হোম / আহতদের তালিকা / মো: সৌরভ হোসেন
মো: সৌরভ হোসেন

মো: সৌরভ হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা:ছাত্র
প্রতিষ্ঠানের নাম: খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয়
মো: সৌরভ হোসেন একজন শিক্ষার্থী, যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর, পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলায়। তার জন্মস্থান খাগড়াছড়ি, যা পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এক অনন্য অঞ্চল। বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত, যেখানে তিনি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা একই—শালবন, খাগড়াছড়ি পৌরসভা, খাগড়াছড়ি সদর, খাগড়াছড়ি। সেখানেই তিনি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বসবাস করছেন। সৌরভের পারিবারিক পটভূমি সাধারণ হলেও নৈতিকতা ও শ্রমের দৃঢ় ভিত্তিতে গড়া। তার পিতা মো: সিরাজুল ইসলাম একজন পরিশ্রমী কাঠমিস্ত্রী, যিনি সৎ পরিশ্রমের মাধ্যমে সংসারের দায়িত্ব পালন করেন। তার মাতা রুজি বেগম একজন স্নেহময়ী ও পরিশ্রমী গৃহিণী, যিনি ভালোবাসা ও মমতার বন্ধনে পরিবারকে একত্রিত রেখেছেন।
সৌরভের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পার্বত্য খাগড়াছড়ির স্নিগ্ধ পরিবেশে। প্রকৃতির সান্নিধ্য, পাহাড়ি জীবনের সরলতা এবং পারিবারিক শিক্ষার আলো তার মানসিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি স্বপ্ন দেখেন সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার। দৃঢ় মনোবল, অধ্যবসায় এবং পারিবারিক মূল্যবোধ তাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, সারাদেশের পরিস্থিতি চরমভাবে অবনতি ঘটে। রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না করার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটও আদালত খারিজ করে দেয়। ফলে ওইদিন সারা দেশে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। “জঙ্গিদমন” কায়দায় সাধারণ নিরস্ত্র শিক্ষার্থী-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একইসাথে ঘোষণা হয় ঐতিহাসিক “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচির।
আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে গোটা দেশের ছাত্র-জনতা এক দফা দাবিতে অনঢ় হয়ে দাঁড়ায়। সেই দাবি ছিল একটাই— ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ। ৪ আগস্ট থেকেই শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি। তবে একইসাথে দেশজুড়ে জারি করা হয় আরও কঠোর কারফিউ, যাতে আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা যায়।
সেদিন সকাল থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশের সশস্ত্র হামলার মুখে খালি হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন কয়েকশ’ মানুষ। রাজধানীর রামপুরায় নামেন ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও আশপাশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ। তাদের ওপরও ঝরে পড়তে থাকে গুলির বৃষ্টি।
এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে সকাল ১১টার দিকে আন্দোলনরত একটি মিছিলে কোর্ট বিল্ডিং সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করা হয়। মিছিল চলতে থাকে শান্তিপূর্ণভাবেই, কিন্তু মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি মিনিটের মধ্যেই সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের একদল ক্যাডার লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
হামলার এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা সামনে এগিয়ে এসে টেনে নিয়ে গিয়ে মাথায় আঘাত করে। আঘাতের তীব্রতায় অজ্ঞান হয়ে পড়া হয় মাটিতে। পরবর্তীতে তারা পায়ে নির্মম আঘাত করে পা ভেঙে দেয়। অচেতন অবস্থায় রক্তাক্ত শরীর পড়ে থাকলেও নির্মম হামলাকারীরা সেখানে থেমে থাকেনি। অবশেষে উপস্থিত ছাত্র-জনতা এগিয়ে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে।
জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর দেখা যায়, মাথায় গভীর আঘাতের কারণে সেলাই দেওয়া হয়েছে। তীব্র ব্যথা আর ভাঙা পায়ের যন্ত্রণার মধ্যেও একটাই উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই আন্দোলন আর কেবল কোনো গোষ্ঠীর নয়, বরং গোটা জাতির মুক্তির আন্দোলন।
চিকিৎসা
হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত আধুনিক জেলা হাসপাতাল, খাগড়াছড়িতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে মাথার আঘাত পরীক্ষা করে চারটি সেলাই দেন এবং ভাঙা পায়ে ব্যান্ডেজ করে দেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিন দিন পর সেলাইয়ের সঠিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য পুনরায় হাসপাতালে যেতে হয়। এরপর আরও দুই দিন পর নিয়মমাফিক ড্রেসিং খোলা হয়। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে হাসপাতালে এক্স-রে করা হলে পায়ের আঘাতের গুরুতরতা নিশ্চিত হয়। সেই অনুযায়ী চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসারে নিয়মিত ব্যান্ডেজ পরিবর্তন, ওষুধ সেবন এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিক চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।
চিকিৎসা প্রস্তাবনা
মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চারটি সেলাই দেওয়া হয়েছে, তবে প্রাথমিক চিকিৎসা সত্ত্বেও এখনও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। মাথার আঘাত থেকে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, স্নায়বিক জটিলতা বা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এ কারণে বিশেষায়িত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করে সঠিক অবস্থা নির্ধারণ করা জরুরি।
কর্মসংস্থান প্রস্তাবনা
খাগড়াছড়ির শিক্ষার্থী মো: সৌরভ হোসেন আন্দোলনে অংশগ্রহণকালে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়। মাথায় সেলাই ও পায়ে আঘাত পাওয়ার কারণে শারীরিকভাবে তিনি দীর্ঘমেয়াদে ভারী শ্রমভিত্তিক কাজে যুক্ত হতে পারছেন না। চিকিৎসার পর বর্তমানে সুস্থ হয়ে উঠলেও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় পর্যায়ে একটি কম্পিউটার কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেয়া যায়। এর মাধ্যমে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ ও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরা মৌলিক কম্পিউটার শিক্ষা, মাইক্রোসফট অফিস অ্যাপ্লিকেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা এবং ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাবে। এতে একদিকে এলাকার তরুণ সমাজ প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ হয়ে উঠবে, অন্যদিকে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে খাগড়াছড়ি জেলায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে বেকারত্ব সমস্যা হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।



একনজরে:

নাম: মো: সৌরভ হোসেন
জন্মতারিখ: ১২/০৯/১৯৯৯
জন্মস্থান:খাগড়াছড়ি
পেশা:ছাত্র
প্রতিষ্ঠানের নাম: খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা: শালবন,খাগড়াছড়ি পৌরসভা,খাগড়াছড়ি সদর,খাগড়াছড়ি
বর্তমান ঠিকানাঃ একই
পিতাঃ মোঃ সিরাজুল ইসলাম (কাঠমিস্ত্রী)
মাতা:রুজি বেগম
যোগাযোগঃ ০১৮৭১৫৬৬৭০৯
আয়: ১৫,০০০ টাকা
আয়ের উৎস: পড়ালেখার পাশাপাশি কম্পিউটার অপারেটর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:৬
বোন:তানজিনা আক্তার,শিক্ষার্থী,অনার্স ১ম বর্ষ
ঘটনার স্থানঃ খাগড়াছড়ি সদরের শাপলা চত্বর এলাকায় খলিল ফার্মেসীর সামনে
আক্রমণকারীঃ সন্ত্রাসী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ
আহত হওয়ার সময়ঃ ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা ৫০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍