নুর মাওলা
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা: ছাত্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
নুর মাওলার জীবন পরিচিতিঃ
নুর মাওলা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জন্মগ্রহণ করেন ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে নোয়াখালীর চরবাটা ইউনিয়নে। তিনি এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। তার পিতা মোঃ হানিফ একজন কৃষক এবং মাতা খতিজা খাতুন গৃহিণী। পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ৭ জন, যাদের মধ্যে নুর মাওলার দুই ভাই নুরনবী ও নুর আলম উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত। পরিবারটির মাসিক আয় মাত্র ১০ হাজার টাকা, যা কৃষিকাজের মাধ্যমেই আসে।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি নুর মাওলা সবসময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তিনি আন্দোলনে অংশ নেন। বিকেল ৫টার দিকে মুরাদপুর এলাকায় দমননীতি চালানো কুখ্যাত ছাত্রলীগ ও পুলিশের দ্বারা তিনি আক্রান্ত হন। অতর্কিত আক্রমণে লাঠি ও স্টাম্প দিয়ে তাকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়। এই ঘটনায় তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজ নুর মাওলার জীবন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার ও নিজের চিকিৎসার দায়িত্ব একসাথে বহন করে তিনি ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ১৬ জুলাইয়ের নৃশংস হামলাঃ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়। আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে সরকারের অন্যায্য কোটা নীতির বিরুদ্ধে, যেখানে শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামে। ১০ জুলাই-এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, পদযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি উচ্চপদস্থ নেতারা আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ তোলে। ১৬ জুলাই-এর দুই দিন আগে ১৪ জুলাই স্বৈরাচার শেখ হাসিনা বলে, কোটা বিষয়ে তাঁর কিছু করার নেই এবং “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা বাদ পড়লে রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে কি না”—এই প্রশ্নও তোলেন। এখানে স্পষ্ট ভাবে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে “রাজাকার” বলে আখ্যায়িত করে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ হামলা চালায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুর মাওলা ১৬ জুলাই সেই আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। তার কন্ঠে ১৬ জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা-
তিনি বলেন, সেই দিনেই ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার ভয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে গেলেও আমি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসিনি। যদিও ১৫ জুলাই কিছু জটিলতার কারণে অংশ নিতে পারিনি, পরদিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আমি ও আমার বন্ধুরা মুরাদপুর এলাকায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে যোগ দিই।
সেদিন দুপুরে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নিই এবং বিকেল তিনটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পুরো পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ কিন্তু আশাবাদী, কারণ সবাই বিশ্বাস করছিল যে আমাদের ন্যায্য দাবি আদায় হবেই। কিন্তু বিকেল গড়াতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হঠাৎ করেই নৃশংস আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দাগি সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহযোগিতায় আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা লাঠি, স্টাম্প ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নিরীহ শিক্ষার্থীদের উপর বর্বরোচিত হামলা চালায়।
আমি নিজেও সেই আক্রমণের শিকার হই। কয়েকজন অমানবিক নির্যাতনকারী ছাত্রলীগের দস্যুপ্রবণ কর্মী আমাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। লাঠি ও স্টাম্পের প্রচণ্ড আঘাতে আমার বুকের হাড় ভেঙে যায়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও তারা থামেনি। একের পর এক আঘাতে আমি গুরুতর আহত হই। সেদিন শুধু আমি নই, অসংখ্য শিক্ষার্থী রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়।
আওয়ামী লীগের পাষণ্ড ও শয়তানি নেতারা এই নৃশংস হামলাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন রক্তপিপাসু ভাষায় ঘোষণা দেন যে—যারা "আমি রাজাকার" স্লোগান দিচ্ছে, তাদের শেষ দেখে ছাড়বেন। এমন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই হামলাগুলো ছিল পরিকল্পিত এবং সংগঠিত।
এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ আমাকে একদিকে গর্বিত করেছে, কারণ আমি দেশের গণতন্ত্র ও শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অংশ হতে পেরেছি। অন্যদিকে, সেই দিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমার জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। আজও আমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন বহন করছি, কিন্তু মনোবল ভাঙেনি। আন্দোলন চলবে, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে।
চিকিৎসা ও আহত অবস্থারঃ
১৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ আমার জীবনে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। আগের দিন যোগ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও কিছু জটিলতার কারণে সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৬ জুলাই দুপুরে আমি ও আমার বন্ধুরা মুরাদপুর এলাকায় কর্মসূচিতে যোগ দিই। দুপুর ৩টার দিকে আন্দোলনের ঘোষণা হয় এবং বিকাল ৫-৬টার মধ্যে হঠাৎ ছাত্রলীগ ও পুলিশের সমন্বিত আক্রমণের মুখে পড়ি। অতর্কিত আক্রমণে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। আক্রমণকারীদের কয়েকজন আমাকে ধরে লাঠি ও স্টাম্প দিয়ে প্রচণ্ডভাবে প্রহার করে।
এতে আমার বুকের হাড় ভেঙে যায় এবং আমি মারাত্মকভাবে আহত হই। পরে চিকিৎসার জন্য প্রথমে হেলথ ভিউ ক্লিনিকে ভর্তি হই, এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা নেই। বুকের হাড় ভাঙা সেরে গেলেও ইউরিন সমস্যাটি রয়ে গেছে এবং বর্তমানে নিয়মিত ডাক্তারি ফলো-আপ ও ওষুধ চালু রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে স্কিন সমস্যাও দেখা দিয়েছে। এ কারণে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
পেশার দিক থেকে আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার খরচ এবং পরিবারের দেখাশোনা করার জন্য আমি আগে ব্যবসা ও টিউশনি করতাম। কিন্তু আহত হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও উপার্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং আর্থিক সহায়তা এখন আমার জন্য অপরিহার্য।
আন্দোলনে নুর মাওলার কৃতিত্ব ও অবদানঃ
নুর মাওলা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। ১৬ জুলাই ২০২৪ সালের আন্দোলনে তিনি সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে মুরাদপুরে উপস্থিত হন, যেখানে তারা শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালান। তিনি কেবল অংশগ্রহণ করেননি, বরং সহকর্মীদের নেতৃত্ব দিয়ে অবস্থান মজবুত রাখার চেষ্টা করেন।
বিকেল ৫-৬টার দিকে ছাত্রলীগ ও পুলিশের ধৃষ্ট আক্রমণের সময় তিনি সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ করেন। তার অবদান ছিল দৃঢ় মনোবল ও ন্যায়ের প্রতি অটল সমর্থন প্রদর্শন, যা অন্য আন্দোলনকারীদেরও উৎসাহিত করেছে। নুর মাওলার সাহসিকতা আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে উজ্জীবিত করেছে।
প্রস্তাবনাঃ
নুর মাওলার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বর্তমানে তার ইউরিন ইনফেকশন এবং ত্বকের সমস্যার কারণে দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে, তাই উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আগে ব্যবসা ও প্রাইভেট টিউশন করে নিজের পড়াশোনার খরচ এবং পরিবারের জীবনধারণ চালাতেন। বাবা অসহায় হওয়ায় পরিবারের আয়ও সীমিত। তাই তাকে একটি ভালো চাকরি, বিশেষত ব্যাংক বা অফিসিয়াল জব, দেওয়া প্রয়োজন।
একনজরেঃ
নাম: নুর মাওলা
জন্মতারিখ: ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান: নোয়াখালী
পেশা: ছাত্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল নম্বার: ০১৮৩১১৩৪৯৩৯
ঘটনা: ১৬ জুলাই ২০২৪, মুরাদপুর; ছাত্রলীগের হিংস্র হামলায় বুক, হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত
আঘাত: বুকের হাড় ভেঙে যাওয়া, ইউরিন সমস্যা, ত্বকের সমস্যা, প্রচণ্ড ব্যথা
চিকিৎসা: স্থানীয় হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ; চিকিৎসা চলমান
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭
পিতা: মোঃ হানিফ, কৃষক, ৫৮ বছর
মা: খতিজা খাতুন, গৃহিণী, ৪২ বছর
ভাই-বোন: নুরনবী (ভাই, ২০), নুর আলম (ভাই, ২৩)
নুর মাওলা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জন্মগ্রহণ করেন ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে নোয়াখালীর চরবাটা ইউনিয়নে। তিনি এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। তার পিতা মোঃ হানিফ একজন কৃষক এবং মাতা খতিজা খাতুন গৃহিণী। পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ৭ জন, যাদের মধ্যে নুর মাওলার দুই ভাই নুরনবী ও নুর আলম উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত। পরিবারটির মাসিক আয় মাত্র ১০ হাজার টাকা, যা কৃষিকাজের মাধ্যমেই আসে।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি নুর মাওলা সবসময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তিনি আন্দোলনে অংশ নেন। বিকেল ৫টার দিকে মুরাদপুর এলাকায় দমননীতি চালানো কুখ্যাত ছাত্রলীগ ও পুলিশের দ্বারা তিনি আক্রান্ত হন। অতর্কিত আক্রমণে লাঠি ও স্টাম্প দিয়ে তাকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়। এই ঘটনায় তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজ নুর মাওলার জীবন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার ও নিজের চিকিৎসার দায়িত্ব একসাথে বহন করে তিনি ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ১৬ জুলাইয়ের নৃশংস হামলাঃ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়। আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে সরকারের অন্যায্য কোটা নীতির বিরুদ্ধে, যেখানে শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামে। ১০ জুলাই-এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, পদযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি উচ্চপদস্থ নেতারা আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ তোলে। ১৬ জুলাই-এর দুই দিন আগে ১৪ জুলাই স্বৈরাচার শেখ হাসিনা বলে, কোটা বিষয়ে তাঁর কিছু করার নেই এবং “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা বাদ পড়লে রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে কি না”—এই প্রশ্নও তোলেন। এখানে স্পষ্ট ভাবে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে “রাজাকার” বলে আখ্যায়িত করে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ হামলা চালায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুর মাওলা ১৬ জুলাই সেই আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। তার কন্ঠে ১৬ জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা-
তিনি বলেন, সেই দিনেই ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার ভয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে গেলেও আমি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসিনি। যদিও ১৫ জুলাই কিছু জটিলতার কারণে অংশ নিতে পারিনি, পরদিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আমি ও আমার বন্ধুরা মুরাদপুর এলাকায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে যোগ দিই।
সেদিন দুপুরে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নিই এবং বিকেল তিনটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পুরো পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ কিন্তু আশাবাদী, কারণ সবাই বিশ্বাস করছিল যে আমাদের ন্যায্য দাবি আদায় হবেই। কিন্তু বিকেল গড়াতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হঠাৎ করেই নৃশংস আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দাগি সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহযোগিতায় আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা লাঠি, স্টাম্প ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নিরীহ শিক্ষার্থীদের উপর বর্বরোচিত হামলা চালায়।
আমি নিজেও সেই আক্রমণের শিকার হই। কয়েকজন অমানবিক নির্যাতনকারী ছাত্রলীগের দস্যুপ্রবণ কর্মী আমাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। লাঠি ও স্টাম্পের প্রচণ্ড আঘাতে আমার বুকের হাড় ভেঙে যায়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও তারা থামেনি। একের পর এক আঘাতে আমি গুরুতর আহত হই। সেদিন শুধু আমি নই, অসংখ্য শিক্ষার্থী রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়।
আওয়ামী লীগের পাষণ্ড ও শয়তানি নেতারা এই নৃশংস হামলাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন রক্তপিপাসু ভাষায় ঘোষণা দেন যে—যারা "আমি রাজাকার" স্লোগান দিচ্ছে, তাদের শেষ দেখে ছাড়বেন। এমন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই হামলাগুলো ছিল পরিকল্পিত এবং সংগঠিত।
এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ আমাকে একদিকে গর্বিত করেছে, কারণ আমি দেশের গণতন্ত্র ও শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অংশ হতে পেরেছি। অন্যদিকে, সেই দিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমার জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। আজও আমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন বহন করছি, কিন্তু মনোবল ভাঙেনি। আন্দোলন চলবে, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে।
চিকিৎসা ও আহত অবস্থারঃ
১৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ আমার জীবনে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। আগের দিন যোগ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও কিছু জটিলতার কারণে সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৬ জুলাই দুপুরে আমি ও আমার বন্ধুরা মুরাদপুর এলাকায় কর্মসূচিতে যোগ দিই। দুপুর ৩টার দিকে আন্দোলনের ঘোষণা হয় এবং বিকাল ৫-৬টার মধ্যে হঠাৎ ছাত্রলীগ ও পুলিশের সমন্বিত আক্রমণের মুখে পড়ি। অতর্কিত আক্রমণে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। আক্রমণকারীদের কয়েকজন আমাকে ধরে লাঠি ও স্টাম্প দিয়ে প্রচণ্ডভাবে প্রহার করে।
এতে আমার বুকের হাড় ভেঙে যায় এবং আমি মারাত্মকভাবে আহত হই। পরে চিকিৎসার জন্য প্রথমে হেলথ ভিউ ক্লিনিকে ভর্তি হই, এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা নেই। বুকের হাড় ভাঙা সেরে গেলেও ইউরিন সমস্যাটি রয়ে গেছে এবং বর্তমানে নিয়মিত ডাক্তারি ফলো-আপ ও ওষুধ চালু রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে স্কিন সমস্যাও দেখা দিয়েছে। এ কারণে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
পেশার দিক থেকে আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার খরচ এবং পরিবারের দেখাশোনা করার জন্য আমি আগে ব্যবসা ও টিউশনি করতাম। কিন্তু আহত হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও উপার্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং আর্থিক সহায়তা এখন আমার জন্য অপরিহার্য।
আন্দোলনে নুর মাওলার কৃতিত্ব ও অবদানঃ
নুর মাওলা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। ১৬ জুলাই ২০২৪ সালের আন্দোলনে তিনি সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে মুরাদপুরে উপস্থিত হন, যেখানে তারা শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালান। তিনি কেবল অংশগ্রহণ করেননি, বরং সহকর্মীদের নেতৃত্ব দিয়ে অবস্থান মজবুত রাখার চেষ্টা করেন।
বিকেল ৫-৬টার দিকে ছাত্রলীগ ও পুলিশের ধৃষ্ট আক্রমণের সময় তিনি সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ করেন। তার অবদান ছিল দৃঢ় মনোবল ও ন্যায়ের প্রতি অটল সমর্থন প্রদর্শন, যা অন্য আন্দোলনকারীদেরও উৎসাহিত করেছে। নুর মাওলার সাহসিকতা আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে উজ্জীবিত করেছে।
প্রস্তাবনাঃ
নুর মাওলার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বর্তমানে তার ইউরিন ইনফেকশন এবং ত্বকের সমস্যার কারণে দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে, তাই উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আগে ব্যবসা ও প্রাইভেট টিউশন করে নিজের পড়াশোনার খরচ এবং পরিবারের জীবনধারণ চালাতেন। বাবা অসহায় হওয়ায় পরিবারের আয়ও সীমিত। তাই তাকে একটি ভালো চাকরি, বিশেষত ব্যাংক বা অফিসিয়াল জব, দেওয়া প্রয়োজন।
একনজরেঃ
নাম: নুর মাওলা
জন্মতারিখ: ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান: নোয়াখালী
পেশা: ছাত্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল নম্বার: ০১৮৩১১৩৪৯৩৯
ঘটনা: ১৬ জুলাই ২০২৪, মুরাদপুর; ছাত্রলীগের হিংস্র হামলায় বুক, হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত
আঘাত: বুকের হাড় ভেঙে যাওয়া, ইউরিন সমস্যা, ত্বকের সমস্যা, প্রচণ্ড ব্যথা
চিকিৎসা: স্থানীয় হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ; চিকিৎসা চলমান
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭
পিতা: মোঃ হানিফ, কৃষক, ৫৮ বছর
মা: খতিজা খাতুন, গৃহিণী, ৪২ বছর
ভাই-বোন: নুরনবী (ভাই, ২০), নুর আলম (ভাই, ২৩)
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍