মো: আমিনুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আমি ১৯৭১ দেখিনি, কিন্তু ২০২৪-এর স্বাধীনতা নিজ চোখে দেখেছি”—পটুয়াখালীর সন্তান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলামের এই উক্তি আজ এক ঐতিহাসিক দলিল। ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার রাজপথে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক যোদ্ধা। শনির আখড়া থেকে শাহবাগ—প্রতিটি রণক্ষেত্রে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন স্বৈরাচারের বর্বরতা, হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ আর সহযোদ্ধাদের শাহাদাত।
৫ আগস্ট সকালে যখন সারা দেশ বিজয়ের প্রহর গুনছে, তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় পুলিশের অতর্কিত গুলিবর্ষণে আমিনুলের শরীরে বিঁধে যায় ২০টি ছররা গুলি। সেই রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে নির্যাতন করা হয়। দুপুরে স্বৈরাচারের পতনের পর মুক্তি পেলেও তার শরীরে রয়ে গেছে সেই দুঃসহ রাতের ক্ষত। আজও তার দেহের অভ্যন্তরে বিঁধে থাকা গুলিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণার জানান দেয়।
পেশায় শিক্ষক আমিনুল বর্তমানে অসুস্থ মা ও অভাবী পরিবারের একমাত্র আশার আলো। কিন্তু শরীরের ভেতরে থাকা এই ‘ধাতব বিষ’ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব তাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিপ্লবের এই অগ্রসেনানী কোনো করুণা নয়, বরং তার ত্যাগ ও মেধার মূল্যায়ন চান।
৫ আগস্ট সকালে যখন সারা দেশ বিজয়ের প্রহর গুনছে, তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় পুলিশের অতর্কিত গুলিবর্ষণে আমিনুলের শরীরে বিঁধে যায় ২০টি ছররা গুলি। সেই রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে নির্যাতন করা হয়। দুপুরে স্বৈরাচারের পতনের পর মুক্তি পেলেও তার শরীরে রয়ে গেছে সেই দুঃসহ রাতের ক্ষত। আজও তার দেহের অভ্যন্তরে বিঁধে থাকা গুলিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণার জানান দেয়।
পেশায় শিক্ষক আমিনুল বর্তমানে অসুস্থ মা ও অভাবী পরিবারের একমাত্র আশার আলো। কিন্তু শরীরের ভেতরে থাকা এই ‘ধাতব বিষ’ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব তাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিপ্লবের এই অগ্রসেনানী কোনো করুণা নয়, বরং তার ত্যাগ ও মেধার মূল্যায়ন চান।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
“প্রতিটি বিপ্লবী বীরদের দায়িত্ব
কে নেবে, বাংলাদেশ না স্বাধীন বাংলাদেশ?”
জন্ম, শিক্ষা ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
মো: আমিনুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন ২০০০ সালের ১৮ মার্চ পটুয়াখালী সদর উপজেলার বড় বিঘাই গ্রামে। বর্তমানে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন এবং পাশাপাশি রেনেসাঁ আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন। পিতার নাম মৃত আফাজ শিকদার, যিনি জীবদ্দশায় ছিলেন একজন দূরদর্শী মানুষ। মাতা মোসা: আছিয়া বেগম, বয়স ৫৭, তিনি বর্তমানে অসুস্থ এবং চিকিৎসা নির্ভর জীবন কাটাচ্ছেন।
ভাই মো: জহিরুল ইসলাম, ৩২ বছর বয়সে ঢাকার একটি জুয়েলার্স দোকানে চাকরি করেন। বড় বোন মাসুমা বেগম, বয়স ৩৪, একজন গৃহিণী। আমিনুল বর্তমানে পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখার মূল ভরসা।“আমি আমার এই জীবনে কখনো সরাসরি যুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখেছি, স্বৈরাচারবিরোধী যুদ্ধ দেখেছি। আমি আমার চোখে দেখা জুলাইয়ের ঘটনাগুলো নিচে উল্লেখ করছি। কোটা আন্দোলন আমাদের শনির আখড়ায় শুরু হয় ১৭ জুলাই, বুধবার ২০২৪। আমি ব্রাইট স্কুলের কাছাকাছি আমার এক স্টুডেন্টকে পড়িয়ে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ দেখি একটি অ্যাম্বুলেন্স ধোলাইপাড়ের দিকে দ্রুত গতিতে যাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর দেখি ছাত্রদের একটি দল ছুটে আসছে। এই অবস্থা দেখে দোকানপাটের লোকজন ও রাস্তার সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন দোকান ও জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। আমিও কিছু না বুঝে তাদের সঙ্গে দৌড়ে একটি দোকানে আশ্রয় নিই। কিছুক্ষণ পর বাইরে বের হয়ে শুনি, আমি টিউশন থেকে বের হয়ে যে অ্যাম্বুলেন্সটি দেখেছিলাম সেটিতে করে নাকি ছাত্রলীগের কিছু সন্ত্রাসী এসে বর্ণমালা স্কুলের সামনে বোমা মেরে পালিয়ে যায় এবং আমাদের এক ভাই স্পটেই শহীদ হন। এজন্যই ছাত্ররা ওই অ্যাম্বুলেন্সটিকে ধাওয়া করেছিল। এরপর বর্ণমালা স্কুলের সামনে এসে দেখি, পুলিশ সেখানে গুলি চালাচ্ছে। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং সরাসরি গুলি করছে। পুলিশের সেই গুলিতে আমাদের একজন ভাই শহীদ হন। আমি তখন বর্ণমালা স্কুল সংলগ্ন একটি মসজিদে আশ্রয় নিই। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শনির আখড়া বাজারে আসতে যাই, কিন্তু আবারও পুলিশের টিয়ারশেলে আমার চোখ জ্বালাপোড়া শুরু করে, প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। জীবনে প্রথমবার টিয়ারশেলের মুখোমুখি হই। সেদিন রাতে ভাবলাম এই কোটা আন্দোলন একটি যৌক্তিক, ন্যায়সংগত আন্দোলন। এই স্বৈরাচার কেবল কোটা নয়, আমাদের সব অধিকারই হরণ করছে। আমি বুঝলাম, যদি আমার ভাইয়েরা হেরে যায়, তাহলে হারবে পুরো বাংলাদেশ। আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। পরদিন, ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার থেকে আমি আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে যোগ দেই। আমি শনির আখড়া-যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থান করি। আন্দোলনে গিয়ে দেখি কিভাবে নিরস্ত্র মানুষদের পাখির মতো মারছে ফ্যাসিস্ট পুলিশের দল। মাগরিবের পর, শনির আখড়া মেইন রোডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম, রায়েরবাগ ও যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স, টেম্পু, রিকশায় করে শুধু রক্তাক্ত ভাইদের আনা হচ্ছে। সালমান মেডিকেলে তখন আহত ও নিহত ভাইদের দিয়ে পুরো হাসপাতাল ভরে গেছে। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন ফিলিস্তিনে আছি। মনে হচ্ছিল, ইসরাইলের বর্বর হামলার শিকার মুসলিমদের মতোই আমরা আক্রান্ত হচ্ছি। এরপর শুক্রবার ১৯ জুলাই আমি সারা দিন যাত্রাবাড়ীতে ছিলাম। আসরের নামাজের পর ফ্লাইওভারের উপর পুলিশের সাঁজোয়া যান ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। রাত ৯টার দিকে ফ্লাইওভারের ওপর সাঁজোয়া যান আমাদের দিকে ছুটে আসে। উপায়ান্তর না পেয়ে আমি ফ্লাইওভার থেকে লাফ দিই। আমাদের দুই ভাই আটকা পড়ে এবং পুলিশ তাদের স্পটেই গুলি করে হত্যা করে। রাত ১০টার পর হঠাৎ দেখি, একে একে আমাদের ভাইয়েরা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাচ্ছে। গুলির আওয়াজ শোনা গেলেও বোঝা যাচ্ছিল না কে করছে। পরে বুঝলাম, বিভিন্ন ভবন থেকে গুলি করছে। যাত্রাবাড়ী থেকে রায়েরবাগ পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও পুলিশের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন ভবনে ঢুকে আমাদের ভাইদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছিল। আমি দেখেছি, রায়েরবাগ ও শনির আখড়ায় হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হচ্ছে। পুরো এলাকা যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ভবন ও হেলিকপ্টার থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয়। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও ভারতের 'র' সেনারা আমাদের ভাইদের নির্মমভাবে হত্যা করে যাচ্ছিল। এরপর ৪ তারিখ সকালে শাহবাগ যাই। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের ভেতর থেকে ছাত্রলীগের গুন্ডারা আমাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। আমরা গেটভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পাল্টা প্রতিরোধ করি। দুপুরে দেখি বাংলা মোটর ফার্মগেটের মোড় থেকে গুলিবিদ্ধ ভাইদের রক্তাক্ত অবস্থায় শাহবাগে আনা হচ্ছে। আমরা তখন একটি দল নিয়ে বাংলামোটরের দিকে যাই। সেখানে বিভিন্ন ভবন থেকেও আমাদের ওপর গুলি ছোড়া হয়। সামনেই পুলিশ আর পেছনে ছাত্রলীগ। আমরা পাল্টা প্রতিরোধ করে ফার্মগেট মোড় দখল করি। পুরো দিন জুড়ে চলছিল যুদ্ধ। রাস্তায় রেলিংয়ে আওয়াজ করে ভাইদের সংকেত দিতাম। "এদিকে আসেন, আমাদের ভাইদের মেরে ফেলছে।" এই লড়াই চলেছিল মাগরিব পর্যন্ত। সেদিন রাতেই ঘোষণা আসে, "মার্চ টু ঢাকা" হবে ৫ তারিখেই, ৬ তারিখ নয়। আমার জুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় একটি নতুন জুতা কিনি, যেন দৌড়াতে সুবিধা হয়। পরদিন সকাল ৮টায় পাঁচ ভাই একসঙ্গে শনির আখড়া যাই। কুতুবখালী রোডে পুলিশের চতুর্মুখী অবস্থান ছিল। আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে শহীদ মিনারের দিকে যাই। সেখানে এক থেকে দেড়শ ভাই একত্রিত হই। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে দুই দিকের রাস্তা ব্লক করে ৫০ জনের বেশি পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলে এবং অতর্কিতে গুলি বর্ষণ শুরু করে। ছত্রভঙ্গ হই। দেয়াল টপকাতে গিয়ে এক মেয়ে গুলিতে নিহত হয়। আমি ও আরেক ভাই গুলি খেয়ে পড়ে যাই। কোনো রকমে দৌড়ে নজরুল সমাধির পাশে আশ্রয় নিই। সেখানে দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী আমাদেরকে সাহায্য করেন। দুইজন ছাত্র পানি দেয়। আমি আমার সহযোদ্ধার গুলি উঠাতে সাহায্য করি। পরে রিকশা করে বকশিবাজার মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ আমাদের নামিয়ে আটক করে, ফোন কেড়ে নেয়, শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। সেখানে গালাগালি ও নির্যাতন করে। দুপুরে শুনি স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়েছে। এরপর ৩টার দিকে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এখনও আমার শরীরে ছররা গুলি রয়েছে। সানগ্লাস ভেঙে যাওয়ায় আমি তখন কিছুই দেখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, চিরতরে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বের হতে পেরেছিলাম।
বের হয়ে দেখি, রাজপথ পঙ্গপালের মতো মানুষের ঢল। সবাই হাসছে, বিজয় উৎযাপন করছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি ১৯৭১ দেখিনি, কিন্তু ২০২৪-এর স্বাধীনতা নিজ চোখে দেখলাম। ৫ আগস্ট আমি স্বাধীনতার সেই অমোঘ স্বাদ পেলাম। যা মিষ্টি, আনন্দদায়ক, এবং গর্বের।
পেশাগত জীবন ও সংগ্রাম
বর্তমানে তিনি একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এত বড় শারীরিক ক্ষতি ও মানসিক ট্রমা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত তিনি ভালো একটি চাকরি পাননি। অর্থনৈতিকভাবে নিজের ও পরিবারের দেখাশোনা করার মতো উপার্জন নেই।
পরিবারে নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
বৃদ্ধা ও অসুস্থ মা, বেকার বোন ও স্বল্প আয়ের ভাইয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারটির এখন একমাত্র আশার আলো আমিনুল ইসলাম। কিন্তু তার শরীরের অভ্যন্তরে থাকা গুলিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোনো সময় এসব গুলি মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে।
সাহসী তরুণের আকুতি
মো: আমিনুল ইসলাম একজন সাহসী ছাত্র, একজন শিক্ষক, একজন প্রতিবাদকারী এবং সর্বোপরি একজন দায়িত্বশীল পুত্র। তার গুলিবিদ্ধ দেহ ও মন আজও আন্দোলনের ইতিহাস বহন করছে। তিনি চান, চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থা হোক এবং জীবনের একটি সম্মানজনক চাকরি পাওয়া যাতে পরিবারসহ সে মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারে।
পুনর্বাসন প্রস্তাবনা
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম এই অগ্রপথিক মো: আমিনুল ইসলামের শারীরিক পুনর্বাসন ও নিরাপদ অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা না করা হলে ভবিষ্যতে সে পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। তার চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং একটি সম্মানজনক চাকরি তার ন্যায্য অধিকার।
এক নজরে মো: আমিনুল ইসলাম
নাম : মো: আমিনুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১৮-০৩-২০০০
বর্তমান পেশা : ছাত্র, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
খণ্ডকালীণ শিক্ষক, রেনেসাঁ আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা : বড় বিঘাই, পটুয়াখালী সদর, পটুয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : গোবিন্দপুর, দনিয়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
পিতা : মৃত আফাজ শিকদার
মাতা : মোসা: আছিয়া বেগম, বয়স : ৫৭ বছর, অসুস্থ
ভাই-বোনের বিবরণ
১. ভাই, মো: জহিরুল ইসলাম, বয়স: ৩২ বছর, পেশা: চাকরি; জুয়েলার্সের দোকান
২. বোন, মাসুমা বেগম, বয়স: ৩৪ বছর, গৃহিণী
আহত বিবরণ
আক্রমণকারী : শাহবাগ ও অন্যান্য থানার পুলিশ বাহিনী
আঘাতের ধরন : শরীরে ২০টি গুলিবিদ্ধ
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকা শহীদ মিনার
আহত হওয়ার তারিখ : ৫ আগস্ট ২০২৪, সময়: সকাল ১০.০০টা
কে নেবে, বাংলাদেশ না স্বাধীন বাংলাদেশ?”
জন্ম, শিক্ষা ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
মো: আমিনুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন ২০০০ সালের ১৮ মার্চ পটুয়াখালী সদর উপজেলার বড় বিঘাই গ্রামে। বর্তমানে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন এবং পাশাপাশি রেনেসাঁ আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন। পিতার নাম মৃত আফাজ শিকদার, যিনি জীবদ্দশায় ছিলেন একজন দূরদর্শী মানুষ। মাতা মোসা: আছিয়া বেগম, বয়স ৫৭, তিনি বর্তমানে অসুস্থ এবং চিকিৎসা নির্ভর জীবন কাটাচ্ছেন।
ভাই মো: জহিরুল ইসলাম, ৩২ বছর বয়সে ঢাকার একটি জুয়েলার্স দোকানে চাকরি করেন। বড় বোন মাসুমা বেগম, বয়স ৩৪, একজন গৃহিণী। আমিনুল বর্তমানে পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখার মূল ভরসা।“আমি আমার এই জীবনে কখনো সরাসরি যুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখেছি, স্বৈরাচারবিরোধী যুদ্ধ দেখেছি। আমি আমার চোখে দেখা জুলাইয়ের ঘটনাগুলো নিচে উল্লেখ করছি। কোটা আন্দোলন আমাদের শনির আখড়ায় শুরু হয় ১৭ জুলাই, বুধবার ২০২৪। আমি ব্রাইট স্কুলের কাছাকাছি আমার এক স্টুডেন্টকে পড়িয়ে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ দেখি একটি অ্যাম্বুলেন্স ধোলাইপাড়ের দিকে দ্রুত গতিতে যাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর দেখি ছাত্রদের একটি দল ছুটে আসছে। এই অবস্থা দেখে দোকানপাটের লোকজন ও রাস্তার সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন দোকান ও জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। আমিও কিছু না বুঝে তাদের সঙ্গে দৌড়ে একটি দোকানে আশ্রয় নিই। কিছুক্ষণ পর বাইরে বের হয়ে শুনি, আমি টিউশন থেকে বের হয়ে যে অ্যাম্বুলেন্সটি দেখেছিলাম সেটিতে করে নাকি ছাত্রলীগের কিছু সন্ত্রাসী এসে বর্ণমালা স্কুলের সামনে বোমা মেরে পালিয়ে যায় এবং আমাদের এক ভাই স্পটেই শহীদ হন। এজন্যই ছাত্ররা ওই অ্যাম্বুলেন্সটিকে ধাওয়া করেছিল। এরপর বর্ণমালা স্কুলের সামনে এসে দেখি, পুলিশ সেখানে গুলি চালাচ্ছে। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং সরাসরি গুলি করছে। পুলিশের সেই গুলিতে আমাদের একজন ভাই শহীদ হন। আমি তখন বর্ণমালা স্কুল সংলগ্ন একটি মসজিদে আশ্রয় নিই। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শনির আখড়া বাজারে আসতে যাই, কিন্তু আবারও পুলিশের টিয়ারশেলে আমার চোখ জ্বালাপোড়া শুরু করে, প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। জীবনে প্রথমবার টিয়ারশেলের মুখোমুখি হই। সেদিন রাতে ভাবলাম এই কোটা আন্দোলন একটি যৌক্তিক, ন্যায়সংগত আন্দোলন। এই স্বৈরাচার কেবল কোটা নয়, আমাদের সব অধিকারই হরণ করছে। আমি বুঝলাম, যদি আমার ভাইয়েরা হেরে যায়, তাহলে হারবে পুরো বাংলাদেশ। আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। পরদিন, ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার থেকে আমি আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে যোগ দেই। আমি শনির আখড়া-যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থান করি। আন্দোলনে গিয়ে দেখি কিভাবে নিরস্ত্র মানুষদের পাখির মতো মারছে ফ্যাসিস্ট পুলিশের দল। মাগরিবের পর, শনির আখড়া মেইন রোডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম, রায়েরবাগ ও যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স, টেম্পু, রিকশায় করে শুধু রক্তাক্ত ভাইদের আনা হচ্ছে। সালমান মেডিকেলে তখন আহত ও নিহত ভাইদের দিয়ে পুরো হাসপাতাল ভরে গেছে। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন ফিলিস্তিনে আছি। মনে হচ্ছিল, ইসরাইলের বর্বর হামলার শিকার মুসলিমদের মতোই আমরা আক্রান্ত হচ্ছি। এরপর শুক্রবার ১৯ জুলাই আমি সারা দিন যাত্রাবাড়ীতে ছিলাম। আসরের নামাজের পর ফ্লাইওভারের উপর পুলিশের সাঁজোয়া যান ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। রাত ৯টার দিকে ফ্লাইওভারের ওপর সাঁজোয়া যান আমাদের দিকে ছুটে আসে। উপায়ান্তর না পেয়ে আমি ফ্লাইওভার থেকে লাফ দিই। আমাদের দুই ভাই আটকা পড়ে এবং পুলিশ তাদের স্পটেই গুলি করে হত্যা করে। রাত ১০টার পর হঠাৎ দেখি, একে একে আমাদের ভাইয়েরা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাচ্ছে। গুলির আওয়াজ শোনা গেলেও বোঝা যাচ্ছিল না কে করছে। পরে বুঝলাম, বিভিন্ন ভবন থেকে গুলি করছে। যাত্রাবাড়ী থেকে রায়েরবাগ পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও পুলিশের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন ভবনে ঢুকে আমাদের ভাইদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছিল। আমি দেখেছি, রায়েরবাগ ও শনির আখড়ায় হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হচ্ছে। পুরো এলাকা যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ভবন ও হেলিকপ্টার থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয়। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও ভারতের 'র' সেনারা আমাদের ভাইদের নির্মমভাবে হত্যা করে যাচ্ছিল। এরপর ৪ তারিখ সকালে শাহবাগ যাই। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের ভেতর থেকে ছাত্রলীগের গুন্ডারা আমাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। আমরা গেটভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পাল্টা প্রতিরোধ করি। দুপুরে দেখি বাংলা মোটর ফার্মগেটের মোড় থেকে গুলিবিদ্ধ ভাইদের রক্তাক্ত অবস্থায় শাহবাগে আনা হচ্ছে। আমরা তখন একটি দল নিয়ে বাংলামোটরের দিকে যাই। সেখানে বিভিন্ন ভবন থেকেও আমাদের ওপর গুলি ছোড়া হয়। সামনেই পুলিশ আর পেছনে ছাত্রলীগ। আমরা পাল্টা প্রতিরোধ করে ফার্মগেট মোড় দখল করি। পুরো দিন জুড়ে চলছিল যুদ্ধ। রাস্তায় রেলিংয়ে আওয়াজ করে ভাইদের সংকেত দিতাম। "এদিকে আসেন, আমাদের ভাইদের মেরে ফেলছে।" এই লড়াই চলেছিল মাগরিব পর্যন্ত। সেদিন রাতেই ঘোষণা আসে, "মার্চ টু ঢাকা" হবে ৫ তারিখেই, ৬ তারিখ নয়। আমার জুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় একটি নতুন জুতা কিনি, যেন দৌড়াতে সুবিধা হয়। পরদিন সকাল ৮টায় পাঁচ ভাই একসঙ্গে শনির আখড়া যাই। কুতুবখালী রোডে পুলিশের চতুর্মুখী অবস্থান ছিল। আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে শহীদ মিনারের দিকে যাই। সেখানে এক থেকে দেড়শ ভাই একত্রিত হই। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে দুই দিকের রাস্তা ব্লক করে ৫০ জনের বেশি পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলে এবং অতর্কিতে গুলি বর্ষণ শুরু করে। ছত্রভঙ্গ হই। দেয়াল টপকাতে গিয়ে এক মেয়ে গুলিতে নিহত হয়। আমি ও আরেক ভাই গুলি খেয়ে পড়ে যাই। কোনো রকমে দৌড়ে নজরুল সমাধির পাশে আশ্রয় নিই। সেখানে দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী আমাদেরকে সাহায্য করেন। দুইজন ছাত্র পানি দেয়। আমি আমার সহযোদ্ধার গুলি উঠাতে সাহায্য করি। পরে রিকশা করে বকশিবাজার মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ আমাদের নামিয়ে আটক করে, ফোন কেড়ে নেয়, শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। সেখানে গালাগালি ও নির্যাতন করে। দুপুরে শুনি স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়েছে। এরপর ৩টার দিকে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এখনও আমার শরীরে ছররা গুলি রয়েছে। সানগ্লাস ভেঙে যাওয়ায় আমি তখন কিছুই দেখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, চিরতরে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বের হতে পেরেছিলাম।
বের হয়ে দেখি, রাজপথ পঙ্গপালের মতো মানুষের ঢল। সবাই হাসছে, বিজয় উৎযাপন করছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি ১৯৭১ দেখিনি, কিন্তু ২০২৪-এর স্বাধীনতা নিজ চোখে দেখলাম। ৫ আগস্ট আমি স্বাধীনতার সেই অমোঘ স্বাদ পেলাম। যা মিষ্টি, আনন্দদায়ক, এবং গর্বের।
পেশাগত জীবন ও সংগ্রাম
বর্তমানে তিনি একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এত বড় শারীরিক ক্ষতি ও মানসিক ট্রমা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত তিনি ভালো একটি চাকরি পাননি। অর্থনৈতিকভাবে নিজের ও পরিবারের দেখাশোনা করার মতো উপার্জন নেই।
পরিবারে নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
বৃদ্ধা ও অসুস্থ মা, বেকার বোন ও স্বল্প আয়ের ভাইয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারটির এখন একমাত্র আশার আলো আমিনুল ইসলাম। কিন্তু তার শরীরের অভ্যন্তরে থাকা গুলিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোনো সময় এসব গুলি মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে।
সাহসী তরুণের আকুতি
মো: আমিনুল ইসলাম একজন সাহসী ছাত্র, একজন শিক্ষক, একজন প্রতিবাদকারী এবং সর্বোপরি একজন দায়িত্বশীল পুত্র। তার গুলিবিদ্ধ দেহ ও মন আজও আন্দোলনের ইতিহাস বহন করছে। তিনি চান, চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থা হোক এবং জীবনের একটি সম্মানজনক চাকরি পাওয়া যাতে পরিবারসহ সে মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারে।
পুনর্বাসন প্রস্তাবনা
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম এই অগ্রপথিক মো: আমিনুল ইসলামের শারীরিক পুনর্বাসন ও নিরাপদ অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা না করা হলে ভবিষ্যতে সে পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। তার চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং একটি সম্মানজনক চাকরি তার ন্যায্য অধিকার।
এক নজরে মো: আমিনুল ইসলাম
নাম : মো: আমিনুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১৮-০৩-২০০০
বর্তমান পেশা : ছাত্র, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
খণ্ডকালীণ শিক্ষক, রেনেসাঁ আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা : বড় বিঘাই, পটুয়াখালী সদর, পটুয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা : গোবিন্দপুর, দনিয়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
পিতা : মৃত আফাজ শিকদার
মাতা : মোসা: আছিয়া বেগম, বয়স : ৫৭ বছর, অসুস্থ
ভাই-বোনের বিবরণ
১. ভাই, মো: জহিরুল ইসলাম, বয়স: ৩২ বছর, পেশা: চাকরি; জুয়েলার্সের দোকান
২. বোন, মাসুমা বেগম, বয়স: ৩৪ বছর, গৃহিণী
আহত বিবরণ
আক্রমণকারী : শাহবাগ ও অন্যান্য থানার পুলিশ বাহিনী
আঘাতের ধরন : শরীরে ২০টি গুলিবিদ্ধ
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকা শহীদ মিনার
আহত হওয়ার তারিখ : ৫ আগস্ট ২০২৪, সময়: সকাল ১০.০০টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍