মোঃ আশরাফুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা: শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠানের নাম:মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠানের নাম:মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম পরিচয়
মোঃ আশরাফুল ইসলাম একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ, যিনি ১০ই অক্টোবর, ২০০২ সালে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ বালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান ১২নং চান্দ্র ইউনিয়নের অন্তর্গত, যা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি জনপদ।
আশরাফুলের পিতা আব্দুল মোতালেব একজন পরিশ্রমী কৃষক, যিনি সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করে পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মাতা, পারুল বেগম, দুঃখজনকভাবে প্রয়াত হয়েছেন, তবে তাঁর স্মৃতি আশরাফুলের জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। পারিবারিক জীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল ও মেধাবী সন্তান হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে মোঃ আশরাফুল ইসলাম মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়নরত। তিনি উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলতে এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর অধ্যয়ন ও চিন্তাধারায় আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবকল্যাণের প্রতি গভীর আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।
বর্তমানে তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলার ফরাজী বাড়িতে বসবাস করছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা দক্ষিণ বালিয়া, ১২নং চান্দ্র ইউনিয়ন, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। এই দুই ঠিকানার মধ্যে তিনি শিক্ষাজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছেন।
আশরাফুল ইসলাম একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি জ্ঞান, সততা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর জীবনযাত্রা, শিক্ষা ও পারিবারিক পটভূমি তাঁকে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করেছে, যার উপর দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের জন্য এক নতুন মোড় এনে দেয়। সেদিন বিকেলে সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, “মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নাতি–নাতনিরা মেধাবী নয়, বরং রাজাকারের নাতি–পুতিরাই মেধাবী।” প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য ছাত্রসমাজকে তীব্রভাবে নাড়া দেয় এবং আন্দোলনকারীদের ন্যায্য দাবি অবমূল্যায়ন করে তাঁদের ‘রাজাকার’-এর সঙ্গে তুলনা করার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই মন্তব্যের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রাতের বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান তোলে—“তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার” এবং “কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছিলো উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে শান্ত করা, কিন্তু উল্টো তাঁর এই মন্তব্য আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
ঢাকার মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে ন্যায্য কোটার সংস্কারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। আমি নিজেও আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলাম। মধ্যরাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকাবাহার এলাকায় স্লোগান দেওয়ার সময় হঠাৎ করে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী আমাদের উপর হামলা চালায়। শুধু কণ্ঠ মিলিয়ে প্রতিবাদের স্লোগান দেওয়া ছিল আমার অপরাধ। সন্ত্রাসীরা আমার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে আমি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই। মাথা ও পায়ে ধারাবাহিকভাবে আঘাত করতে থাকে তারা। লাঠি ও রড দিয়ে আঘাত করার ফলে আমার জয়েন্ট ও লিগামেন্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তক্ষরণ না হলেও প্রচণ্ড ব্যথায় আমি তখন প্রায় অচেতন হয়ে পড়ি। পায়ের জোড়াগুলো নড়ে গেলে ব্যথার তীব্রতা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
১৪ জুলাই রাতের এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়, কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবিতে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তাদের প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে রক্ত, ব্যথা ও ত্যাগ দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছিল। আমি সেদিন শুধু একজন আহত আন্দোলনকারীই নই, বরং প্রমাণ হয়েছি এই সত্যের যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে ক্ষমতাসীন শক্তির আঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবুও প্রতিবাদের স্লোগান কণ্ঠে ধরে রাখা, মিছিলের ভিড়ে অংশ নেওয়া এবং মাথা ও পায়ের ব্যথা উপেক্ষা করে ন্যায়বিচারের লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছিল আমাদের অঙ্গীকার।
রই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চাঁদপুরে আবারও সহিংসতা সংঘটিত হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের আগ মুহূর্তে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে চাঁদপুরে আমাকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ছেলে সন্ত্রাসী রনি নেতৃত্ব দেয় এই আক্রমণের। সেদিন হঠাৎ করেই আমাকে লক্ষ্য করে রড দিয়ে মাথার ডান পাশে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আমি মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, আর শরীর ভরে যায় তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণায়।
চিকিৎসা
প্রথম আক্রমণের শিকার হওয়ার পর আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং মাথা ও পায়ের ব্যথা কমানোর জন্য এন্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করতে হয়। জয়েন্ট ও লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় চলাফেরায় প্রচণ্ড কষ্ট হতো, ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রাম নিতে হয়। তবে শারীরিক ব্যথা সত্ত্বেও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থেমে যায়নি। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট চাঁদপুরে দ্বিতীয়বার আক্রমণের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হলে পুনরায় চিকিৎসা নিতে হয়। মাথার ডান পাশে রডের আঘাতে রক্তক্ষরণ হওয়ায় আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। চিকিৎসকরা নিয়মিত ওষুধ সেবন ও বিশ্রামের নির্দেশ দেন। ধারাবাহিক এই আঘাত ও চিকিৎসা-প্রক্রিয়া আমার শরীরে স্থায়ী ব্যথা ও দুর্বলতা সৃষ্টি করলেও আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাস ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি আরও দৃঢ় করেছে।
কর্মসংস্থান প্রস্তাবনা
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ধারাবাহিকভাবে হামলার শিকার হয়ে গুরুতরভাবে আহত হওয়া একজন তরুণ শিক্ষার্থী বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। প্রথম আক্রমণের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে হয়, যেখানে জয়েন্ট ও লিগামেন্টের ক্ষতির কারণে চলাফেরায় জটিলতা দেখা দেয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট চাঁদপুরে দ্বিতীয় দফায় পরিকল্পিত হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হন এবং সেলাইয়ের মাধ্যমে জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এ ধরনের পুনঃপুন শারীরিক আঘাতের ফলে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে এবং চিকিৎসার খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাজীবনে নিয়মিতভাবে অধ্যয়ন ও ন্যায়ের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে আর্থিক অনটনের কারণে কর্মসংস্থান একটি জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করলে তিনি নিজের জীবন-জীবিকা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবেন এবং পরিবারের আর্থিক দায়ভারও বহন করতে পারবেন। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা ও যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে যে আঘাত ও সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও সুরক্ষিত চাকরির ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু নিজেকে পুনর্গঠিত করতে পারবেন না, বরং সমাজের জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন।
একনজরে:
নাম: মোঃ আশরাফুল ইসলাম
জন্মতারিখ: ১০/১০/২০০২
জন্মস্থান:চাঁদপুর
পেশা: শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠানের নাম:মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
স্থায়ী ঠিকানা: দক্ষিণ বালিয়া,১২নং চান্দ্র,চাঁদপুর সদর,চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানাঃ ফরাজী বাড়ি, চাঁদপুর সদর,চাঁদপুর
পিতাঃ আব্দুল মোতালেব (কৃষক)
মাতা:মৃত পারুল বেগম
যোগাযোগঃ ০১৭৭৩৪০৮৭০৭
আয়: ১২,০০০ টাকা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:২
ভাই:মাহমুদুল হাসান, শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি
ঘটনার স্থানঃ জিরো পয়েন্ট,চবি এবং চাঁদপুর
আক্রমণকারীঃ চবিতে শাহরিয়ার, চাঁদপুরে রনি
আহত হওয়ার সময়ঃ ১৪ জুলাই ও ৫ আগস্ট ২০২৪
মোঃ আশরাফুল ইসলাম একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ, যিনি ১০ই অক্টোবর, ২০০২ সালে বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ বালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান ১২নং চান্দ্র ইউনিয়নের অন্তর্গত, যা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি জনপদ।
আশরাফুলের পিতা আব্দুল মোতালেব একজন পরিশ্রমী কৃষক, যিনি সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করে পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মাতা, পারুল বেগম, দুঃখজনকভাবে প্রয়াত হয়েছেন, তবে তাঁর স্মৃতি আশরাফুলের জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। পারিবারিক জীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল ও মেধাবী সন্তান হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে মোঃ আশরাফুল ইসলাম মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়নরত। তিনি উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলতে এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর অধ্যয়ন ও চিন্তাধারায় আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবকল্যাণের প্রতি গভীর আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।
বর্তমানে তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলার ফরাজী বাড়িতে বসবাস করছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা দক্ষিণ বালিয়া, ১২নং চান্দ্র ইউনিয়ন, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। এই দুই ঠিকানার মধ্যে তিনি শিক্ষাজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছেন।
আশরাফুল ইসলাম একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি জ্ঞান, সততা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর জীবনযাত্রা, শিক্ষা ও পারিবারিক পটভূমি তাঁকে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করেছে, যার উপর দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের জন্য এক নতুন মোড় এনে দেয়। সেদিন বিকেলে সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, “মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নাতি–নাতনিরা মেধাবী নয়, বরং রাজাকারের নাতি–পুতিরাই মেধাবী।” প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য ছাত্রসমাজকে তীব্রভাবে নাড়া দেয় এবং আন্দোলনকারীদের ন্যায্য দাবি অবমূল্যায়ন করে তাঁদের ‘রাজাকার’-এর সঙ্গে তুলনা করার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই মন্তব্যের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রাতের বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান তোলে—“তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার” এবং “কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছিলো উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে শান্ত করা, কিন্তু উল্টো তাঁর এই মন্তব্য আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
ঢাকার মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে ন্যায্য কোটার সংস্কারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। আমি নিজেও আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলাম। মধ্যরাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকাবাহার এলাকায় স্লোগান দেওয়ার সময় হঠাৎ করে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী আমাদের উপর হামলা চালায়। শুধু কণ্ঠ মিলিয়ে প্রতিবাদের স্লোগান দেওয়া ছিল আমার অপরাধ। সন্ত্রাসীরা আমার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে আমি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই। মাথা ও পায়ে ধারাবাহিকভাবে আঘাত করতে থাকে তারা। লাঠি ও রড দিয়ে আঘাত করার ফলে আমার জয়েন্ট ও লিগামেন্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তক্ষরণ না হলেও প্রচণ্ড ব্যথায় আমি তখন প্রায় অচেতন হয়ে পড়ি। পায়ের জোড়াগুলো নড়ে গেলে ব্যথার তীব্রতা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
১৪ জুলাই রাতের এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়, কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবিতে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তাদের প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে রক্ত, ব্যথা ও ত্যাগ দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছিল। আমি সেদিন শুধু একজন আহত আন্দোলনকারীই নই, বরং প্রমাণ হয়েছি এই সত্যের যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে ক্ষমতাসীন শক্তির আঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবুও প্রতিবাদের স্লোগান কণ্ঠে ধরে রাখা, মিছিলের ভিড়ে অংশ নেওয়া এবং মাথা ও পায়ের ব্যথা উপেক্ষা করে ন্যায়বিচারের লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছিল আমাদের অঙ্গীকার।
রই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চাঁদপুরে আবারও সহিংসতা সংঘটিত হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের আগ মুহূর্তে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে চাঁদপুরে আমাকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ছেলে সন্ত্রাসী রনি নেতৃত্ব দেয় এই আক্রমণের। সেদিন হঠাৎ করেই আমাকে লক্ষ্য করে রড দিয়ে মাথার ডান পাশে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আমি মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, আর শরীর ভরে যায় তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণায়।
চিকিৎসা
প্রথম আক্রমণের শিকার হওয়ার পর আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং মাথা ও পায়ের ব্যথা কমানোর জন্য এন্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করতে হয়। জয়েন্ট ও লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় চলাফেরায় প্রচণ্ড কষ্ট হতো, ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রাম নিতে হয়। তবে শারীরিক ব্যথা সত্ত্বেও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থেমে যায়নি। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট চাঁদপুরে দ্বিতীয়বার আক্রমণের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হলে পুনরায় চিকিৎসা নিতে হয়। মাথার ডান পাশে রডের আঘাতে রক্তক্ষরণ হওয়ায় আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। চিকিৎসকরা নিয়মিত ওষুধ সেবন ও বিশ্রামের নির্দেশ দেন। ধারাবাহিক এই আঘাত ও চিকিৎসা-প্রক্রিয়া আমার শরীরে স্থায়ী ব্যথা ও দুর্বলতা সৃষ্টি করলেও আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাস ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি আরও দৃঢ় করেছে।
কর্মসংস্থান প্রস্তাবনা
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ধারাবাহিকভাবে হামলার শিকার হয়ে গুরুতরভাবে আহত হওয়া একজন তরুণ শিক্ষার্থী বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। প্রথম আক্রমণের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে হয়, যেখানে জয়েন্ট ও লিগামেন্টের ক্ষতির কারণে চলাফেরায় জটিলতা দেখা দেয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট চাঁদপুরে দ্বিতীয় দফায় পরিকল্পিত হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হন এবং সেলাইয়ের মাধ্যমে জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এ ধরনের পুনঃপুন শারীরিক আঘাতের ফলে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে এবং চিকিৎসার খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাজীবনে নিয়মিতভাবে অধ্যয়ন ও ন্যায়ের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে আর্থিক অনটনের কারণে কর্মসংস্থান একটি জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করলে তিনি নিজের জীবন-জীবিকা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবেন এবং পরিবারের আর্থিক দায়ভারও বহন করতে পারবেন। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা ও যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে যে আঘাত ও সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও সুরক্ষিত চাকরির ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু নিজেকে পুনর্গঠিত করতে পারবেন না, বরং সমাজের জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন।
একনজরে:
নাম: মোঃ আশরাফুল ইসলাম
জন্মতারিখ: ১০/১০/২০০২
জন্মস্থান:চাঁদপুর
পেশা: শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠানের নাম:মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
স্থায়ী ঠিকানা: দক্ষিণ বালিয়া,১২নং চান্দ্র,চাঁদপুর সদর,চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানাঃ ফরাজী বাড়ি, চাঁদপুর সদর,চাঁদপুর
পিতাঃ আব্দুল মোতালেব (কৃষক)
মাতা:মৃত পারুল বেগম
যোগাযোগঃ ০১৭৭৩৪০৮৭০৭
আয়: ১২,০০০ টাকা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:২
ভাই:মাহমুদুল হাসান, শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি
ঘটনার স্থানঃ জিরো পয়েন্ট,চবি এবং চাঁদপুর
আক্রমণকারীঃ চবিতে শাহরিয়ার, চাঁদপুরে রনি
আহত হওয়ার সময়ঃ ১৪ জুলাই ও ৫ আগস্ট ২০২৪
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍