হোম / আহতদের তালিকা / মো: বিল্লাল মিয়া
মো: বিল্লাল মিয়া

মো: বিল্লাল মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের সাহসী যুবক মো. বিল্লাল মিয়া ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র আশার প্রদীপ। ২০০০ সালে জন্ম নেওয়া বিল্লাল শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে জীবন যুদ্ধের মুখোমুখি হন। দুই মেয়ে—সুমাইয়া (৭) ও মারিয়া (৪)-র সুন্দর ভবিষ্যৎ আর অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ঢাকার রাজপথে ভাড়ায় পিকআপ চালাতেন তিনি।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; দিনটি ছিল বিল্লালের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যাওয়ার দিন। বিকেলে কাজ শেষে গ্যারেজে গাড়ি রেখে বাসায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায়। একাধিক গুলি তার পেট, কোমর ও দুই পা ঝাঁঝরা করে শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। রাজপথে লুটিয়ে পড়া বিল্লালের রক্তে ভিজে যায় ঢাকার মাটি।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার ইতিহাস। ঢাকা মেডিকেল থেকে মিটফোর্ড, এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তায় তাকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। প্রায় ৮ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হলেও বিল্লালের শরীর এখন প্রায় সম্পূর্ণ অবশ। পঙ্গুত্বের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় ঢাকার ভাড়া বাসা ছেড়ে এখন কিশোরগঞ্জের জরাজীর্ণ ভিটায় আশ্রয় নিয়েছে পরিবারটি। অর্থাভাবে বড় মেয়ে সুমাইয়ার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

বিল্লাল কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, ছিলেন এক সাধারণ শ্রমজীবী। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের নৃশংসতা তাকে আজ অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। একসময়ের উপার্জনক্ষম এই মানুষটি আজ এক নিঃসঙ্গ প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন—কবে তিনি আবার সুস্থ হয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারবেন।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

একজন নিরীহ পিকআপ
চালকের জীবনগাথা
মো: বিল্লাল মিয়া
ক্রমিক: ০৬৩
আইডি: ঢাকা সিটি ০৬৩
জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি
বিল্লাল মিয়া, একজন সাধারণ ঘরের সাহসী যুবক, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোঃ ওহাব মিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন বহু আগেই, ফলে ছোট বয়স থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় বিল্লালকে। তার মা মোসাম্মৎ নাসিমা একজন গৃহিণী, বয়স ৪৫ বছর। সংসারে বিল্লালই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবার বলতে মা, স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং তিনি নিজে মোট পাঁচ জন সদস্য। এছাড়াও রয়েছে তিন জন বিবাহিত বোন: মোসা: রাবেয়া, মোসা: খাদিজা এবং মোসা: ফাহিমা, যারা বর্তমানে গৃহিণী। পারিবারিক জীবনে শান্ত ও যত্নশীল স্বভাবের মানুষ ছিলেন বিল্লাল। ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় মা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতেন। গ্রামের জরাজীর্ণ পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে এবং মায়ের অসুস্থতাজনিত প্রয়োজনে ঢাকায় বসতি স্থাপন করেন তিনি। পৈতৃকভাবে তার কোনো জমি নেই, মায়ের নামে মাত্র দুই শতক জমি রয়েছে কিশোরগঞ্জে। সেই জমিতেও বসবাসের উপযোগী কোনো ঘর নেই।
কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
পেশাগত জীবনে বিল্লাল মিয়া ছিলেন একজন পিকআপ ভ্যানচালক। ভাড়ায় চালিত গাড়ির মাধ্যমে প্রতিদিনের খরচ চালানোই ছিল তার মূল অবলম্বন। ভোরে ঘুম থেকে উঠে গাড়ি নিয়ে বের হতেন, কখনো মালামাল পৌঁছাতে, কখনো বাসা বাড়ির মালামাল পরিবর্তন। এই কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি পরিবারে হাসি ফোটাতেন। মাসে যতটুকু আয় হতো, তার সবটাই ব্যয় করতেন সন্তানদের পড়ালেখা, পরিবারের ভরণপোষণ এবং অসুস্থ মায়ের ওষুধ-পথ্যে। বিল্লালের দুই মেয়ে সুমাইয়া (৭ বছর) প্রথম শ্রেণির ছাত্রী এবং ছোট মেয়ে মারিয়া (৪ বছর) এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। বাবার ভালোবাসা, যত্ন এবং স্বপ্নে বড় হচ্ছিল তারা। বিল্লালের জীবনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ। সেই কালো দিন (১৯ জুলাই ২০২৪) ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই এই দিনটি বিল্লাল মিয়ার জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। প্রতিদিনের মতোই সে দিনটিতেও তিনি গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন জীবিকার তাগিদে। সকাল থেকে রাজধানীর পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত সার দশে চলছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে কাজ শেষ করে গ্যারেজে গাড়ি রেখে বাসায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা কোনো পূর্ব কারণ ছাড়াই তার উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলির আঘাতে তার পেট, কোমর এবং দুই পা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। শরীর ভেদ করে গুলি প্রবেশ করে বেরিয়ে যায়। একটি বা দু’টি নয়, একাধিক গুলি। যেন কোনো সন্ত্রাসীকে হত্যা করতে পুলিশ যেভাবে টার্গেটেড শুট করে, সেভাবেই একজন নিরীহ পিকআপ চালকের শরীরকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলে রাষ্ট্রের আইনের রক্ষকরা। রাস্তার মাঝখানে লুটিয়ে পড়েন বিল্লাল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পথ। আশপাশের মানুষেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ এগিয়ে এসে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসা ও শারীরিক ক্ষয় প্রথমে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে গুলি বের না করে শুধু ব্যান্ডেজ করে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাও মাত্র এক রাত রাখার জন্য ২০ হাজার টাকার বিল করে দেয়া হয় পরিবারকে। পরদিন ২০ জুলাই বিল্লাল মিয়াকে মিডফোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৬ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। গুলি বের করতে অপারেশন করা হয়, অপারেশনের খরচ, ওষুধপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সব মিলিয়ে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসনের লড়াই। গুলির আঘাতে তার শরীরের অনেকাংশে স্নায়বিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পায়ে ও কোমরে এখনও যন্ত্রণা রয়েছে। বর্তমানে শরীর একপ্রকার সম্পূর্ণ অবশ। চিকিৎসা ব্যয় ও সহযোগিতা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। কোনো আয় নেই, জমি নেই, নিজের ঘর নেই তারপরেও ছোট ছোট দুই মেয়ের মুখ চেয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময় নতুন বাংলাদেশ তার পাশে এসে দাঁড়ায়। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৩ লক্ষ টাকা। ডিসি অফিস থেকে ২ লক্ষ টাকা ও সেনাপ্রধানের মাধ্যমে ৫ লক্ষ টাকা উপহার প্রদান করা হয়। এই সহায়তায় চিকিৎসার কিছু অংশ মেটানো সম্ভব হয়, কিন্তু খরচ এখানেই থেমে নেই। এরপর তাকে সরকারিভাবে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ৮ লক্ষ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এখনও চিকিৎসা চলমান। আবারও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনেফিরে আসতে পারবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বর্তমান অবস্থা ও জীবন সংগ্রাম
পরিবারের সবাই বর্তমানে কিশোরগঞ্জে ফিরে গিয়েছে। ঢাকার ভাড়া বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে, কারণ আয় বলতে কিছু নেই এখন। বসবাসের অনুপযোগী হলেও জরাজীর্ণ সে ঘরটি এখন একমাত্র অবলম্বন। বিল্লাল মিয়ার মা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। মেয়েরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, স্ত্রী দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। একসময় যে মানুষ পরিবার চালাতেন, আজ তিনিই অক্ষম, অপারগ ও নির্ভরশীল।
লেখক কথন
একজন নিরীহ পিকআপ চালক, যিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন, যিনি শুধু জীবন ও জীবিকার জন্য রাস্তায় বেরিয়েছিলেন। তাকে আওয়ামী পুলিশ গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেবে? এ প্রশ্ন শুধু বিল্লালের নয়, গোটা সমাজের সামনে এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে আছে। এই ঘটনার মাধ্যমে খুনী হাসিনা ও তার পালিত বাহিনীর দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতার চিত্র।
বিল্লাল মিয়ার জীবন এখন শুধুই অপেক্ষা। কখন আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন, কখন আবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারবেন, কখন আবার পরিবারের হাল ধরতে পারবেন। কিন্তু এই অপেক্ষা এক নিঃসঙ্গ প্রতীক্ষা হয়ে আছে। আমাদের উচিত, বিল্লাল মিয়াদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ একটি জাতি তখনই উন্নত হয়, যখন সে তার নিপীড়িত মানুষদের ঘাড়ে হাত রেখে বলে “তুমি একা নও।”
প্রস্তাবনা
১. নিজ গ্রামে বসবাসযোগ্য একটি ঘর নির্মাণে সহায়তা।
২. তার নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা বা মাসিক অনুদান চালু।
৩. তার স্ত্রী বা মায়ের নামে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিয়ে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা।
৪. দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য সরকারি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা।
৫. বিল্লাল মিয়ার সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া।

এক নজরে মো বিল্লাল মিয়া
নাম : মো: বিল্লাল মিয়া
জন্ম তারিখ : ০১-০১-২০০০
জন্মস্থান : কিশোরগঞ্জ
পেশা : ড্রাইভার (পিকআপ ড্রাইভার)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: হোসেনপুর, ৫ নং ওয়ার্ড, থানা: হোসেনপুর, জেলা: কিশোরগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা : বাগিচা রোড, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা
পিতা : মৃত মো: ওহাব মিয়া
মাতা : মোসা: নাসিমা, গৃহিণী, বয়স: ৪৫ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
বোনদের বিবরণ
বোন: ৩ জন
১. মোসা: রাবেয়া, গৃহিণী
২. মোসা: খাদিজা, গৃহিণী
৩. মোসা: ফাহিমা, গৃহিণী
সন্তানদের বিবরণ
মেয়ে : ২ জন
১. সুমাইয়া, বয়স: ৭ বছর, শ্রেণি: ১ম
২. মারিয়া, বয়স: ৪ বছর
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ি
আহত হওয়ার সময় : তারিখ: ১৯ জুলাই ২০২৪, সময়: বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী
আক্রমণের ধরন : দুই পা, বুকে গুলিবিদ্ধ, গুলি শরীরভেদ করে বেরিয়ে যায়

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍