মো: রিপন হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
অপারেশনের পরেও চোখে কোনো দৃষ্টি ফেরেনি। যখন জিজ্ঞেস করি—দেখা যাবে না কেন? ডাক্তাররা বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”—এক বুক হাহাকার নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের সন্তান মো. রিপন হোসেন। ১৯৮৯ সালে জন্ম নেওয়া রিপন হোসেন ছিলেন একজন পেশাদার পিকআপ চালক। বাবা-মা হারানো এই লড়াকু যুবক ২৫ হাজার টাকা আয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তানের সংসার সুখে আগলে রেখেছিলেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একাত্মতা জানাতে রায়েরবাগ এলাকায় মিছিলে যোগ দেন তিনি। দুপুর ৩টার দিকে কদমতলী থানার ছাদ থেকে পুলিশের ছোড়া একটি গুলি সরাসরি বিঁধে যায় রিপনের বাম চোখে। মুহূর্তেই তার চিরচেনা পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে যায়। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা হলেও, সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসেনি।
আজ রিপন কর্মহীন। যে হাত স্টিয়ারিং ধরে তিন সন্তানের অন্নসংস্থান করত, সেই হাত আজ অন্যের কাছে সাহায্যের জন্য প্রসারিত। ৫ম ও ১ম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। অভাবের তাড়নায় ধুঁকছে পুরো পরিবার। এক চোখের আলো হারিয়ে রিপন এখন শুধু অন্ধকার দেখছেন না, দেখছেন সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একাত্মতা জানাতে রায়েরবাগ এলাকায় মিছিলে যোগ দেন তিনি। দুপুর ৩টার দিকে কদমতলী থানার ছাদ থেকে পুলিশের ছোড়া একটি গুলি সরাসরি বিঁধে যায় রিপনের বাম চোখে। মুহূর্তেই তার চিরচেনা পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে যায়। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা হলেও, সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসেনি।
আজ রিপন কর্মহীন। যে হাত স্টিয়ারিং ধরে তিন সন্তানের অন্নসংস্থান করত, সেই হাত আজ অন্যের কাছে সাহায্যের জন্য প্রসারিত। ৫ম ও ১ম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। অভাবের তাড়নায় ধুঁকছে পুরো পরিবার। এক চোখের আলো হারিয়ে রিপন এখন শুধু অন্ধকার দেখছেন না, দেখছেন সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
অপারেশনের পরেও চোখে কোনো দৃষ্টিশক্তি
ফেরেনি। যখন জিজ্ঞেস করা হয় “চোখে দেখা
যাবে না কেন?” তখন ডাক্তারদের একটাই
জবাব, “আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”
জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
মো: রিপন হোসেন ১৯৮৯ সালের ৫ মার্চ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে তাঁর শিকড় মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কোলা ইউনিয়নের দক্ষিণ নন্দন কোনা গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন মৃত মো: ছোরহাব হোসেন, পেশায় দর্জি, এবং মাতা ছিলেন মৃত মোসা: মমতাজ বেগম, একজন সাধারণ গৃহিণী। বাবা-মা দু’জনেই ইহজগত ত্যাগ করেছেন, ফলে জীবনসংগ্রামের শুরু থেকেই রিপনের কাঁধে উঠে আসে সংসারের দায়ভার। তার তিন ভাই রয়েছেন বাবু শেখ (৫০), গাড়ি চালক; মনির শেখ (৪৭), দর্জি; এবং সানি শেখ (৩৯), ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। ভাইয়েরা নিজেরা জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত হলেও রিপনের সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মতো অর্থশক্তি তাদের কারো নেই।
বিবাহিত জীবন ও সন্তানদের স্বপ্ন
বর্তমানে তিনি বসবাস করেন যাত্রাবাড়ী থানাধীন রায়েরবাগ, রশিদবাগ এলাকায় একটি ছোট বাসায়। পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী শাহীনা বেগম (২৫) এবং তিন সন্তান আরহি ইসলাম (১১), আয়ান ইসলাম (৭) এবং আড়াই বছর বয়সী ছোট্ট আয়াত ইসলাম। আরহি ও আয়ান স্থানীয় রায়েরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৫ম ও ১ম শ্রেণিতে পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল রিপনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
কর্মজীবন ও আয়ের অবস্থা
আহতের আগে রিপন একজন পিকআপ চালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রতিদিন বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করে মাসে প্রায় ২৫,০০০ টাকা আয় করতেন। কমিশনে গাড়ি চালিয়ে যে আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চালাতেন, সন্তানদের পড়ালেখা চালাতেন এবং ঘরভাড়াসহ যাবতীয় ব্যয় মেটাতেন। পিতা-মাতাহীন এক যুবকের জন্য এই অর্থই ছিল বেঁচে থাকার রশি।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ১৯ জুলাইয়ের ভয়াবহ দিন
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন রিপন নিজেও একাত্ম হয়ে যান এই ন্যায্য দাবির সংগ্রামে। ১৫ জুলাই থেকেই তিনি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯ জুলাই শুক্রবার, নামাজ শেষে রায়েরবাগ থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে বের হন। দুপুর ৩টার দিকে যখন তিনি কদমতলী থানার কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎ করে ছাদ থেকে পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরু করে।
একটি গুলি সোজা এসে আঘাত করে তার বাম চোখে। ছিটকে পড়ে যান তিনি রাস্তায়। ভয়ের চেয়ে বড় হয়ে আসে অন্ধকার। সত্যিকারের অন্ধকার। একটি চোখের আলো নিভে যায় সেদিন।
চিকিৎসার বিভ্রান্তি, হয়রানি ও হতাশা
প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানকার কর্তব্যরতরা কোনো চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠায়। পরে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালে। সেখানে কিছু ওষুধ দেওয়া হয় এবং বলা হয় ২২ জুলাই যেতে। ২২ তারিখ রিপন সেখানে গেলে কয়েকটি টেস্ট করানো হয়। এরপর তারা জানায় যে গুলি এখনো চোখে রয়ে গেছে এবং অপারেশন লাগবে। পরে একদিন হাসপাতালে ভর্তি রেখে গুলি বের করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপারেশনের পরেও চোখে কোনো দৃষ্টিশক্তি ফেরেনি। যখন জিজ্ঞেস করা হয় “চোখে দেখা যাবে না কেন?” তখন ডাক্তারদের একটাই জবাব, “আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে চোখে না দেখতে পাওয়ার কারণে রিপন হোসেন কোনো কাজ করতে পারছেন না। সংসার চলছে ধার-দেনায়। সন্তানের পড়াশুনার খরচ পর্যন্ত মেটানো যাচ্ছে না। চোখে কালো অন্ধকার, আর সামনে আর্থিক অনিশ্চয়তার দুর্বিষহ যাত্রা। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছেন না, চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারছেন না।
আর্থিক সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
আপাতত কিছু বেসরকারি সহায়তায় সংসার চলছে ঠিকই, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে, স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। একজন শ্রমজীবী পিতার এক চোখ হারিয়ে ফেলার পরেও যখন রাষ্ট্র তার পেছনে দাঁড়ায় না, তখন সেটি একটি জাতির বিবেকের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। রিপন হোসেন এখন শুধু বাঁচার জন্য নয়, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে, চোখের আলোহীনতা সত্তে¡ও তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহানুভ‚তির অপেক্ষায় আছেন। মো: রিপন হোসেনের জীবন এখন একটি নিঃসঙ্গ যুদ্ধ। তিনি এক চোখ হারিয়েছেন, কিন্তু হার মানেননি। তবে আর্থিক অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা-অপ্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক অবহেলার কারণে তার লড়াই প্রতিদিন কঠিনতর হচ্ছে। এই জীবনগাথা কোনো কাল্পনিক ট্র্যাজেডি নয় এটি বাস্তব, রক্তমাখা, অন্ধকারে ডুবে থাকা একজন বাংলাদেশি পিতার দৈনন্দিন জীবন। আজ তার পাশে দাঁড়ানোর সময় তার জন্য, তার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য, মানবতার জন্য। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিবেকবান মানুষের প্রতি আমাদের অনুরোধ আসুন, আমরা তার পাশে দাঁড়াই। তার চোখের আলো না ফিরলেও, তার পরিবারের মুখে যেন আলো জ্বলে।
প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসার সুযোগ: সরকারি উদ্যোগে চোখের পুনরায় চিকিৎসা (চোখের প্রতিস্থাপন, বিদেশে রেফার ইত্যাদি)।
২. পুনর্বাসন সহায়তা: তার স্ত্রীর নামে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু করতে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা।
৩. আবাসন: নিজ গ্রামে একটি বাসযোগ্য ঘর নির্মাণ।
৪. মাসিক ভাতা সহায়তা: প্রতিবন্ধী ভাতা চালু এবং সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি।
এক নজরে মো: রিপন হোসেন
নাম : মো: রিপন হোসেন
জন্ম তারিখ : ৫/৩/১৯৮৯
জন্মস্থান : ঢাকা
পেশা : পিকআপ চালক (ভাঁড়ায় চালিত)
নিজ জেল : মুন্সীগঞ্জ
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ নন্দন কোনা, ইউনিয়ন: কোলা, থানা: সিরাজদিখান, জেলা: মুন্সীগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রায়েরবাগ, রশিদ বাগ, ইউনিয়ন: মাতুয়াইল, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতা : মৃত মো: ছোরহাব হোসেন
মাতা : মৃত মোসা: মমতাজ বেগম
মাসিক আয় : ২৫,০০০ (বর্তমানে বন্ধ)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন (স্ত্রী, সন্তান-৩ জন, রিপন হোসেন)
স্ত্রী : শাহীনা বেগম, বয়স: ২৫ বছর, গৃহিণী
সন্তান : ৩ জন
১. আরহি ইসলাম, বয়স: ১১ বছর, শ্রেণি: ৫ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: রায়েরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
২. আয়ান ইসলাম, বয়স: ৭ বছর, শ্রেণি: ১ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: রায়েরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
৩. আয়াত ইসলাম, বয়স: ৩ বছর
ভাই : ৩ জন
১. মো: বাবু শেখ, বয়স: ৫০ বছর, পেশা: গাড়িচালক
২. মো: মনির শেখ, বয়স: ৪৭ বছর, পেশা: দর্জি
৩. মো: সানি শেখ, বয়স: ৩৯ বছর, পেশা: ইলেকট্রিক মিস্ত্রী
আহত বিবরণ
ঘটনার স্থান : কদমতলী থানা সংলগ্ন, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, শুক্রবার, দুপুর ৩.০০টা
আক্রমণকারি : কদমতলি থানার পুলিশ বাহিনী
ফেরেনি। যখন জিজ্ঞেস করা হয় “চোখে দেখা
যাবে না কেন?” তখন ডাক্তারদের একটাই
জবাব, “আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”
জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
মো: রিপন হোসেন ১৯৮৯ সালের ৫ মার্চ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে তাঁর শিকড় মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কোলা ইউনিয়নের দক্ষিণ নন্দন কোনা গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন মৃত মো: ছোরহাব হোসেন, পেশায় দর্জি, এবং মাতা ছিলেন মৃত মোসা: মমতাজ বেগম, একজন সাধারণ গৃহিণী। বাবা-মা দু’জনেই ইহজগত ত্যাগ করেছেন, ফলে জীবনসংগ্রামের শুরু থেকেই রিপনের কাঁধে উঠে আসে সংসারের দায়ভার। তার তিন ভাই রয়েছেন বাবু শেখ (৫০), গাড়ি চালক; মনির শেখ (৪৭), দর্জি; এবং সানি শেখ (৩৯), ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। ভাইয়েরা নিজেরা জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত হলেও রিপনের সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মতো অর্থশক্তি তাদের কারো নেই।
বিবাহিত জীবন ও সন্তানদের স্বপ্ন
বর্তমানে তিনি বসবাস করেন যাত্রাবাড়ী থানাধীন রায়েরবাগ, রশিদবাগ এলাকায় একটি ছোট বাসায়। পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী শাহীনা বেগম (২৫) এবং তিন সন্তান আরহি ইসলাম (১১), আয়ান ইসলাম (৭) এবং আড়াই বছর বয়সী ছোট্ট আয়াত ইসলাম। আরহি ও আয়ান স্থানীয় রায়েরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৫ম ও ১ম শ্রেণিতে পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল রিপনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
কর্মজীবন ও আয়ের অবস্থা
আহতের আগে রিপন একজন পিকআপ চালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রতিদিন বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করে মাসে প্রায় ২৫,০০০ টাকা আয় করতেন। কমিশনে গাড়ি চালিয়ে যে আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চালাতেন, সন্তানদের পড়ালেখা চালাতেন এবং ঘরভাড়াসহ যাবতীয় ব্যয় মেটাতেন। পিতা-মাতাহীন এক যুবকের জন্য এই অর্থই ছিল বেঁচে থাকার রশি।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ১৯ জুলাইয়ের ভয়াবহ দিন
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন রিপন নিজেও একাত্ম হয়ে যান এই ন্যায্য দাবির সংগ্রামে। ১৫ জুলাই থেকেই তিনি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯ জুলাই শুক্রবার, নামাজ শেষে রায়েরবাগ থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে বের হন। দুপুর ৩টার দিকে যখন তিনি কদমতলী থানার কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎ করে ছাদ থেকে পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরু করে।
একটি গুলি সোজা এসে আঘাত করে তার বাম চোখে। ছিটকে পড়ে যান তিনি রাস্তায়। ভয়ের চেয়ে বড় হয়ে আসে অন্ধকার। সত্যিকারের অন্ধকার। একটি চোখের আলো নিভে যায় সেদিন।
চিকিৎসার বিভ্রান্তি, হয়রানি ও হতাশা
প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানকার কর্তব্যরতরা কোনো চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠায়। পরে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালে। সেখানে কিছু ওষুধ দেওয়া হয় এবং বলা হয় ২২ জুলাই যেতে। ২২ তারিখ রিপন সেখানে গেলে কয়েকটি টেস্ট করানো হয়। এরপর তারা জানায় যে গুলি এখনো চোখে রয়ে গেছে এবং অপারেশন লাগবে। পরে একদিন হাসপাতালে ভর্তি রেখে গুলি বের করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপারেশনের পরেও চোখে কোনো দৃষ্টিশক্তি ফেরেনি। যখন জিজ্ঞেস করা হয় “চোখে দেখা যাবে না কেন?” তখন ডাক্তারদের একটাই জবাব, “আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে চোখে না দেখতে পাওয়ার কারণে রিপন হোসেন কোনো কাজ করতে পারছেন না। সংসার চলছে ধার-দেনায়। সন্তানের পড়াশুনার খরচ পর্যন্ত মেটানো যাচ্ছে না। চোখে কালো অন্ধকার, আর সামনে আর্থিক অনিশ্চয়তার দুর্বিষহ যাত্রা। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছেন না, চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারছেন না।
আর্থিক সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
আপাতত কিছু বেসরকারি সহায়তায় সংসার চলছে ঠিকই, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে, স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। একজন শ্রমজীবী পিতার এক চোখ হারিয়ে ফেলার পরেও যখন রাষ্ট্র তার পেছনে দাঁড়ায় না, তখন সেটি একটি জাতির বিবেকের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। রিপন হোসেন এখন শুধু বাঁচার জন্য নয়, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে, চোখের আলোহীনতা সত্তে¡ও তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহানুভ‚তির অপেক্ষায় আছেন। মো: রিপন হোসেনের জীবন এখন একটি নিঃসঙ্গ যুদ্ধ। তিনি এক চোখ হারিয়েছেন, কিন্তু হার মানেননি। তবে আর্থিক অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা-অপ্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক অবহেলার কারণে তার লড়াই প্রতিদিন কঠিনতর হচ্ছে। এই জীবনগাথা কোনো কাল্পনিক ট্র্যাজেডি নয় এটি বাস্তব, রক্তমাখা, অন্ধকারে ডুবে থাকা একজন বাংলাদেশি পিতার দৈনন্দিন জীবন। আজ তার পাশে দাঁড়ানোর সময় তার জন্য, তার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য, মানবতার জন্য। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিবেকবান মানুষের প্রতি আমাদের অনুরোধ আসুন, আমরা তার পাশে দাঁড়াই। তার চোখের আলো না ফিরলেও, তার পরিবারের মুখে যেন আলো জ্বলে।
প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসার সুযোগ: সরকারি উদ্যোগে চোখের পুনরায় চিকিৎসা (চোখের প্রতিস্থাপন, বিদেশে রেফার ইত্যাদি)।
২. পুনর্বাসন সহায়তা: তার স্ত্রীর নামে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু করতে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা।
৩. আবাসন: নিজ গ্রামে একটি বাসযোগ্য ঘর নির্মাণ।
৪. মাসিক ভাতা সহায়তা: প্রতিবন্ধী ভাতা চালু এবং সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি।
এক নজরে মো: রিপন হোসেন
নাম : মো: রিপন হোসেন
জন্ম তারিখ : ৫/৩/১৯৮৯
জন্মস্থান : ঢাকা
পেশা : পিকআপ চালক (ভাঁড়ায় চালিত)
নিজ জেল : মুন্সীগঞ্জ
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ নন্দন কোনা, ইউনিয়ন: কোলা, থানা: সিরাজদিখান, জেলা: মুন্সীগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রায়েরবাগ, রশিদ বাগ, ইউনিয়ন: মাতুয়াইল, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতা : মৃত মো: ছোরহাব হোসেন
মাতা : মৃত মোসা: মমতাজ বেগম
মাসিক আয় : ২৫,০০০ (বর্তমানে বন্ধ)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন (স্ত্রী, সন্তান-৩ জন, রিপন হোসেন)
স্ত্রী : শাহীনা বেগম, বয়স: ২৫ বছর, গৃহিণী
সন্তান : ৩ জন
১. আরহি ইসলাম, বয়স: ১১ বছর, শ্রেণি: ৫ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: রায়েরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
২. আয়ান ইসলাম, বয়স: ৭ বছর, শ্রেণি: ১ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: রায়েরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
৩. আয়াত ইসলাম, বয়স: ৩ বছর
ভাই : ৩ জন
১. মো: বাবু শেখ, বয়স: ৫০ বছর, পেশা: গাড়িচালক
২. মো: মনির শেখ, বয়স: ৪৭ বছর, পেশা: দর্জি
৩. মো: সানি শেখ, বয়স: ৩৯ বছর, পেশা: ইলেকট্রিক মিস্ত্রী
আহত বিবরণ
ঘটনার স্থান : কদমতলী থানা সংলগ্ন, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, শুক্রবার, দুপুর ৩.০০টা
আক্রমণকারি : কদমতলি থানার পুলিশ বাহিনী
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍