হোম / আহতদের তালিকা / মো: শাহীন
 মো: শাহীন

মো: শাহীন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

“ছবি নেই বলে আমি কি আন্দোলনে ছিলাম না? আমার শরীরের এই বুলেটের ক্ষত কি মিথ্যা?”—এক বুক হাহাকার নিয়ে এই প্রশ্নটিই আজ সমাজের কাছে রাখছেন কুমিল্লার মুরাদনগরের সন্তান মো. শাহীন। পেশায় রিকশাচালক শাহীন ৫ আগস্ট ২০২৪; খুনি হাসিনার পতনের দিনে বিজয় মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন নিজের ছেলেকে সাথে নিয়ে। বিকেল ৪টায় যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশের গুলিতে তার কোমর ও উরু ঝাঁঝরা হয়ে যায়।

আহত শাহীনকে ঢাকা মেডিকেলে ১২ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসা দেওয়া হলেও তার লড়াই শেষ হয়নি। ৮ সদস্যের বিশাল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই মানুষটি আজ পঙ্গুপ্রায়। রিকশা চালানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারেন না তিনি। অভাবের তাড়নায় ১১ বছরের ছেলে সাইফুল আজ পড়াশোনা ছেড়ে দোকানের কর্মচারী, আর বড় ছেলে হাসান পরিবারের হাল ধরতে বিদেশে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, শাহীনের আহত হওয়ার কোনো ছবি বা ভিডিও নেই। এই এক অজুহাতে সরকারি তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন তিনি। কোনো সাহায্য বা স্বীকৃতি পাননি এই অকুতোভয় বাবা। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের রক্ত দিলেন, সেই দেশ আজ তাকে কেবল ‘ছবি নেই’ বলে পরিচয়হীন করে রেখেছে।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ছবিহীন বলে বঞ্চিত, পঙ্গুত্বের দায় কার?
একজন রিকশাচালকের দেশপ্রেম!

জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ
মো: শাহীন জন্মগ্রহণ করেন ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সালে কুমিল্লার কালিপুরা গ্রামে। তিনি বেড়ে উঠেছেন একটি কৃষিজীবী দরিদ্র পরিবারে। তার পিতা মো: মানিক মিয়া এবং মাতা মোছা: মোলেকা বেগম বর্তমানে প্রবীণ এবং অসুস্থ। বাবার বয়স এখন ৭৭, আর মায়ের ৬২। দরিদ্রতা, প্রতিদিনের সংগ্রাম আর জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়েই শাহীন তার শৈশব ও কৈশোর পার করেছেন। পড়াশুনার সুযোগ পাননি, অল্প বয়সেই জীবিকার খোঁজে শহরমুখী হন। ঢাকায় এসে নানা ধরনের শ্রমজীবী পেশায় যুক্ত হন, শেষমেশ রিকশা চালানোই হয়ে ওঠে তার পেশা।
পরিবার ও সন্তানদের জীবন সংগ্রাম
মো: শাহীনের পরিবারে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৮ জন। তার রয়েছে ছয় সন্তান। বড় মেয়ে জান্নাত এখন গৃহিণী, আর বড় ছেলে হাসান ১৭ বছর বয়সেই প্রবাসে যাওয়ার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় মেয়ে খাদিজা মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেছে। ১৩ বছর বয়সী নাদিয়া কুতুবখালী মহিলা মাদ্রাসায় পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। ১১ বছরের সাইফুল স্কুলে না গিয়ে একটি দোকানে কাজ করছে, আর সবচেয়ে ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করছে। এই পরিবারের প্রতিটি সদস্য অভাব আর দুঃখের ছায়ায় বেড়ে উঠছে। শাহীন ছিলেন এই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী; তিনি কাজ করতেন রিকশাচালক হিসেবে। মাঝে মাঝে কাঁচামালের ব্যবসাও করতেন কিন্তু সেটাও ছিল অস্থায়ী।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের আগস্টে যখন ঢাকাজুড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন শাহীন তার বড় ছেলের সঙ্গে এক আনন্দমিছিলে যোগ দেন। দেশজুড়ে খুনি হাসিনার দেশত্যাগের খবরে সাধারণ মানুষ আনন্দে উত্তাল হয়ে ওঠে। শাহীনও সেই উৎসবমুখর পরিবেশে শামিল হয়েছিলেন তার ছেলেকে নিয়ে। তিনি কখনোই রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ দিনমজুর, একজন পিতা, একজন সংগ্রামী নাগরিক। কিন্তু সেদিন তার ওপর নেমে আসে খুনী হাসিনার বর্বরতার নির্মমতা!
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াল মুহূর্ত
৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টা। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থানরত ছাত্র-জনতা আওয়ামী পুলিশি গুলির মুখে পড়ে। যাত্রাবাড়ী থানার ছাদ থেকে গুলি ছোড়া হয়। সেই আক্রমণে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। শাহীন তখন তার ছেলেকে হারিয়ে খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা। এর মধ্যেই তার শরীরের নিচের অংশে একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয়। বুলেট তার কোমর ও উরুর ভেতর দিয়ে এ ফোঁড়-ও ফোঁড় হয়ে যায়। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে তখন চিৎকার, কান্না আর রক্তের স্রোত।
চিকিৎসা
আহত অবস্থায় তাকে সঙ্গে থাকা মানুষজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। বিকেল ৫টার দিকে তার চিকিৎসা শুরু হয়। সেখানে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ভর্তি থাকেন। অবস্থার জটিলতা বেড়ে গেলে ডাক্তাররা তাকে অন্য একটি হাসপাতালে রেফার করেন পরবর্তী দুই মাস সেখানেই চিকিৎসা চলে। শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি বাসায় ফেরেন, তবে শরীরে থেকে যায় যন্ত্রণার ছাপ, দুর্বলতা আর পঙ্গুত্বের এক বাস্তবতা। তিনি দাবি করেন, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় সরকারি কোনো সহায়তা তিনি পাননি।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও অসচ্ছলতা
আজকের দিনে মো: শাহীন সম্পূর্ণ কর্মক্ষম নন। রিকশা চালানো তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও কষ্টসাধ্য। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে বা সামান্য পরিশ্রমেও তিনি যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন পঙ্গু অবস্থায় গোটা পরিবারটি যেন দুর্যোগের মাঝে আটকে পড়েছে। সন্তানদের পড়ালেখা, চিকিৎসা ও খাদ্য সবই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সরকারি স্বীকৃতি ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চনা
আহত অবস্থায় তার কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া না যাওয়ায় সরকারিভাবে তাকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। এই একটিমাত্র কারণে তিনি সরকারি কোনো অর্থ, চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সহায়তা পাননি। অথচ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সত্য, তার শরীরে এখনো সেই বুলেটের দাগ রয়েছে।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
শাহীনের ছেলে-মেয়েরা বর্তমানে জীবিকার তাড়নায় ছিটকে পড়ছে শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনের পথ থেকে। মেয়েরা অল্প বয়সেই বিবাহিত, আর ছেলেরা জড়িয়ে পড়ছে শ্রমজীবী কাজে। ১১ বছর বয়সে দোকানে কাজ করছে সাইফুল, যা তার শৈশবকে কেড়ে নিচ্ছে। এই পরিবারে আগামী প্রজন্ম গড়ে ওঠার পরিবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে দারিদ্র্য আর রাষ্ট্রীয় অবহেলায়।
সামাজিক সংকট
শাহীন এখন মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। তার চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। একজন রিকশাচালক যিনি প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শ্রম দিয়ে সংসার চালাতেন, আজ তিনি কারো করুণা কিংবা সাহায্যের আশায় দিন গুনছেন। পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ তাকে প্রতিনিয়ত ভেঙে ফেলছে। সমাজ ও রাষ্ট্র যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন একজন গরিব মানুষের কাছে জীবন হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার নাম।
প্রস্তাবনা
১. পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তা: মো: শাহীন এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ নন। তাকে আবারও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় তার চিকিৎসার খরচ বহনের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
২. ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: পরিবারে এখন কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই। তাই ক্ষতিপূরণ হিসেবে আর্থিক সহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
৩. পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা সহায়তা: সন্তানদের পড়ালেখা ও জীবিকার জন্য তাদের শিক্ষাবৃত্তি ও পুষ্টিসেবাসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর্থ-সামাজিকভাবে গড়ে উঠতে পারে।

এক নজরে মো: শাহীন
নাম : মো: শাহীন
জন্ম তারিখ : ০১-০১-১৯৭৮
জন্মস্থান : কালিপুরা, কুমিল্লা
পূর্বের পেশা : রিকশা চালক
নিজ জেলা : কুমিল্লা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মানিক মিয়ার বাড়ি, কালিপুরা, সোনাতলা, ইউনিয়ন: ৭ নং বাঙ্গরা পশ্চিম,
থানা: মুরাদনগর, জেলা : কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা: কুতুবখালি, ওয়ার্ড নং: ৬২, থানা: যাত্রাবাড়ী, সিটি: ঢাকা দক্ষিণ, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতা : মো: মানিক মিয়া, বৃদ্ধ, বয়স: ৭৭ বছর
মাতা : মোছা: মোলেকা বেগম, বৃদ্ধা, বয়স : ৬২
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৮ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. জান্নাত, বয়স: ২০ বছর, পেশা: গৃহিণী,
২. হাসান, বয়স: ১৭ বছর, পেশা: শ্রমিক, (প্রবাসে যাওয়ার প্রচেষ্টায়)
৩. খাদিজা, বয়স: ১৫ বছর, পেশা: গৃহিণী
৪. নাদিয়া, বয়স: ১৩ বছর, শ্রেণি: ৮ম, মহিলা মাদ্রাসা, কুতুবখালী, যাত্রাবাড়ি
৫. সাইফুল, বয়স: ১১ বছর, দোকান কর্মচারি (প্যান্টের দোকান)
৬. আব্দুল্লাহ, বয়স: ৭ বছর, পেশা: ছাত্র, হাফেজিয়া মাদ্রাসা
আহত বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার সংলগ্ন
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪.০০টা
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী
আঘাতের ধরন : কোমরে গুলিবিদ্ধ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍