হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ মারুফ হোসাইন
  মোঃ মারুফ হোসাইন

মোঃ মারুফ হোসাইন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ছাত্র
প্রতিষ্ঠান: খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়ঃ
মোঃ মারুফ হোসাইন ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার শান্তিনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাহাড়ঘেরা পরিবেশেই তার শৈশব কাটে। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা মারুফের বাবা মোঃ নুরুল ইসলাম বর্তমানে অসুস্থ, বয়স ৬৫ বছর। মা মরিয়ম বিবি, বয়স ৫৫, সংসার সামলানোই যার একমাত্র কাজ। সংসারের মাসিক আয় মাত্র ছয় হাজার টাকা, যার উৎস মায়ের আয়ার কাজ। এমন সীমিত আয়ে দুই সদস্যের এই ছোট পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন মা-বাবা।
ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী মারুফ বর্তমানে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্র। স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দুটোই শান্তিনগর এলাকায়। গ্রামের প্রতিটি পথঘাট, প্রতিটি স্মৃতি তার বেড়ে ওঠার সাক্ষী হয়ে আছে।
২০২৪ সালের আগস্টে যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে, তখনও সাধারণ ছাত্র হিসেবে তিনি নিজের জীবন নিয়ে স্বপ্ন বুনছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিনগুলোতে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো বন্ধ করতে করা রিট খারিজ হয়ে গেলে ৪ আগস্ট দমননীতি শুরু হয়— জঙ্গিদমন কায়দায় গুলি ছোঁড়া হয় নিরীহ সাধারণ ছাত্রদের দিকে। এসময় সারাদেশে ঘোষণা হয় "মার্চ টু ঢাকা"। সেই আন্দোলনের উত্তাপে আহত হন মারুফ হোসাইন।
আন্দলনে অংশগ্রহণঃ
আমি সেই দিন সকাল থেকেই মনে করেছিলাম—শান্তিনগরের ছেলে হিসেবেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলাটা আমার কর্তব্য। খাগড়াছড়ি কোট বিল্ডিংয়ের সামনে যখন বৈষম্য-বিরোধী মিছিল জমে উঠল, আমাদের গলার আওয়াজ জোরালো হচ্ছিল: সমান অধিকার, ন্যায়, এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে। আমরা ছোট ছোট প্ল্যাকার্ড জড়িয়ে ছিলাম, গলা ছেড়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম; পথের ধারেই বাজারে আসা মানুষ কৌতূহলে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ পেছন দিক থেকে আছড়ে পড়ল একদল—হাতেনাতে রাম, দা, ছুরি আর লাঠিসোঁটা। তারা আলাদা আলাদা দলে ছড়িয়ে পড়ে; আমাদের পেছন থেকে এক ধাক্কা, আর চেঁচিয়ে ওঠা—“ছত্রিমুখ” না, একদমই পরিকল্পিত আক্রমণ।
ভাগার পথে আমার বুক কাঁপছিল; আশেপাশের মানুষ ছুটে পালালো, আমি আর কিছু সহযোদ্ধা ভাই-বোন একসাথে একটি দালানের পার্শ্বে লুকিয়ে ফেললাম। ক’টা মুহূর্ত শান্তি, তারপর জানা গেল—তারা আমাদের অবস্থান জানতে পেরেছে। যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বলে পরিচিত কয়েকজন উঠে পড়ে লাগল; ধারালো লাঠি ও রড দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত। মাথার এক পাশে ঝরতে লাগল রক্ত, কানে বাজলো লাঠির ধাক্কা—শব্দটা ছিল ঘাতক, ক্রন্দন যেন দাঁতের ভেতর গান বাজাচ্ছে। আমরা চিৎকার করে বলেছিলাম—আমরা শিক্ষার্থী, আমরা শুধুই আমাদের অধিকার চাই—কিন্তু তাদের কাছে তা কিছুই ছিল না। পরে পার্শ্ববর্তী একটি দোকানের ভেতর দিয়ে আমরা হাপিয়ে লুকিয়ে পড়ি; সেখান থেকেই কেউ ফোন করে, দ্রুত চিকিৎসা নিলে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।
৪ আগস্ট ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনের মধ্যে একটি; সেই দিন “March to Dhaka” ঘোষণা করা হয়েছিল এবং বহু জায়গায় তীব্র সংঘর্ষ, কারফিউ ও নেটওয়ার্ক শাটডাউন রিপোর্ট করা হয়। এই দিনকে ঘিরে প্রচুর ধারালো অভিযোগ ও প্রাণহানি সংবাদ উঠে আসে এবং পরবর্তী কালক্রমে রাজনৈতিক ভূদলনও দেখা যায়। আমার মতো দরিদ্র পরিবারের ছেলেগুলো—যাদের পিতা অসুস্থ, মা প্রতিদিন আয়া করে সংসার চালান, মাসিক আয় ছয় হাজার—তারা এই দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নগুলো আজ এমন এক হাতেই কাটা পড়েছে যেখানে ন্যায়ের বদলে নৃশংসতা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রতি করা ওই নৃশংসতার স্মৃতি—লাঠির ভেপারি, রক্তে রং করা রাস্তা, হাসপাতালের চত্বরে বড্ড কষ্টের চিৎকার—সবই হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেল।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বিবরণঃ
আন্দোলনের সময় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর অজ্ঞান অবস্থায় প্রথমে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সমস্যার কারণে সেখানে ভর্তি করা সম্ভব না হওয়ায় তাকে দ্রুত পার্কসাইড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ডাক্তার প্রাথমিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন, তবে জানান যে সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য ভবিষ্যতে আরও একটি বা একাধিক অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষত ডানহাতের আঙুল ভেঙ্গে যাওয়ায় সেটি পুনর্বিন্যাস ও প্লেট বসানোর ব্যবস্থা অপরিহার্য। বর্তমানে ঐ হাত দিয়ে দৈনন্দিন কাজ করাও সম্ভব হচ্ছে না। ডাক্তার সতর্ক করেছেন যে, যদি ভবিষ্যতে উন্নত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা না হয়, তবে মারুফকে স্থায়ীভাবে অক্ষম বা পঙ্গুত্বপূর্ণ জীবন ধারণ করতে হতে পারে।
এর আগে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার সময় তাকে ব্যথানাশক, সংক্রমণ রোধক ও প্রয়োজনীয় বেঁয়াম ব্যবহার করা হয়। ডাক্তার বলেছেন, এক মাস পর্যবেক্ষণের পরে যদি আঙুলের কার্যক্ষমতা প্রত্যাশা মতো ফিরে না আসে, তবে হ্যান্ড থেরাপি বা ফিজিওথেরাপি দিয়ে পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রধান প্রস্তাবনা হলো ভাঙা আঙুলের পুনরায় অস্ত্রোপচার ও প্লেট বসানো, যাতে হাতের পূর্ণ কার্যক্ষমতা ফিরে আসে।
একনজরেঃ
নাম: মোঃ মারুফ হোসাইন
জন্ম তারিখ: ২৮/০৯/২০০৬
জন্মস্থান: খাগড়াছড়ি
পেশা: ছাত্র
প্রতিষ্ঠান: খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ

স্থায়ী ঠিকানা:
গ্রাম: শান্তিনগর
ইউনিয়ন: সদর
থানা: খাগড়াছড়ি
জেলা: খাগড়াছড়ি

বর্তমান ঠিকানা:
এলাকা/মহল্লা: শান্তিনগর
থানা: খাগড়াছড়ি
জেলা: খাগড়াছড়ি

পরিবারিক তথ্য:
পিতার নাম: মোঃ নুরুল ইসলাম (পেশা: অসুস্থ, বয়স: ৬৫)
মাতার নাম: মরিয়ম বিবি (পেশা: গৃহিণী, বয়স: ৫৫)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ২ জন
যোগাযোগ: ০১৮৮৬৮৫৫০৩৭, ০১৮৮৫৮৫৫০৩৭
মাসিক আয়: ৬,০০০ টাকা (উৎস: আয়া)

ঘটনার স্থান: খাগড়াছড়ি, ভাঙা ব্রিজ
ঘটনার তারিখ ও সময়: ০৪/০৮/২০২৪, দুপুর ১২:০০
আহত হওয়ার কারণ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সশস্ত্র বাহিনীর হামলা
আহতের ধরন: ডানহাতের আঙুল ভাঙা, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত

চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা:
ডানহাতের আঙুলের প্লেট বসিয়ে পুনর্বিন্যাস করা
ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন
দৈনন্দিন কাজ ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পর্যাপ্ত সহায়তা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍