হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ নাজমুল হাসান
মোঃ নাজমুল হাসান

মোঃ নাজমুল হাসান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : চাকুরিজীবি
প্রতিষ্ঠান : মডারেটর, নেট ষ্টার গ্রুপ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
‎
‎১৯৯৮ সালের ১৭ই অক্টোবর। চাঁদপুর জেলার মতলব থানার ৬নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত ঢাকিরগাঁও গ্রামে জন্ম নেয় এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান মোঃ নাজমুল হাসান। বাবা মোঃ সুজাত খান ছিলেন একজন কৃষক, মাটি চাষ করে সংসার চালাতেন। মায়ের নাম মোছাঃ নাজমা বেগম, তিনি ছিলেন গৃহিণী। নাজমুলের জন্মের সময় পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেনএকদিন পড়াশোনা করে যেন ভালো কিছু হয়, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। ‎শৈশব থেকেই নাজমুল ছিল শান্ত-ভদ্র এবং পরিশ্রমী। গ্রামের মাটির মাঠে খেলা, ধানক্ষেতে দৌড়ঝাঁপ, পুকুরে সাঁতারএসবের মাঝেই তার বেড়ে ওঠা। বাবা যদিও কৃষক ছিলেন, তবে চাইতেন ছেলেকে তিনি যেন কৃষকের কষ্টের জীবন থেকে মুক্ত করতে পারেন। মা নাজমুলকে প্রতিদিন পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন, খাবার খাওয়ার পর পাশে বসে দেখতেন পড়া হচ্ছে কি না।
‎গ্রামের স্কুলেই শুরু হয় তার শিক্ষাজীবন। দারিদ্র্যের কারণে বইপত্র ও জামাকাপড়ের অভাব ছিল চিরকালীন সঙ্গী, তবুও পড়াশোনায় তিনি পিছিয়ে যাননি। ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল ছিল নাজমুল। ভাইবোনদের দেখাশোনা, বাড়ির কাজে মাকে সাহায্য করাএসব কাজ নিয়মিত করত। বড় ভাই নাসির খান চাকরিজীবী হয়ে সংসারে কিছুটা সহায়তা করলেও পরিবারের প্রধান ভরসা ছিল কৃষির আয়। ‎যৌবনে পৌঁছে নাজমুল বুঝতে শিখল, জীবন কেবল নিজের জন্য নয়; পরিবার, সমাজ এবং দেশের জন্যও কিছু করা জরুরি। ধীরে ধীরে সে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। ঢাকায় গিয়ে যোগ দেয় নেট ষ্টার গ্রুপে, মডারেটর পদে। পরিবারের জন্য একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে সে।
‎‎
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
‎‎২০২৪ সাল। পুরো দেশ উত্তাল কোটা সংস্কার আন্দোলনে। শিক্ষার্থীরা ন্যায্য অধিকার ও সমঅধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সাধারণ চাকুরিজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করে।
‎নাজমুল তখন ঢাকায় চাকরি করছে। প্রতিদিন খবরের কাগজে, টেলিভিশনে ও সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের খণ্ডচিত্র দেখতে দেখতে তার মনে জেগে ওঠে তীব্র এক দায়িত্ববোধ। সে ভাবতে শুরু করে—“আমি যদি ন্যায়ের পক্ষে না দাঁড়াই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব?”‎চাকরিজীবী হলেও নাজমুল আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়। সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে, পরিচিতদের উদ্বুদ্ধ করে। উত্তরা, আজমপুর, এয়ারপোর্ট এলাকায় যেসব কর্মসূচি হতো, সেখানে নিয়মিত উপস্থিত থাকত সে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিত, মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাত।
‎নাজমুল বিশ্বাস করত এই আন্দোলন শুধু ছাত্রদের নয়, বরং পুরো জাতির আন্দোলন। অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদে তার নিজের উপস্থিতিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
‎
‎আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
‎‎৫ই আগস্ট ২০২৪, বিকেল ৫টা। উত্তরা আজমপুর থেকে বিজয় মিছিল শুরু হয় গণভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য। মিছিলের ভেতর ছিলেন নাজমুলও। চারপাশে তরুণ যুবকের ভিড়, হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে স্লোগান,স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের। ‎কিন্তু অচিরেই পরিস্থিতি বদলে যায়। এয়ারপোর্ট সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ করেই এপিবিএন পুলিশের একটি দল এসে মিছিলে হামলা চালায়। লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস, গুলির শব্দে মুহূর্তেই এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ‎সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই নাজমুলকে লক্ষ্য করে একাধিক পুলিশ আঘাত করে। লাঠির আঘাতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আতঙ্কিত মানুষ ছুটোছুটি করতে থাকে, কেউ সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে, কেউ আবার আহতদের টেনে সরে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন মানুষ এগিয়ে এসে নাজমুলকে মিছিল থেকে সরিয়ে আনে। প্রাথমিকভাবে আহত স্থান চেপে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তখনই সিদ্ধান্ত হয় তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। এই ঘটনার পর নাজমুল কিছুদিন আত্মগোপনে থাকেন। কিন্তু আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে পরবর্তীতে পরিবারের মাধ্যমে তাকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
‎
‎চিকিৎসা ও সংগ্রাম
‎চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকরা তার ক্ষতস্থানে সেলাই দেন। বেশ কিছুদিন তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চিকিৎসকরা জানান, নিয়মিত চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদী চেকআপ ছাড়া পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা কঠিন হবে। ‎নাজমুলের শরীর এখনো আগের মতো শক্তিশালী হয়নি। মাঝে মাঝে ব্যথা অনুভূত হয়, হাঁটা-চলায় কষ্ট হয়। এই অবস্থায় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারও আর্থিক সংকটে পড়ে গেছে। ‎মা প্রতিদিন তার পাশে বসে থাকেন, ছেলের কষ্ট দেখে অশ্রু ঝরান। বাবা কৃষিকাজ করে সামান্য আয় করছেন, কিন্তু চিকিৎসার খরচ মেটাতে তা যথেষ্ট নয়। বড় ভাই নাসির খান সাহায্য করার চেষ্টা করেন, তবুও ব্যয়ভার অনেক বেশি হয়ে যায়। ‎চিকিৎসকরা বলছেন—নাজমুলকে নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ ও বিশ্রামে থাকতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু নাজমুলের আশা একটাই কোনোভাবে সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। সমাজে সবার পাশে দাঁড়াবে। আহত হলেও তার মনোবল ভাঙেনি। বরং সংগ্রামী চেতনায় আরও দৃঢ় হয়েছে।
তথ্য কণিকা
নাম : মোঃ নাজমুল হাসান
জন্ম তারিখ : ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮
জন্মস্থান : ঢাকিরগাঁও
পেশা : চাকুরিজীবি
প্রতিষ্ঠান : মডারেটর, নেট ষ্টার গ্রুপ
নিজ জেলা : চাঁদপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা :
গ্রাম: ঢাকিরগাঁও
ইউনিয়ন : ৬নং ওয়ার্ড
থানা : মতলব
জেলা : চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানা :
বাসা: ২৯/১৬
এলাকা : সেক্টর ১১, উত্তরা পশ্চিম
থানা : উত্তরা পশ্চিম
জেলা : ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মোঃ সুজাত খান
মায়ের নাম : মোছাঃ নাজমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, বয়স ৫৩
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
মাসিক আয় : কৃষিকাজ থেকে প্রাপ্ত আয়
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
ভাইবোন/সন্তানদের বিবরণ :
১. মোঃ নাসির খান, বয়স ৩০, চাকুরিজীবী, সম্পর্ক: বড় ভাই
২. মোঃ ইত্রাত, বয়স ২, ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার তথ্য
ঘটনার স্থান : উত্তরা আজমপুর ও এয়ারপোর্ট, ঢাকা
আহত হওয়ার সময়কাল : বিকাল ৫টা, ৫ই আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : এপিবিএন পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍