হোম / আহতদের তালিকা / বেল্লাল হোসেন
বেল্লাল হোসেন

বেল্লাল হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

নোয়াখালীর বৈকুন্ঠপুরে ১৯৯৪ সালের ৫ জুন জন্ম নেওয়া দিনমজুর বেল্লাল হোসেন শহরে এসেছিলেন শুধু পরিবারের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে জীবনের ভিত্তি গড়তে। টাইলসের কাজ করে কঠোর পরিশ্রমে সংসার টিকিয়ে রাখা এই যুবক ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দিনে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে জীবনের গতি থমকে যেতে দেখেন। ডান হাত, চোখ ও মাথায় রয়ে যাওয়া গুলির যন্ত্রণা তাকে আজ কর্মহীন, অসহায় ও নির্ভরশীল করে তুলেছে। তবু বেল্লালের গল্প নিছক দুঃখের নয় এটি অন্যায়ের মুখে দাঁড়ানো এক সাধারণ মানুষের নীরব সাহসের প্রতিচ্ছবি।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

বেল্লাল হোসেন
ক্রমিক: ০৫৭
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৭
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
বেল্লাল হোসেনের জন্ম ১৯৯৪ সালের ৫ জুন, নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানার ২নং রামনারায়ণপুর ইউনিয়নের বৈকুন্ঠপুর গ্রামে। তাঁর পিতা নুর হোসেন একজন কৃষিজীবী, বয়স ৬৫; মাতা পারভিন আক্তার একজন গৃহিণী, বয়স ৫২ বছর। পরিবারটি আট সদস্যের, যার মধ্যে বেল্লাল ছিলেন অন্যতম উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বেল্লালের ভাই মো: হোসেন প্রবাসে থাকেন, আর দুই বোন ফাতেমা আক্তার পিংকি ও কুলছুম আক্তার প্রিয়া বিবাহিত ও গৃহিণী। পরিবারের জন্য একজন ভরসার নাম ছিলেন বেল্লাল।
কর্মজীবন ও জীবিকার সংগ্রাম
ঢাকার যাত্রাবাড়ী সাদ্দাম মার্কেটে দিনমজুর হিসেবে টাইলস লাগানোর কাজ করতেন বেল্লাল। মাসে প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করতেন, যা দিয়ে স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানসহ ঢাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই ছেলেটি কঠোর পরিশ্রমে শহরের জীবনে নিজেকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিলেন। প্রতিদিন সকালে কাজে গিয়ে সন্ধ্যায় ক্লান্ত দেহ নিয়ে ফিরলেও মুখে হাসি থাকত, কারণ সংসারের চাকা তিনি নিজ হাতে ঘোরাতে পারছিলেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, দুপুর ১টার সময় বেল্লাল প্রতিদিনের মতো কাজের জন্য সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় ছিলেন। তখন চলছিল ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে বেপরোয়া গুলি চালায়। এই গুলিতে বেল্লালের ডান হাতে ও ডান চোখে ছিটা গুলি লাগে। বাম হাতের একটি আঙুলও ভেঙে যায়। হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি।
চিকিৎসার সংগ্রাম ও দীর্ঘ যন্ত্রণা
আহতের পরপরই স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসা শুরু হলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় অপারেশন বা বুলেট অপসারণ সম্ভব হয়নি। তার ডান হাত, মাথা এবং চোখে এখনো একাধিক বুলেট অবস্থান করছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এই গুলিগুলো যতদিন শরীরে থাকবে, ততদিন ব্যথা, মাথা ঘোরা, ও ঝিমঝিম ভাব চলতেই থাকবে। চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থাকায় এখন তিনি কোনো ভারী কাজ তো করতেই পারেন না, এমনকি হাত দিয়ে কিছু তুললেও তীব্র ব্যথা অনুভব করেন।
সংসার, স্ত্রী-সন্তান ও আর্থিক বিপর্যয়
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই বেল্লালের আয় একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে যাত্রাবাড়ীর ভাড়া বাসায় থাকা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিবারের খরচ, চিকিৎসা, ওষুধ, ভাড়া সবকিছুর চাপ একসাথে বেল্লালের জীবনে নেমে এসেছে দুর্যোগের মতো। আগে যে মানুষটি সবার মুখে হাসি ফোটাতেন, আজ তিনি নিজেই পরিবারের বোঝা হয়ে পড়েছেন, এ বাস্তবতা তাকে মানসিকভাবেও বিপর্যন্ত করে তুলছে।
দগদগে ক্ষত ও পঙ্গুত্বের শঙ্কা
গোলাগুলিতে শুধু বাহ্যিক আঘাতই হয়নি, বরং ভেতরের হাড় ও স্নায়ুতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোখে ছিটা গুলির কারণে দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে গুলি থাকার কারণে মাঝেমাঝেই মাথা ব্যথা ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এসব দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কারণে ভবিষ্যতে পঙ্গুত্বের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে, যদি না উন্নত চিকিৎসা দ্রুত নিশ্চিত করা যায়।
চিকিৎসার ব্যয় ও সহায়তার অভাব
বর্তমানে বেল্লাল চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে পারছেন না। উন্নত হাসপাতালে গেলে গুলিগুলো অপারেশনের মাধ্যমে বের করা সম্ভব, কিন্তু এজন্য প্রয়োজন প্রায় ৩-৪ লক্ষ টাকার মতো। সরকারি সহায়তা বা সংগঠনের পক্ষ থেকে কেউ এগিয়ে আসেনি। বেসরকারি সাহায্য না পেলে বেল্লালকে হয়তো অবশিষ্ট জীবন ব্যথা ও অসহায়ত্বে কাটাতে হবে।
বেল্লাল হোসেন একজন নিরীহ দিনমজুর, যিনি কেবল জীবিকার জন্য শহরে এসেছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারের গুলিতে আজ তিনি অসহায়, কর্মহীন ও যন্ত্রণায় জর্জরিত। তার জীবন থেমে গেলেও দায়িত্ব আমাদের থেমে থাকা উচিত নয়। আমরা যদি চুপ থাকি, তবে একদিন আমাদের পাশের ঘরের মানুষটিও হয়তো একই পরিণতির শিকার হবে। তাই এখনই সময় বেল্লালের পাশে দাঁড়ানোর।
মানবিক আবেদন ও প্রস্তাবনা
১. বেল্লালের উন্নত চিকিৎসা ও গুলি অপসারণে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
২. পরিবারকে সহায়তার জন্য নিয়মিত ভাতা চালু করা হোক।
৩. বেল্লালকে হালকা ধরনের কাজ বা ব্যবসার জন্য প্রাথমিক অনুদান দেওয়া হোক।
৪. রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দোষী পুলিশ সদস্যদের বিচার করা হোক।

এক নজরে বেল্লাল হোসেন
নাম: বেল্লাল হোসেন
জন্ম তারিখ: ০৫-০৬-১৯৯৪
জন্মন্মস্থান: নোয়াখালী
পেশা: দিনমজুর (টাইলস মিস্ত্রি)
নিজ জেলা: নোয়াখালী
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: বৈকুন্ঠপুর, ইউনিয়ন: ২নং রামনারায়ণপুর, থানা: চাটখিল, জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা: সাদ্দাম মার্কেট, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম: নুর হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স: কৃষি, ৬৫
মায়ের নাম: পারভিন আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৫২
মাসিক আয়: ৩০ হাজার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৮ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মো: হোসেন, বয়স: ২৮ বছর, পেশা: প্রবাসি
২. ফাতেমা আক্তার পিংকি, বয়স: ২৪, পেশা: গৃহিণী
৩. কুলছুম আক্তার প্রিয়া, বয়স: ২২, পেশা: গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান: সাদ্দাম মার্কেট, যাত্রাবাড়ী
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১.০০টা
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍