আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা: শিক্ষার্থী
উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
১৬ বছরের আওয়ামী সন্ত্রাস
আওয়ামী লীগ সরকার তার শাসন টিকিয়ে রাখতে শুরু থেকেই বেছে নিয়েছে দমন-পীড়নের পথ। ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে গুলি চালায় নিরপরাধ মানুষের বুকে, মঞ্চস্থ করে একপাক্ষিক নির্বাচন নামের প্রহসন। দিনের পর দিন চলতে থাকে গুম, খুন, বিচারহীনতা, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাস, এবং মতপ্রকাশের ওপর নিষ্ঠুর দমন। গোটা দেশ যেন পরিণত হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর রাষ্ট্রে, যেখানে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, প্রতিবাদ করতে প্রাণ হারায়।
এই ভয়াবহতা ব্যতিক্রম ছিল না ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও। বহুদিন চুপ থাকলেও, সেই মাসে দেশের ছাত্র–তরুণ সমাজ যেন জেগে উঠেছিল ঘুম ভেঙে। শিক্ষাগত বৈষম্য, বেকারত্ব, পুলিশের বর্বরতা এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা তাদের রাস্তায় নামিয়ে আনে। ঢাকাসহ সারাদেশের রাজপথে ধ্বনিত হয় প্রতিবাদের স্লোগান -“স্বৈরাচারের পতন চাই!, খুনী হাসিনার পতন চাই।”
নিরস্ত্র, সাহসী ছাত্ররা হাতে প্ল্যাকার্ড আর চোখে আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সত্যের পক্ষে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার তাদের জবাব দেয় আগুন দিয়ে। গুলি চালানো হয় পাখির মতো। বেধড়ক লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান - সব একত্র হয়ে গড়ে তোলে এক বিভীষিকাময় রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা মিলে যেন ঘোষণা দেয়: “প্রতিবাদ করলেই মৃত্যু”। শত শত তরুণ আহত হয়, কেউ কেউ চিরতরে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তাজা রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। কেউ হারায় চোখের দৃষ্টি, কেউ হারায় শরীরের অঙ্গ। সূচনা হয় ইতিহাসের নির্মম এক কালো অধ্যায়ের।
কিন্তু গণহত্যা চালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি খুনী শেখ হাসিনার। ৫ ই আগস্ট তাকে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয় তার প্রভু দিল্লীর দরবারে। জুলাই-আগস্টের এর এই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসে কখনো কখনো একটি প্রজন্ম জেগে ওঠে, যারা ভয় না পেয়ে প্রশ্ন করে, প্রতিবাদ করে, এবং প্রয়োজন হলে রক্তও দেয়। তারা ফিরে যায় না, যতক্ষণ না স্বৈরাচার-খুনীদের পতন হয়।
পরিচিতি
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি পড়াশোনার পাশাপাশি দেশের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা পোষণ করেন। বয়স মাত্র একুশ। জন্ম নোয়াখালীর গোপালপুরে হলেও বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বসবাস করেন। তাঁর বাবা একজন প্রাইভেট শিক্ষক, মাসিক স্বল্প আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। মা একজন গৃহিণী, বর্তমানে ক্যান্সারের দ্বিতীয় স্টেজে আক্রান্ত।
তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। ছোট ভাই এখনও স্কুলে পড়ে, আর বোন উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত। আব্দুল্লাহ তার পরিবারের অন্যতম ভরসা। সীমিত আয়ের সংসারে তিনি পড়াশোনা শেষে পারিবারিক দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিবেন এই প্রত্যাশা তার বাবা-মায়ের। কিন্তু দেশ যখন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, তখন তিনি চুপ করে থাকতে পারেননি। স্বাধীনতার স্বপ্ন, ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, আর একটি মুক্ত ভবিষ্যতের আশায় তিনি রাজপথে নেমেছেন।
জুলাই ২০২৪-এ সারাদেশে যখন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ মিলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়, তখন আব্দুল্লাহ সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন। রামদার কোপ, গুলির আঘাত, আর লাঠির প্রচণ্ড আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যান তিনি। আজও তার শরীরে সেই দিনের ক্ষতের দাগ বহন করছে, ব্যথা মনে করিয়ে দিচ্ছে আন্দোলনের নির্মম ইতিহাস। তবুও তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, নিজের চিকিৎসার জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য, আর একটি নতুন বাংলাদেশের জন্য।
১৬ জুলাই, বিভীষিকাময় গাজীপুর চৌরাস্তা
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) শহীদ মিনার চত্বর থেকে শুরু হয় ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের এক উত্তাল অধ্যায়। হাজারো ছাত্র জনতা মিছিল করে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ে অবস্থান নেয়। কিন্তু বেশিক্ষণ সময় পায়নি তারা। ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবং পুলিশ বাহিনী সশস্ত্র হয়ে মিছিলে হামলা চালায়। রামদা, চাপাতি, রড, হকিস্টিক, PVC পাইপ, ককটেল, পেট্রল বোমা কিছুই বাদ যায়নি। পেট্রল বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করা হয়। নির্মম এই হামলায় আহত হয় অনেকেই।
রামদার কোপ
সেই হামলায় গুরুতর আহত হন আব্দুল্লাহ। প্রথমে আব্দুল্লাহর বাম হাতে রামদার কোপ দেয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। রক্ত ঝরতে থাকে গলগল করে। এক সন্ত্রাসী আবার কোপ দিতে গেলে তিনি তার হাত ধরে ফেলেন। এই অবস্থায় ৫-৬ জন নরপশু একসাথে রড, পাইপ, লাঠি দিয়ে তাকে পেটাতে থাকে। আরেক নরপশু তার মাথায় কোপ দিতে গেলে তিনি হাত তুলে ধরেন। কোপটি গিয়ে লাগে ডান হাতের কব্জিতে।
আওয়ামী পুলিশের নির্মমতা
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মারাত্নক আহত অবস্থায় আব্দাল্লাহ যখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটছিলেন তখনই পুলিশ গুলি চালায় তাকে লক্ষ্য করে, এক গুলি গিয়ে লাগে তার পায়ের মাংসে।
চিকিৎসার সংগ্রাম
আব্দুল্লাহর রক্তে ভিজে যায় রাজপথ, তার নিজের জামা-কাপড়। নিকটস্থ কয়েকটি ফার্মেসিতে ছুটে যান তিনি। কিন্তু কেউ চিকিৎসা দিতে সাহস করে না। তারা বলে “আপনাদের চিকিৎসা দিলে আমাদের সমস্যা হবে।”
এই মুমূর্ষু অবস্থায় তিনি যখন রাস্তা দিয়ে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আশায় ঘুরছিলেন, ঠিক তখনই আবারো তার উপর হামলে পরে পিশাচ ছাত্রলীগ – যুবলীগের পেটোয়া বাহিনী। আবারও তার উপর চলে লাঠির নির্মম আঘাত। শত আঘাতে আর রক্তক্ষরণের কারণে তখন তার উঠে দাড়ানোর শক্তিও ছিল না।
হাসপাতালও সন্ত্রাসী আওয়ামী বাহিনীর দখলে
অবশেষে এক অচেনা ছাত্র ভাই রিকশায় তুলে নেন। তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছালে দেখা যায় ছাত্রলীগ হাসপাতালের ভিতরে অবস্থান করছে, বাইরে পুলিশ দিয়ে ঘেরাও; যেন কোনো আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসা না পায়।
চিকিৎসা অসম্ভব দেখে অচেনা সেই ছাত্র আব্দুল্লাহকে তার নিজ বাসায় নিয়ে যান। ক্ষতস্থানগুলো দ্রুত বেঁধে দেন।
পরের ধাপে চেষ্টা করা হয় পপুলার হাসপাতালে। কিন্তু গেইটেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, আন্দোলনে কেন গিয়েছিলেন, এখানে আপনার চিকিৎসা করা হবে না। অবশেষে SOR মেডিকেল সার্ভিস অ্যান্ড হসপিটাল লিমিটেড-এ নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয়, ক্ষতস্থান সেলাই করা হয়। স্যালাইন দেওয়ার পর ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে। ডাক্তার জানায় হাতের কব্জির রগ কেটে গেছে, এখন বড় অপারেশন সম্ভব নয়। দেহে রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। পরবর্তীতে তার রুমমেটদের খবর দেওয়া হলে তারা এসে আব্দুল্লাহকে বাসায় নিয়ে যায়।
পালিয়ে বেঁচে থাকা
নিজ পরিবারের কাছে ফেরার ইচ্ছে থাকলেও, সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে বাসায় না গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয় এক পরিচিত আত্মীয়ের বাসায়। সেখানেও প্রতিটি রাত ভয়ে আর আতঙ্কে কাটে, কেননা তখন চলছিল পুলিশ ও ছাত্রলীগের তাণ্ডব, মধ্যরাতে ছাত্রদের বাসায় হামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন। কারও সাথে যোগাযোগও করা সম্ভব হচ্ছিল না, হাসিনা আর পোষা মন্ত্রী পলকের নির্দেশে ছিল মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ, ইন্টারনেট বন্ধ।
বাবা-মায়ের কাছে ফেরা
জুলাই ২৪ পর্যন্ত আত্মীয়ের বাসায় লুকিয়ে থাকতে হয়। ক্ষতস্থানে পচন ধরতে শুরু করে। ব্যথা আর যন্ত্রনার তীব্র জ্বালার মাঝে, দিন-রাত কাটছিল আব্দুল্লাহর। এরপর বিশেষ ব্যবস্থায় এক আত্নীয়ের সহায়তায় পুলিশের চোখ এড়িয়ে চট্টগ্রামে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয় তাকে। দীর্ঘদিন চলে চিকিৎসা।
বর্তমান অবস্থা
তার ডান হাতের কব্জির রগ কেটে যাওয়ায় হাত নড়াচড়া প্রায় অসম্ভব। হঠাৎ হাত অবশ হয়ে যায়, তীব্র ব্যথা অনূভুত হয় মাঝেমেধ্যেই। ডাক্তার বলেছেন হাতে কৃত্রিম রগ বসানো ও পূর্ণাঙ্গ অপারেশন করানো জরুরি।
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের কথা শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয় , এটি বাংলাদেশের ছাত্র জনতার ত্যাগের প্রতিচ্ছবি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভঙ্গুর; বাবা লিভার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত, মা ক্যান্সারে ভুগছেন, সংসার চলে অল্প আয়ে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে শীঘ্রই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তার চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের জন্য সমাজ, রাষ্ট্র এবং সহমর্মী মানুষের এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তার পড়ালেথা এবং চিকিৎসার খরচ চালানের জন্য শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করার পর তার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্তানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
জন্ম তারিখ : ২৪-১০-২০০৩
পেশা/ পদবী : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : নোয়াখালী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: গোপালপুর, ইউনিয়ন: বিজবাগ, ডাকঘর: বিজবাগ, থানা: সেনবাগ, জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: কুমিরা, এলাকা: কুমিরা, থানা: সিতাকুণ্ড, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: জাকের হোসাইন
পিতার পেশা ও বয়স : প্রাইভেট শিক্ষক, ৪০
মায়ের নাম : তাহমিনা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ১২০০০
আয়ের উৎস : বাবার শিক্ষকতা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ:
১. আব্দুল্লাহ আল জাবির, বয়স- ১৪, পেশা- শিক্ষার্থী, সম্পর্ক- ভাই
২. সুমাইয়া নাছরিন মীম, বয়স- ২০, পেশা- শিক্ষার্থী, সম্পর্ক- বোন
আহতের চিত্র
ঘটনার স্থান: গাজিপুর চৌরাস্তা মোড়
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার সময়কাল: ১৬ জুলাই ২০২৪ ,বিকেল ৩.০ টা
আঘাতের ধরণ: রামদা দিয়ে কোপানো হয়, পায়ে গুলিবিদ্ধ এবং লাঠির আঘাত
চিকিৎসা: গুলি বের করা হয়
বর্তমান অবস্থা: উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন
আওয়ামী লীগ সরকার তার শাসন টিকিয়ে রাখতে শুরু থেকেই বেছে নিয়েছে দমন-পীড়নের পথ। ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে গুলি চালায় নিরপরাধ মানুষের বুকে, মঞ্চস্থ করে একপাক্ষিক নির্বাচন নামের প্রহসন। দিনের পর দিন চলতে থাকে গুম, খুন, বিচারহীনতা, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাস, এবং মতপ্রকাশের ওপর নিষ্ঠুর দমন। গোটা দেশ যেন পরিণত হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর রাষ্ট্রে, যেখানে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, প্রতিবাদ করতে প্রাণ হারায়।
এই ভয়াবহতা ব্যতিক্রম ছিল না ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও। বহুদিন চুপ থাকলেও, সেই মাসে দেশের ছাত্র–তরুণ সমাজ যেন জেগে উঠেছিল ঘুম ভেঙে। শিক্ষাগত বৈষম্য, বেকারত্ব, পুলিশের বর্বরতা এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা তাদের রাস্তায় নামিয়ে আনে। ঢাকাসহ সারাদেশের রাজপথে ধ্বনিত হয় প্রতিবাদের স্লোগান -“স্বৈরাচারের পতন চাই!, খুনী হাসিনার পতন চাই।”
নিরস্ত্র, সাহসী ছাত্ররা হাতে প্ল্যাকার্ড আর চোখে আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সত্যের পক্ষে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার তাদের জবাব দেয় আগুন দিয়ে। গুলি চালানো হয় পাখির মতো। বেধড়ক লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান - সব একত্র হয়ে গড়ে তোলে এক বিভীষিকাময় রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা মিলে যেন ঘোষণা দেয়: “প্রতিবাদ করলেই মৃত্যু”। শত শত তরুণ আহত হয়, কেউ কেউ চিরতরে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তাজা রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। কেউ হারায় চোখের দৃষ্টি, কেউ হারায় শরীরের অঙ্গ। সূচনা হয় ইতিহাসের নির্মম এক কালো অধ্যায়ের।
কিন্তু গণহত্যা চালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি খুনী শেখ হাসিনার। ৫ ই আগস্ট তাকে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয় তার প্রভু দিল্লীর দরবারে। জুলাই-আগস্টের এর এই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসে কখনো কখনো একটি প্রজন্ম জেগে ওঠে, যারা ভয় না পেয়ে প্রশ্ন করে, প্রতিবাদ করে, এবং প্রয়োজন হলে রক্তও দেয়। তারা ফিরে যায় না, যতক্ষণ না স্বৈরাচার-খুনীদের পতন হয়।
পরিচিতি
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি পড়াশোনার পাশাপাশি দেশের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা পোষণ করেন। বয়স মাত্র একুশ। জন্ম নোয়াখালীর গোপালপুরে হলেও বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বসবাস করেন। তাঁর বাবা একজন প্রাইভেট শিক্ষক, মাসিক স্বল্প আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। মা একজন গৃহিণী, বর্তমানে ক্যান্সারের দ্বিতীয় স্টেজে আক্রান্ত।
তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। ছোট ভাই এখনও স্কুলে পড়ে, আর বোন উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত। আব্দুল্লাহ তার পরিবারের অন্যতম ভরসা। সীমিত আয়ের সংসারে তিনি পড়াশোনা শেষে পারিবারিক দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিবেন এই প্রত্যাশা তার বাবা-মায়ের। কিন্তু দেশ যখন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, তখন তিনি চুপ করে থাকতে পারেননি। স্বাধীনতার স্বপ্ন, ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, আর একটি মুক্ত ভবিষ্যতের আশায় তিনি রাজপথে নেমেছেন।
জুলাই ২০২৪-এ সারাদেশে যখন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ মিলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়, তখন আব্দুল্লাহ সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন। রামদার কোপ, গুলির আঘাত, আর লাঠির প্রচণ্ড আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যান তিনি। আজও তার শরীরে সেই দিনের ক্ষতের দাগ বহন করছে, ব্যথা মনে করিয়ে দিচ্ছে আন্দোলনের নির্মম ইতিহাস। তবুও তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, নিজের চিকিৎসার জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য, আর একটি নতুন বাংলাদেশের জন্য।
১৬ জুলাই, বিভীষিকাময় গাজীপুর চৌরাস্তা
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) শহীদ মিনার চত্বর থেকে শুরু হয় ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের এক উত্তাল অধ্যায়। হাজারো ছাত্র জনতা মিছিল করে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ে অবস্থান নেয়। কিন্তু বেশিক্ষণ সময় পায়নি তারা। ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবং পুলিশ বাহিনী সশস্ত্র হয়ে মিছিলে হামলা চালায়। রামদা, চাপাতি, রড, হকিস্টিক, PVC পাইপ, ককটেল, পেট্রল বোমা কিছুই বাদ যায়নি। পেট্রল বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করা হয়। নির্মম এই হামলায় আহত হয় অনেকেই।
রামদার কোপ
সেই হামলায় গুরুতর আহত হন আব্দুল্লাহ। প্রথমে আব্দুল্লাহর বাম হাতে রামদার কোপ দেয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। রক্ত ঝরতে থাকে গলগল করে। এক সন্ত্রাসী আবার কোপ দিতে গেলে তিনি তার হাত ধরে ফেলেন। এই অবস্থায় ৫-৬ জন নরপশু একসাথে রড, পাইপ, লাঠি দিয়ে তাকে পেটাতে থাকে। আরেক নরপশু তার মাথায় কোপ দিতে গেলে তিনি হাত তুলে ধরেন। কোপটি গিয়ে লাগে ডান হাতের কব্জিতে।
আওয়ামী পুলিশের নির্মমতা
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মারাত্নক আহত অবস্থায় আব্দাল্লাহ যখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটছিলেন তখনই পুলিশ গুলি চালায় তাকে লক্ষ্য করে, এক গুলি গিয়ে লাগে তার পায়ের মাংসে।
চিকিৎসার সংগ্রাম
আব্দুল্লাহর রক্তে ভিজে যায় রাজপথ, তার নিজের জামা-কাপড়। নিকটস্থ কয়েকটি ফার্মেসিতে ছুটে যান তিনি। কিন্তু কেউ চিকিৎসা দিতে সাহস করে না। তারা বলে “আপনাদের চিকিৎসা দিলে আমাদের সমস্যা হবে।”
এই মুমূর্ষু অবস্থায় তিনি যখন রাস্তা দিয়ে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আশায় ঘুরছিলেন, ঠিক তখনই আবারো তার উপর হামলে পরে পিশাচ ছাত্রলীগ – যুবলীগের পেটোয়া বাহিনী। আবারও তার উপর চলে লাঠির নির্মম আঘাত। শত আঘাতে আর রক্তক্ষরণের কারণে তখন তার উঠে দাড়ানোর শক্তিও ছিল না।
হাসপাতালও সন্ত্রাসী আওয়ামী বাহিনীর দখলে
অবশেষে এক অচেনা ছাত্র ভাই রিকশায় তুলে নেন। তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছালে দেখা যায় ছাত্রলীগ হাসপাতালের ভিতরে অবস্থান করছে, বাইরে পুলিশ দিয়ে ঘেরাও; যেন কোনো আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসা না পায়।
চিকিৎসা অসম্ভব দেখে অচেনা সেই ছাত্র আব্দুল্লাহকে তার নিজ বাসায় নিয়ে যান। ক্ষতস্থানগুলো দ্রুত বেঁধে দেন।
পরের ধাপে চেষ্টা করা হয় পপুলার হাসপাতালে। কিন্তু গেইটেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, আন্দোলনে কেন গিয়েছিলেন, এখানে আপনার চিকিৎসা করা হবে না। অবশেষে SOR মেডিকেল সার্ভিস অ্যান্ড হসপিটাল লিমিটেড-এ নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয়, ক্ষতস্থান সেলাই করা হয়। স্যালাইন দেওয়ার পর ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে। ডাক্তার জানায় হাতের কব্জির রগ কেটে গেছে, এখন বড় অপারেশন সম্ভব নয়। দেহে রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। পরবর্তীতে তার রুমমেটদের খবর দেওয়া হলে তারা এসে আব্দুল্লাহকে বাসায় নিয়ে যায়।
পালিয়ে বেঁচে থাকা
নিজ পরিবারের কাছে ফেরার ইচ্ছে থাকলেও, সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে বাসায় না গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয় এক পরিচিত আত্মীয়ের বাসায়। সেখানেও প্রতিটি রাত ভয়ে আর আতঙ্কে কাটে, কেননা তখন চলছিল পুলিশ ও ছাত্রলীগের তাণ্ডব, মধ্যরাতে ছাত্রদের বাসায় হামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন। কারও সাথে যোগাযোগও করা সম্ভব হচ্ছিল না, হাসিনা আর পোষা মন্ত্রী পলকের নির্দেশে ছিল মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ, ইন্টারনেট বন্ধ।
বাবা-মায়ের কাছে ফেরা
জুলাই ২৪ পর্যন্ত আত্মীয়ের বাসায় লুকিয়ে থাকতে হয়। ক্ষতস্থানে পচন ধরতে শুরু করে। ব্যথা আর যন্ত্রনার তীব্র জ্বালার মাঝে, দিন-রাত কাটছিল আব্দুল্লাহর। এরপর বিশেষ ব্যবস্থায় এক আত্নীয়ের সহায়তায় পুলিশের চোখ এড়িয়ে চট্টগ্রামে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয় তাকে। দীর্ঘদিন চলে চিকিৎসা।
বর্তমান অবস্থা
তার ডান হাতের কব্জির রগ কেটে যাওয়ায় হাত নড়াচড়া প্রায় অসম্ভব। হঠাৎ হাত অবশ হয়ে যায়, তীব্র ব্যথা অনূভুত হয় মাঝেমেধ্যেই। ডাক্তার বলেছেন হাতে কৃত্রিম রগ বসানো ও পূর্ণাঙ্গ অপারেশন করানো জরুরি।
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের কথা শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয় , এটি বাংলাদেশের ছাত্র জনতার ত্যাগের প্রতিচ্ছবি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভঙ্গুর; বাবা লিভার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত, মা ক্যান্সারে ভুগছেন, সংসার চলে অল্প আয়ে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে শীঘ্রই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তার চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের জন্য সমাজ, রাষ্ট্র এবং সহমর্মী মানুষের এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা:
তার পড়ালেথা এবং চিকিৎসার খরচ চালানের জন্য শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করার পর তার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্তানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
জন্ম তারিখ : ২৪-১০-২০০৩
পেশা/ পদবী : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : নোয়াখালী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: গোপালপুর, ইউনিয়ন: বিজবাগ, ডাকঘর: বিজবাগ, থানা: সেনবাগ, জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: কুমিরা, এলাকা: কুমিরা, থানা: সিতাকুণ্ড, জেলা: চট্টগ্রাম
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: জাকের হোসাইন
পিতার পেশা ও বয়স : প্রাইভেট শিক্ষক, ৪০
মায়ের নাম : তাহমিনা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ১২০০০
আয়ের উৎস : বাবার শিক্ষকতা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই/বোনদের বিবরণ:
১. আব্দুল্লাহ আল জাবির, বয়স- ১৪, পেশা- শিক্ষার্থী, সম্পর্ক- ভাই
২. সুমাইয়া নাছরিন মীম, বয়স- ২০, পেশা- শিক্ষার্থী, সম্পর্ক- বোন
আহতের চিত্র
ঘটনার স্থান: গাজিপুর চৌরাস্তা মোড়
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
আহত হওয়ার সময়কাল: ১৬ জুলাই ২০২৪ ,বিকেল ৩.০ টা
আঘাতের ধরণ: রামদা দিয়ে কোপানো হয়, পায়ে গুলিবিদ্ধ এবং লাঠির আঘাত
চিকিৎসা: গুলি বের করা হয়
বর্তমান অবস্থা: উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍