হোম / আহতদের তালিকা / এম এ হোসেন
এম এ হোসেন

এম এ হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশাঃ শিক্ষক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

“আন্দোলনের মাটিতে এক শিক্ষকের কণ্ঠ
এম এ হোসেন ফেনী জেলার দক্ষিন সুজাপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম তারিখ ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২। তার পিতা মোঃ আঃ রব মিয়া, যিনি কৃষির সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে ৯৩ বছর বয়সী। মাতা মোছাঃ মোমেনা খাতুন (৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন) ছিলেন গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই সাধারণ, সীমিত আয় ও ঋণগ্রন্থের মাধ্যমে চলে জীবন-যাত্রা।
হোসেনের ছোটবেলা ছিল শান্ত এবং সাধ্যের মধ্যে। গ্রামের পরিবেশ ও পরিবার তাকে শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব শিখিয়েছে। তিনি খুব কমবয়সে শিখতে আগ্রহী ছিলেন এবং পরিশ্রমী চরিত্রের অধিকারী। গ্রামের ছোট মাঠ, স্কুল এবং পাড়ার ছোট রাস্তা তার শৈশবের অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে, যেখানে পড়াশোনা, খেলা ও সামাজিক সহমর্মিতা তার জীবনের মূল অংশ।
শৈশব থেকেই হোসেন ছিলেন দায়িত্বশীল, শিক্ষার্থী হিসেবে স্বপ্নবিলাসী। পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা তাকে গ্রামের সাধারণ পরিবেশের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে প্রেরণা যুগিয়েছে। পরিবার তার শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, যদিও আর্থিক সীমাবদ্ধতা সবসময় চ্যালেঞ্জ ছিল।
তিনি পরে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন, যেখানে তার জীবনের শৃঙ্খল ও স্বপ্ন একত্রিত হয়। তার পরিবারে মোট পাঁচজন সদস্য ছিলেন—পিতা, মা, তিনি নিজে এবং দুই সন্তান। ছোটবেলা থেকে হোসেনের চরিত্র, মনোভাব ও অধ্যবসায় তাকে শুধু শিক্ষার্থী নয়, বরং সমাজের জন্য দায়বদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে তৈরি করেছে।
হোসেনের জন্ম ও শৈশবের এই তথ্য প্রমাণ করে, একটি সাধারণ পরিবার থেকেও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষ তার জীবন গড়ে তুলতে পারে।
রক্তে রঞ্জিত আগস্টঃ
ফেনীর ইতিহাস আজ রক্তে রক্তাক্ত। মহিপাল ওভার ব্রিজের রাস্তায় সাধারণ মানুষের রক্ত ছড়িয়ে পড়ে, আর রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভ স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ ও খুনি হাসিনাকে নির্মম খেলায় পরিণত করেছে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রমাণ করল—স্বৈরাচারী কোনো শক্তিই চিরদিন জনগণের ন্যায়ের দাবিকে দমন করতে পারবে না।
শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, ধর্মপ্রাণ যুবক কিংবা নিরীহ কিশোর—কেউই রক্ষা পায়নি। খুনি হাসিনার নির্দেশে পরিচালিত আওয়ামী লীগ, তাদের দোসর ছাত্রলীগ এবং হাসিনার পুলিশের সহায়তায় আহত হন এম এ হোসেন। বাম চোখে রাবার বুলেট লেগে তার দৃষ্টি শক্তি ও স্মরণ শক্তি আজও দুর্বল। ওই সময় প্রায় ৪০০–৫০০ সাধারণ মানুষ আহত হন, নিহত হন ১৩ জন দেশপ্রেমিক ছাত্র ও এক রিক্সা চালক। হোসেন নিজে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন, হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল স্বপ্ন, সাহস এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ।
সেদিন মহিপাল ওভার ব্রিজে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়েছিল অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে। তাদের মুখে ছিল স্লোগান—“এক দফা, এক দাবি।” কিন্তু স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ এই দৃশ্য সহ্য করতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের শত্রু মনে করে তারা রাষ্ট্রীয় পুলিশকে ব্যবহার করেছে এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীদেরও মিছিলে ছেড়ে দিয়েছে। গুলি, টিয়ারশেল এবং লাঠিচার্জের মাধ্যমে একমাত্র লক্ষ্য পূরণ করা হয়েছে—“খুনি হাসিনার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা।”
ফেনী, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে একই নৃশংসতা ঘটেছে। মসজিদ থেকে নামাজ শেষে আসা ছাত্রদের ওপরও গুলি চালানো হয়। যারা জনগণের রক্ষক হওয়ার কথা, তারা পরিণত হয়েছে জনগণের জল্লাদে। আর সাধারণ মানুষ, যারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল, তারা আজও আঘাত ও মানসিক কষ্টে ভুগছে। এম এ হোসেনের দৃষ্টিতে এখনও সেই ভয়ের ছাপ আছে। তার বাম চোখের আঘাতের কারণে সে দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি শিক্ষাজীবন চালাতে পারছে না।
আজ এম এ হোসেন সহ অসংখ্য আহত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায়। এই ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি পুরো জাতির কান্না। রাস্তায় লুটিয়ে পড়া মানুষ, অসহায় শিক্ষার্থী এবং আহত জনতার গল্প প্রমাণ করে, ন্যায়ের সংগ্রাম কখনো দমন করা যায় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে, আমাদের ভাইরা বুক পেতে গুলি খেয়েছিল, মায়ের কান্না আন্দোলনের জ্বালানি হয়েছিল, আর স্বৈরাচারী সাম্রাজ্য অবশেষে জনগণের অদম্য শক্তির কাছে ভেঙে পড়েছিল।
এই রক্তাক্ত আগস্টের ঘটনা ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এম এ হোসেন এবং তার মতো অসংখ্য আহত তরুণ প্রমাণ করেছে—ন্যায়ের জন্য লড়াই কখনো বন্ধ হয় না, আর স্বপ্ন ও সাহস সর্বদা জয়ের পথে অগ্রসর হয়।
চিকিৎসা ও আহত অবস্থারঃ
৪ আগস্ট ২০২৪-এর বর্বর আক্রমণের পর মুহাম্মদ হোসেনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মহিপাল ওভার ব্রিজ এলাকায় আওয়ামী লীগ বাহিনী ও তাদের সহযোগী সশস্ত্র দলে হামলার সময় তার বাম চোখের উপরে রাবার বুলেট লেগেছিল। এর ফলে তার দৃষ্টি শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং কিছুক্ষণের জন্য অন্ধত্ব অনুভূত হয়েছে। পাশাপাশি, হামলার আতঙ্ক ও আঘাতের প্রভাবে স্মরণশক্তি ও মনোযোগও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে প্রতিদিনের সাধারণ কাজকর্ম, শিক্ষণীয় কার্যক্রম এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসা শুরু হয় স্থানীয় প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও আঘাতের মূল্যায়ন করা হয়। এরপর তাকে ছাগলনাইয়া উপজেলা কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়, যেখানে চোখের পরীক্ষা ও মানসিক মূল্যায়ন করা হয়। বর্তমানে ফেনী সদর হাসপাতাল ও অন্যান্য উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে ধারাবাহিক চিকিৎসা চলছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন—দৃষ্টি শক্তি পুনরুদ্ধার, স্মরণশক্তি উন্নয়ন এবং হার্টের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য উন্নত চিকিৎসা অপরিহার্য।
ফরহাদ বা তার পরিবার উন্নত ও নিরাপদ চিকিৎসার জন্য সহায়তা কামনা করছেন, যাতে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে পারেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে পুনর্বাসন পেতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং পেশাদার মনোবিদ্যাজনিত সহায়তা ছাড়া পূর্ণ সুস্থতা অর্জন সম্ভব নয়।



এম এ হোসেনের প্রস্তাবনাঃ
মুহাম্মদ এ হোসেন জানান, ৪ আগস্ট ২০২৪-এর বর্বর হামলার ফলে তার দৃষ্টি শক্তি, স্মরণশক্তি এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় গুরুতর প্রভাব পড়েছে। তিনি নিরাপদ ও উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজনীয় মনে করছেন, যাতে চোখের আঘাতের পুনর্বাসন, স্মরণশক্তির উন্নয়ন এবং হার্টের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। এছাড়া মানসিক ও শারীরিক পুনর্বাসনের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত সাপোর্ট চাইছেন। তিনি আশা করেন, যথাযথ চিকিৎসা পেলে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পেশাগত কাজকর্মে যোগ দিতে পারবেন। পরিবারও তার সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা কামনা করছে।
একনজরে তথ্যঃ
 নামঃ এম এ হোসেন
 জন্মঃ ১/২/১৯৮২, ফেনী
 পেশাঃ শিক্ষক
 মোবাইলঃ ০১৫৬৮৬৭১৬৫৫
 ঘটনা/আঘাতঃ ০৪/০৮/২০২৪, মহিপাল, ফেনী; বাম চোখে রাবার বুলেট
 চিকিৎসাঃ ছাগলনাইয়া উপজেলা কমপ্লেক্স, ফেনী সদর, ঢাকা পিজি, ইবনে সিনা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
 পরিবারঃ ৫ সদস্য
 পিতাঃ মোঃ আঃ রব মিয়া, কৃষি, ৯৩
 মাতাঃ মোছাঃ মোমেনা খাতুন (মৃত), ৭০
 ভাই-বোনঃ ইযাজিন (১৬), ইয়াসমিন (১৪)
 পুনর্বাসন প্রয়োজনঃ উন্নত চিকিৎসা, নিরাপদ শিক্ষা ও কর্মজীবন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍