হোম / আহতদের তালিকা / মো: আবুল বশার
মো: আবুল বশার

মো: আবুল বশার

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মো. আবুল বশার পটুয়াখালীর বাউফলের ধানদী গ্রামের এক সাধারণ অথচ দৃঢ়চেতা মানুষ। যার জীবনের ভিত্তি শ্রম, সততা ও পরিবারের প্রতি অটল নিবেদন। ঢাকায় কর্মজীবনে স্থির হলেও গ্রামের মাটির টান ও মানবিকতা তাকে সবসময় পথ দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে সংহতি জানাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া বদলে দেয় তার জীবনের ছন্দ। তবু ভেঙে যায়নি তার এই বিশ্বাস ন্যায়ের প্রতি মানুষের অঙ্গীকার একদিন জয়ী হবে। আজও তিনি সংগ্রামের মাঝেই নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বুকে লালন করেন, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য অবিচল আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: আবুল বশার
ক্রমিক: ০৬০
আইডি: ঢাকা সিটি ০৬০
জন্ম পরিচয় ও জীবনের প্রেক্ষাপট
মো: আবুল বশার এক নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী মানুষ, যিনি জীবনের প্রতিটি বাঁকে পরিবারের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ধানদী গ্রামে একটি নিভৃত গ্রামীণ জনপদে, যেখানে মানুষ এখনও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। শৈশব থেকেই গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও মানবিকতা তাকে গড়ে তোলে এক নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে। বর্তমানে তিনি ঢাকায় বসবাস করলেও গ্রামের মাটির টান, সংস্কৃতি ও জীবনবোধ আজও তার অন্তরে গভীরভাবে গাঁথা।
বাশার একজন সাধারণ চাকরিজীবী হিসেবে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে চলছিলেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক শান্তিপূর্ণ সংসার। সীমিত আয়ে হলেও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কঠোর পরিশ্রম আর সততা দিয়ে জীবনের সব বাধা জয় করা সম্ভব। কিন্তু ভাগ্য যেন এক নির্মম মোড়ে এসে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক আন্দোলনের সময় তিনি বুকে গুলিবিদ্ধ হন, যা তার জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়। জীবনের যে ছন্দ তিনি পরিবারকে দিতে চেয়েছিলেন তা হঠাৎ থেমে যায় এক নিষ্ঠুর মুহূর্তে।
পারিবারিক অবস্থা ও সংকট
বর্তমানে আবুল বাশারের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তার পরিবারে মোট ১০ জন সদস্য রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন বার্ধক্যজনিত কারনে অসুস্থ তার মা সকিনা বেগম এবং বাবা জব্বার হাওলাদার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই দু'জনের পক্ষে এখন দৈনন্দিন কোনো কাজ করাও সম্ভব নয়। নিজেরাই নিজের শরীরের ভার নিতে পারেন না, সেখানে পরিবারের উপার্জনের দায়িত্ব নেওয়া তো অসম্ভব।
এই বৃহৎ পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন আবুল বাশার। বর্তমানে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসার পরিকাঠামোর মধ্যে অস্থির সময় পার করছেন। তার মাসিক আয় মাত্র ১২,০০০ টাকা, যা দিয়ে পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিশুদের শিক্ষা, ভাড়া ও দৈনন্দিন অন্যান্য খরচ নির্বাহ করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।
এই পরিবারটির প্রতিটি সদস্য বাশারের ওপর নির্ভরশীল, আর তিনি নিজেই আজ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটি এক অসহায় বাস্তবতার মুখোমুখি। আবুল বাশারের এই জীবন সংগ্রাম নিছক ব্যক্তিগত নয়, বরং সমাজের সে সব মানুষদের প্রতিচ্ছবি যারা প্রতিকূলতার মাঝেও ন্যায় ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়। এখন তার পরিবার ও জীবনের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে দেশের শিক্ষার্থীরা কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে আসে। দেশজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মানব বন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, সেমিনার ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরে। শিক্ষার্থীরা বারবার শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, যাতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং একটি ন্যায্য, সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়
কিন্তু এই অহিংস ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জবাবে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়ানক দমনমূলক। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের লক্ষ্য করে ছোড়া হতে থাকে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও কখনো কখনো তাজা গুলিও। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর, আটক এবং এমনকি সরাসরি হামলা চালানো হয়। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, আন্দোলনকারীরা আত্মরক্ষায় বাধ্য হয়, ফলে আন্দোলন কিছু কিছু এলাকায় সহিংসতায় রূপ নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে, ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় যখন স্বৈরাচারবিরোধী গণ আন্দোলন চলছিল, তখন তাতে অংশগ্রহণ করেন আবুল বাশার নামের এক সাধারণ নাগরিক। তিনি ছিলেন ছাত্রদের দাবির প্রতি সংহতিশীল এবং গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। কিন্তু সে দিনই ঘটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। কার গুলিতে তিনি আহত হন, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব না হলেও এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে দমন করার নগ্ন রাষ্ট্রীয় প্রয়াস।
এই ঘটনা শুধু আবুল বাশারের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয় বরং রাষ্ট্রীয় দমননীতির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল জনগণের কন্ঠস্বর শোনা, তাদের সঙ্গে সংলাপে বসা। কিন্তু তারা সন্ত্রাসী কায়দায় নিরস্ত্র ছাত্র ও সাধারণ জনগণের ওপরে দমন-পীড়নের স্টিমরোলার চালায়। গুলিবিদ্ধ আবুল বাশারের মতো আরও অনেক নিরীহ মানুষ এই দমননীতির বলি হয়েছেন।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মো: আবুল বশারকে দ্রুত একজন এমবিবিএস ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা হয় এবং কিছু মৌলিক ওষুধ চালু রাখা হয় যাতে সংক্রমণ রোধ হয় ও যন্ত্রণা কমানো যায়। শুরুতে চিকিৎসা কার্যক্রম কিছুটা নিয়মিত থাকলেও আর্থিক অসচ্ছলতা এবং আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে তার চিকিৎসা কার্যত বন্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে নিজের সঞ্চয় ও বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-দেনা করে সংগ্রহ করতে হয়েছে।
চিকিৎসকের মতে, বর্তমানে তার শরীরে বড় কোনো অপারেশনের প্রয়োজন নেই, তবে গুলির প্রভাব ও চিকিৎসা অসমাপ্ত থাকায় দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক আঘাতের লক্ষণ স্পষ্ট। ভবিষ্যতে শারীরিক পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হতে পারে, যা যথাযথ মনোযোগ ও চিকিৎসাসেবা ছাড়া সম্ভব নয়।
কর্মসংস্থান ও আগ্রহ
গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে আবুল বাশার একজন পরিশ্রমী কর্মজীবী ছিলেন, যিনি পরিবারকে সামর্থ্য অনুযায়ী ভালোভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে শারীরিক দুর্বলতা, অবসাদ ও মানসিক চাপের কারণে তিনি কোনো কাজ করতে পারছেন না। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে, চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠলে আবারও কর্মজীবনে ফিরবেন এবং পরিবারকে আগের মতোই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিতে পারবেন। কাজের প্রতি তার আগ্রহ ও নিষ্ঠা আজও অটুট। উপযুক্ত চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে তিনি আবারো স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে চান।
পরিশেষে, মো: আবুল বশার একজন নিরীহ, পরিশ্রমী মানুষ,
যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সংকটে পড়েছেন। আর্থিক সহায়তা ও সহমর্মিতা পেলে হয়তো তিনি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তার এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সমাজের সবার দায়িত্ব তার পাশে দাড়ানো।
প্রস্তাবনা
১. আর্থিক সহায়তা প্রদান করলে উপকৃত হবে।
২. ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ বহন করা।
আবুল বাশারের মতে, "আমার পরিবার এখন শুধুই আমার অসহায়তার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু সহযোগিতা পেলে হয়তো আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবো।"

এক নজরে মো: আবুল বশার
নাম: মো: আবুল বশার
জন্ম তারিখ: ০১-০১-১৯৮৯
বর্তমান ঠিকানা: বাগিচা মসজিদ, মীর হাজিরবাগ, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ধানদী, থানা: বাউফল, জেলা: পটুয়াখালী
পারিবারিক তথ্য
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬ জন।
পিতা : জব্বার হাওলাদার, বয়স: ৬৬
মাতা: সকিনা বেগম, বয়স: ৬১
ছেলে: মোহাম্মদ বাইজিদ, বয়স: ১১ বছর
মেয়ে: সুমাইয়া আক্তার, বয়স: ৫ বছর
আহত হওয়ার সময়: ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আহত হওয়ার স্থান: শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍