হোম / আহতদের তালিকা / আবু রায়হান
আবু রায়হান

আবু রায়হান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ছাত্র, পটিয়া মাদ্রাসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আবু রায়হানের জীবনকথাঃ
আবু রায়হান, কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর মুন্সীর ডেইল গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের মেধাবী ছাত্র। তিনি ২০০৩ সালের ৫ জুন পাহাড়তলীতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি পটিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করছেন। ছোটবেলা থেকেই জ্ঞান অর্জন এবং সমাজসেবায় মনোযোগী রায়হান তার পরিবারকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তার পিতা আবুল কালাম একজন দিনমজুর এবং মা জীবন আরা একজন গৃহিণী। পাঁচ সদস্যের পরিবারে সীমিত আয়ের মধ্যেই চলতে হয় তাদের। পরিবারের ছোট ভাই “রাশেদ” পড়াশোনা করছে এবং বড় বোন নিলুফা ইছমিন সাথীও শিক্ষাজীবনে নিয়োজিত।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিনে আবু রায়হানের জীবনে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। সেদিন তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে মাদ্রাসা থেকে মিছিলে যোগ দেন। আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শুরু করেন। বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে, তবে আঘাতের কারণে তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সংগ্রামী জীবনযুদ্ধে একদিকে রয়েছে চিকিৎসার কষ্ট, অন্যদিকে রয়েছে পরিবারের দায়ভার। তবুও আবু রায়হান সুস্থ হয়ে আবারও পড়াশোনায় ফিরতে এবং নিজের পরিবারকে সহযোগিতা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
আবু রায়হানের আন্দোলনে অংশগ্রহণঃ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২০২৪ -এর মাঝামাঝি থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তার মূল তাড়নায় ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পুনঃ অবস্থানবিরোধী ক্ষোভ — যা দ্রুত একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনটি শুরুতে ছাত্রদের সরকারি চাকরি কোটার বিরোধ থেকে নাগরিক-শাসন, ন্যায়ের দাবি এবং শাসন পদত্যাগের দাবিতে মিলিত হয়। ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ দাবি ও রাস্তায় উপস্থিতি দ্রুত ঝড়ে পরিণত হয় এবং এপ্রসঙ্গে প্রশাসন ও আওয়ামী প্রশাসনের নিপীড়নের শিকার হোন
৪ আগস্ট নিজে এক মোড় ছিল—রাজধানীসহ দেশের বহু জেলায় প্রতিবাদ এক বিরাট স্তরে পৌঁছালো। ওই দিন দ্রুত ভিড় জমে রাজধানীর কেন্দ্রীয় স্থানে; সাথে গভীর উত্তেজনা। একই সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকার-পন্থী উপদলগুলোর কড়া হামলা, কারফিউ ঘোষণা, ইন্টারনেট শাটডাউন ও ব্যাপক গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠে।
ঢাকার বাইরেও—ফেনী, চট্টগ্রাম, পটিয়া, রাজশাহী, মুন্সিগঞ্জসহ—প্রতিবাদি শহরগুলোতে লাঠি, শটগান, রাইফেল ও গুলি ব্যবহার করে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা হয়েছে; বহু জায়গায় নরকীয় সংঘর্ষ ও মারামারি ঘটেছে, আর হাজারো মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা বলছেন এটি ছিল কেবল পুলিশি দমন নয়—কখনো কখনো সন্ত্রাসী আওয়ামীলীগের সংগঠিত আক্রমণও দেখা গেছে।
কক্সবাজার জেলার আবু রায়হান আন্দোলনে ভূমিকা নেয়। আবু রায়হান — পটিয়া মাদরাসার ছাত্র - ৪ আগস্ট মাদ্রাসা থেকে সহপাঠীদের সঙ্গে মিছিল করে বের হন। তিনি নিজে এবং তার সঙ্গীরা শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করছিলেন বলে বর্ণনা করেন। ওই এলাকা-পটিয়া ডাংচ বাঙলা মোড়- হঠাৎ করে সংঘর্ষের অগ্নিকর্ষে পরিণত হয়; ছাত্রলীগের কিছু নরপিচাশ লাঠি-প্রহার এবং সরাসরি গুলিতে আক্রমণ শুরু করে। আবু রায়হান সেদিন গুলিবিদ্ধ হন এবং গুরুতরভাবে আহত হন। তার হাতে, পায়ে বা শরীরে প্রাপ্ত ক্ষত ও রক্তক্ষরণ তাকে মাটিতে লুটিয়ে দেয়; এরপর সহপাঠী ও স্থানীয়রা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর আওয়ামী লীগ এবং তাদের কুখ্যাত, দস্যুপ্রবণ যুবলীগ ও রক্তপিপাসু, নৃশংস ছাত্রলীগ—কখনও সরাসরি, কখনও অনুগত সেচ্ছাসেবী বাহিনী হিসেবে—শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশকে ভাঙতে লাঠি, দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও সহিংস কৌশল প্রয়োগ করেছে। প্রতিবাদকারীদের ওপর চালানো এই হিংস্রতাপূর্ণ, পাষণ্ড ও অমানবিক আক্রমণ বহু এলাকায় মানুষকে আহত ও হত্যা করেছে; এ ঘটনা শুধুই ব্যক্তিগত আঘাত নয়—এটি গণতান্ত্রিক দাবি দমন করার একটি ভয়ংকর নজির।
আবু রায়হানের মতো ক’শ ছাত্রের আহত হওয়া শুধু এক ব্যক্তির কাহিনি নয়; এটা সেই দিনের রক্তাক্ত স্মৃতি, যা তুলে ধরে—কীভাবে সাধারণ ছাত্র-যুবকরা ন্যায়ের দাবিতে দাঁড়ালেও বর্বর পদ্ধতিতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছে। যে সহিংসতা ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে, তার হিসাব-নিকাশ ও ক্ষতিপূরণ, এবং ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—এটাই দেশের সামনে থাকা এক প্রধান দাবি।
চিকিৎসা ও আহত অবস্থারঃ
৪ আগস্ট ২০২৪ সালে আন্দোলনের সময় আবু রায়হান মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে মিছিলে যোগ দেয়। সেই মুহূর্তে ছাত্রলীগের সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। হঠাৎ আবু রায়হান গুলিবিদ্ধ হয় ও গুরুতর আহত হইয় এবং দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে তাকে ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তার পরপর দুটি অপারেশন হয়। এই চিকিৎসায় প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। পরবর্তীতে নিয়মিত চেকআপ ও জটিলতার কারণে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, যার জন্য অতিরিক্ত ৮ হাজার টাকা খরচ হয়।
আবু রায়হান বলেন, আমার বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালীতে হওয়ায় প্রতিবার চিকিৎসার জন্য আসা-যাওয়ার ভাড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। এতে আমার পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। শারীরিকভাবে আমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নই; আহত জায়গায় ব্যথা রয়ে গেছে এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এই অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে আমার চিকিৎসার খরচ, ভোগান্তি এবং শারীরিক কষ্ট একদিকে যেমন আমাকে দুর্বল করে দিয়েছে, অন্যদিকে আর্থিক সংকট আমার পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত চিকিৎসা ও সহায়তা ছাড়া সুস্থ হওয়া এখনো অনিশ্চিত।
আবু রায়হানের কৃতিত্ব ও অবদানঃ
আবু রায়হান কোটা সংস্কার আন্দোলনের একজন সাহসী অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং ছাত্রদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আন্দোলনের বিভিন্ন সমাবেশ, বিক্ষোভ ও পদযাত্রায় তিনি সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখে তরুণদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দৃঢ় অবস্থান নেন।
তার কণ্ঠে ও লেখনিতে আন্দোলনের দাবি ছিল স্পষ্ট—সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে কোটার যৌক্তিক সংস্কার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি আন্দোলনের পক্ষে লিখে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করেন। এতে তিনি অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন।
শারীরিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আবু রায়হান মাঠে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান। পুলিশের বাধা, হামলা ও দমননীতির মধ্যেও তিনি সাহসিকতার পরিচয় দেন। তাঁর এই ত্যাগ ও অবদান আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
প্রস্তাবনাঃ
আবু রায়হান বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ এবং উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর পুনর্বাসনের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তিনি একজন ছাত্র হলেও পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। তাই তাঁর জন্য একটি ভালো চাকরির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তিনি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। তাঁর বাড়ি ৬ শতক জমির ওপর অবস্থিত, অন্য কোনো সম্পত্তি নেই। এ অবস্থায় চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে সরকারি ও সামাজিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
এক নজরেঃ
 নাম: আবু রায়হান (চট্টগ্রাম–৩৫৯)
 জন্মতারিখ: ৫ জুন ২০০৩
 জন্মস্থান: পাহাড়তলী, কক্সবাজার
 পেশা: ছাত্র, পটিয়া মাদ্রাসা
 মোবাইল নম্বার: ০১৮৩৮৭৮৩৫৬৩
 পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫
 পিতা: আবুল কালাম, দিনমজুর, বয়স ৫০
 মা: জীবন আরা, গৃহিণী
 ভাই-বোন: রাশেদ (ভাই, বয়স ১১), নিলুফা ইছমিন সাথী (বোন, বয়স ২৮)
 ঘটনা: ৪ আগস্ট ২০২৪, পটিয়া ডাংচ বাঙলা মোড়; ছাত্রলীগের নৃশংস গুলিতে আহত
 আঘাত: গুলিবিদ্ধ, মাথায় ও শরীরে গুরুতর জখম, রক্তক্ষরণ ও শারীরিক দুর্বলতা
 চিকিৎসা: স্থানীয় চিকিৎসকের বাসায় প্রাথমিক সেলাই ও ব্যান্ডেজ; পরে ঢাকা লালবাগ ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍