হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ জোবায়ের মিয়া
  মোঃ জোবায়ের মিয়া

মোঃ জোবায়ের মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা/পদবী: চাকুরিজীবী, ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেড

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মোঃ জোবায়ের মিয়া – জীবন পরিচয়
মোঃ জোবায়ের মিয়া, কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ি গ্রামের সন্তান। তিনি ২০০১ সালের ২১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেডে চাকুরিরত থেকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজার জেলার মহেশখালি থানার ৬নং ওয়ার্ড, মাতারবাড়ি ইউনিয়নে হলেও বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও থানার করিম ম্যানশনে বসবাস করতেন।
তার পরিবারে মা দিলু আরা বেগম, যিনি একজন গৃহিণী, এবং আরও দুই ভাইবোন রয়েছে। বাবা হাসান মিয়া দীর্ঘদিন আগে মারা যান। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সীমিত, মাসিক আয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা, যা মূলত তার চাকরির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ছোট ভাই মোঃ জাহেদুল ইসলাম নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং বোন সুমাইয়া আক্তার ইউসেপ মাবিয়ায় দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
১৮ জুলাই ২০২৪ সালে তিনি চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। সেখানে দুপুর ৩টার দিকে ছাত্রলীগ ও পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে গুরুতর আহত হন। তার পা ও হাতে গুলি লাগে, মাথা ও পিঠে আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয় জনতা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও যথাযথ চিকিৎসা পাননি। পরে শমসেরপাড়া মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসা হয় এবং হাতের বুলেট বের করা গেলেও চোখে এখনো বুলেটের টুকরো রয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং একটি স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা তার জীবনে জরুরি হয়ে পড়েছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও হতাহতের বর্ণনা
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হয়ে থাকবে। সেই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই ‘সর্বাত্মক অবরোধ’ বা সম্পূর্ণ শাটডাউন পালনের ডাক দেওয়া হয়। ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কর্মসূচিতে যোগ দেয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল ও সমাবেশ করে।
বীর সাহসী মোঃ জোবায়ের মিয়া এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তিনি সেদিন দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম নতুন ব্রিজ এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগ দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিকে সামনে আনা এবং সরকারের দমননীতি ও অন্যায় কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে চললেও বিকেল ৩টার দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
হঠাৎ করেই নরপিশাচ আওয়ামী লীগ, রক্তপিপাসু যুবলীগ ও হিংস্র ছাত্রলীগের দস্যুপ্রবণ বাহিনী পুলিশের সহযোগিতায় মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। গ্যাস, রাবার বুলেট, এমনকি সরাসরি লাইভ ফায়ারিং ব্যবহার করা হয়। এই বর্বরোচিত হামলায় অসংখ্য ছাত্র-জনতা রক্তাক্ত হয় এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
জোবায়ের মিয়ার জীবনেও সেই দিন কালো অধ্যায় হয়ে আসে। পুলিশের ছোড়া গুলি তার পা ও হাতে লাগে। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেও নৃশংস খুনি বাহিনী তাকে মাথা ও পিঠে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। মানবতাবিরোধী এই অমানবিক নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর আহত হন। ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও প্রথমদিকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেও তার চোখে এখনও গুলির টুকরা রয়ে গেছে, যা দ্রুত বের করা প্রয়োজন।
১৮ জুলাইয়ের এই দমননীতি শুধু জোবায়ের নয়, আরও শত শত তরুণ-যুবকের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ওই দিন অন্তত ২৭ জন নিহত হয় এবং হাজারেরও বেশি আহত হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলেছে, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে তথ্য গোপন করার চেষ্টা করে।
আসলে সেই দিনটি শুধু একটি আন্দোলনের দমন নয়, বরং পুরো জাতির ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নামক কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বর্বরতা ও পৈশাচিকতার নগ্ন প্রকাশ। যুবলীগের রক্তপিপাসু বাহিনী এবং ছাত্রলীগের নরপিশাচ সন্ত্রাসীরা সাধারণ ছাত্রদের উপর যে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে, তা ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
এই আন্দোলন ছিল ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াই, আর ১৮ জুলাইয়ের রক্তাক্ত ঘটনা প্রমাণ করে—বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের অধিকার আদায়ে জীবন দিতে প্রস্তুত।
চিকিৎসা ও আহত অবস্থাঃ
১৮ জুলাইয়ের ভয়াবহ ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর ছাত্র-জনতা মোঃ জোবায়ের মিয়াকে উদ্ধার করে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি; বরং অবহেলার শিকার হন তিনি। পরে অনেক কষ্টে তাকে শমসের পাড়া মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার হাতে গুলি লাগার কারণে সেখান থেকে বুলেটটি বের করা সম্ভব হয়, তবে শরীরের অন্যান্য আঘাত এবং বিশেষ করে চোখে ঢুকে থাকা বুলেটের টুকরো এখনো রয়ে গেছে। এ টুকরোগুলো দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন, নতুবা দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়াও মাথা ও পিঠে আঘাতের কারণে তিনি এখনও প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগছেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটা কিংবা ভারসাম্য রক্ষা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আঘাতের ফলে তার শারীরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখনো উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাননি। শুধু অল্প কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে তিনি দিন কাটাচ্ছেন।
বর্তমানে তার উন্নত চিকিৎসা একান্ত প্রয়োজন। সময়মতো সার্জারি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। তাই দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অবদান ও কৃতিত্বঃ
মোঃ জোবায়ের মিয়া শুধু একজন চাকুরিজীবী নন, তিনি একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিকও। তার কর্মজীবনে তিনি ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেডে নিষ্ঠা, সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করেছেন। অল্প আয়ে পরিবারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা তার বড় কৃতিত্ব। বাবাহারা পরিবারে তিনি মায়ের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছেন এবং ভাইবোনদের পড়াশোনার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন।
এছাড়া, ১৮ জুলাইয়ের আন্দোলনে তিনি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবেননি; দেশের জন্য, প্রজন্মের জন্য এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তার এই অংশগ্রহণ নিছক ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে আত্মত্যাগের প্রতীক। আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি সাহসিকতার সাথে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন।
এভাবেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে নিজের পরিবার ও দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করাই জীবনের প্রকৃত কৃতিত্ব। তার এই ত্যাগ ও অবদান কেবল তার পরিবারের কাছে নয়, বরং সমগ্র জাতির কাছেও এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
প্রস্তাবনাঃ
মোঃ জোবায়ের মিয়ার জন্য উন্নত চিকিৎসা একান্ত প্রয়োজন। ১৮ জুলাইয়ের গুরুতর আহত অবস্থার কারণে তার চোখে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে এখনও বুলেটের টুকরো রয়ে গেছে, যা দ্রুত অপসারণ না করলে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তিনি পূর্বে চাকুরিজীবী ছিলেন, তবে আহত হওয়ার পর নিজের বসবাস ও স্থায়ী ঠিকানা নেই। তাই একটি ঘর ও নিরাপদ জীবনযাত্রার ব্যবস্থা জরুরি। এছাড়া, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তিনি ভালো ও স্থায়ী চাকরির সুযোগ প্রার্থনা করছেন, যাতে নিজের জীবন ও পরিবার পরিচালনা করতে সক্ষম হন। এই সহায়তা তার স্বনির্ভরতা এবং সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ নিশ্চিত করবে।
এক নজরে – মোঃ জোবায়ের মিয়া
 নাম: মোঃ জোবায়ের মিয়া
 জন্মতারিখ: ২১ জানুয়ারি ২০০১
 জন্মস্থান: কক্সবাজার
 পেশা/পদবী: চাকুরিজীবী, ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেড
 স্থায়ী ঠিকানা: মাতারবাড়ি, থানা: মহেশখালি, ইউনিয়ন: ৬নং ওয়ার্ড, কক্সবাজার
 বর্তমান ঠিকানা: করিম ম্যানশন, মোহরা, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম
 পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪
 পিতার নাম ও অবস্থা: হাসান মিয়া (মৃত)
 মাতার নাম ও পেশা: দিলু আরা বেগম, গৃহিণী
 ভাইবোন: মোঃ জাহেদুল ইসলাম (১৭, দ্বাদশ শ্রেণি), সুমাইয়া আক্তার (২০, দশম শ্রেণি)
 যোগাযোগঃ০১৮৬৫৩৬৪১৩৬
 আহত হওয়ার তারিখ ও স্থান: ১৮ জুলাই ২০২৪, নতুন ব্রিজ, চট্টগ্রাম
 চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: প্রাথমিক চিকিৎসা শমসেরপাড়া মেডিকেলে, উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন; পুনর্বাসন ও স্থায়ী চাকরির সুযোগ প্রস্তাবিত

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍