২, থানা কদমতলী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: নৈকেঠি, রাজাপুর, ঝালকাঠি
পারিবারিক তথ্য
পিতা: আব্দুল গনি হাওলাদার
পিতার পেশা ও বয়স: রাজমিস্ত্রীর যোগালি, ৬০
মাতা: মিনারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৪০
বোনের নাম: ইয়াসমিন আক্তার তন্নি, গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান: যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়:১৯ জুলাই ২০২৪, সকাল ১১.০০টা
আক্রমণকারী: পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍