হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ লিটন
মোঃ লিটন

মোঃ লিটন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

• পেশা (পরিবার): ছোট লেট মেশিন ওয়ার্কশপ (ছোট ব্যবসা)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও পরিচয়
মোঃ লিটনের জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালে, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার এক সাধারণ পরিবারে। তার পিতা জামালউদ্দিন একজন পরিশ্রমী মানুষ এবং মাতা লিলুফা খাতুন একজন গৃহিণী। লিটনের পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে একটি ছোট লেট মেশিন ওয়ার্কশপের মাধ্যমে, যার মাসিক আয় মাত্র ১০,০০০ টাকা। অভাব-অনটনের মাঝেও এই পরিবারটি বেঁচে থাকে আত্মসম্মান আর ভালোবাসার বন্ধনে। পাঁচ সদস্যের এই পরিবারে লিটনের এক ভাই মোঃ রুবেল, যিনি ২২ বছর বয়সে অনার্স পাস করেছেন, এবং আরেক ভাই মোঃ সুমন (২৫) পেশায় একজন শ্রমিক। সীমিত আয়ের এই পরিবারে লিটনের বেড়ে ওঠা ছিল সংগ্রামের, কিন্তু তবুও কখনও হার মানেননি স্বপ্নের কাছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণের বর্ণনা
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, দিনটি ছিল শুক্রবার। বিকাল আনুমানিক তিনটা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমপ্লিট শাটডাউন ডাকে সাড়া দিয়ে মোঃ লিটনও অন্যদের সঙ্গে যোগ দেন একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে। তার বুকের গভীরে ছিল দেশ ও সমাজের প্রতি ভালোবাসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। সেদিন চট্টগ্রামের বদ্দারহাট পুকুরপাড়ে হাজারো প্রতিবাদী কণ্ঠ একত্রিত হয়েছিল বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে। লিটন ছিলেন তাদেরই একজন, যিনি মুখ তুলে দাঁড়িয়েছিলেন নিপীড়নের বিরুদ্ধে।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই শান্তিপূর্ণ মিছিল রূপ নেয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। পুলিশ ও সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের সদস্যরা একত্রিত হয়ে অতর্কিতে ছুড়ে দেয় গুলি, টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট। চারপাশে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক আর চিৎকার। বিক্ষোভকারীরা ছুটতে থাকে প্রাণ বাঁচানোর আশায়। কাঁদানে গ্যাসে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে, আর গুলির শব্দে কেঁপে উঠে পুরো এলাকা।
এই ভয়াবহ মুহূর্তে মোঃ লিটনও দৌড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার বুক ও হাতে সরাসরি গুলি লাগে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আশেপাশের মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে, কেউ কেউ সাহস করে এগিয়ে আসে তাকে বাঁচাতে। সেদিন তার শরীর গুলিবিদ্ধ হলেও, সেই মুহূর্তে যে দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগ তিনি দেখিয়েছেন—তা তাকে একটি সাহসী প্রতীক করে তোলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে।

চিকিৎসার বিবরণ
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রক্তাক্ত মোঃ লিটনকে সেদিন আশপাশের মানুষ ও সহযোদ্ধারা দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে, অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে স্থানান্তর করা হয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে। কিন্তু এখানেও তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায়, পরবর্তীতে নেওয়া হয় শামসের পাড়া ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে, যেখানে তার শরীরে থাকা গুলিগুলোর জটিলতা নিয়ে চিকিৎসকরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান।
ডাক্তারেরা তার শরীর থেকে কয়েকটি বুলেট অপসারণ করতে সক্ষম হলেও, দু’টি গুলি এখনো তার শরীরে রয়ে গেছে। এই রয়ে যাওয়া বুলেটদুটি শুধু শারীরিক যন্ত্রণারই নয়, বরং প্রতিদিন তাকে মানসিক যন্ত্রণারও মুখোমুখি করে তোলে। ভবিষ্যতে এই বুলেটগুলো তার চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, হতে পারে বড় কোনো শারীরিক জটিলতার কারণও। এক তরুণ, যে স্বপ্ন দেখেছিল সমাজ পরিবর্তনের, তার শরীরে আজও বহন করে চলেছে সেই প্রতিবাদের ক্ষত।
দীর্ঘ চিকিৎসার পরও মোঃ লিটন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। প্রতিনিয়ত শরীরে রয়ে যাওয়া গুলির যন্ত্রণা তার জীবনের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা হয়ে গেছে। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে তার জীবন হয়ে পড়েছে আরও কঠিন। অথচ এই ত্যাগ তার ছিল একটি ন্যায়বিচারের স্বপ্নে বিশ্বাস রেখে, সমাজের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে। আজ তিনি শুধু একজন আহত মানুষ নন, বরং একটি অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জীবন্ত সাক্ষী।

এক নজরে মোঃ লিটন
• পুরো নাম: মোঃ লিটন
• জন্ম তারিখ: ২ জানুয়ারি ১৯৮৮
• জন্মস্থান: হাতিয়া, নোয়াখালী, বাংলাদেশ
• পিতা: মোঃ জামালউদ্দিন
• মাতা: লিলুফা খাতুন
• পেশা (পরিবার): ছোট লেট মেশিন ওয়ার্কশপ (ছোট ব্যবসা)
• পারিবারিক মাসিক আয়: প্রায় ১০,০০০ টাকা
• পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
• ভাইবোন:
o মোঃ রুবেল (২২ বছর), অনার্স পাস
o মোঃ সুমন (২৫ বছর), শ্রমিক
• আন্দোলনে অংশগ্রহণ: ১৮ জুলাই ২০১৪, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামের বদ্দারহাটে যোগদান
• আহত হওয়া: পুলিশের গুলিতে বুক ও হাতে গুলিবিদ্ধ
• চিকিৎসা:
o চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল
o চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল
o শামসের পাড়া ন্যাশনাল মেডিকেল
• বর্তমান অবস্থা: শরীরে এখনও দুটি বুলেট রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍