হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ বোরহান উদ্দিন সাদিক
🕯️

মোঃ বোরহান উদ্দিন সাদিক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ছাত্র, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

স্মৃতির পাতায় “জুলাই আন্দোলন”

গেজেট নং ২২৫৯
বর্তমান ঠিকানা: মধ্যম মটুয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম–পশ্চিম সোনাই, ডাকঘর–কয়লা বাজার, উপজেলা–মীরশরাই, জেলা–চট্টগ্রাম।



২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন আমার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যা কোনোদিনই ভুলে যাওয়ার নয়। সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, সাহস, ত্যাগ ও প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে পার করা সেই দিনগুলো আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।

আন্দোলনে প্রথম সম্পৃক্ততা

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আমি সর্বপ্রথম ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি। তখন ফেনীর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় ছিল না। ছাগলনাইয়ার ফরহাদ হোসেন রাকিব ভাইয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই কর্মসূচিতে যুক্ত হই। সেদিনই পরিচয় হয় আজিজুল হক ভাই ও মুহাইমিন তাজিম ভাইয়ের সঙ্গে।

এরপর **১৬ জুলাই** ফেনীর রেলগেইট এলাকায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে অংশ নিই। পরদিন, **১৭ জুলাই**, শহরের ট্রাংক রোডস্থ শহীদ মিনারে আয়োজিত কর্মসূচিতেও যোগ দিই।

সেদিন সকাল থেকেই আন্দোলনে অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলা শুরু করে। তারা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীদের একের পর এক আটক করতে থাকে।

শহীদ মিনারে আটক ও নির্যাতন

আমি, **ফরহাদ হোসেন রাকিব ভাই, রফিকুল ইসলাম রনি ভাই, শোয়াইব, শারাফাত হোসেন ভাই এবং নাঈম ফরায়েজী**—আমরা কয়েকজন নবী হোটেলের নিচে একত্রিত হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সেখানে এসে আমাদের আটক করে শহীদ মিনারে নিয়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা সেখানে আটকে রাখে।

আটক অবস্থায় অনেককে কিল-ঘুষি ও মারধর করে আহত করা হয়। আমাদের সবার মোবাইল ফোন জমা দিতে বাধ্য করা হয়। তবে আমি কৌশলে আমার মোবাইল ফোনটি জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকি।

আটক অবস্থায় আমাদের জোরপূর্বক বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। এর মধ্যে ছিল—

জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।”
তুমি কে? আমি কে? বাঙালি, বাঙালি।”
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।”

কেউ স্লোগান দিতে অস্বীকৃতি জানালে, কিংবা আস্তে স্লোগান দিলে, তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, চড়-থাপ্পড় এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

কয়েক ঘণ্টা পর আমাদের পিটিআই স্কুল মাঠে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সুযোগে আমি রেলিং টপকে সেখান থেকে বের হয়ে যেতে সক্ষম হই। এরপর সমবায় মার্কেটের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দ্রুত আন্দোলনের বিভিন্ন গ্রুপে আটককৃতদের বিষয়ে তথ্য জানিয়ে দিই।

সেই সংকটময় মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে সহযোদ্ধাদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াকেই আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে করেছিলাম।

আন্দোলনের দিনগুলো

এরপর থেকে ট্রাংক রোড ও এস.এস.কে. রোড এলাকার প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। এ সময় আন্দোলনের আরও অনেক সমন্বয়কারীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য **প্রিন্স মাহমুদ আজিজ** ও **মানিক ভাই**। মানিক ভাইয়ের নেতৃত্বে রামপুরের একটি কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তাঁদের অবদান ও ভূমিকা আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

একপর্যায়ে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) অফিস থেকে আমাকে একাধিকবার ফোন করা হয়। বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। সেই ফোনালাপ ও আচরণ আমাকে মানসিকভাবে আতঙ্কিত করলেও আমি আন্দোলন থেকে এক পা-ও পিছিয়ে যাইনি।

৪ আগস্ট ২০২৪ — জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন

এরপর আসে ৪ আগস্ট ২০২৪ আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন, ভয়াবহ এবং স্মরণীয় দিনগুলোর একটি।

সকাল প্রায় **১১টার দিকে** পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আমি মহিপাল চত্বরে উপস্থিত হই। কিছুক্ষণ পর তৎকালীন ছাত্রশিবিরের ফেনী জেলা সভাপতি **ইমাম হোসাইন ভাইয়ের** সঙ্গে যোগ দিই। তাঁর নেতৃত্বে স্লোগান দিতে দিতে আমরা মহিপাল বাস কাউন্টার এলাকা থেকে রাস্তায় নেমে ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান গ্রহণ করি।

এক দফা দাবির সেই কর্মসূচিতে অল্প সময়ের মধ্যেই মহিপাল চত্বর ছাত্র-জনতার স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নেন। পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

রাজপথে নামাজ

দুপুর প্রায় **১টার দিকে** মসজিদের মাইকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। আমরা সবাই রাজপথেই জামাতে নামাজ আদায় করি।

সেই নামাজ আমার কাছে ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা—ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একসঙ্গে সেজদাবনত হওয়ার এক বিরল দৃশ্য। চারপাশে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, অথচ সেই মুহূর্তে আমরা সবাই মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছিলাম।

গুলির শব্দ ও আহত হওয়ার ঘটনা

নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ চারদিক থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতা জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন দিকে ছুটে যেতে থাকে। অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।

আমরা তখন ফ্লাইওভারের সামনে অবস্থান নিয়েছিলাম। অনেকে ফ্লাইওভারের ওপরেও অবস্থান করছিলেন। উপরে থাকা অনেকেই গুলির স্প্লিন্টারে আহত হন।

সেই সময় আমার সঙ্গে **ফরহাদ হোসেন রাকিব ভাই** ছিলেন। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আমিও আহত হই। ফরহাদ ভাইও গুলির স্প্লিন্টারে আহত হন।

কিন্তু আহত হয়েও আমাদের মনোবল ভেঙে পড়েনি।

### প্রতিরোধের সেই মুহূর্ত

আমি ও ফরহাদ ভাইসহ আন্দোলনকারীরা ফ্লাইওভারের পাশের একটি মাঠ থেকে ইট সংগ্রহ করে উপরে নিয়ে যাই। সেই মুহূর্তে ইটই ছিল আমাদের আত্মরক্ষার একমাত্র অবলম্বন।

আমরা ছিলাম নিরস্ত্র। আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তবুও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করার মানসিকতা ছিল না। জীবন ও নিরাপত্তার ভয়কে পাশ কাটিয়ে আমরা নিজেদের এবং সহযোদ্ধাদের রক্ষা করার চেষ্টা করি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সংকল্প নিয়েই আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম।

### সেই দিনগুলোর স্মৃতি

আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে ওঠে। ভয় ছিল, আতঙ্ক ছিল, ছিল অনিশ্চয়তা। কিন্তু এসব কিছুর চেয়েও বড় ছিল স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

জুলাই আন্দোলন আমার কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নাম নয়; এটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই আন্দোলন আমাকে শিখিয়েছে—সাহস কী, ত্যাগ কী, ঐক্যের শক্তি কতটা গভীর, বিপদের সময় ধৈর্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি বিশ্বাস মানুষকে কতটা দৃঢ় করে তুলতে পারে।

সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। সময় যতই পেরিয়ে যাক, জীবনের সেই অধ্যায়, সেই মানুষগুলো, সেই রাজপথ এবং সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি আমার মনে আজীবন বেঁচে থাকবে।

জুলাই আন্দোলনের সেই দিনগুলো আমার জীবনের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে—চিরকাল

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍