মো: মনিরুজ্জামান
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বাগেরহাটের দশানী গ্রামের সন্তান মো: মনিরুজ্জামান। জন্ম ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৪, শেয়ার মার্কেট পেশায় স্বপ্নবান এক যুবক, যার লক্ষ্য ছিল আর্থিক স্বনির্ভরতা ও নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তোলা। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি আওয়ামী কর্মী ও পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। ভেঙে যায় পায়ের হাড়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্নায়ু, আর চলার সঙ্গী হয় একখানা লাঠি। দীর্ঘ চিকিৎসা ও আর্থিক সংকটে আজ তিনি পেশাহীন। তবু ভেতরের দৃঢ়তা এখনো নতুন শুরুর অপেক্ষায়। নিঃশব্দ সংগ্রামের এই মানুষটি প্রমাণ করে দিয়েছেন একটি গুলি শরীর ভাঙতে পারে, কিন্তু ন্যায়ের স্বপ্ন ভাঙতে পারে না।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
পায়ের হাড় ভাঙা এবং নার্ভে স্থায়ী ক্ষতের কারণে মনিরুজ্জামান এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না
মো: মনিরুজ্জামান
ক্রমিক: ০৫৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৮
জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
মো: মনিরুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৪ সালের ২২ ডিসেম্বর, বাগেরহাট সদর উপজেলার দশানী এলাকায়। পিতা রুস্তম আলী এবং মাতা মর্জিনা খাতুন উভয়েই বর্তমানে কর্মহীন ও বৃদ্ধ। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও মনিরুজ্জামান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন উচ্চাভিলাষী ও অধ্যবসায়ী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। বড় ভাই মো: মুক্তারুজ্জামান (বয়স ৪০) এবং ছোট ভাই মো: মহিনুরজ্জামান (বয়স ৩২) দু'জনেই সাধারণ মানুষ, যাদের জীবন সংগ্রামের গল্পও একেকটি অধ্যায়। পরিবারের প্রয়োজনেই ঢাকায় এসে মনিরুজ্জামান পেশাগত জীবন শুরু করেন।
পেশাগত জীবন ও স্বপ্ন
আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আগে মনিরুজ্জামান শেয়ার মার্কেট সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। বিনিয়োগ, স্টক বিশ্লেষণ, বাজার পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতা ছিল তার। এই পেশায় তিনি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ভবিষ্যতে নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তোলারও পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সে স্বপ্ন থেমে যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের এক বিকালে, যখন তিনি নিজ দেশের মানুষের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও হামলার শিকার
২০২৪ সালের ২০ জুলাই, শনিবার। বিকেল আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিট। মনিরুজ্জামান আছরের নামাজ আদায় করে নিজ এলাকা মানিকনগরের বিশ্বরোড অংশে (বাবু ডাক্তার গলি সংলগ্ন) ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। এটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান, যেখানে সাধারণ মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করছিল। কিন্তু আন্দোলন দমন করতে সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশ এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা। হঠাৎ করে তারা গুলি চালাতে শুরু করে। সবার দৃষ্টি যখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, তখন মনিরুজ্জামান পেছনে পড়ে যান। সেই সুযোগে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাকে টার্গেট করে গুলি চালায়।
আঘাত ও গুলির ক্ষয়ক্ষতি
পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ছোড়া ছররাগুলিতে মনিরুজ্জামানের বাম পা ক্ষতবিক্ষত হয়। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত আসে ডান পায়ে, যেখানে সরাসরি রাইফেলের গুলি লাগে এবং পায়ের হাড় ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। গুলির পরপরই তার শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণা ও আতঙ্কে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রথমে স্থানীয়দের সহায়তায় এবং পরে ছোট ভাইয়ের সহযোগিতায় তাকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসার দীর্ঘ লড়াই ও অপারেশন
মুগদা হাসপাতাল থেকে দ্রুত পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। সেই অপারেশনই তার জীবনের প্রথম বড় অস্ত্রোপচার। হাড় ভেঙে যাওয়ায় পায়ের গঠন ও চলাফেরার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। প্রথম ধাপের অপারেশনশেষে থিয়েটারে যেতে হয় বারবার, এখনো চলমান রয়েছে চিকিৎসা। নিয়মিত ঔষধ গ্রহণ, ফিজিওথেরাপি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও নতুন করে অপারেশনের প্রস্তাব সব মিলিয়ে চিকিৎসা প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
দৈনন্দিন চলাচলে সীমাবদ্ধতা ও লাঠির উপর নির্ভরতা
পায়ের হাড় ভাঙা ও নার্ভে স্থায়ী ক্ষতের কারণে মনিরুজ্জামান এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। প্রতিটি পা ফেলা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় এক ভয়াবহ বিকেলের সেই গুলির শব্দ। লাঠি ছাড়া তিনি এখন চলাফেরা করতে অক্ষম। ভবিষ্যতে পুনরায় অপারেশন দরকার হবে বলে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তার আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে এতো সীমিত যে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
চিকিৎসা ব্যয় ও আর্থিক সংকট
বর্তমানে পর্যন্ত প্রায় ৫ লক্ষ টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান। এর মধ্যে অপারেশন, ওষুধ, থিয়েটার, ফিজিওথেরাপি, হাসপাতাল ভর্তির খরচ, রক্ত, টেস্ট ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই ব্যয়ের অধিকাংশই পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ধার করে যোগাড় করতে হয়েছে। বর্তমানে তার কাছে প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, যেন দ্বিতীয় ধাপের অপারেশন এবং পূর্ণ পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়।
কর্মহীনতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আহতের আগে চাকরিতে নিয়োজিত থাকলেও বর্তমানে মনিরুজ্জামান পুরোপুরি বেকার। লাঠি নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া-আসাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে থেমে থাকতে চান না। শারীরিক অক্ষমতা থাকলেও মানসিকভাবে এখনও তিনি দৃঢ়। তিনি ব্যবসা শুরু করতে চান বিশেষ করে শেয়ার মার্কেট সম্পর্কিত ব্যবসা, যেখানে তিনি অভিজ্ঞ। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি চাইছেন স্বল্প পরিসরে কোনো সহায়তা, যেখান থেকে নতুন করে শুরু করতে পারেন।
মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
অসুস্থতা, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যন্ত করে তুলেছে। প্রতিবেশী, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে গেছে, কারণ সবাই মনে করে সে এখন একটি 'বোঝা'। অথচ এই মানুষটিই ছিল কখনো পরিবারের আশা। আজ সে সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ ও হতাশাগ্রস্ত। মনিরুজ্জামানের কথা বলার ভঙ্গিতেই ফুটে ওঠে গভীর বেদনা।
রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব
মনিরুজ্জামানের জীবন কেবল তার একার নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবাধিকারেরও আয়না। একজন নিরস্ত্র নাগরিক শুধুমাত্র ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে গুলিবিদ্ধ হলো, পঙ্গুত্ব বরণ করলো, আর আজ সহায়তা না পেয়ে ধুকে ধুকে মরছে। রাষ্ট্র কি তার পাশে দাঁড়াবে না? সমাজ কি তাকিয়ে থাকবে চুপচাপ?
এখনই সময় এই প্রতিবাদী মানুষটির পাশে দাঁড়াবার। চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই হবে মানবিক দায়িত্ব।
লেখক কথন
মো: মনিরুজ্জামান আজ শুধু একজন আহত ব্যক্তি নন, তিনি এক জীবন্ত দলিল, কীভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা একজন মানুষের জীবন ভেঙে দেয়। কিন্তু তার দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্ন তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে প্রেরণা দেয়। তার পাশে দাঁড়ালে কেবল একজন মানুষ নয়, সমাজের ন্যায় ও মানবতার পক্ষেই আমরা দাঁড়াবো। এখন প্রয়োজন সহযোগিতা, সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রস্তাবনা
১: পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তা ও দ্বিতীয় অপারেশনের সরকারি উদ্যোগ
২: আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে জরুরি পুনর্বাসন তহবিল গঠন
৩: ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য স্বল্প সুদে ঋণ বা অনুদান
৪: মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও সামাজিক পুনর্মিলন কর্মসূচি
৫: ক্ষতিগ্রস্ত আন্দোলনকারীদের জন্য সরকারি তালিকা ও পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়ন
এক নজরে মো: মনিরুজ্জামান
নাম: মো: মনিরুজ্জামান
জন্ম তারিখ: ২২-১২-১৯৮৪
পেশা: চাকরি (শেয়ার মার্কেটে), বর্তমানে বেকার
বাবা: রুস্তুম আলী, কর্মহীন বৃদ্ধ
মাতা: মর্জিনা খাতুন, কর্মহীন বৃদ্ধা : দশানী, বাগেরহাট সদর, বাগেরহাট
স্থায়ী ঠিকানা
বর্তমান ঠিকানা: ৯৯/ডি, মানিকনগর, মুগদা, ঢাকা
ভাইদের বিবরণ
১. মো. মুক্তারুজ্জামান, বয়স: ৪০ বছর
২. মো. মহিনুরজ্জামান, বয়স: ৩২ বছর
আহত হওয়ার স্থান: নিকনগর বিশ্বরোড (বাবু ডাক্তার গলি), মানিকনগর, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ২০ জুলাই ২০২৪, শনিবার, সময়: ৫.৩০ মিনিট বিকাল
আক্রমণকারী: মানিকনগর এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী ও যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
মো: মনিরুজ্জামান
ক্রমিক: ০৫৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৮
জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
মো: মনিরুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৪ সালের ২২ ডিসেম্বর, বাগেরহাট সদর উপজেলার দশানী এলাকায়। পিতা রুস্তম আলী এবং মাতা মর্জিনা খাতুন উভয়েই বর্তমানে কর্মহীন ও বৃদ্ধ। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও মনিরুজ্জামান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন উচ্চাভিলাষী ও অধ্যবসায়ী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। বড় ভাই মো: মুক্তারুজ্জামান (বয়স ৪০) এবং ছোট ভাই মো: মহিনুরজ্জামান (বয়স ৩২) দু'জনেই সাধারণ মানুষ, যাদের জীবন সংগ্রামের গল্পও একেকটি অধ্যায়। পরিবারের প্রয়োজনেই ঢাকায় এসে মনিরুজ্জামান পেশাগত জীবন শুরু করেন।
পেশাগত জীবন ও স্বপ্ন
আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আগে মনিরুজ্জামান শেয়ার মার্কেট সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। বিনিয়োগ, স্টক বিশ্লেষণ, বাজার পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতা ছিল তার। এই পেশায় তিনি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ভবিষ্যতে নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তোলারও পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সে স্বপ্ন থেমে যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের এক বিকালে, যখন তিনি নিজ দেশের মানুষের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও হামলার শিকার
২০২৪ সালের ২০ জুলাই, শনিবার। বিকেল আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিট। মনিরুজ্জামান আছরের নামাজ আদায় করে নিজ এলাকা মানিকনগরের বিশ্বরোড অংশে (বাবু ডাক্তার গলি সংলগ্ন) ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। এটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান, যেখানে সাধারণ মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করছিল। কিন্তু আন্দোলন দমন করতে সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশ এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা। হঠাৎ করে তারা গুলি চালাতে শুরু করে। সবার দৃষ্টি যখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, তখন মনিরুজ্জামান পেছনে পড়ে যান। সেই সুযোগে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাকে টার্গেট করে গুলি চালায়।
আঘাত ও গুলির ক্ষয়ক্ষতি
পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ছোড়া ছররাগুলিতে মনিরুজ্জামানের বাম পা ক্ষতবিক্ষত হয়। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত আসে ডান পায়ে, যেখানে সরাসরি রাইফেলের গুলি লাগে এবং পায়ের হাড় ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। গুলির পরপরই তার শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণা ও আতঙ্কে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রথমে স্থানীয়দের সহায়তায় এবং পরে ছোট ভাইয়ের সহযোগিতায় তাকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসার দীর্ঘ লড়াই ও অপারেশন
মুগদা হাসপাতাল থেকে দ্রুত পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। সেই অপারেশনই তার জীবনের প্রথম বড় অস্ত্রোপচার। হাড় ভেঙে যাওয়ায় পায়ের গঠন ও চলাফেরার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। প্রথম ধাপের অপারেশনশেষে থিয়েটারে যেতে হয় বারবার, এখনো চলমান রয়েছে চিকিৎসা। নিয়মিত ঔষধ গ্রহণ, ফিজিওথেরাপি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও নতুন করে অপারেশনের প্রস্তাব সব মিলিয়ে চিকিৎসা প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
দৈনন্দিন চলাচলে সীমাবদ্ধতা ও লাঠির উপর নির্ভরতা
পায়ের হাড় ভাঙা ও নার্ভে স্থায়ী ক্ষতের কারণে মনিরুজ্জামান এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। প্রতিটি পা ফেলা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় এক ভয়াবহ বিকেলের সেই গুলির শব্দ। লাঠি ছাড়া তিনি এখন চলাফেরা করতে অক্ষম। ভবিষ্যতে পুনরায় অপারেশন দরকার হবে বলে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তার আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে এতো সীমিত যে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
চিকিৎসা ব্যয় ও আর্থিক সংকট
বর্তমানে পর্যন্ত প্রায় ৫ লক্ষ টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান। এর মধ্যে অপারেশন, ওষুধ, থিয়েটার, ফিজিওথেরাপি, হাসপাতাল ভর্তির খরচ, রক্ত, টেস্ট ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই ব্যয়ের অধিকাংশই পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ধার করে যোগাড় করতে হয়েছে। বর্তমানে তার কাছে প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, যেন দ্বিতীয় ধাপের অপারেশন এবং পূর্ণ পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়।
কর্মহীনতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আহতের আগে চাকরিতে নিয়োজিত থাকলেও বর্তমানে মনিরুজ্জামান পুরোপুরি বেকার। লাঠি নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া-আসাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে থেমে থাকতে চান না। শারীরিক অক্ষমতা থাকলেও মানসিকভাবে এখনও তিনি দৃঢ়। তিনি ব্যবসা শুরু করতে চান বিশেষ করে শেয়ার মার্কেট সম্পর্কিত ব্যবসা, যেখানে তিনি অভিজ্ঞ। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি চাইছেন স্বল্প পরিসরে কোনো সহায়তা, যেখান থেকে নতুন করে শুরু করতে পারেন।
মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
অসুস্থতা, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যন্ত করে তুলেছে। প্রতিবেশী, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে গেছে, কারণ সবাই মনে করে সে এখন একটি 'বোঝা'। অথচ এই মানুষটিই ছিল কখনো পরিবারের আশা। আজ সে সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ ও হতাশাগ্রস্ত। মনিরুজ্জামানের কথা বলার ভঙ্গিতেই ফুটে ওঠে গভীর বেদনা।
রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব
মনিরুজ্জামানের জীবন কেবল তার একার নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবাধিকারেরও আয়না। একজন নিরস্ত্র নাগরিক শুধুমাত্র ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে গুলিবিদ্ধ হলো, পঙ্গুত্ব বরণ করলো, আর আজ সহায়তা না পেয়ে ধুকে ধুকে মরছে। রাষ্ট্র কি তার পাশে দাঁড়াবে না? সমাজ কি তাকিয়ে থাকবে চুপচাপ?
এখনই সময় এই প্রতিবাদী মানুষটির পাশে দাঁড়াবার। চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই হবে মানবিক দায়িত্ব।
লেখক কথন
মো: মনিরুজ্জামান আজ শুধু একজন আহত ব্যক্তি নন, তিনি এক জীবন্ত দলিল, কীভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা একজন মানুষের জীবন ভেঙে দেয়। কিন্তু তার দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্ন তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে প্রেরণা দেয়। তার পাশে দাঁড়ালে কেবল একজন মানুষ নয়, সমাজের ন্যায় ও মানবতার পক্ষেই আমরা দাঁড়াবো। এখন প্রয়োজন সহযোগিতা, সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রস্তাবনা
১: পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তা ও দ্বিতীয় অপারেশনের সরকারি উদ্যোগ
২: আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে জরুরি পুনর্বাসন তহবিল গঠন
৩: ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য স্বল্প সুদে ঋণ বা অনুদান
৪: মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও সামাজিক পুনর্মিলন কর্মসূচি
৫: ক্ষতিগ্রস্ত আন্দোলনকারীদের জন্য সরকারি তালিকা ও পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়ন
এক নজরে মো: মনিরুজ্জামান
নাম: মো: মনিরুজ্জামান
জন্ম তারিখ: ২২-১২-১৯৮৪
পেশা: চাকরি (শেয়ার মার্কেটে), বর্তমানে বেকার
বাবা: রুস্তুম আলী, কর্মহীন বৃদ্ধ
মাতা: মর্জিনা খাতুন, কর্মহীন বৃদ্ধা : দশানী, বাগেরহাট সদর, বাগেরহাট
স্থায়ী ঠিকানা
বর্তমান ঠিকানা: ৯৯/ডি, মানিকনগর, মুগদা, ঢাকা
ভাইদের বিবরণ
১. মো. মুক্তারুজ্জামান, বয়স: ৪০ বছর
২. মো. মহিনুরজ্জামান, বয়স: ৩২ বছর
আহত হওয়ার স্থান: নিকনগর বিশ্বরোড (বাবু ডাক্তার গলি), মানিকনগর, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ২০ জুলাই ২০২৪, শনিবার, সময়: ৫.৩০ মিনিট বিকাল
আক্রমণকারী: মানিকনগর এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী ও যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍