মো: আবুল বাশার
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আমার দায়িত্বই তো ওদের পাশে থাকা সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় ৫ আগস্টের সেই রক্তঝরা বিকেলে এভাবেই নিজের দায়িত্বের জানান দিয়েছিলেন শরীয়তপুরের সন্তান, পিকআপ চালক মো. আবুল বাশার। ১৯৮৫ সালে জন্ম নেওয়া বাশার অতি কষ্টে সংসার চালিয়েছেন, কিন্তু কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।
৫ আগস্ট ২০২৪; সারা দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে ভাসছে, যাত্রাবাড়ী তখনো ছিল স্বৈরাচারের ঘাতক পুলিশের রণক্ষেত্র। বিকেল ৪টায় যাত্রাবাড়ী মোড়ে এক নারকীয় গুলিবর্ষণে বাশারের বাম পা ছিঁড়ে বিঁধে যায় ছররা গুলি। ছাত্রদের কাঁধে ভর করে হাসপাতালে পৌঁছালেও সুস্থতা এখনো সুদূর পরাহত। শরীরে বিঁধে থাকা ছররা গুলি আর ছিঁড়ে যাওয়া পেশি তাকে আজ পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে পা দিয়ে তিনি পিকআপের প্যাডেল চেপে পরিবারের মুখে আহার তুলে দিতেন, সেই পা আজ কর্মহীন, যন্ত্রণাদগ্ধ।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে বুশরা আর প্রথম শ্রেণির ছেলে ওমর ফারুকের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারে। অর্থাভাবে থমকে গেছে বাশারের চিকিৎসা, বন্ধ হওয়ার উপক্রম সন্তানদের পড়াশোনা। বাশার কোনো রাজনৈতিক পদধারী নন, কিন্তু তিনি সেই সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, যাদের রক্তে অর্জিত হয়েছে এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা।
৫ আগস্ট ২০২৪; সারা দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে ভাসছে, যাত্রাবাড়ী তখনো ছিল স্বৈরাচারের ঘাতক পুলিশের রণক্ষেত্র। বিকেল ৪টায় যাত্রাবাড়ী মোড়ে এক নারকীয় গুলিবর্ষণে বাশারের বাম পা ছিঁড়ে বিঁধে যায় ছররা গুলি। ছাত্রদের কাঁধে ভর করে হাসপাতালে পৌঁছালেও সুস্থতা এখনো সুদূর পরাহত। শরীরে বিঁধে থাকা ছররা গুলি আর ছিঁড়ে যাওয়া পেশি তাকে আজ পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে পা দিয়ে তিনি পিকআপের প্যাডেল চেপে পরিবারের মুখে আহার তুলে দিতেন, সেই পা আজ কর্মহীন, যন্ত্রণাদগ্ধ।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে বুশরা আর প্রথম শ্রেণির ছেলে ওমর ফারুকের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারে। অর্থাভাবে থমকে গেছে বাশারের চিকিৎসা, বন্ধ হওয়ার উপক্রম সন্তানদের পড়াশোনা। বাশার কোনো রাজনৈতিক পদধারী নন, কিন্তু তিনি সেই সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, যাদের রক্তে অর্জিত হয়েছে এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
বাশার হেসে বলেছিলেন
“আমার দায়িত্বই তো ওদের পাশে থাকা”
জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
মো: আবুল বাশার ১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শরিয়তপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত বিনোদপুর ডালিকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে প্রতিদিনের রুটি-রুজির সংগ্রাম ছিল জীবনের নিত্য সঙ্গী। পিতা ইউনুস আলী ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। গ্রামীণ জীবনের একান্ত সাদামাটা একজন মানুষ হিসেবে ইউনুস আলী দিন এনে দিন খাওয়া সংসারে জীবনের কঠিন সত্যগুলো খুব ছোটবেলায়ই বাশারকে শিখিয়ে দেন। মাতা সূর্যবানু ছিলেন একজন ঘরকন্যার দায়িত্বে নিবেদিতপ্রাণ নারী। অল্প বয়সেই মো: আবুল বাশার নিজের চোখে দেখেছেন। অভাবের ভিতরও সততার সঙ্গে বেঁচে থাকার সংগ্রাম কেমন হয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা কখনোই ভালো ছিল না।
ছোটবেলায় গ্রামে একটি টিনের ঘরে বেড়ে ওঠেন তিনি। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরের মধ্যে পড়ে, শীতকালে কুয়াশা ঘরের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ত। পড়াশোনার সময় তার হাতে চিরকালই ছিল কুপি কিংবা হারিকেন। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে শিক্ষা জীবন বেশিদূর এগোয়নি। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে জীবিকার তাগিদে পিতার সঙ্গে মাঠে-ঘাটে কাজ করতে শুরু করেন। বাল্যকাল থেকেই তার মধ্যে ছিল এক ধরনের দায়িত্ববোধ। বাবা-মা যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন, তখন সংসারের ভার নিজের কাঁধেই তুলে নেন বাশার। পরে একজন ভাড়ায় চালিত পিকআপ চালক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পণ্য পরিবহনের কাজ করতেন। কখনো ফল-মূল, কখনো কাপড়-চোপড়, আবার কখনো নির্মাণ সামগ্রী, বিভিন্ন পণ্য নিয়ে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলে, আবার গ্রাম থেকে শহরে পণ্য পৌঁছে দেয়ার মধ্য দিয়েই চলছিল জীবনের চাকা। বিয়ে করেন মোবিনা আক্তার রুমাকে। রুমা খুবই সাধারণ, কিন্তু পরিবার গঠনে দারুণ দক্ষ! তারা দ’ুজনে সুখের সংসার গড়ে তোলেন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় দুই সন্তান। এক কন্যা, এক পুত্র। বড় কন্যা আকিয়া আক্তার বুশরা এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, ছেলে ওমর ফারুক এখনো প্রথম শ্রেণিতে। ছোট এই পরিবারই আবুল বাশারের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। বাশারের কাছে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এই সন্তানদের মানুষ করা। তার আশা ছিল, তার সন্তান যেন স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে, শিখে-জানে এবং একদিন ভালো মানুষ হয়। তিনি নিজে যে কষ্ট করেছেন, সন্তানরা যেন তা না করে। এই ছিল তার স্বপ্ন। দিন-রাতের পরিশ্রম, একাধিক শিফটে পিকআপ চালানো। সবকিছু এই একটি লক্ষ্যের পেছনে নিবেদিত ছিল। কিন্তু এই শান্ত, সাদামাটা জীবনেই নেমে আসে তাণ্ডব। একটি দেশের রাজনৈতিক দুর্যোগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক তরুণ সমাজের রুখে দাঁড়ানো। তাতে একদিন অংশ নেন তিনিও। তিনিও তখন জানতেন না, সে দিনটি তার জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেবে। তিনি হয়তো ভাবতেও পারেননি, তার মতো একজন পিকআপ চালকের জীবনে রাজপথের আন্দোলন এভাবে রক্ত আর যন্ত্রণার চিহ্ন আঁকবে। সে দিনের নাম ৫ আগস্ট ২০২৪। তার পূর্ব পর্যন্ত মো: আবুল বাশার ছিলেন একজন নিরীহ শ্রমজীবী মানুষ, যার একমাত্র অপরাধ ছিল নিজ দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। একদিকে হাসিনার নিপীড়ন, অন্যদিকে জীবিকার লড়াই। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এক সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন এক প্রতিবাদের প্রতীক। জন্ম হয় এক যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনের। যার শরীরের এক অংশ আজও রক্তাক্ত, আর মন মরণব্যথায় নীল।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ২০২৪ সালের জুলাই মাস। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব ছাত্র-আন্দোলন। “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন” নামে পরিচিত এই তীব্র জাগরণ মেধা ও ন্যায়ের পক্ষে এবং দুর্নীতি, রাজনৈতিক কোটা, পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অনমনীয় শ্লোগানে এগিয়ে যেতে থাকে। শহর থেকে গ্রাম সবখানে ছড়িয়ে পড়ে এক বিক্ষুব্ধ জোয়ার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বর উঠে আসে হাজার তরুণের কণ্ঠে। এই আন্দোলনের ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু বার্তা ছিল গভীর “মেধার ভিত্তিতে চাই চাকরি”, “ভাগ নয়, অধিকার চাই”, “দুর্নীতির অবসান চাই”। দেশের সাধারণ জনগণও বুঝে ওঠে। এই তরুণদের দাবিগুলো তাদের নিজের স্বপ্নের সাথেও মিলে যায়। সেই তরুণদের পাশে দাঁড়াতে চায় সমাজের নানা স্তরের মানুষ। শিক্ষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি গরিব রিকশাচালক কিংবা হকারও।
মো: আবুল বাশার তখন এই ঢেউয়েরই এক ঢেউয়ে পরিণত হন। তিনি বলেছিলেন, “আমি ছাত্র না, কিন্তু আমার মেয়েটা স্কুলে পড়ে, আমার ছেলেটা এখন প্রথম শ্রেণিতে। আজকের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে কাল তাদেরও কোনো অধিকার থাকবে না।” আন্দোলনের সূচনা থেকেই তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাত্রদের মিছিল ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। কখনো পানি পৌঁছে দিতেন, কখনো কিছু আর্থিক সহায়তা করতেন। আস্তে আস্তে ছাত্রদের কাছেও তিনি হয়ে ওঠেন একজন সম্মানিত বড় ভাই। জুলাই পেরিয়ে আগস্ট আসে। আন্দোলনের ঢেউ আরও তীব্র হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা জানিয়ে দেয়, এবার এক দফা, এক দাবি। স্বৈরাচারী সরকার শেখ হাসিনার পদত্যাগ। ৫ আগস্ট ঘোষণা করা হয় ‘ঢাকা অবরোধ’। সর্বস্তরের মানুষ পথে নামে। মো: আবুল বাশার সেদিন বিকেল সাড়ে তিনটায় নিজের বাড়ি থেকে বের হন। পাশে স্ত্রী অনুনয় করছিলেন, “আপনি এখনো যান কেন? আপনার কোনো দায়িত্ব নেই?” বাশার হেসে বলেছিলেন, “আমার দায়িত্বই তো ওদের পাশে থাকা, কাল আমাদের ছেলে-মেয়ের যেন এ পরিণতি না হয়।” বেলা বারোটায় খবর আসে হাসিনা পালিয়ে গিয়েছে। তবে খবর তখনও যাত্রাবাড়ী পৌছায়নি। এরপর দুপুর ১.০০টা। খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশের চারদিকে। বিজয় মিছিল শুরু হয়। ততক্ষণে মুক্তিকামী জনতা সংসদ ভবন, বঙ্গভবন দখল করে নিয়েছে। যাত্রাবাড়ী তখনও যেন স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি, খুনি হাসিনার ইন্ধনে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে থাকে। বিকেল ৪.০০টা। যাত্রাবাড়ী মোড়ে বিজয় মিছিল চলছে। চারপাশে মানুষের ঢল, শ্লোগান গর্জে উঠছে, “পলাইছে রে পলাইছে, শেখ হাসিনা পলাইছে”, “শেখ হাসিনার পতন চাই”, ততক্ষন চারদিকে সাঁজোয়া গাড়িতে আরও পুলিশ এসে মিলিত হয়। সঙ্গে সাদা পোশাকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকজন। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই জনতার উপর। নারকীয় বর্বরতায় গুলিবর্ষণ শুরু করে। সকল মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ছুটতে থাকে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ। কেউ পড়ে যায়, কেউ রক্তাক্ত হয়, কেউ চিৎকার করে সাহায্য চায়। এই আতঙ্কময় মুহূর্তে মো: আবুল বাশার ছাত্রদের পেছনে ছিলেন। তিনি দেখছিলেন কীভাবে রাস্তায় পড়ে রইল জনি, মিরাজ, সাকিব। হঠাৎই তার ডান পাশ দিয়ে একটা গুলি এসে ঢুকে যায় বাম পায়ে। তীব্র ব্যথায় মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন। রক্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে তার প্যান্ট, তার চারপাশের রাস্তাঘাট। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, “আমার সন্তানদের কি আর দেখতে পারবো না?” বাশার জানতেন না, তিনি বেঁচে থাকবেন কি না। তিনি শুধু দেখেছিলেন, পুলিশ ঘিরে ধরছে রক্তাক্ত মানুষদের। কে বাঁচবে, কে মরবে, সে বাছবিচার যেন কেউ করছিল না। তখনই কয়েকজন ছাত্র তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। তারা ঝুঁকি নিয়ে তাকে টেনে তোলে। রিকশার ব্যবস্থা করে তাকে নিয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
ততক্ষণে যাত্রাবাড়ী যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। রক্ত, লাশ, কান্না, ধোঁয়া আর হাহাকারে ঢেকে যায় পুরো এলাকা। অনেকেই আর জীবিত ফিরেনি। মো: আবুল বাশার সে যাত্রায় বেঁচে যান। তবে তার পা আর আগের মতো থাকে নি। শুরু হয় এক নতুন লড়াই। ব্যথা, অপারেশন, চিকিৎসা এবং অর্থসংকটে এক বিষাক্ত অধ্যায়। তিনি তখন জানতেন না, একটি গুলির দাগ তার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। কিন্তু তবুও, তিনি কখনো অনুশোচনা করেন না। আজও তিনি বলেন, “যদি সময় ফিরে আসত, আবারও যেতাম মিছিলে। দেশের জন্য, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য, বাঁচার অধিকারের জন্য রক্ত দিতে হলেও আমি প্রস্তুত।” চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা যাত্রাবাড়ী থেকে ছাত্রদের সহায়তায় মো: আবুল বাশার যখন রক্তাক্ত অবস্থায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান, তখন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেন মৃত্যু আর আহাজারির এক করুণ পরিবেশ। হাজারো আন্দোলনকারী, সাধারণ মানুষ, ছাত্র, পথচারী তখন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ছুটে আসে। চারদিকে শোনা যাচ্ছিল- “একজন ডাক্তার দেন! প্লিজ আগে দেখেন!” এই আর্ত চিৎকার। মো: আবুল বাশার তখন পায়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতর। তাঁর বাম পায়ে গুলি লেগে মাংস ছিঁড়ে গেছে, হাড়ে আঘাত লেগেছে কি না তা তখনই বুঝা যাচ্ছিল না। হাসপাতালের চিকিৎসকরা দ্রুত তাঁকে ট্রলি করে জরুরি অপারেশন রুমে নিয়ে যান। ওখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা চলে। অবস্থার ভয়াবহতা দেখে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন তাঁকে ভর্তি রাখতে হবে। প্রথম সপ্তাহের চিকিৎসা প্রথম সাত দিন মো: আবুল বাশার ছিলেন হাসপাতালে ভর্তি। এ সময় তাঁর পায়ের এক্স-রে করা হয়, ক্ষতস্থানে ইনফেকশন ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য নিয়মিত ড্রেসিং ও ইনজেকশন দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, গুলি একটি সরাসরি পেশি ছিঁড়ে ঢুকেছে এবং ভেতরে কয়েকটি ছররা গুলি ছড়িয়ে আছে। অপারেশনের মাধ্যমে কিছু গুলি অপসারণ সম্ভব হলেও কিছু গুলি এমনভাবে মাংস ও হাড়ের মাঝে ঢুকে গেছে, যেগুলো অপারেশন ছাড়া বের করা সম্ভব নয়। প্রথম অপারেশনে একটি বড় ধাতব ছররা গুলি অপসারণ করা হয়। এরপর টানা ৫ দিন তিনি শুধু স্যালাইন আর ব্যথানাশকেই ছিলেন। হাঁটতে পারতেন না, শোয়া অবস্থায় একদিকে পা রেখে দিন কাটতো। চিকিৎসকরা তাঁকে বারবার বলে দেন, যেহেতু ছররা গুলি ভেতরে রয়েছে, সেগুলো হয়তো ভবিষ্যতে ইনফেকশন বা হাড়ের ক্ষয় ডেকে আনতে পারে। বাড়িতে ফেরা ও পুনরায় চিকিৎসার প্রয়োজন এক সপ্তাহ পর যখন অবস্থার সামান্য উন্নতি ঘটে, তখন তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়, কিন্তু নির্দেশনা ছিল। প্রতি দু’দিন পরপর হাসপাতালে এসে ড্রেসিং করাতে হবে। তাঁর পায়ে তখন ব্যান্ডেজ, ভেতরে সেলাই। স্ত্রী মোবিনা খাতার ওষুধ কিনতে গিয়ে ধারদেনায় পড়ে যান। প্রথম সপ্তাহের চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা হয়ে যায়। যা পরিবারের জন্য এক বিশাল বোঝা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও চলাফেরার সমস্যা বর্তমানে মো: আবুল বাশার তার বাম পায়ে স্থায়ী জটিলতার মধ্যে আছেন। পায়ের নিচের দিকে স্পর্শ করলে এখনো ঝিনঝিনে ব্যথা অনুভব করেন। হাঁটতে পারলেও দীঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। সামান্য ভারী কাজ করলেই পায়ে ব্যথা চেপে বসে। ফলে গাড়ি চালানোর কাজ, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকতে হয়, সেটিও তার পক্ষে আর কঠিন হয়ে পড়েছে। ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছেন, ছররা গুলির কারণে পায়ের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে এই অবস্থায় স্নায়ুবিক সমস্যা, পা ফুলে যাওয়া, এমনকি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পারিবারিক জীবনের সংকট ও অর্থনৈতিক দুর্দশা
মো: আবুল বাশার, একসময় একজন কর্মঠ পিকআপ চালক হিসেবে ভাড়ায় মালামাল পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রতিদিন সকালে উঠে গাড়ি নিয়ে বের হতেন, সারা দিন বিভিন্ন দোকান, গুদাম, মার্কেট ঘুরে পণ্য পৌঁছে দিতেন। কাজ ছিল কষ্টকর, তবে ছিল সম্মানজনক। এই কাজ দিয়েই তিনি তাঁর স্ত্রী ও দু’টি সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেন, ঘরে চাল-ডাল আনতেন, ঈদের সময় নতুন জামা
কিনতেন। কিন্তু এখন? এখন এই সংসার যেন একটি গুলির শব্দে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। মো: আবুল বাশার আজ পুরোপুরি কর্মক্ষম নন। তাঁর বাম পায়ে এখনো ছররা গুলি রয়ে গেছে, যা অস্ত্রোপচার ছাড়া অপসারণ সম্ভব নয়। চিকিৎসকের ভাষায় পায়ের অবস্থা জটিল, উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন টাকার, আর টাকা আয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য পথ এখন আর তার নেই। তিনি জানান, “আগে একদিন কাজ বন্ধ থাকলে অন্তত আশেপাশের দোকান থেকে চাল, তেল ধার করে আনা যেত। এখন তো সবাই ভাবে, আমি আর ঠিক হব না। কেউ আর ধার দেয় না, সাহায্য তো দূরের কথা।”
লেখক কথন
একটি গুলি কেবল একজন মানুষকে আঘাত করে না, একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, একটি সমাজকে রক্তাক্ত করে তোলে। আবুল বাশারের পরিবারের আজকের অর্থনৈতিক সংকট, সন্তানদের ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা, স্ত্রীর ক্লান্ত দৃষ্টিভঙ্গি, ভাড়া বাড়ির দুঃখ, হাসপাতালের ফেলে আসা রাত। এসব যেন এক দীর্ঘ ত্যাগগাথা। মো: আবুল বাশার আজ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি খুনী হাসিনা ও তার পেটোয়া সরকারের কাছে এক নীরব প্রশ্নবোধক চিহ্ন!
অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা
১. এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হোক, যা দিয়ে তিনি ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারেন।
২. চিকিৎসা সহায়তার জন্য বরাদ্দ দেয়া হোক, কারণ তার পায়ে এখনো ছররা গুলি রয়ে গেছে যা অপারেশন ছাড়া উঠানো যাবে না।
৩. মাসিক ১০,০০০ টাকা ভাতা নির্ধারণ করা হোক যতদিন পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ কর্মক্ষম না হন বা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না হয়।
৪. দুই সন্তানের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হোক, যাতে তারা নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।
এক নজরে মো: আবুল বাশার
নাম : মো: আবুল বাশার
জন্ম তারিখ : ১৯.৯.১৯৮৫
জন্মস্থান : শরিয়তপুর
পেশা : পিকআপ চালক (ভাড়ায় চালিত)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বিনোদপুর ডালি কান্দি, থানা: সদর, জেলা: শরিয়তপুর
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: নয়ানগর ৩৬/এ, এলাকা: দক্ষিণ কাজলা, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পিতার নাম : মৃত ইউনুস আলী
মায়ের নাম : মৃত সূর্য বানু
স্ত্রীর নাম : মোবিনা আক্তার রুমা, পেশা: গৃহিণী, শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৫ম শ্রেণি
পরিবারের সদস্য : ৪ জন
মেয়ে : ১. আকিয়া আক্তার বুশরা, বয়স: ১২ বছর, ছাত্র, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, মেরীগোল্ড আইডিয়াল স্কুল
ছেলে : ১. ওমর ফারুক, বয়স: ৭ বছর, ১ম শ্রেণি,
আহত বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী
আক্রমণকারী : পুলিশ
আক্রমণের ধরণ : বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ
আহত হওয়ার তারিখ : ৫/৮/২৪, সময়: বিকাল ৪.০০টা
“আমার দায়িত্বই তো ওদের পাশে থাকা”
জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
মো: আবুল বাশার ১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শরিয়তপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত বিনোদপুর ডালিকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে প্রতিদিনের রুটি-রুজির সংগ্রাম ছিল জীবনের নিত্য সঙ্গী। পিতা ইউনুস আলী ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। গ্রামীণ জীবনের একান্ত সাদামাটা একজন মানুষ হিসেবে ইউনুস আলী দিন এনে দিন খাওয়া সংসারে জীবনের কঠিন সত্যগুলো খুব ছোটবেলায়ই বাশারকে শিখিয়ে দেন। মাতা সূর্যবানু ছিলেন একজন ঘরকন্যার দায়িত্বে নিবেদিতপ্রাণ নারী। অল্প বয়সেই মো: আবুল বাশার নিজের চোখে দেখেছেন। অভাবের ভিতরও সততার সঙ্গে বেঁচে থাকার সংগ্রাম কেমন হয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা কখনোই ভালো ছিল না।
ছোটবেলায় গ্রামে একটি টিনের ঘরে বেড়ে ওঠেন তিনি। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরের মধ্যে পড়ে, শীতকালে কুয়াশা ঘরের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ত। পড়াশোনার সময় তার হাতে চিরকালই ছিল কুপি কিংবা হারিকেন। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে শিক্ষা জীবন বেশিদূর এগোয়নি। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে জীবিকার তাগিদে পিতার সঙ্গে মাঠে-ঘাটে কাজ করতে শুরু করেন। বাল্যকাল থেকেই তার মধ্যে ছিল এক ধরনের দায়িত্ববোধ। বাবা-মা যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন, তখন সংসারের ভার নিজের কাঁধেই তুলে নেন বাশার। পরে একজন ভাড়ায় চালিত পিকআপ চালক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পণ্য পরিবহনের কাজ করতেন। কখনো ফল-মূল, কখনো কাপড়-চোপড়, আবার কখনো নির্মাণ সামগ্রী, বিভিন্ন পণ্য নিয়ে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলে, আবার গ্রাম থেকে শহরে পণ্য পৌঁছে দেয়ার মধ্য দিয়েই চলছিল জীবনের চাকা। বিয়ে করেন মোবিনা আক্তার রুমাকে। রুমা খুবই সাধারণ, কিন্তু পরিবার গঠনে দারুণ দক্ষ! তারা দ’ুজনে সুখের সংসার গড়ে তোলেন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় দুই সন্তান। এক কন্যা, এক পুত্র। বড় কন্যা আকিয়া আক্তার বুশরা এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, ছেলে ওমর ফারুক এখনো প্রথম শ্রেণিতে। ছোট এই পরিবারই আবুল বাশারের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। বাশারের কাছে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এই সন্তানদের মানুষ করা। তার আশা ছিল, তার সন্তান যেন স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে, শিখে-জানে এবং একদিন ভালো মানুষ হয়। তিনি নিজে যে কষ্ট করেছেন, সন্তানরা যেন তা না করে। এই ছিল তার স্বপ্ন। দিন-রাতের পরিশ্রম, একাধিক শিফটে পিকআপ চালানো। সবকিছু এই একটি লক্ষ্যের পেছনে নিবেদিত ছিল। কিন্তু এই শান্ত, সাদামাটা জীবনেই নেমে আসে তাণ্ডব। একটি দেশের রাজনৈতিক দুর্যোগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক তরুণ সমাজের রুখে দাঁড়ানো। তাতে একদিন অংশ নেন তিনিও। তিনিও তখন জানতেন না, সে দিনটি তার জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেবে। তিনি হয়তো ভাবতেও পারেননি, তার মতো একজন পিকআপ চালকের জীবনে রাজপথের আন্দোলন এভাবে রক্ত আর যন্ত্রণার চিহ্ন আঁকবে। সে দিনের নাম ৫ আগস্ট ২০২৪। তার পূর্ব পর্যন্ত মো: আবুল বাশার ছিলেন একজন নিরীহ শ্রমজীবী মানুষ, যার একমাত্র অপরাধ ছিল নিজ দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। একদিকে হাসিনার নিপীড়ন, অন্যদিকে জীবিকার লড়াই। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এক সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন এক প্রতিবাদের প্রতীক। জন্ম হয় এক যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনের। যার শরীরের এক অংশ আজও রক্তাক্ত, আর মন মরণব্যথায় নীল।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ২০২৪ সালের জুলাই মাস। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব ছাত্র-আন্দোলন। “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন” নামে পরিচিত এই তীব্র জাগরণ মেধা ও ন্যায়ের পক্ষে এবং দুর্নীতি, রাজনৈতিক কোটা, পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অনমনীয় শ্লোগানে এগিয়ে যেতে থাকে। শহর থেকে গ্রাম সবখানে ছড়িয়ে পড়ে এক বিক্ষুব্ধ জোয়ার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বর উঠে আসে হাজার তরুণের কণ্ঠে। এই আন্দোলনের ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু বার্তা ছিল গভীর “মেধার ভিত্তিতে চাই চাকরি”, “ভাগ নয়, অধিকার চাই”, “দুর্নীতির অবসান চাই”। দেশের সাধারণ জনগণও বুঝে ওঠে। এই তরুণদের দাবিগুলো তাদের নিজের স্বপ্নের সাথেও মিলে যায়। সেই তরুণদের পাশে দাঁড়াতে চায় সমাজের নানা স্তরের মানুষ। শিক্ষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি গরিব রিকশাচালক কিংবা হকারও।
মো: আবুল বাশার তখন এই ঢেউয়েরই এক ঢেউয়ে পরিণত হন। তিনি বলেছিলেন, “আমি ছাত্র না, কিন্তু আমার মেয়েটা স্কুলে পড়ে, আমার ছেলেটা এখন প্রথম শ্রেণিতে। আজকের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে কাল তাদেরও কোনো অধিকার থাকবে না।” আন্দোলনের সূচনা থেকেই তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাত্রদের মিছিল ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। কখনো পানি পৌঁছে দিতেন, কখনো কিছু আর্থিক সহায়তা করতেন। আস্তে আস্তে ছাত্রদের কাছেও তিনি হয়ে ওঠেন একজন সম্মানিত বড় ভাই। জুলাই পেরিয়ে আগস্ট আসে। আন্দোলনের ঢেউ আরও তীব্র হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা জানিয়ে দেয়, এবার এক দফা, এক দাবি। স্বৈরাচারী সরকার শেখ হাসিনার পদত্যাগ। ৫ আগস্ট ঘোষণা করা হয় ‘ঢাকা অবরোধ’। সর্বস্তরের মানুষ পথে নামে। মো: আবুল বাশার সেদিন বিকেল সাড়ে তিনটায় নিজের বাড়ি থেকে বের হন। পাশে স্ত্রী অনুনয় করছিলেন, “আপনি এখনো যান কেন? আপনার কোনো দায়িত্ব নেই?” বাশার হেসে বলেছিলেন, “আমার দায়িত্বই তো ওদের পাশে থাকা, কাল আমাদের ছেলে-মেয়ের যেন এ পরিণতি না হয়।” বেলা বারোটায় খবর আসে হাসিনা পালিয়ে গিয়েছে। তবে খবর তখনও যাত্রাবাড়ী পৌছায়নি। এরপর দুপুর ১.০০টা। খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশের চারদিকে। বিজয় মিছিল শুরু হয়। ততক্ষণে মুক্তিকামী জনতা সংসদ ভবন, বঙ্গভবন দখল করে নিয়েছে। যাত্রাবাড়ী তখনও যেন স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি, খুনি হাসিনার ইন্ধনে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে থাকে। বিকেল ৪.০০টা। যাত্রাবাড়ী মোড়ে বিজয় মিছিল চলছে। চারপাশে মানুষের ঢল, শ্লোগান গর্জে উঠছে, “পলাইছে রে পলাইছে, শেখ হাসিনা পলাইছে”, “শেখ হাসিনার পতন চাই”, ততক্ষন চারদিকে সাঁজোয়া গাড়িতে আরও পুলিশ এসে মিলিত হয়। সঙ্গে সাদা পোশাকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকজন। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই জনতার উপর। নারকীয় বর্বরতায় গুলিবর্ষণ শুরু করে। সকল মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ছুটতে থাকে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ। কেউ পড়ে যায়, কেউ রক্তাক্ত হয়, কেউ চিৎকার করে সাহায্য চায়। এই আতঙ্কময় মুহূর্তে মো: আবুল বাশার ছাত্রদের পেছনে ছিলেন। তিনি দেখছিলেন কীভাবে রাস্তায় পড়ে রইল জনি, মিরাজ, সাকিব। হঠাৎই তার ডান পাশ দিয়ে একটা গুলি এসে ঢুকে যায় বাম পায়ে। তীব্র ব্যথায় মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন। রক্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে তার প্যান্ট, তার চারপাশের রাস্তাঘাট। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, “আমার সন্তানদের কি আর দেখতে পারবো না?” বাশার জানতেন না, তিনি বেঁচে থাকবেন কি না। তিনি শুধু দেখেছিলেন, পুলিশ ঘিরে ধরছে রক্তাক্ত মানুষদের। কে বাঁচবে, কে মরবে, সে বাছবিচার যেন কেউ করছিল না। তখনই কয়েকজন ছাত্র তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। তারা ঝুঁকি নিয়ে তাকে টেনে তোলে। রিকশার ব্যবস্থা করে তাকে নিয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
ততক্ষণে যাত্রাবাড়ী যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। রক্ত, লাশ, কান্না, ধোঁয়া আর হাহাকারে ঢেকে যায় পুরো এলাকা। অনেকেই আর জীবিত ফিরেনি। মো: আবুল বাশার সে যাত্রায় বেঁচে যান। তবে তার পা আর আগের মতো থাকে নি। শুরু হয় এক নতুন লড়াই। ব্যথা, অপারেশন, চিকিৎসা এবং অর্থসংকটে এক বিষাক্ত অধ্যায়। তিনি তখন জানতেন না, একটি গুলির দাগ তার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। কিন্তু তবুও, তিনি কখনো অনুশোচনা করেন না। আজও তিনি বলেন, “যদি সময় ফিরে আসত, আবারও যেতাম মিছিলে। দেশের জন্য, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য, বাঁচার অধিকারের জন্য রক্ত দিতে হলেও আমি প্রস্তুত।” চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা যাত্রাবাড়ী থেকে ছাত্রদের সহায়তায় মো: আবুল বাশার যখন রক্তাক্ত অবস্থায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান, তখন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেন মৃত্যু আর আহাজারির এক করুণ পরিবেশ। হাজারো আন্দোলনকারী, সাধারণ মানুষ, ছাত্র, পথচারী তখন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ছুটে আসে। চারদিকে শোনা যাচ্ছিল- “একজন ডাক্তার দেন! প্লিজ আগে দেখেন!” এই আর্ত চিৎকার। মো: আবুল বাশার তখন পায়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতর। তাঁর বাম পায়ে গুলি লেগে মাংস ছিঁড়ে গেছে, হাড়ে আঘাত লেগেছে কি না তা তখনই বুঝা যাচ্ছিল না। হাসপাতালের চিকিৎসকরা দ্রুত তাঁকে ট্রলি করে জরুরি অপারেশন রুমে নিয়ে যান। ওখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা চলে। অবস্থার ভয়াবহতা দেখে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন তাঁকে ভর্তি রাখতে হবে। প্রথম সপ্তাহের চিকিৎসা প্রথম সাত দিন মো: আবুল বাশার ছিলেন হাসপাতালে ভর্তি। এ সময় তাঁর পায়ের এক্স-রে করা হয়, ক্ষতস্থানে ইনফেকশন ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য নিয়মিত ড্রেসিং ও ইনজেকশন দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, গুলি একটি সরাসরি পেশি ছিঁড়ে ঢুকেছে এবং ভেতরে কয়েকটি ছররা গুলি ছড়িয়ে আছে। অপারেশনের মাধ্যমে কিছু গুলি অপসারণ সম্ভব হলেও কিছু গুলি এমনভাবে মাংস ও হাড়ের মাঝে ঢুকে গেছে, যেগুলো অপারেশন ছাড়া বের করা সম্ভব নয়। প্রথম অপারেশনে একটি বড় ধাতব ছররা গুলি অপসারণ করা হয়। এরপর টানা ৫ দিন তিনি শুধু স্যালাইন আর ব্যথানাশকেই ছিলেন। হাঁটতে পারতেন না, শোয়া অবস্থায় একদিকে পা রেখে দিন কাটতো। চিকিৎসকরা তাঁকে বারবার বলে দেন, যেহেতু ছররা গুলি ভেতরে রয়েছে, সেগুলো হয়তো ভবিষ্যতে ইনফেকশন বা হাড়ের ক্ষয় ডেকে আনতে পারে। বাড়িতে ফেরা ও পুনরায় চিকিৎসার প্রয়োজন এক সপ্তাহ পর যখন অবস্থার সামান্য উন্নতি ঘটে, তখন তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়, কিন্তু নির্দেশনা ছিল। প্রতি দু’দিন পরপর হাসপাতালে এসে ড্রেসিং করাতে হবে। তাঁর পায়ে তখন ব্যান্ডেজ, ভেতরে সেলাই। স্ত্রী মোবিনা খাতার ওষুধ কিনতে গিয়ে ধারদেনায় পড়ে যান। প্রথম সপ্তাহের চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা হয়ে যায়। যা পরিবারের জন্য এক বিশাল বোঝা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও চলাফেরার সমস্যা বর্তমানে মো: আবুল বাশার তার বাম পায়ে স্থায়ী জটিলতার মধ্যে আছেন। পায়ের নিচের দিকে স্পর্শ করলে এখনো ঝিনঝিনে ব্যথা অনুভব করেন। হাঁটতে পারলেও দীঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। সামান্য ভারী কাজ করলেই পায়ে ব্যথা চেপে বসে। ফলে গাড়ি চালানোর কাজ, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকতে হয়, সেটিও তার পক্ষে আর কঠিন হয়ে পড়েছে। ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছেন, ছররা গুলির কারণে পায়ের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে এই অবস্থায় স্নায়ুবিক সমস্যা, পা ফুলে যাওয়া, এমনকি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পারিবারিক জীবনের সংকট ও অর্থনৈতিক দুর্দশা
মো: আবুল বাশার, একসময় একজন কর্মঠ পিকআপ চালক হিসেবে ভাড়ায় মালামাল পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রতিদিন সকালে উঠে গাড়ি নিয়ে বের হতেন, সারা দিন বিভিন্ন দোকান, গুদাম, মার্কেট ঘুরে পণ্য পৌঁছে দিতেন। কাজ ছিল কষ্টকর, তবে ছিল সম্মানজনক। এই কাজ দিয়েই তিনি তাঁর স্ত্রী ও দু’টি সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেন, ঘরে চাল-ডাল আনতেন, ঈদের সময় নতুন জামা
কিনতেন। কিন্তু এখন? এখন এই সংসার যেন একটি গুলির শব্দে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। মো: আবুল বাশার আজ পুরোপুরি কর্মক্ষম নন। তাঁর বাম পায়ে এখনো ছররা গুলি রয়ে গেছে, যা অস্ত্রোপচার ছাড়া অপসারণ সম্ভব নয়। চিকিৎসকের ভাষায় পায়ের অবস্থা জটিল, উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন টাকার, আর টাকা আয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য পথ এখন আর তার নেই। তিনি জানান, “আগে একদিন কাজ বন্ধ থাকলে অন্তত আশেপাশের দোকান থেকে চাল, তেল ধার করে আনা যেত। এখন তো সবাই ভাবে, আমি আর ঠিক হব না। কেউ আর ধার দেয় না, সাহায্য তো দূরের কথা।”
লেখক কথন
একটি গুলি কেবল একজন মানুষকে আঘাত করে না, একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, একটি সমাজকে রক্তাক্ত করে তোলে। আবুল বাশারের পরিবারের আজকের অর্থনৈতিক সংকট, সন্তানদের ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা, স্ত্রীর ক্লান্ত দৃষ্টিভঙ্গি, ভাড়া বাড়ির দুঃখ, হাসপাতালের ফেলে আসা রাত। এসব যেন এক দীর্ঘ ত্যাগগাথা। মো: আবুল বাশার আজ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি খুনী হাসিনা ও তার পেটোয়া সরকারের কাছে এক নীরব প্রশ্নবোধক চিহ্ন!
অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা
১. এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হোক, যা দিয়ে তিনি ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারেন।
২. চিকিৎসা সহায়তার জন্য বরাদ্দ দেয়া হোক, কারণ তার পায়ে এখনো ছররা গুলি রয়ে গেছে যা অপারেশন ছাড়া উঠানো যাবে না।
৩. মাসিক ১০,০০০ টাকা ভাতা নির্ধারণ করা হোক যতদিন পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ কর্মক্ষম না হন বা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না হয়।
৪. দুই সন্তানের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হোক, যাতে তারা নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।
এক নজরে মো: আবুল বাশার
নাম : মো: আবুল বাশার
জন্ম তারিখ : ১৯.৯.১৯৮৫
জন্মস্থান : শরিয়তপুর
পেশা : পিকআপ চালক (ভাড়ায় চালিত)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বিনোদপুর ডালি কান্দি, থানা: সদর, জেলা: শরিয়তপুর
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: নয়ানগর ৩৬/এ, এলাকা: দক্ষিণ কাজলা, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পিতার নাম : মৃত ইউনুস আলী
মায়ের নাম : মৃত সূর্য বানু
স্ত্রীর নাম : মোবিনা আক্তার রুমা, পেশা: গৃহিণী, শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৫ম শ্রেণি
পরিবারের সদস্য : ৪ জন
মেয়ে : ১. আকিয়া আক্তার বুশরা, বয়স: ১২ বছর, ছাত্র, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, মেরীগোল্ড আইডিয়াল স্কুল
ছেলে : ১. ওমর ফারুক, বয়স: ৭ বছর, ১ম শ্রেণি,
আহত বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী
আক্রমণকারী : পুলিশ
আক্রমণের ধরণ : বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ
আহত হওয়ার তারিখ : ৫/৮/২৪, সময়: বিকাল ৪.০০টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍