মো: মামুন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বৈষম্য মানি না, মাথা নত করি না”—এই মূলমন্ত্র বুকে ধারণ করেই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজপথে নেমেছিলেন ভোলার চরফ্যাশনের সাহসী যুবক, মিনি পিকআপ চালক মো. মামুন। রাজনীতির সাথে সম্পর্কহীন মামুনের একমাত্র পরিচয় ছিল তিনি একজন শ্রমজীবী, যিনি কেবল বৈষম্যমুক্ত এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে সেই রক্তঝরা বিকেলে পুলিশের গুলিতে মামুনের চোখ, মুখ ও মাথায় বিঁধে যায় অসংখ্য পিলেট। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার স্বপ্ন। চিকিৎসার নামে সরকারি টালবাহানা আর গ্রেপ্তারের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ১০ মাস তিনি লড়াই করেছেন মৃত্যুর সাথে। ৮ বার অস্ত্রোপচার হলেও আজও তার দেহে রয়ে গেছে ৯টি পিলেট; এক চোখে শুধু আলো-আঁধারির আভাস, অন্য চোখে তীব্র যন্ত্রণা।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মামুন আজ আর স্টিয়ারিং ধরতে পারেন না। মাতুয়াইলে একটি ছোট চায়ের দোকানে এখন তার জীবন সংগ্রাম চলে। অভাবের তাড়নায় ছোট বোন লামিয়ার পড়াশোনাও বন্ধ। মামুন নিজের দৃষ্টি বিসর্জন দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন স্বাধীনতার নতুন সূর্য। এই অকুতোভয় বীরের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে সেই রক্তঝরা বিকেলে পুলিশের গুলিতে মামুনের চোখ, মুখ ও মাথায় বিঁধে যায় অসংখ্য পিলেট। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার স্বপ্ন। চিকিৎসার নামে সরকারি টালবাহানা আর গ্রেপ্তারের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ১০ মাস তিনি লড়াই করেছেন মৃত্যুর সাথে। ৮ বার অস্ত্রোপচার হলেও আজও তার দেহে রয়ে গেছে ৯টি পিলেট; এক চোখে শুধু আলো-আঁধারির আভাস, অন্য চোখে তীব্র যন্ত্রণা।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মামুন আজ আর স্টিয়ারিং ধরতে পারেন না। মাতুয়াইলে একটি ছোট চায়ের দোকানে এখন তার জীবন সংগ্রাম চলে। অভাবের তাড়নায় ছোট বোন লামিয়ার পড়াশোনাও বন্ধ। মামুন নিজের দৃষ্টি বিসর্জন দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন স্বাধীনতার নতুন সূর্য। এই অকুতোভয় বীরের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
“বৈষম্য মানি না, মাথা নত করি না”
দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনে একজন ড্রাইভারের ভূমিকা
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
ভোলার চরাঞ্চলের হাওয়ায় ভেসে আসা এক ভোরবেলা ২০০০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন মো. মামুন। ভোলা জেলার চরফ্যাশন থানার মাঝের চর গ্রামে তার শৈশব কেটেছে ধূলিধূসর বাস্তবতার মাঝে। বাবা মো. মিলন ছিলেন একসময় ভ্যানচালক; বয়সে তখন পয়ত্রিশ, অথচ জীবনভর কষ্টের ভারে পঞ্চাশ ছুঁয়ে যাওয়া মুখ। গৃহিণী মা হাসনা বিবি ছিলেন ঘরের প্রদীপ, যিনি সংসারের প্রতিটি কোণায় অভাব ঢেকে রাখতেন নিঃশব্দ ভালোবাসায়। মামুনের শৈশব ছিল শূন্যতার সঙ্গে বোঝাপড়ার আর্তনাদ।
প্রায় পাঁচ বছর আগে বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। শুধু রক্তের সম্পর্ক রেখে যান, দায়িত্বের কোনো চিহ্ন নয়। তখন থেকেই মামুনের কাঁধে পড়ে পরিবারের হাল ধরার ভার। চারজনের সংসার। এক বোন লামিয়া, বয়স সতেরো, নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল; এখন অর্থের অভাবে পড়ালেখা বন্ধ। ছোট ভাই মো. শামীম, মাত্র পনেরো, মামুনের এক বন্ধুর দোকানে দিনমজুরের কাজ করে। তাদের মধ্যে মামুনই ছিলেন আশার আলো, যিনি হাল না ছেড়ে জীবনের হাল ধরেছিলেন।
চালকের আসন থেকে নেতৃত্বে
মামুন ছিলেন একজন মিনি পিকআপ চালক। রাজধানী ঢাকার মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়ায়, বানিয়ারবাগের ধুলো আর ব্যস্ততার মধ্যে দিনরাত শ্রম দিয়ে মাসে ২০,০০০ টাকা আয় করতেন। এই সামান্য উপার্জন দিয়েই মায়ের ও ভাই-বোনের মুখে আহার তুলে দিতেন। নিজের জন্য আলাদা কোনো স্বপ্ন ছিল না, ছিল শুধু একটাই দায়; পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখা।
আন্দোলনের দিন ১৮ জুলাইয়ের রুদ্ধশ্বাস বিকেল
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই; বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত দিন। এদিন শুধু একটি দিন নয়, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র প্রতিবাদের এক অগ্নিময় আলেখ্য। ছিল রাষ্ট্রীয় বর্বরতার নগ্ন প্রদর্শনী, যেখানে ক্ষমতা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গুলি চালিয়েছিল সাধারণ মানুষের বুকে।
সকাল ৯টা বাজে তখন। মামুন তার অভ্যস্ত দিনের মতোই ঘর ।থেকে বেরিয়েছিলেন। মাথায় ছিল না কোনো আন্দোলনের পরিকল্পনা, মন ছিল শ্রমিকজীবনের নিরন্তর চক্রে আটকে থাকা দায়-দায়িত্বে। কিন্তু পথে নেমেই দেখেন ঢাকার বাতাস যেন পাল্টে গেছে; শামসুল হক কলেজের ছাত্রদের সাথে হাজারো সাধারণ মানুষের মিছিল ছড়িয়ে পড়ছে যাত্রাবাড়ি এলাকায়। মুখে একটিই শ্লোগান “বৈষম্যের অবসান চাই”, “সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন করো।” এই মিছিল কেবল শিক্ষার্থীদের ছিল না, ছিল দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, এমনকি দোকানদারদেরও; যারা জীবনের প্রতিটি দিন বঞ্চনার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বাঁচে। মামুন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি চলে যান সেই জনস্রোতের মধ্যে, যেখানে ছিল না কোনো নেতা, ছিল না কোনো রাজনৈতিক রং, শুধু ছিল শোষণের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত আর্তনাদ। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল। জনতার ঢল তখন যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের ওপর। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে প্রতিবাদের শ্লোগান, চোখে-মুখে জ্বলছে দ্রোহের আগুন।
বিকেল ৩টা। যখন আন্দোলন ছিল একেবারে শান্তিপূর্ণ, ঠিক তখনই ফ্লাইওভারের ওপর ছুটে আসে যাত্রাবাড়ি থানার স্বৈরাচার সরকারের ঘাতক পুলিশ ও বিজিবি। যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশের সাথে সাদা পোশাকে আরও কিছু অচেনা মুখ। তাদের মুখে ছিল না বাংলা ভাষা, বরং মামুন পরিষ্কারভাবে শুনতে পান হিন্দি ভাষায় কথাবার্তা, “জলদি করো... মারো...”। সন্দেহ হয়, এরা কি ভারতের কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য !
এবার শুরু হয় একপেশে যুদ্ধ। টিয়ারসেলের বিস্ফোরণ, শটগানের গর্জন, রাবার বুলেটে সবকিছু যেন মুহূর্তেই আকাশ ছেড়ে নিচে নেমে আসে। জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কান্না, চিৎকার আর রক্তের গন্ধে ভরে যায় বাতাস। পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা কোনো কারণ ছাড়াই মারধর শুরু করে; ধরা পড়লেই লাঠি, লাথি, গুলি; এ যেন হায়েনার উল্লাস।
মামুন দৌড়াতে চান, কিন্তু চোখে পড়ে তারই পাশের এক কিশোর মুখ থুবড়ে পড়ছে রাস্তায়। তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে যান। সেই মুহূর্তেই তার দিকে ছুটে আসে একটি গুলি; আধা ইঞ্চি লম্বা, রাষ্ট্রযন্ত্রের ধাতব নির্মমতা। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার চোখ, মাথা, মুখের কোষ। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে, মামুন মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন মাটিতে; রক্তে ভিজে যায় তার জামা, আর মানুষের চিৎকারে ছাপিয়ে আসে নিঃশব্দ মৃত্যু।
কেউ একজন তাকে তুলে ধরে। কে সে তা আজও অজানা। হয়তো সহযোদ্ধা, হয়তো অপরিচিত এক পথচারী। যে-ই হোক, তার সাহসে মামুন অচেতন শরীরে পৌঁছান কাজলার এক বেসরকারি হাসপাতালে; জীবনের সাথে প্রথমবারের মতো লড়াইটা শুরু হয় সেখান থেকে।
চিকিৎসার অন্ধকার অধ্যায়
চোখে-মুখে অন্ধকার নিয়ে মামুন প্রথমে কাজলা এলাকার এক প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেই তিনি খবর দেন তার কাজিনকে। এক আন্দোলনকারী সাথীর মৃত্যুর পর আতঙ্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামুনকে ঢামেকে পাঠিয়ে দেয়, এম্বুলেন্সে কোনো সঙ্গী ছাড়া। ঢামেকে পৌঁছার পর তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতে হয় চিকিৎসা ছাড়া একটি স্ট্রেচারে যেখানে সময় যেন মৃত্যুর অপেক্ষা।
রাত ৩টায় তাকে অপারেশন করার কথা বলা হলেও তিনদিন থাকার পর পুরো শরীর থেকে গুলি বের না করেই তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। পরে হাসপাতাল থেকে ফোন করে আবার ভর্তি হতে বলা হয়। মামুনের সন্দেহ হয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ‘ভিজিট’ নাটকের অংশ হিসেবে কিছু আহতকে হাসপাতালে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এই তথ্য জানার পর তিনি গা-ঢাকা দেন। ঢামেকে যেদিন তিনি ভর্তি ছিলেন, সে রাতের মিডিয়া কাভারেজ ও হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়। সে খবর ছড়িয়ে পড়লে মামুন ১০ দিন গৃহবন্দি থাকেন, এক বিনিদ্র আতঙ্কের ভেতরে।
চিকিৎসার দীর্ঘ যন্ত্রণা ও রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর যে জীবন শুরু হয়, তা আর আগের মতো থাকে না। একে বলে “বেঁচে থাকা”, কিন্তু জীবনের স্বাদ সেখানে থাকে না, থাকে কেবল বেদনার দীর্ঘশ্বাস, আতঙ্কের ছায়া আর রাষ্ট্রযন্ত্রের হিংস্র থাবার দগদগে দাগ। মো: মামুনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
অচেতন অবস্থায় যখন তাকে কাজলা এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়, তখন তার মুখ, চোখ ও মাথায় রক্ত ঝরছিল। হুঁশ ছিল না, ছিল না কোনো আপনজন। একজন অচেনা সহযোদ্ধার সহানুভূতিতে খবর যায় মামুনের কাজিনের কাছে। কিন্তু সময় তখন কেবলই নিষ্ঠুর; হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় আন্দোলনরত একজন তরুণ প্রাণ হারায়। হাসপাতালের আতঙ্কিত কর্তৃপক্ষ, পুলিশের ভয়ে কিংবা সরকারি হুকুমে, মামুনসহ আহতদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অ্যাম্বুলেন্সে তার সাথে ছিল না কেউ; এমনকি চালকও স্ট্রেচারে ফেলে দিয়ে নিঃশব্দে চলে যায়। এই বিশাল শহরের ব্যস্ত জরুরি বিভাগে চার ঘণ্টা ধরে একা মামুন পড়ে থাকেন। কেউ এগিয়ে আসে না, কেউ চোখ তুলে চায় না। যেন রাষ্ট্রীয় নির্দেশে চিকিৎসা বন্ধ ছিল তার মতো ‘অপরাধী’র জন্য। রাষ্ট্র তখন তাকে আন্দোলনকারী নয়, একজন “রাষ্ট্রবিরোধী” বলে চিহ্নিত করেছে; যে কিনা শুধু চোখে স্বপ্ন দেখার অপরাধে গুলি খেয়েছে।
রাত ৩টার দিকে, পরিবারের সদস্যরা এসে তাকে খুঁজে বের করেন এবং তদ্বিরের পর চিকিৎসকেরা অবশেষে তাকে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করেন। কিন্তু এই চিকিৎসা ছিল অসম্পূর্ণ, অবহেলায় ভরা। তিনদিন হাসপাতালে রেখে সমস্ত পিলেট না বের করেই রিলিজ দিয়ে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত ছিল নিছক চিকিৎসাগত নয় বরং রাষ্ট্রীয় নাটকের প্রথম অঙ্ক। কেননা, একদিন পর হাসপাতাল থেকে ফোন আসে পুনরায় ভর্তি হওয়ার জন্য। মামুন সন্দেহে পড়ে যান এবং যখন অন্য আহতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন উন্মোচিত হয় চরম সত্য: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাসপাতালে “দর্শনার্থী” হিসেবে আগমনকে কেন্দ্র করে এ নাটক সাজানো হয়েছে। সরকার চেয়েছিল আহতদের সামনে এনে মানবিকতার মুখোশ পরতে। অথচ আহতদের রক্ত তখনো শুকায়নি।
মামুন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এ নাটকে অংশ নেবেন না। তার এ সিদ্ধান্ত ছিল সাহসিকতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তই তাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরে নিয়ে আসে। ঢামেক হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, ১৮ জুলাইয়ের মিডিয়ার ভিডিও, সব বিশ্লেষণ করে পুলিশ চিহ্নিত করে আহতদের, যারা ‘প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির হয়নি’। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বের ভয়ংকর শিকার অভিযান; পেটোয়া পুলিশ বাহিনী রাস্তায় নামে, গ্রেফতারের তালিকায় মামুনের নাম।
ভয়ে আতঙ্কিত মামুন একঘরে হয়ে যান। বাসার দরজা বন্ধ করে দিন কাটান। কোনো আলো, কোনো শব্দ যেন তাকে ডেকে না তোলে। প্রায় ১০ দিন অদৃশ্য থাকেন রাষ্ট্রের চোখ থেকে। তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরলে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে গিয়ে শুরু করেন চোখের চিকিৎসা। যেখানে নতুন করে খুলে যায় যন্ত্রণার দরজা।
টানা ১০ মাস ধরে চলে চিকিৎসা। যার মধ্যে ৮ বার অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রতিটি অপারেশন ছিল একেকটি যুদ্ধ। এক চোখে আজ কেবল আলো-আঁধারির আভাস পান মামুন; আরেক চোখে রয়েছে তিনটি পিলেট, যা তাকে অনবরত ঝাপসা দৃষ্টি আর যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। চোখের পেছনে, মস্তিষ্কে, মাথার পাশে আজও রয়ে গেছে ৬টি পিলেট যা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় ১৮ জুলাইয়ের সেই বিকেলের কথা।
এখনো কোনোদিন হঠাৎ শব্দ হলে বুক কেঁপে ওঠে, কোনো অচেনা মুখ দেখলে মনে হয় সে হয়তো গোয়েন্দা। রাতে ঘুম আসে না, মাথাব্যথা ওঠে জ্বরের মতো, চোখের ভেতর ঝলসে ওঠে আগুনের রেখা। এই তো মামুনের বাস্তবতা; একটি রাষ্ট্রের নির্যাতনের নিঃশব্দ সাক্ষ্য, যেখানে একজন তরুণ কেবল বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অপরাধে এমন নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করেছে।
যে স্বপ্ন এখনো মরেনি
মো. মামুন এখন আর পিকআপ চালাতে পারেন না। চোখের এই অবস্থা নিয়ে তার আর স্টিয়ারিংয়ে বসা চলে না। তিনি এখন মাতুয়াইল এলাকায় একটি ছোট্ট চায়ের দোকান চালান, মা-ভাইয়ের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য। তার জীবন আজ এক অদৃশ্য যুদ্ধের নাম; অভিমান, অভাব, অবিচার আর একরাশ অন্ধকার। কিন্তু হেরে যাননি মামুন। চোখে না দেখলেও হৃদয়ে এখনও দৃশ্যমান স্বপ্ন; একদিন এই দেশ, এই মানুষ, বৈষম্যহীন সমাজে বাঁচবে। যেখানে কেউ আর গুলি খেয়ে বেঁচে থাকার দায়ে চোখ হারাবে না। মো. মামুন সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বর, যে আজও বলে “আমি দেখিনি, কিন্তু আমি জানি; আলো আসবেই।”
প্রস্তাবনা
১। চোখ ও স্নায়ুর উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি খরচে বিদেশে প্রেরণ।
২। স্থায়ী মাসিক ভাতা ও স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা প্রদান।
৩। একটি বিকল্প পেশার জন্য প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ চালু করার সুযোগ প্রদান।
৪। বাসস্থান সংক্রান্ত সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এক নজরে মো: মামুন
নাম : মো: মামুন
জন্ম তারিখ : ০৫/০৯/২০০০
জন্মস্থান : ভোলা
পেশা : ড্রাইভার
প্রতিষ্ঠান : মালিকানা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মাঝেরচর, ইউনিয়ন: সেন্টার বাজার, থানা: চরফ্যাশন, জেলা: ভোলা
বর্তমান ঠিকানা : এলাকা: মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়া (বানিয়ারবাগ), থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মিলন
মায়ের নাম : হাসনা বিবি
পিতার পেশা : ভ্যান চালক, বয়স: ৪৫
মায়ের পেশা : গৃহিণী
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : মিনি পিকআপ ড্রাইভার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. নাম: লামিয়া, বয়স: ১৭, পেশা: ছাত্রী (বর্তমানে লেখাপড়া বন্ধ), শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৯ম পাস
২. নাম: মো: শামীম, বয়স: ১৫, পেশা: ভাইয়ের দোকানে কাজ করেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৫ম শ্রেণি পাস
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ি থানার সামনে (ফ্লাইওভারের উপরে)
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ
দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনে একজন ড্রাইভারের ভূমিকা
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
ভোলার চরাঞ্চলের হাওয়ায় ভেসে আসা এক ভোরবেলা ২০০০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন মো. মামুন। ভোলা জেলার চরফ্যাশন থানার মাঝের চর গ্রামে তার শৈশব কেটেছে ধূলিধূসর বাস্তবতার মাঝে। বাবা মো. মিলন ছিলেন একসময় ভ্যানচালক; বয়সে তখন পয়ত্রিশ, অথচ জীবনভর কষ্টের ভারে পঞ্চাশ ছুঁয়ে যাওয়া মুখ। গৃহিণী মা হাসনা বিবি ছিলেন ঘরের প্রদীপ, যিনি সংসারের প্রতিটি কোণায় অভাব ঢেকে রাখতেন নিঃশব্দ ভালোবাসায়। মামুনের শৈশব ছিল শূন্যতার সঙ্গে বোঝাপড়ার আর্তনাদ।
প্রায় পাঁচ বছর আগে বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। শুধু রক্তের সম্পর্ক রেখে যান, দায়িত্বের কোনো চিহ্ন নয়। তখন থেকেই মামুনের কাঁধে পড়ে পরিবারের হাল ধরার ভার। চারজনের সংসার। এক বোন লামিয়া, বয়স সতেরো, নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল; এখন অর্থের অভাবে পড়ালেখা বন্ধ। ছোট ভাই মো. শামীম, মাত্র পনেরো, মামুনের এক বন্ধুর দোকানে দিনমজুরের কাজ করে। তাদের মধ্যে মামুনই ছিলেন আশার আলো, যিনি হাল না ছেড়ে জীবনের হাল ধরেছিলেন।
চালকের আসন থেকে নেতৃত্বে
মামুন ছিলেন একজন মিনি পিকআপ চালক। রাজধানী ঢাকার মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়ায়, বানিয়ারবাগের ধুলো আর ব্যস্ততার মধ্যে দিনরাত শ্রম দিয়ে মাসে ২০,০০০ টাকা আয় করতেন। এই সামান্য উপার্জন দিয়েই মায়ের ও ভাই-বোনের মুখে আহার তুলে দিতেন। নিজের জন্য আলাদা কোনো স্বপ্ন ছিল না, ছিল শুধু একটাই দায়; পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখা।
আন্দোলনের দিন ১৮ জুলাইয়ের রুদ্ধশ্বাস বিকেল
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই; বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত দিন। এদিন শুধু একটি দিন নয়, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র প্রতিবাদের এক অগ্নিময় আলেখ্য। ছিল রাষ্ট্রীয় বর্বরতার নগ্ন প্রদর্শনী, যেখানে ক্ষমতা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গুলি চালিয়েছিল সাধারণ মানুষের বুকে।
সকাল ৯টা বাজে তখন। মামুন তার অভ্যস্ত দিনের মতোই ঘর ।থেকে বেরিয়েছিলেন। মাথায় ছিল না কোনো আন্দোলনের পরিকল্পনা, মন ছিল শ্রমিকজীবনের নিরন্তর চক্রে আটকে থাকা দায়-দায়িত্বে। কিন্তু পথে নেমেই দেখেন ঢাকার বাতাস যেন পাল্টে গেছে; শামসুল হক কলেজের ছাত্রদের সাথে হাজারো সাধারণ মানুষের মিছিল ছড়িয়ে পড়ছে যাত্রাবাড়ি এলাকায়। মুখে একটিই শ্লোগান “বৈষম্যের অবসান চাই”, “সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন করো।” এই মিছিল কেবল শিক্ষার্থীদের ছিল না, ছিল দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, এমনকি দোকানদারদেরও; যারা জীবনের প্রতিটি দিন বঞ্চনার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বাঁচে। মামুন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি চলে যান সেই জনস্রোতের মধ্যে, যেখানে ছিল না কোনো নেতা, ছিল না কোনো রাজনৈতিক রং, শুধু ছিল শোষণের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত আর্তনাদ। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল। জনতার ঢল তখন যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের ওপর। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে প্রতিবাদের শ্লোগান, চোখে-মুখে জ্বলছে দ্রোহের আগুন।
বিকেল ৩টা। যখন আন্দোলন ছিল একেবারে শান্তিপূর্ণ, ঠিক তখনই ফ্লাইওভারের ওপর ছুটে আসে যাত্রাবাড়ি থানার স্বৈরাচার সরকারের ঘাতক পুলিশ ও বিজিবি। যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশের সাথে সাদা পোশাকে আরও কিছু অচেনা মুখ। তাদের মুখে ছিল না বাংলা ভাষা, বরং মামুন পরিষ্কারভাবে শুনতে পান হিন্দি ভাষায় কথাবার্তা, “জলদি করো... মারো...”। সন্দেহ হয়, এরা কি ভারতের কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য !
এবার শুরু হয় একপেশে যুদ্ধ। টিয়ারসেলের বিস্ফোরণ, শটগানের গর্জন, রাবার বুলেটে সবকিছু যেন মুহূর্তেই আকাশ ছেড়ে নিচে নেমে আসে। জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কান্না, চিৎকার আর রক্তের গন্ধে ভরে যায় বাতাস। পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা কোনো কারণ ছাড়াই মারধর শুরু করে; ধরা পড়লেই লাঠি, লাথি, গুলি; এ যেন হায়েনার উল্লাস।
মামুন দৌড়াতে চান, কিন্তু চোখে পড়ে তারই পাশের এক কিশোর মুখ থুবড়ে পড়ছে রাস্তায়। তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে যান। সেই মুহূর্তেই তার দিকে ছুটে আসে একটি গুলি; আধা ইঞ্চি লম্বা, রাষ্ট্রযন্ত্রের ধাতব নির্মমতা। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার চোখ, মাথা, মুখের কোষ। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে, মামুন মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন মাটিতে; রক্তে ভিজে যায় তার জামা, আর মানুষের চিৎকারে ছাপিয়ে আসে নিঃশব্দ মৃত্যু।
কেউ একজন তাকে তুলে ধরে। কে সে তা আজও অজানা। হয়তো সহযোদ্ধা, হয়তো অপরিচিত এক পথচারী। যে-ই হোক, তার সাহসে মামুন অচেতন শরীরে পৌঁছান কাজলার এক বেসরকারি হাসপাতালে; জীবনের সাথে প্রথমবারের মতো লড়াইটা শুরু হয় সেখান থেকে।
চিকিৎসার অন্ধকার অধ্যায়
চোখে-মুখে অন্ধকার নিয়ে মামুন প্রথমে কাজলা এলাকার এক প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেই তিনি খবর দেন তার কাজিনকে। এক আন্দোলনকারী সাথীর মৃত্যুর পর আতঙ্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামুনকে ঢামেকে পাঠিয়ে দেয়, এম্বুলেন্সে কোনো সঙ্গী ছাড়া। ঢামেকে পৌঁছার পর তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতে হয় চিকিৎসা ছাড়া একটি স্ট্রেচারে যেখানে সময় যেন মৃত্যুর অপেক্ষা।
রাত ৩টায় তাকে অপারেশন করার কথা বলা হলেও তিনদিন থাকার পর পুরো শরীর থেকে গুলি বের না করেই তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। পরে হাসপাতাল থেকে ফোন করে আবার ভর্তি হতে বলা হয়। মামুনের সন্দেহ হয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ‘ভিজিট’ নাটকের অংশ হিসেবে কিছু আহতকে হাসপাতালে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এই তথ্য জানার পর তিনি গা-ঢাকা দেন। ঢামেকে যেদিন তিনি ভর্তি ছিলেন, সে রাতের মিডিয়া কাভারেজ ও হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়। সে খবর ছড়িয়ে পড়লে মামুন ১০ দিন গৃহবন্দি থাকেন, এক বিনিদ্র আতঙ্কের ভেতরে।
চিকিৎসার দীর্ঘ যন্ত্রণা ও রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর যে জীবন শুরু হয়, তা আর আগের মতো থাকে না। একে বলে “বেঁচে থাকা”, কিন্তু জীবনের স্বাদ সেখানে থাকে না, থাকে কেবল বেদনার দীর্ঘশ্বাস, আতঙ্কের ছায়া আর রাষ্ট্রযন্ত্রের হিংস্র থাবার দগদগে দাগ। মো: মামুনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
অচেতন অবস্থায় যখন তাকে কাজলা এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়, তখন তার মুখ, চোখ ও মাথায় রক্ত ঝরছিল। হুঁশ ছিল না, ছিল না কোনো আপনজন। একজন অচেনা সহযোদ্ধার সহানুভূতিতে খবর যায় মামুনের কাজিনের কাছে। কিন্তু সময় তখন কেবলই নিষ্ঠুর; হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় আন্দোলনরত একজন তরুণ প্রাণ হারায়। হাসপাতালের আতঙ্কিত কর্তৃপক্ষ, পুলিশের ভয়ে কিংবা সরকারি হুকুমে, মামুনসহ আহতদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অ্যাম্বুলেন্সে তার সাথে ছিল না কেউ; এমনকি চালকও স্ট্রেচারে ফেলে দিয়ে নিঃশব্দে চলে যায়। এই বিশাল শহরের ব্যস্ত জরুরি বিভাগে চার ঘণ্টা ধরে একা মামুন পড়ে থাকেন। কেউ এগিয়ে আসে না, কেউ চোখ তুলে চায় না। যেন রাষ্ট্রীয় নির্দেশে চিকিৎসা বন্ধ ছিল তার মতো ‘অপরাধী’র জন্য। রাষ্ট্র তখন তাকে আন্দোলনকারী নয়, একজন “রাষ্ট্রবিরোধী” বলে চিহ্নিত করেছে; যে কিনা শুধু চোখে স্বপ্ন দেখার অপরাধে গুলি খেয়েছে।
রাত ৩টার দিকে, পরিবারের সদস্যরা এসে তাকে খুঁজে বের করেন এবং তদ্বিরের পর চিকিৎসকেরা অবশেষে তাকে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করেন। কিন্তু এই চিকিৎসা ছিল অসম্পূর্ণ, অবহেলায় ভরা। তিনদিন হাসপাতালে রেখে সমস্ত পিলেট না বের করেই রিলিজ দিয়ে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত ছিল নিছক চিকিৎসাগত নয় বরং রাষ্ট্রীয় নাটকের প্রথম অঙ্ক। কেননা, একদিন পর হাসপাতাল থেকে ফোন আসে পুনরায় ভর্তি হওয়ার জন্য। মামুন সন্দেহে পড়ে যান এবং যখন অন্য আহতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন উন্মোচিত হয় চরম সত্য: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাসপাতালে “দর্শনার্থী” হিসেবে আগমনকে কেন্দ্র করে এ নাটক সাজানো হয়েছে। সরকার চেয়েছিল আহতদের সামনে এনে মানবিকতার মুখোশ পরতে। অথচ আহতদের রক্ত তখনো শুকায়নি।
মামুন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এ নাটকে অংশ নেবেন না। তার এ সিদ্ধান্ত ছিল সাহসিকতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তই তাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরে নিয়ে আসে। ঢামেক হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, ১৮ জুলাইয়ের মিডিয়ার ভিডিও, সব বিশ্লেষণ করে পুলিশ চিহ্নিত করে আহতদের, যারা ‘প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির হয়নি’। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বের ভয়ংকর শিকার অভিযান; পেটোয়া পুলিশ বাহিনী রাস্তায় নামে, গ্রেফতারের তালিকায় মামুনের নাম।
ভয়ে আতঙ্কিত মামুন একঘরে হয়ে যান। বাসার দরজা বন্ধ করে দিন কাটান। কোনো আলো, কোনো শব্দ যেন তাকে ডেকে না তোলে। প্রায় ১০ দিন অদৃশ্য থাকেন রাষ্ট্রের চোখ থেকে। তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরলে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে গিয়ে শুরু করেন চোখের চিকিৎসা। যেখানে নতুন করে খুলে যায় যন্ত্রণার দরজা।
টানা ১০ মাস ধরে চলে চিকিৎসা। যার মধ্যে ৮ বার অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রতিটি অপারেশন ছিল একেকটি যুদ্ধ। এক চোখে আজ কেবল আলো-আঁধারির আভাস পান মামুন; আরেক চোখে রয়েছে তিনটি পিলেট, যা তাকে অনবরত ঝাপসা দৃষ্টি আর যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। চোখের পেছনে, মস্তিষ্কে, মাথার পাশে আজও রয়ে গেছে ৬টি পিলেট যা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় ১৮ জুলাইয়ের সেই বিকেলের কথা।
এখনো কোনোদিন হঠাৎ শব্দ হলে বুক কেঁপে ওঠে, কোনো অচেনা মুখ দেখলে মনে হয় সে হয়তো গোয়েন্দা। রাতে ঘুম আসে না, মাথাব্যথা ওঠে জ্বরের মতো, চোখের ভেতর ঝলসে ওঠে আগুনের রেখা। এই তো মামুনের বাস্তবতা; একটি রাষ্ট্রের নির্যাতনের নিঃশব্দ সাক্ষ্য, যেখানে একজন তরুণ কেবল বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অপরাধে এমন নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করেছে।
যে স্বপ্ন এখনো মরেনি
মো. মামুন এখন আর পিকআপ চালাতে পারেন না। চোখের এই অবস্থা নিয়ে তার আর স্টিয়ারিংয়ে বসা চলে না। তিনি এখন মাতুয়াইল এলাকায় একটি ছোট্ট চায়ের দোকান চালান, মা-ভাইয়ের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য। তার জীবন আজ এক অদৃশ্য যুদ্ধের নাম; অভিমান, অভাব, অবিচার আর একরাশ অন্ধকার। কিন্তু হেরে যাননি মামুন। চোখে না দেখলেও হৃদয়ে এখনও দৃশ্যমান স্বপ্ন; একদিন এই দেশ, এই মানুষ, বৈষম্যহীন সমাজে বাঁচবে। যেখানে কেউ আর গুলি খেয়ে বেঁচে থাকার দায়ে চোখ হারাবে না। মো. মামুন সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বর, যে আজও বলে “আমি দেখিনি, কিন্তু আমি জানি; আলো আসবেই।”
প্রস্তাবনা
১। চোখ ও স্নায়ুর উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি খরচে বিদেশে প্রেরণ।
২। স্থায়ী মাসিক ভাতা ও স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা প্রদান।
৩। একটি বিকল্প পেশার জন্য প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ চালু করার সুযোগ প্রদান।
৪। বাসস্থান সংক্রান্ত সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এক নজরে মো: মামুন
নাম : মো: মামুন
জন্ম তারিখ : ০৫/০৯/২০০০
জন্মস্থান : ভোলা
পেশা : ড্রাইভার
প্রতিষ্ঠান : মালিকানা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মাঝেরচর, ইউনিয়ন: সেন্টার বাজার, থানা: চরফ্যাশন, জেলা: ভোলা
বর্তমান ঠিকানা : এলাকা: মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়া (বানিয়ারবাগ), থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মিলন
মায়ের নাম : হাসনা বিবি
পিতার পেশা : ভ্যান চালক, বয়স: ৪৫
মায়ের পেশা : গৃহিণী
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : মিনি পিকআপ ড্রাইভার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. নাম: লামিয়া, বয়স: ১৭, পেশা: ছাত্রী (বর্তমানে লেখাপড়া বন্ধ), শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৯ম পাস
২. নাম: মো: শামীম, বয়স: ১৫, পেশা: ভাইয়ের দোকানে কাজ করেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৫ম শ্রেণি পাস
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ি থানার সামনে (ফ্লাইওভারের উপরে)
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍