হোম / আহতদের তালিকা / আব্দু রব রনি
আব্দু রব রনি

আব্দু রব রনি

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ড্রাইভার, সি, এন, জি ড্রাইভার

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

রক্তাক্ত প্রতিবাদের প্রতীক আব্দু রব রনিঃ
আব্দু রব রনি একজন সাহসী সাধারণ মানুষ, যিনি ৬ জুন ১৯৮৫ সালে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার দাইবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান। তার বাবা আব্দুল কাশেম (মৃত) ছিলেন কৃষক, আর মা মোছাঃ ছকিনা বেগম গৃহিণী। সীমিত আয় ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও মা-বাবা পরিবারের সকলের জীবিকা চালিয়ে আসেন। আব্দু রবের পরিবারে মোট পাঁচজন। তার দুই সন্তান–রবিন (১৪) ও জুবাইর (১১) শিক্ষার্থী।
ছোটবেলা থেকেই আব্দু রব পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও ন্যায়ের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত ছিলেন সি, এন, জি প্রতিষ্ঠানে। সহজ সরল জীবনধারা, সততা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বপরায়ণতার জন্য তিনি পরিচিত।
৪ আগস্ট ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আব্দু রব সাধারণ মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। নিরস্ত্র অবস্থায় রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তার সাহসিকতার প্রতীক। পরিবার, সমাজ ও নিজের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে তিনি ন্যায়ের লড়াইয়ে অবদান রেখেছেন।
আব্দু রব রনির পরিচিতি শুধু একজন ড্রাইভার বা গ্রামীণ মানুষ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও স্বৈরাচারী অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ: আব্দু রব রনির দৃঢ় প্রতিবাদঃ
আব্দু রব রনি—নিরস্ত্র হলেও সাহসী একজন সাধারণ মানুষ। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, সকাল ১০ টার দিকে, তিনি তাঁর এলাকায় হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বৈরাতান্ত্রিক শাসন, দুর্নীতি বাকস্বাধীনতা হরনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য আন্দোলনে যোগ দেন। তার সাথে ছিলেন কিছু গ্রামের বন্ধু ও পরিচিতজন। ফেনীর সেনবাগ ও নিকটবর্তী এলাকায় আন্দোলনের ডাক ছড়িয়ে পড়ে, এবং মানুষগুলো ধীরে ধীরে মহিপাল জিরো পয়েন্ট ফ্লাইওভারের দিকে সমবেত হতে শুরু করে।
আব্দু রব সেই ভিড়ের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, শুধু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার উদ্দ্যেশ্যে। তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কেবল তাঁর মনোবল, স্লোগান ও হাসিনাকে বিদায় করার জন্য দৃঢ় সংকল্প। মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন, কিভাবে সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলছে। তিনি জানতেন যে এই আন্দোলন শুধুই রাজনৈতিক নয়, এটি ছিল মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য লড়াই।
যোহরের নামাজের পর, আব্দু রব লক্ষ্য করেন সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা শশ্বন মিয়াজীর নির্দেশে আন্দোলন থামাতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সহিংসতা ছড়ানো হচ্ছে। তবুও, তিনি ভয়ে পশ্চাদপদ হননি। তিনি নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষদের পাশে দাঁড়ান, তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। আব্দু রব ফ্লাইওভারের উপরে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। ইট-পাটকেল হাতে তুলে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি চেষ্টা করেন মিছিলকে শান্তিপূর্ণ রাখার।
এই অংশগ্রহণ শুধু একটি উপস্থিতি ছিল না; এটি ছিল একটি সাহসী প্রতিবাদ। নিরস্ত্র মানুষদের সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার দেখানোর একটি নিদর্শন। কিন্তু ঘাতক আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্রলীগ তা সহ্য করতে পারে নি। হঠাৎ করেই গুলি চালানো শুরু হয়। আব্দু রব ও তার সহযোদ্ধারা তখনই লক্ষ্য হন গুলির মধ্য দিয়ে নিরস্ত্রদের ওপর নৃশংস হামলার।
অবশেষে, এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্যই আব্দু রব গুলিবিদ্ধ হন। গলায় বাম পাশে ও ডান হাতে বুলেট বিদ্ধ হয়। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান, কিন্তু তাঁর সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার এই ঘটনার মধ্যেও স্পষ্ট ছিল। এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা ত্যাগ করেও মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে
চিকিৎসা:
আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়া আব্দুর রব রনিকে প্রথমে স্থানীয় ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়, রক্তবাহিত ক্ষত বাঁধা হয় এবং মেডিসিন সেবন করানো হয়। অবস্থার গুরুতর হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ডাক্তারেরা তার মাথা ও হাতের আঘাত পরীক্ষা করে অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন। অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবে শরীর এখনও সম্পূর্ণ পুনর্বাসিত হয়নি। চিকিৎসা চলমান থাকায় নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং ফলো-আপ প্রয়োজন। চিকিৎসার মাধ্যমে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়, কিন্তু আঘাতের ক্ষত এখনও পূর্ণরূপে সেরে ওঠেনি।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ–ছাত্রলীগের নৃশংসতা ও আন্দোলনে অংশগ্রহণ: একটি স্বপ্ন, একটি সংগ্রাম, একটি রক্তাক্ত বিকেল
আব্দু রব রনি—একজন সাধারণ গ্রামীণ পরিবারে জন্ম নেওয়া শ্রমজীবী মানুষ। ছোটবেলা থেকেই তিনি সচেতন ছিলেন সমাজের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, বিকেল ১২টার সময়, ফেনীর সার্কেট হাউস রোডে গণতন্ত্র ফেরত আনার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যোগ দেন। হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কেবল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের শক্তি ও ন্যায়ের স্লোগান।
কিন্তু স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর ছাত্রলীগ–যুবলীগ সেই শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ সহ্য করতে পারেনি। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে তারা আক্রমণ চালিয়ে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণ করে। আব্দু রব রনিও তখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। তার গলায়, হাতে এবং পায়ে গুলি লেগে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আশেপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটে চলে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, গত ১৬ বছর ধরে বর্বর আওয়ামী লীগ–ছাত্রলীগ কেবল ক্ষমতা ধরে রাখতে নৃশংসতা চালাচ্ছে, নিরস্ত্র মানুষের জীবন বিপন্ন করছে।
যদিও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, আব্দু রবের মনোবল অটুট। তার স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে—ন্যায়ের লড়াই থামানো যায় না, আর স্বৈরাচারের ভয়বোধ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমাতে পারবে না। রক্তাক্ত বিকেলটি শুধু তার জন্য নয়, এটি গোটা জাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।
পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাঃ
পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আব্দু রব রনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হতে চাইছেন। বর্তমানে তার পরিবার টিনের একটি ঘরে বসবাস করছে, যা আবহাওয়া ও নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই তিনি একটি শক্তিশালী, টেকসই ঘরের প্রত্যাশা করছেন, যা পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং তার সন্তানদের পড়াশোনা ও মানসম্মত জীবনযাপন সহজ করবে। চিকিৎসার পরিপূর্ণতা ও স্থায়ী বাসস্থানের মাধ্যমে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে এবং তার দক্ষতা ও প্রতিভা সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান।
একনজরেঃ
 নাম: আব্দু রব রনি
 জন্ম: ০৬ জুন ১৯৮৫, সেনবাগ, নোয়াখালী
 পেশা: ড্রাইভার, সি, এন, জি ড্রাইভার
 ঘটনা: ৪ আগস্ট ২০২৪, সার্কেট হাউস রোড, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ–ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলায় গুলিবিদ্ধ
 আঘাত: গলা ও হাত
 চিকিৎসা: ফেনী সদর হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
 পুনর্বাসন: উন্নত চিকিৎসা, স্থায়ী ঘর, পুনঃচাকুরি
 পরিবার: ৫ সদস্য, সীমিত আয়

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍