হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ তানবির হোসেন
  মোঃ তানবির হোসেন

মোঃ তানবির হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শৈশব ও বেড়ে ওঠা
২০০৮ সালের ১৮ জুন, লক্ষ্মীপুর জেলার বানছা নগরে জন্ম নেন তানবির হোসেন। জন্মের সময় পরিবারে আনন্দের সীমা ছিল না। বাবা মোঃ কামাল হোসেন তখনও তরুণ, বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি। পেশায় তিনি দিনমজুর। প্রতিদিন ভোরে বের হতেন সারাদিন খাটুনি করে যা পেতেন তা দিয়েই সংসার চালাতেন। তার কপালের ঘামে উপার্জিত অর্থ দিয়েই চলত পাঁচ সদস্যের সংসার।
মা জেসমিন বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি তিনি সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। দারিদ্র্য থাকলেও তাদের সংসারে ছিল মায়া-মমতা ও ভালোবাসা। শৈশবেই তানবির দেখেছে কষ্টের জীবন। অনেক সময় টাকার অভাবে স্কুলে ফি দেওয়া যেত না। কখনও বই কেনার টাকাও জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ত। তবুও বাবা-মা স্বপ্ন দেখতেন— ছেলে পড়াশোনা শিখে একদিন বড় মানুষ হবে। গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনার শুরু। সহপাঠীদের মাঝে তানবির ছিল শান্ত স্বভাবের, খুব বেশি দুষ্টুমি করত না। পড়াশোনায় মাঝারি হলেও তার স্বপ্ন ছিল একদিন দেশের জন্য কিছু করার। পরিবারে বড় ভাই শুভ তখন দশম শ্রেণিতে পড়ত, ছোট ভাই জিহাদ ছিল মাদ্রাসার ছাত্র। তানবির মাঝের সন্তান হওয়ায় সবার কাছ থেকে ভালোবাসা পেত।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলেন। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেধার যেন মূল্যায়ন হয়। সেজন্য তারা ৫৬% কোটার সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি না মেনে বরং তাদের উপর পুলিশ নির্যাতন করে। প্রচন্ড গণআন্দোলনের মুখে সরকার কোটা ব্যবস্থা মেনে নিলেও সেটার কোন স্থায়ী সমাধান দিয়েছিলেন না। যার ফলে ২০২৪ সালে নতুন করে কোটার সংস্কারের আন্দোলন গড়ে উঠে। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সময় গড়ায়। এবার শুধু ঢাকায় নয়, দেশের প্রতিটি শহরে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। ন্যায্য দাবি নিয়ে তারা একত্রিত হয়। তানবির তখন স্কুল পড়ুয়া হলেও তার মনে জেগে ওঠে দেশপ্রেমের আগুন।
সে ভাবত— যদি শিক্ষার্থীদের উপর অন্যায় হয়, তবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। বাবার কষ্ট, সংসারের অভাব, সমাজের বৈষম্য—সব মিলিয়ে তার ভেতরে একটা বিদ্রোহ জন্ম নেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, যখনই সুযোগ আসবে, দেশের জন্য কণ্ঠ তুলবে। চট্টগ্রামে তখন উত্তাল আন্দোলনের ঢেউ। দেওয়ান হাট, আন্দরকিল্লা, নিউমার্কেট—সব জায়গায় ছাত্ররা মিছিল করছিল। বড় ভাই শুভ প্রায়ই মিছিলে যেত, আর তানবিরও বন্ধুদের নিয়ে খোঁজখবর রাখত।
৫ আগস্টের রক্তাক্ত সকাল
৫ আগস্ট ২০২৪ । সকাল থেকেই চট্টগ্রাম শহরজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। শিক্ষার্থীরা “এক দফা” দাবিতে মিছিল ডেকেছিল।
তানবিরও সেদিন নিজের বন্ধুদের নিয়ে দেওয়ান হাট মোড়ে যায়। স্লোগানে গগনবিদারী আওয়াজ উঠছিল— "হত্যার বিচার চাই, কোটার সংস্কার চাই, স্বৈরাচারী সরকারের পতন চাই।" কিছুক্ষণ পরেই পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা পুলিশের সাথে একত্র হয়ে মিছিলে আক্রমণ করে। টিয়ার গ্যাস ছোঁড়া হয়, চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে যায়। আতঙ্কে মানুষ দৌড়াতে থাকে।
ঠিক তখনই গুলির শব্দ ভেসে আসে। প্রথমে কয়েক রাউন্ড ছোড়া হয়, তারপর একের পর এক গুলি। চাইনিজ রাইফেল থেকে ছোড়া সেই গুলি জনতার ভিড়ে প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
তানবির তখন সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ করে এক গুলি তার শরীর বিদ্ধ করে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারদিকে চিৎকার, আর্তনাদ—
"ভাই বাঁচাও! গুলি খেয়েছে!" বন্ধুরা দ্রুত তাকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। রক্তে ভিজে যাচ্ছিল তার জামা।
হাসপাতালের দিনগুলো
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে দুপুর ১২টার দিকে তাকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা প্রথমে সামান্য চিকিৎসা দেন, পরে তাকে নাক-কান-গলা বিভাগে পাঠান। সেখানে দীর্ঘ ২০ দিন চিকিৎসা চলে।
তবে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। একাধিকবার অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও পুরোপুরি সফল হয়নি। অবশেষে ডাক্তাররা জানালেন— তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে।
১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, তাকে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারিতে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক দফা অপারেশন হয়। হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর লালবাতি জ্বলা করিডোরে মা-বাবার কান্না আর ছেলের যন্ত্রণায় সময় কাটত দুঃসহভাবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সেখানে চিকিৎসা নিয়ে অবশেষে তাকে বাসায় আনা হয়।
বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
আজও তানবির পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। শরীরে অপারেশনের দাগ, মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট, চলাফেরায় কষ্ট—এসব নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে উঠেছে। বাবার ৮ হাজার টাকার আয়ে চিকিৎসা, সংসার, পড়াশোনা—সব সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবুও তানবির আশা ছাড়েনি। সে বলে "আমি আবার পড়াশোনা শুরু করতে চাই। আমি চাই একদিন ভালো চাকরি করতে, পরিবারকে সাহায্য করতে। শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের জন্যও কিছু করতে চাই।"
তার চোখে এখনও স্বপ্ন ঝলমল করে। হয়তো শরীর দুর্বল হয়ে গেছে, কিন্তু মনোবল অটুট আছে। তার মতো হাজারো তরুণই দেশের জন্য লড়াই করেছে। তানবির তাদের একজন, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিল, এবং গুলি খেয়ে আজও বেঁচে আছে এক টুকরো আশার প্রতীক হয়ে।
তথ্য কণিকা
নাম: মোঃ তানবির হোসেন
জন্ম তারিখ: ১৮/০৬/২০০৮
জন্মস্থান: লক্ষ্মীপুর
পেশা: ছাত্র
প্রতিষ্ঠান: ইউসেফ স্কুল
নিজ জেলা: লক্ষ্মীপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা:
গ্রাম: বানছা নগর
ইউনিয়ন: লক্ষ্মীপুর পৌরসভা
থানা: লক্ষ্মীপুর সদর
জেলা: লক্ষ্মীপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মোঃ কামাল হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স: দিনমজুর, বয়স ৩৫
মায়ের নাম: জেসমিন বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, বয়স ৩২
মাসিক আয়: ৮,০০০/- টাকা
আয়ের উৎস: দিনমজুরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ:
১. মোঃ জীবন হোসেন শুভ, বয়স ১৯, ছাত্র, শ্রেণি: দশম, সম্পর্ক: ভাই
২. মোঃ জিহাদ ইসলাম, বয়স ৮, ছাত্র, মাদ্রাসা, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : চট্টগ্রাম, দেওয়ান হাট মোড়
আহত হওয়ার সময়কাল : ৫ই আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍