মো: নুরুল হুদা
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা/ পদবী : কর্মহীন
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
ফ্যাসিস্ট মুক্ত বাংলাদেশ
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। জনগণের মনে ছিল একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষা, যেখানে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং সমাজে ন্যায়ের জোরে শান্তি স্থাপন হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির জায়গা দখল করে নেয় একচ্ছত্র ক্ষমতার লোভ, দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন। এক এক করে সংবিধান ও আইনকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।
এই ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপ নেয় ভীতির রাজনীতিতে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পায়, বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এবং অনৈতিক চাপ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সীমিত করা হয়। নির্বাচন হয়ে ওঠে একপাক্ষিক প্রহসনে পরিণত। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মতো ভোটবিহীন ও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষের মনে হতাশা বাড়ে, কারণ তারা দেখল যে, আইন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার যন্ত্র তাদের জন্য কাজ করছে না, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসময় আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিতভাবে জনগণের ওপর এমন এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে যে, সাধারণ মানুষও প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, রাস্তাঘাট, জনসভা প্রতিটি স্থানে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়। মানুষ বুঝতে পারে যে, স্বাধীনভাবে কথা বলাই বিপজ্জনক।
তবুও ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই দীর্ঘ নীরবতার শৃঙ্খল ভেঙে দেয়। তরুণ শিক্ষার্থী, যুব সমাজ, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামে। আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি ছিল চাকরিতে ন্যায্য সুযোগ। কিন্তু সেই লড়াই দ্রুত পরিণত হয় একটি বৃহৎ জনজাগরণের মধ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা দমন-পীড়ন, অবিচার, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানত, তাদের পথে থাকবে গুলি, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার, ভয় ও মিথ্যা মামলা। তবুও তারা দাঁড়ায়, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল - স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে হলে ভয় ভেঙে নামতেই হবে। ২৪ এর জুলাই-আগস্টে বহু রক্তাক্ত দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে আন্দোলন রূপ নিল এক ঐতিহাসিক জনআন্দোলনে। রাজপথে নেমে হাজারো তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে লিখেছে নতুন ইতিহাস।
এই আন্দোলন শুধু চাকরির সুযোগের জন্য ছিল না; এটি ছিল দেশের ন্যায়ের জন্য, দেশের মর্যাদা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি ক্ষত ও ক্ষয় আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত অঙ্গন তৈরি করেছে। এভাবে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়ে ওঠে কেবল এক সামাজিক দাবি নয়, বরং এটি রূপ নেয় দেশের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়, যেখানে রক্ত, দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সাহসের গল্প একত্রে লেখা হয়েছে। তরুণরা দেখিয়ে দেয়, যে ভয়কে ভেঙে নামলেই সমাজের ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিচিতি
মো: নুরুল হুদা, নোয়াখালীর চন্দ্রসুদ্দি গ্রামের এক সাধারণ তরুণ, যিনি স্বপ্ন দেখতেন পরিবারের কাঁধে বোঝা না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু সময়ের নির্মমতা তার সেই স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। পিতার সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি চেষ্টা করতেন নিজেকে গড়ে তুলতে। নুরুল হুদার পরিবারে আরও দুই ভাই একজন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, অন্যজন অষ্টম শ্রেণিতে। পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখতে পিতার মাসিক স্বল্প আয়ের চাকরিই একমাত্র ভরসা। তাই পরিবারকে সাহায্য এইচএসসি পরিক্ষায় পাশ করার পরই তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরিতে যোগ দেন।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন যখন দেশের প্রতিটি রাস্তায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন নুরুল হুদাও রাজপথে নেমেছিলেন অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জানাতে। তার অংশগ্রহণ ছিল নিছক কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এক অন্তর্গত দায়বদ্ধতা।
কিন্তু সেই দায়বদ্ধতার মাশুল তিনি গুনেছেন রক্ত দিয়ে। পায়ে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়া নুরুল হুদা আজও লড়ছেন বেঁচে থাকার সংগ্রামে।
চাকুরি ছেড়ে রাজপথে
২০২৪ সালের জুলাই মাস, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অগ্নিঝরা সময়। মো: নুরুল হুদা তখন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ৫ জুলাই তার বড় ভাই ফোনে আন্দোলনের খবর জানালে তার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার তাগিদ তাকে আর থামিয়ে রাখতে পারেনি। সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন - রাজপথই হবে তার স্থান। ৬ জুলাই থেকে তিনি নিয়মিত আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন। দিনরাত রাজপথে থেকে তিনি অন্যদের সাথে একাত্ম হয়ে লড়াই চালিয়ে যান।
১৬ জুলাইয়ের বিভিষিকা
অন্যান্য দিনের ন্যায় জুলাইয়ের ১৬ তারিখেও ছাত্ররা রাজপথে নামে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ছিল মুরাদপুর এলাকা। তবে বিকেলের দিকে মুরাদপুর মোড়ে আন্দোলনকারীদের মিছিল চলাকালে চারদিক থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় গুলি বর্ষণ। এমনকি বাসার ছাদ থেকেও গুলি ছুড়তে থাকে সন্ত্রাসীরা। গুলির শব্দ, ধোঁয়া, মানুষের চিৎকার সবকিছু মিশে এক ভয়াবহ দৃশ্য। হঠাৎ এই বিভিষিকাময় হামলায় আহত হয় অনেক ছাত্র। অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন।
ছররা গুলির আঘাত
নুরুল হুদা তখন মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তার পায়ে, গলায় ও মাথায় লাগে। গুরুতর আহত হন তিনি।
পুনরায় সন্ত্রাসীদের আক্রমন
গুলিবিদ্ধ হয়েই তিনি রেহাই পাননি নুরুল হুদা। পরদিন ১৭ জুলাই স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় হুমকি দেয় এবং নির্মমভাবে মারধর করে। এ ঘটনার পর তার শারীরিক অবস্থা আরও অবনত হয়। কিডনিতে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়, যা এখন মারাত্নক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
থেমে নেই হামলা-মামলা
দুই দুই বার আক্রমনের পরেও ক্ষান্ত হয়নি খুনী শেখ হাসিনার পালিত হায়েনারা। ১৮ জুলাই আবারও তার বাড়িতে হামলা হয়। ভাঙচুর করা হয় জিনিসপত্র। পরিবারের ওপর ভয়-ভীতি সৃষ্টি করা হয়। এমনকি তার নামে মিথ্যা মামলাও দায়ের করে আওয়ামী পেটোয়া বাহিনী।
দীর্ঘ চিকিৎসার লড়াই
প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও, পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য তিনি কখনও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, হালিশহর জেনারেল হাসপাতাল, কখনও ঢাকায় ইবনে সিনা হাসপাতাল, আবার কখনও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন। কিন্তু টাকার অভাব, চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং পরিবারের আর্থিক অনটন তার সুস্থ হওয়ার পথকে করে তুলেছে আরও কষ্টসাধ্য।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
বর্তমানে তার শরীরে গুলি রয়ে গিয়েছে। এছাড়াও কিডনিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তিনি একজন গুলিবিদ্ধ। চিকিৎসা ব্যবদ অনেক টাকা ব্যক্তিগতভাবে খরচ করতে হয়েছে। তার পরিবার এখন ঋণগ্রস্ত। আবার অসুস্থতার কারণে তিনি চাকুরিতেও যোগ দিতে পারেননি।
নুরুল হুদা এখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান। এজন্য নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মো: নুরুল হুদা
জন্ম তারিখ : ৩০-১০-২০০১
পেশা/ পদবী : কর্মহীন
নিজ জেলা : নোয়াখালী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চন্দ্রসুদ্দি, ইউনিয়ন: ৭ নং বাটুইয়া, ডাকঘর: ভূঞার হাট, থানা: কবিরহাট,
জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: ২ নং গেট, এলাকা: মেয়র গলি, থানা: পাঁচলাইশ, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : নুর নবী
পিতার পেশা ও বয়স : চাকুরি, ৫২
মায়ের নাম : রাজিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ১২,৫০০
আয়ের উৎস : পিতার চাকুরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ:
১. মামুনুর রশিদ, বয়স- ২০, পেশা- শিক্ষার্থী, শ্রেণি- ১০ম, সম্পর্ক- ভাই
২. রিফাত হোসেন, বয়স- ১৬, পেশা- শিক্ষার্থী, শ্রেণি-৮ম, সম্পর্ক- ভাই
আহতের চিত্র
ঘটনার স্থান: মুরাদপুর মোড়
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ( নুর রনি, সাদ্দাম, রুবেল, দেলোয়ার )
আহত হওয়ার সময়কাল: ১৬ ও ১৭ জুলাই ২০২৪ , বিকেল
আঘাতের ধরণ: পায়ে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ, মারধর করা হয়
চিকিৎসা: প্রাথমিক চিকিৎসা
বর্তমান অবস্থা: উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। জনগণের মনে ছিল একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষা, যেখানে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং সমাজে ন্যায়ের জোরে শান্তি স্থাপন হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির জায়গা দখল করে নেয় একচ্ছত্র ক্ষমতার লোভ, দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন। এক এক করে সংবিধান ও আইনকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।
এই ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপ নেয় ভীতির রাজনীতিতে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পায়, বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এবং অনৈতিক চাপ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সীমিত করা হয়। নির্বাচন হয়ে ওঠে একপাক্ষিক প্রহসনে পরিণত। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মতো ভোটবিহীন ও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষের মনে হতাশা বাড়ে, কারণ তারা দেখল যে, আইন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার যন্ত্র তাদের জন্য কাজ করছে না, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এসময় আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিতভাবে জনগণের ওপর এমন এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে যে, সাধারণ মানুষও প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, রাস্তাঘাট, জনসভা প্রতিটি স্থানে বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয়। মানুষ বুঝতে পারে যে, স্বাধীনভাবে কথা বলাই বিপজ্জনক।
তবুও ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই দীর্ঘ নীরবতার শৃঙ্খল ভেঙে দেয়। তরুণ শিক্ষার্থী, যুব সমাজ, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামে। আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি ছিল চাকরিতে ন্যায্য সুযোগ। কিন্তু সেই লড়াই দ্রুত পরিণত হয় একটি বৃহৎ জনজাগরণের মধ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা দমন-পীড়ন, অবিচার, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানত, তাদের পথে থাকবে গুলি, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার, ভয় ও মিথ্যা মামলা। তবুও তারা দাঁড়ায়, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল - স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে হলে ভয় ভেঙে নামতেই হবে। ২৪ এর জুলাই-আগস্টে বহু রক্তাক্ত দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে আন্দোলন রূপ নিল এক ঐতিহাসিক জনআন্দোলনে। রাজপথে নেমে হাজারো তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে লিখেছে নতুন ইতিহাস।
এই আন্দোলন শুধু চাকরির সুযোগের জন্য ছিল না; এটি ছিল দেশের ন্যায়ের জন্য, দেশের মর্যাদা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিটি ক্ষত ও ক্ষয় আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত অঙ্গন তৈরি করেছে। এভাবে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়ে ওঠে কেবল এক সামাজিক দাবি নয়, বরং এটি রূপ নেয় দেশের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়, যেখানে রক্ত, দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সাহসের গল্প একত্রে লেখা হয়েছে। তরুণরা দেখিয়ে দেয়, যে ভয়কে ভেঙে নামলেই সমাজের ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিচিতি
মো: নুরুল হুদা, নোয়াখালীর চন্দ্রসুদ্দি গ্রামের এক সাধারণ তরুণ, যিনি স্বপ্ন দেখতেন পরিবারের কাঁধে বোঝা না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু সময়ের নির্মমতা তার সেই স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। পিতার সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি চেষ্টা করতেন নিজেকে গড়ে তুলতে। নুরুল হুদার পরিবারে আরও দুই ভাই একজন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, অন্যজন অষ্টম শ্রেণিতে। পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখতে পিতার মাসিক স্বল্প আয়ের চাকরিই একমাত্র ভরসা। তাই পরিবারকে সাহায্য এইচএসসি পরিক্ষায় পাশ করার পরই তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরিতে যোগ দেন।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন যখন দেশের প্রতিটি রাস্তায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন নুরুল হুদাও রাজপথে নেমেছিলেন অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জানাতে। তার অংশগ্রহণ ছিল নিছক কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এক অন্তর্গত দায়বদ্ধতা।
কিন্তু সেই দায়বদ্ধতার মাশুল তিনি গুনেছেন রক্ত দিয়ে। পায়ে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়া নুরুল হুদা আজও লড়ছেন বেঁচে থাকার সংগ্রামে।
চাকুরি ছেড়ে রাজপথে
২০২৪ সালের জুলাই মাস, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অগ্নিঝরা সময়। মো: নুরুল হুদা তখন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ৫ জুলাই তার বড় ভাই ফোনে আন্দোলনের খবর জানালে তার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার তাগিদ তাকে আর থামিয়ে রাখতে পারেনি। সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন - রাজপথই হবে তার স্থান। ৬ জুলাই থেকে তিনি নিয়মিত আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন। দিনরাত রাজপথে থেকে তিনি অন্যদের সাথে একাত্ম হয়ে লড়াই চালিয়ে যান।
১৬ জুলাইয়ের বিভিষিকা
অন্যান্য দিনের ন্যায় জুলাইয়ের ১৬ তারিখেও ছাত্ররা রাজপথে নামে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ছিল মুরাদপুর এলাকা। তবে বিকেলের দিকে মুরাদপুর মোড়ে আন্দোলনকারীদের মিছিল চলাকালে চারদিক থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় গুলি বর্ষণ। এমনকি বাসার ছাদ থেকেও গুলি ছুড়তে থাকে সন্ত্রাসীরা। গুলির শব্দ, ধোঁয়া, মানুষের চিৎকার সবকিছু মিশে এক ভয়াবহ দৃশ্য। হঠাৎ এই বিভিষিকাময় হামলায় আহত হয় অনেক ছাত্র। অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন।
ছররা গুলির আঘাত
নুরুল হুদা তখন মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তার পায়ে, গলায় ও মাথায় লাগে। গুরুতর আহত হন তিনি।
পুনরায় সন্ত্রাসীদের আক্রমন
গুলিবিদ্ধ হয়েই তিনি রেহাই পাননি নুরুল হুদা। পরদিন ১৭ জুলাই স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় হুমকি দেয় এবং নির্মমভাবে মারধর করে। এ ঘটনার পর তার শারীরিক অবস্থা আরও অবনত হয়। কিডনিতে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়, যা এখন মারাত্নক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
থেমে নেই হামলা-মামলা
দুই দুই বার আক্রমনের পরেও ক্ষান্ত হয়নি খুনী শেখ হাসিনার পালিত হায়েনারা। ১৮ জুলাই আবারও তার বাড়িতে হামলা হয়। ভাঙচুর করা হয় জিনিসপত্র। পরিবারের ওপর ভয়-ভীতি সৃষ্টি করা হয়। এমনকি তার নামে মিথ্যা মামলাও দায়ের করে আওয়ামী পেটোয়া বাহিনী।
দীর্ঘ চিকিৎসার লড়াই
প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও, পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য তিনি কখনও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, হালিশহর জেনারেল হাসপাতাল, কখনও ঢাকায় ইবনে সিনা হাসপাতাল, আবার কখনও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন। কিন্তু টাকার অভাব, চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং পরিবারের আর্থিক অনটন তার সুস্থ হওয়ার পথকে করে তুলেছে আরও কষ্টসাধ্য।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
বর্তমানে তার শরীরে গুলি রয়ে গিয়েছে। এছাড়াও কিডনিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তিনি একজন গুলিবিদ্ধ। চিকিৎসা ব্যবদ অনেক টাকা ব্যক্তিগতভাবে খরচ করতে হয়েছে। তার পরিবার এখন ঋণগ্রস্ত। আবার অসুস্থতার কারণে তিনি চাকুরিতেও যোগ দিতে পারেননি।
নুরুল হুদা এখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান। এজন্য নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মো: নুরুল হুদা
জন্ম তারিখ : ৩০-১০-২০০১
পেশা/ পদবী : কর্মহীন
নিজ জেলা : নোয়াখালী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চন্দ্রসুদ্দি, ইউনিয়ন: ৭ নং বাটুইয়া, ডাকঘর: ভূঞার হাট, থানা: কবিরহাট,
জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: ২ নং গেট, এলাকা: মেয়র গলি, থানা: পাঁচলাইশ, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : নুর নবী
পিতার পেশা ও বয়স : চাকুরি, ৫২
মায়ের নাম : রাজিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ১২,৫০০
আয়ের উৎস : পিতার চাকুরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ:
১. মামুনুর রশিদ, বয়স- ২০, পেশা- শিক্ষার্থী, শ্রেণি- ১০ম, সম্পর্ক- ভাই
২. রিফাত হোসেন, বয়স- ১৬, পেশা- শিক্ষার্থী, শ্রেণি-৮ম, সম্পর্ক- ভাই
আহতের চিত্র
ঘটনার স্থান: মুরাদপুর মোড়
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ( নুর রনি, সাদ্দাম, রুবেল, দেলোয়ার )
আহত হওয়ার সময়কাল: ১৬ ও ১৭ জুলাই ২০২৪ , বিকেল
আঘাতের ধরণ: পায়ে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ, মারধর করা হয়
চিকিৎসা: প্রাথমিক চিকিৎসা
বর্তমান অবস্থা: উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍