হোম / আহতদের তালিকা / মো: রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)
মো: রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)

মো: রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম শুধু পরিচিতি নয়, বরং একটি সময়ের আর্তনাদ ও সাহসিকতার প্রতীক হয়ে থাকে। তেমনই এক নাম মো. রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)। ২০০০ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া অপুর শিকড় ভোলার বোরহানউদ্দিনে। অভাবের সংসারে ৫ জন ভাই-বোনের মধ্যে অপু ছিলেন পরিবারের অন্যতম আশার প্রদীপ। বাবার সাথে কাঁধ মিলিয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালানো আর ভিভো মোবাইল কোম্পানিতে কাজের মাধ্যমে সাত সদস্যের অভাবী সংসারকে আগলে রেখেছিলেন তিনি।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই; জুলাই বিপ্লবের এক রক্তঝরা বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা ৭টায় যাত্রাবাড়ী থানা সংলগ্ন কাঁচাবাজারের সামনে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিল চলছিল, তখন রাষ্ট্রের নির্দয় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ছররা গুলিতে বিদীর্ণ হয় অপুর দেহ। একটি জ্বলন্ত ছররা গুলি সরাসরি তার ডান চোখকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সেই রাতে রক্তভেজা শরীরে ঢাকা মেডিকেল থেকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট—প্রতিটি দরজায় কড়া নেড়েও ভাগ্যের নির্মমতায় সময়মতো চিকিৎসা পাননি তিনি। অবহেলা আর গ্রেফতারের আতঙ্কে সেই রাতে অপুর পৃথিবী চিরতরে অন্ধকারে ঢেকে যেতে শুরু করে।

এ পর্যন্ত তিনটি জটিল অস্ত্রোপচার হলেও অপুর ডান চোখের দৃষ্টি ফেরেনি। রেটিনা ও কর্নিয়ার মারাত্মক জখম নিয়ে তিনি এখন এক অসহ্য যন্ত্রণার জীবন অতিবাহিত করছেন। বাবার পিকআপ চালানোর সামান্য আয়ে যেখানে সংসার চলে না, সেখানে আরও দুটি ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচারের (রেটিনা ও কর্নিয়া ট্রান্সপ্ল্যান্ট) খরচ জোগানো যেন পাহাড়সম বোঝা। একসময়ের কর্মঠ এই তরুণ আজ ঘরবন্দি, রোদে বের হতে পারেন না, ধুলোবালি তার জন্য বিষ। অপু ভিক্ষা চান না, তিনি চান চিকিৎসার সুযোগ আর মেধা অনুযায়ী একটি ডেস্ক-ভিত্তিক কর্মসংস্থান, যেন আবারও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের হাল ধরতে পারেন।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

বৈষম্যের গুলিতে ঝাঁঝরা
এক তরুণের হৃদয়

কিছু নাম ইতিহাসের পাতায় অশ্রুসিক্ত হয়ে থাকে, কিছু মুখ হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতীক যার একটি নাম মো: রিয়াজ মোর্শেদ, ডাকনাম অপু। এ নামটি কেবল একটি পরিচিতি নয়, এটি এক তরুণ আত্মার প্রতিধ্বনি, এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, দমন পীড়ন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েও সাহসিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০০০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বুকে জন্ম নিয়েছিলেন অপু। শহরের কোলাহল, সংকট আর স্বপ্নের ভেতরে তাঁর বেড়ে ওঠা; যেখানে চারপাশে ছিল সীমাহীন সংগ্রাম, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অসীম সাহস। তাঁর পরিবার কখনো বিত্তবান ছিল না; বরং প্রতিদিনের রুটি রোজগার, পিতার কষ্টার্জিত ড্রাইভিংয়ের আয়ে চলা সাত সদস্যের সংসার ছিল জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু অর্থনৈতিক অনটন কখনো অপুর অন্তর্দৃষ্টি ও মানবিক বোধকে দুর্বল করতে পারেনি। তাঁর চোখে ছিল সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার তীব্র সাহস এবং হৃদয়ে ছিল অন্যায়ের প্রতিবাদ করার এক অনবদ্য শক্তি।
শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার দক্ষিণ কুতুবখালীর ছোট্ট একটি বাসায়। দেয়ালে পলেস্তারা ঝরলেও অপুর চোখে ছিল মহাকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। তিনি কখনো বড় অফিসার কিংবা বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি, বরং চেয়েছিলেন একজন সৎ মানুষ হিসেবে বাঁচতে, পরিবারকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস দিতে। অল্প বয়সেই জীবনের ভার কাঁধে তুলে নেন। ভিভো মোবাইল কোম্পানিতে কাজ করেন, গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতে সাহায্য করেন। একদিকে নিজের পড়াশোনা, অন্যদিকে সংসারের খরচ এই ভারসাম্য রক্ষা করতে নিয়ে অপুর ভিতরটা গড়ে উঠেছিল ধৈর্য, দায়িত্ব ও বাস্তবতার মাটিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো এক যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু‘ অপুর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দেশে বৈষম্য, অনাচার, দুর্নীতি আর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের লাখো তরুণের জন্য এবং এই বিশ্বাস থেকেই তিনি যুক্ত হন ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। অপুর জীবনগাথা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে একটি জাতির বিবেকের প্রহরী। এক তরুণ, যে নিজের চোখ হারিয়েও দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে স্বপ্ন দেখা যায় এবং কীভাবে রক্তঝরা চোখে, সত্যের জন্য লড়াই করা যায়। ইতিহাস হয়তো অনেক নাম ভুলে যাবে, কিš‘ রিয়াজ মোরশেদ (অপু)-এর নাম থাকবে সেই তালিকায়, যারা নিজেকে বিসর্জন দিয়ে অন্যায়ের মুখে দাঁড়িয়েছিল অটল হয়ে।
এক নিঃশব্দ সংগ্রামের ইতিহাস
রিয়াজ মোরশেদ (অপু) এর জীবনের শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠেছে একটি সাধারণ কিন্তু সংবেদনশীল, আন্তরিক ও সংগ্রামী পরিবারের পরতে পরতে। তাঁর শিকড় প্রোথিত ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মিজি বাড়িতে। একসময় এ গ্রামের মাটি, বাতাস, নদী আর মানুষ ছিল তাঁদের ঠিকানা। কিন্তু জীবিকার তাগিদে, ভবিষ্যতের আশায়, জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে রিয়াজের পরিবারকে পাড়ি জমাতে হয় রাজধানী ঢাকায়। এক নির্মম নগর, যেখানে স্বপ্ন প্রসারিত হয়, তেমনি প্রতিদিন জীবনের জন্য যুদ্ধ করেও বেঁচে থাকতে হয়। তারা বসতি গড়েন যাত্রাবাড়ী থানার অন্তর্গত দনিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কুতুবখালী এলাকায়, যেখানে তাদের বর্তমান জীবনযাপন এক সংগ্রামময় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। পরিবারের কর্ণধার পিতা মো. সিরাজ হাওলাদার। বয়স ৫৫ বছর পেরোলেও তিনি এখনো পিকআপ ভ্যান চালিয়ে সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেন ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, আবার গভীর রাত কখনো যাত্রাবাড়ী, কখনো টঙ্গী, কখনো বা আশুলিয়া এই নিয়ত ছুটে চলা কেবল জীবিকা নয় এটি তাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রমাণ, তাঁর পরিবারের জন্য এক নীরব আত্মত্যাগ। তাঁর আয়ের মূল উৎস একমাত্র এই পিকআপ চালানো, যার মধ্য দিয়েই কোনোরকমে চলে সাত সদস্যের পরিবার। রিয়াজের মা ফিরোজা বেগম ৪৮ বছর বয়সী এক গৃহিণী, যাঁর চোখে আছে নিঃসঙ্গ রাতের জেগে থাকার ক্লান্তি, আর মুখে লেগে থাকে নীরব আত্মত্যাগের ভাষাহীন হাসি। তিনি কোনোদিন চাকরি করেননি, তাঁর কর্মস্থল ছিল সংসারের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি দুঃসময়। সংসারের সদস্যদের যত্ন নেয়া, রিয়াজের অসুস্থতার দিনে রাতভর পাশে বসে থাকা, মেয়েদের বিয়ে দেয়া, ছেলেকে প্রতিদিন সাহস জোগানো এই সবকিছুই তিনি করেছেন কোনো দাবি ছাড়াই, এক অনুপম মাতৃত্বের নিদর্শন হয়ে। রিয়াজের পরিবারে রয়েছে তিন জন বড় বোন শারমিন জাহান সুলতানা, নাসরিন জাহান তুলি এবং সিমু জাহান সেতু। তিনজনই এখন গৃহিণী। শারমিন শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি, নবম শ্রেণিতে পড়ালেখা থেমে গেলেও জীবন যুদ্ধ থেমে থাকেনি তাঁর জন্য। নাসরিন পড়াশুনা করেছেন বিবিএ (অনার্স) পর্যন্ত, কিন্তু সে শিক্ষার মূল্যায়ন হয়নি চাকরির বাজারে। তিনি সংসার গুছিয়ে নেন, তবুও এক আক্ষেপ রয়ে যায় সমাজের নারীদের জন্য উপযুক্ত কাজের অভাব নিয়ে। সিমু এখনও তরুণী, কিন্তু তিনিও সংসার জীবনেই নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। সবচেয়ে ছোট ভাই ফারাবি ইসলাম ইফাত, যার বয়স মাত্র ১৬। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে এখন সে একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শিখছে। কৈশোরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেটিও বুঝে গিয়েছে জীবনের নির্মমতা, সংসারের হাল ধরার দায়িত্ব। এই পুরো পরিবার একটি প্রতিচ্ছবি বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের, যারা দিন এনে দিন খায়, যারা স্বপ্ন দেখার আগেই বাস্তবতার ঘূর্ণিপাকে আটকা পড়ে যায়। রিয়াজ মোরশেদ এ পরিবারেরই সন্তান যার হৃদয়ে ছিলো দেশের প্রতি ভালোবাসা, পরিবারকে স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার স্বপ এবং যার জীবন শেষমেশ থেমে যেতে বসেছে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার গুলিতে। এ পরিবার কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়, এখানে প্রতিটি সদস্য একে অপরের কাছে আশ্রয়, শক্তি এবং সাহস খুঁজে পায়। রিয়াজের যন্ত্রণার দিনে এই পরিবারই তাঁর পাশে থেকেছে কেউ চোখে জল লুকিয়ে, কেউ ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে হাসি ছড়িয়ে। তাঁদের এই নিঃশব্দ ত্যাগই রিয়াজের বেঁচে থাকা এবং লড়াইয়ের প্রধান ভিত্তি। স্বপ্নের ভার কাঁধে তুলে নেয়া এক কিশোর যোদ্ধার গল্প রিয়াজ মোরশেদ (অপু)-এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন এক একটি সংগ্রামের ফ্রেমে বাঁধা গল্প। জীবনের ঊষালগ্নেই তিনি বুঝে ফেলেছিলেন, এ পৃথিবীতে শুধু স্বপ্ন দেখে বাঁচা যায় না, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে চাই কঠোর শ্রম, আত্মত্যাগ, চাই নি:শব্দে কষ্ট বয়ে নেওয়ার মানসিকতা। তাই কিশোর বয়সেই, যখন অন্যরা স্কুল-কলেজে পড়া, খেলাধুলা বা বিনোদনে ব্যস্ত থাকে, তখন রিয়াজ নামেন জীবিকার কঠিন পথে হাত-পায়ে ক্লান্তির শিকল পরে তার কিন্তু হৃদয়ে দুর্দম সাহস আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিজ্ঞা। তাঁর শ্রমজীবনের সূচনা হয় আন্তর্জাতিক মোবাইল ব্র্যান্ড ভিভো কোম্পানিতে কাজ করার মাধ্যমে। এখানে তিনি সেলস ও মার্কেটিংয়ের মতো দায়িত্বে ছিলেন। সকাল থেকে রাত অবধি ছুটতে হতো দোকানে দোকানে, মানুষকে বোঝাতে হতো পণ্যের গুণাগুণ, হাসিমুখে নিতে হতো বেচা-কেনার চাপে থাকা ক্লান্তি। কমিশনের ওপর নির্ভর করে যে সামান্য অর্থ আসত, তা দিয়ে সংসারের বাজার করতেন, ছোট ভাইয়ের স্কুলের খরচ মেটাতেন, আর কখনো মায়ের হাতে তুলে দিতেন নীরব ভালোবাসার টুকরো। কিন্তু জীবনের চাকা কেবল এক চাকরির ঘূর্ণিতে ঘুরে না। রিয়াজ তাই একসময় ড্রাইভিংকেই নিজের দ্বিতীয় পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর বাবার মতো তিনিও স্টিয়ারিং ধরে নেমে পড়েন ঢাকার রাস্তায়। কোনোদিন ছোট ট্রাক, কখনো পিকআপ, আবার কখনো ব্যক্তিগত গাড়ি যেটা পাওয়া যেত, সেটাই চালাতেন। সারাদিন গরম রোদের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে রাতে ঘরে ফিরতেন ক্লান্ত দেহ নিয়ে, কিন্তু মুখে থাকত মৃদু হাসি। কারণ, তিনি জানতেন এই শ্রম, ঘাম, ক্লান্তিই তাঁর মা-বাবার মুখে একটুখানি নিশ্চিন্তার পরশ বুলিয়ে দেয়। রিয়াজের এই শ্রমের ভিতরে লুকিয়েছিল এক গভীর মানবিক বোধ। তিনি নিজে হয়তো ঠিকমতো পড়াশুনা করতে পারেননি, জীবন তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি; কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন তাঁর ছোট ভাই ফারাবি ইসলাম ইফাত যেন জীবনের এই সংঘাতময় যাত্রায় একটু স্বচ্ছন্দে হাঁটতে পারে। রিয়াজের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল “ইফাতকে কিছু একটা করতে হবে” যেন তাকে আর মোবাইল কোম্পানির কাজ বা গাড়ির হর্ন বাজিয়ে জীবন শুরু করতে না হয়। এই স্বপ্নের জন্য তিনি নিজের আরাম-আয়েশের কথা কখনো ভাবেননি। ছোট ভাইয়ের জন্য জামা কিনতে গিয়ে নিজের জন্য কিছু না কেনা, ইফাতের স্কুল ফি জোগাতে নিজের প্রিয় খাবার বা বই ছেড়ে দেওয়া এই ছিল তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিদর্শন। এই শ্রমজীবন ছিল রিয়াজের জন্য কেবল এক টাকার লেনদেন নয় এটি ছিল তাঁর আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন। এই অল্প বয়সে যখন জীবন উপভোগ করার কথা, তখন তিনি জীবনকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এক নীরব বীরের মতো। আজও তাঁর সেই ব্যাগভর্তি মোবাইল, সেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, সেই অফিসের ইউনিফর্ম নিঃশব্দে সাক্ষ্য দেয় এই তরুণ শুধু রুটি-রুজির জন্য কাজ করেননি। তিনি নিজের স্বপ্ন, পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও রিয়াজের রক্তাক্ত প্রত্যয় ২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ যেন নতুন এক জাগরণ, যেখানে প্রতিটি তরুণ-তরুণীর বুকে জ্বলছিল একটিই প্রশ্নে: “এই বৈষম্য কবে শেষ হবে?” সেই মাস আর ছিল না ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ পৃষ্ঠা। এটি হয়ে উঠেছিল বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনতার উত্তাল শ্লোগান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের অনড় প্রতিজ্ঞা এবং সবচেয়ে ভয়ানকভাবে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার রক্তমাখা দলিল। দেশজুড়ে জ্বলছিল সেদিন আগুন, কিন্তু সেটি আগুন ছিল ঘৃণার নয়, পরিবর্তনের; সে আগুন ধ্বংস নয় আশা তৈরি করছিল। সেই আগুনেই পুড়েছিল অনেক স্বপ্ন, অনেক জীবন তাদেরই একজন ছিল মো. রিয়াজ মোরশেদ (অপু), যে কেবল একজন ছাত্র নয় বরং একটি যুগের প্রতিনিধিত্বকারী এক সাহসী তরুণ। রিয়াজ তখন নিছক কোনো আন্দোলনকারী নন, তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিজের এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা ও প্রতিবাদী চেতনার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তাঁর কণ্ঠে ছিল সত্যের দাবি দাওয়া, চোখে ছিল বিশ্বাস যে এই রাষ্ট্র একদিন তার সন্তানদের ভালোবাসবে, বৈষম্যের বিষমুক্ত হবে শিক্ষা। ১৭ জুলাই, এক সাধারণ বুধবারে, যখন সকাল শুরু হয়েছিল ঢাকা শহরের চিরচেনা ব্যস্ততায়, তখন রিয়াজ ও তাঁর বন্ধুরা পরিকল্পনা করছিল এক অসাধারণ দিন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে রিয়াজ জড়ো হন কাজলা মোড়ে। সে জায়গাটি হঠাৎই রূপ নেয় মিনি শাহবাগে যেখানে দনিয়া কলেজ, কাজলা হাইস্কুল, কামরাঙ্গীরচর থেকে শত শত শিক্ষার্থী যোগ দিতে থাকে মিছিলে। তাদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল “আমরা বৈষম্য চাই না,” “প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান,” “বঞ্চনা নয়, ন্যায্যতা দাও।” সেই মিছিল ছিল শান্তিপূর্ণ। তারা রাস্তা অবরোধ করেছিল, কিন্তু কারো গাড়িতে আগুন লাগায়নি, কারো ওপর হামলা চালায়নি। তারা শুধু চেয়েছিল রাষ্ট্র তাদের কণ্ঠ শুনুক, তাদের চোখের ভাষা বুঝুক। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে শান্ত কণ্ঠকে মোকাবিলা করে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে ওঠে সেই বিকেল। হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে। পুলিশ এসে উপস্থিত হয়, র‌্যাব তাদের পাশে দাঁড়ায়, আর তার সঙ্গে ছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র ও যুব সংগঠনের পরিচয়হীন, মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। তাদের হাতে লাঠি, রড, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর সবচেয়ে ভয়ানক, ছররা বন্দুক। ভয়াবহ হামলায় চারদিক ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে। ছাত্রদের দৌড়, কান্না, রক্ত, আর প্রতিরোধের মিছিল যেন এক সঙ্গে মিশে যায় শহরের বাতাসে। রিয়াজ সেদিন অল্প আহত হন, শরীরে লাগে রাবার বুলেটের আঘাত, চোখের কোণে লাগে টিয়ারশেলের ধোঁয়া, কিন্তু তিনি পালিয়ে যাননি। তাঁর চোখে ছিল না ভয়, বরং ছিল শপথ এই আন্দোলন থামানো যাবে না। পরদিন ১৮ জুলাই, ঠিক মাগরিবের আজানের পর, যখন শহরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল পবিত্র ধ্বনি “হাইয়্যা আলাল ফালাহ”, তখন রিয়াজ আবার পথে নামেন। এইবার আর কয়েকজন নয়, বড় একটি মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। হাতে ছিল মাইক, কণ্ঠে ছিল চিৎকার “আমরা বৈষম্য মানি না!” গন্তব্য ছিল যাত্রাবাড়ী থানা, উদ্দেশ্য ছিল স্মারকলিপি দেয়া এবং অবস্থান কর্মসূচি। কিন্তু রাষ্ট্র এ কণ্ঠকে মেনে নেয়নি। যখন মিছিলটি সাইনবোর্ড অতিক্রম করে থানার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ করে শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। আকাশে গর্জে ওঠে গুলি, টিয়ারশেলের ধোঁয়া, ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সব শব্দের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল ছররা বন্দুকের সেই বিভীষিকাময় আওয়াজ। রিয়াজ তখন মিছিলের সামনে, চিৎকার করে বলছিলেন, “পিছিয়ে যেও না ভাইয়েরা! আমরা ন্যায্যতার জন্য লড়ছি!” আর ঠিক তখনই তাঁর শরীর বিদ্ধ হয় রাষ্ট্রের রক্তপিপাসু ছররা গুলিতে। তাঁর বুক ফেটে যায়, পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে যায়, মাথায় রক্ত জমে ওঠে, আর তাঁর প্রিয় ডান চোখ যা দিয়ে সে দেখত স্বপ্ন, সে চোখটিকে ছিন্ন করে দেয় ছররার এক বিস্ফোরক টুকরো। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে রিয়াজ, তাঁর চারপাশে চিৎকার করে কাঁদে বন্ধুরা। কিন্তু ছররা গুলি তো কান্না চেনে না, তারা চেনে শুধু নিরস্ত্র প্রতিরোধের ওপর নির্মমতা চালানোকে। এই ছিল রিয়াজের জেগে ওঠা। তরুণ, যে নিজের শরীর দিয়ে ইতিহাসের পাতায় লিখে গেল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অন্তিম প্রতিবাদের চিহ্ন। রিয়াজের রক্তে ভেসে যাওয়া সেই মিছিল আজও হয়তো যাত্রাবাড়ীর বাতাসে ভাসে। তিনি এখনো জীবিত আছেন তাঁর ক্ষতবিক্ষত চোখে নয়, বরং দেশের লাখো তরুণের চোখে যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখেছে তাঁর কাছ থেকে। তাঁর রক্তাক্ত ডান চোখ এখন এই রাষ্ট্রের এক লজ্জার আয়না যেখানে আমরা দেখি, রাষ্ট্র কীভাবে তার সন্তানদের গুলি করে চুপ করাতে চায়। কিন্তু রিয়াজের মতো কেউ চুপ থাকে না। ইতিহাস জানে শরীর হয়তো থেমে যায়, কিন্তু কণ্ঠ থামে না। রিয়াজ মোরশেদ (অপু) ছিলেন সেই কণ্ঠের নাম, যে একবার জেগে উঠে আর কখনো নত হয়নি। রাষ্ট্রীয় অবহেলার ছুরিতে আরেকবার ক্ষতবিক্ষত রিয়াজ ১৮ জুলাইয়ের সন্ধ্যা নামতেই ঢাকার আকাশে যেন ভেসে উঠেছিল শোক আর আতঙ্কের ছায়া। সেদিনের ছাত্র মিছিলে ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া তরুণ রিয়াজ মোরশেদ (অপু)-কে যখন মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তখন বন্ধু আর তার সহযোদ্ধারা কোনো কিছু না ভেবেই তাঁকে কোলে তুলে ছুটে চলে যান রাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। উদ্দেশ্য একটাই একজন মারাত্মক আহত তরুণকে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া। কিন্তু সে হাসপাতালের গেটে পৌঁছেই বুঝতে পারেন, শুধু শরীরে গুলির আঘাতই নয়, এই রাষ্ট্রে আহত হওয়ার পর নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারটুকুও পাওয়া একটা অসম্ভব স্বপ্ন। ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি ইউনিটের সামনে তখন শুধুই আতঙ্ক, আর নিঃশব্দ হাহাকার। মিছিল থেকে ধরে আনা ছাত্রদের তালিকা তৈরি হচ্ছিল ভেতরে, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অবস্থান করছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আহত ছাত্রদের চিকিৎসা নিতে আসা মানেই তখন নতুন করে গ্রেফতার হওয়ার শঙ্কা। রিয়াজ তখন রক্তে ভেজা, চোখ একপাশে ফুলে ওঠা, গলার নিচে জমাট বেঁধে থাকা রক্ত। তাঁর এক বন্ধু ডাক্তারদের অনুনয় করে বলছিলেন “ভাই, ওর অবস্থা খুব খারাপ, ওর চোখে গুলি লেগেছে, ওকে একটু দেখেন” কিন্তু প্রতি্যুত্তরে পাওয়া যাচ্ছিল একটাই বাক্য “এখানে থাকা নিরাপদ না, পুলিশ চারপাশে, দ্রুত চলে যান।” যেন এই তরুণ আর মানুষ নয়, রাষ্ট্রের চোখে সে এখন অপরাধী; একটু চিকিৎসাও তার প্রাপ্য নয়। সেখান থেকে তারা মরিয়া হয়ে রওয়ানা হন আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। কারণ রিয়াজের ডান চোখে লাগা ছররা গুলি তখন তাঁকে ধীরে ধীরে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। বন্ধুরা ভেবেছিলেন, অন্তত চোখের হাসপাতালে গেলে একটু সূরাহা হবে, তাঁর একটি চোখ তো বাঁচানো যাবে। রাত তখন ঘন অন্ধকারে ঢাকা, অ্যাম্বুলেন্স নয় একটি সাধারণ সিএনজিতে ঠাসা অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। কিন্তু ভাগ্য সেদিন যেন প্রতিটি দরজা বন্ধ করে রেখেছিল তাঁর জন্য। আগারগাঁও চক্ষু হাসপাতালে পৌঁছে তাঁরা দেখে, ইমার্জেন্সি ইউনিট বন্ধ। একজন সিকিউরিটি গার্ড জানায়, “রাতে ইমার্জেন্সিতে কোনো ডাক্তার থাকেন না, আপনারা সকাল ৮টার আগে আসেন।” যেন রক্তক্ষরণে অন্ধ হতে থাকা তরুণের চোখের সময় থেমে আছে ভোর না হলে চিকিৎসা মিলবে না! রিয়াজের বন্ধুরা তখন ভেঙে পড়ে, কেউ মাথায় হাত রেখে বলে “ওরে পানি খাওয়াই, রক্ত জমে যাচ্ছে।” কিন্তু হাসপাতালের করিডোরে তখন কেবল অস্বস্তিকর নীরবতা, যেন একটা গর্জে ওঠা প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করতে চায় রাষ্ট্রযন্ত্রের এক অদৃশ্য দেয়াল। চোখে একরাশ রক্ত, কানে টিনিটাসের শব্দ, গায়ে ছররা গুলির অসহনীয় যন্ত্রণা এই অবস্থায় একজন মানুষ যখন চিকিৎসা চাইতে গিয়েও ফিরে আসে, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নয়, সেটি রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার নগ্ন বহি:প্রকাশ। রিয়াজকে ফেরানো হয়নি শুধু চিকিৎসার অভাবে নয়, বরং ফেরানো হয়েছিল রাষ্ট্রের ভয় আর নির্লজ্জ নিষ্ক্রিয়তার কারণে। তাঁর রক্তাক্ত শরীর চিৎকার করছিল, “আমার চোখ বাঁচাও,” কিন্তু হাসপাতালের দরজা যেন সে চিৎকার শুনতে পায়নি বা শুনেও চিকিৎসা দিতে চায়নি। সেদিনের সেই নীরব দরজাগুলো আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে একজন আহত ছাত্র বারবার ছুটে বেরিয়েছে চিকিৎসার আশায়, অথচ তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বারবার, অবহেলা আর ভয় দেখিয়ে। হাসপাতালের সেই ঠাণ্ডা করিডোরে এখনো হয়তো জমে আছে রিয়াজের শুকনো রক্ত, যেটি বলে এই রাষ্ট্রে প্রতিবাদ করলে শুধু গুলি নয়, চিকিৎসার দরজাটাও বন্ধ হয়ে যায়। এই ছিল সেই রাতের গল্প যেখানে একজন তরুণের চোখ হারানোর আগেই সমাজ তার প্রতি সমস্ত চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল। যে যন্ত্রণার শেষ নেই ছররা গুলির বিভীষিকাময় আঘাতের পর, চিকিৎসা শুরু হয়েছিল, কিন্তু শুরুই যেন এক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অন্ধকারের পথ। রিয়াজ মোরশেদ (অপু)-এর ডান চোখে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা ছিল শুধু শারীরিক নয়, এক জটিল স্নায়ুবিক ও কর্নিয়াগত জখম যার চিকিৎসা মানেই একের পর এক অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, অব্যাহত ব্যথা, অজানা ভয় এবং অসহায়তাকে সঙ্গী করে পথচলা। প্রথম দফায় জরুরি ভিত্তিতে একটি অপারেশন করা হয়, যেখানে চোখের ভিতরের রক্ত সরিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা হয়। চোখ তখন ফুলে উঠেছিল, রক্তের ধারা শুকিয়ে হলেও চোখের দৃষ্টিশক্তি ছিল প্রায় নিঃশেষ। এরপর আসে দ্বিতীয় অপারেশনের ধাক্কা। ডাক্তারেরা জানান, রেটিনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং চোখের বলয়ের পেছনের স্নায়ুগুলোতে ছররার টুকরো এখনো রয়ে গেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অস্ত্রোপচারে সেই ছররার কণা বের করার চেষ্টার পাশাপাশি, কৃত্রিম লেন্স বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই অস্ত্রোপচারগুলো শুধু দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর চেষ্টা নয়, বরং রিয়াজের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছিল। এক তরুণ যার চোখ দিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, যার দৃষ্টিতে ছিল মুক্তির প্রত্যয়, সেই চোখে এখন অবিরাম ব্যথা, হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া দৃষ্টিপথ এবং সবসময়ই অনিশ্চয়তার এক সঙ্গী ছায়া। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, চিকিৎসা এখানেই শেষ নয়। রিয়াজের চোখে এখনো রয়েছে রক্ত জমাটের ছাপ এবং পেছনের রেটিনায় স্নায়ুবিক ক্ষত যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো খারাপ হতে পারে। তাই তাঁকে পেরোতে হবে আরও দু’টি জটিল ও ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচারের ধাপ। একটি হবে পূর্ণাঙ্গ রেটিনা রিপেয়ারিং সার্জারি আর অপরটি কর্নিয়াল ট্রান্সপ্ল্যান্ট, যেটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিদেশি যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। এ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ই পেরিয়েছে দুই লক্ষাধিক টাকা। প্রতি সপ্তাহে ফলো-আপ, ওষুধ, লেজার থেরাপি, চোখে ইনজেকশন সব মিলিয়ে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। অথচ এই বিপুল অর্থের কোনো উৎস নেই। সংসারে উপার্জনের একমাত্র ব্যক্তি রিয়াজের পিতা একজন মধ্যবয়সী চালক, যিনি প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় ঘাম ঝরিয়ে কিছু টাকা উপার্জন করেন। তাঁর পক্ষে বিশাল চিকিৎসা ব্যয় চালানো কার্যত অসম্ভব। বাড়িতে রয়েছে রিয়াজের মা ও ছোট দুই বোন তাদের চোখে এখন ভয়, দুশ্চিন্তা আর প্রশ্ন” এই ছেলের চোখ কি আর আগের মতো দেখতে পারবে?” রিয়াজ নিজেও এখন এক মানসিক অবসাদের মধ্যে পড়ে আছেন। একসময় যে চোখ দিয়ে ক্লাসে নোট নিতেন, রাত জেগে বই পড়তেন, প্রজেক্ট তৈরি করতেন সেই চোখ এখন অন্ধকারে বন্দী। মাঝে মাঝে তাঁর মাথা ভার হয়ে আসে, চোখে ঝাপসা দেখতে পান, আর মনে হয়; এ জীবন হয়তো আর আগের মতো হবে না।
তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। রাজনীতিকেরা এখন নীরব, মিডিয়া চুপ আর প্রশাসন একটিও সান্ত্বনার বাক্য উচ্চারণ করেনি। একটি রাষ্ট্র যদি তার প্রতিবাদী সন্তানকে চোখের আলো কেড়ে নেয়ার পর চিকিৎসা পর্যন্ত না দেয়, তবে সে রাষ্ট্রের বিবেক কি একটিবারও কেঁপে ওঠে না? এই মুহূর্তে রিয়াজের চোখের সামনে শুধু একটি জিনিস অপারেশনের তালিকা। আর তার নিচে অন্ধকার, দীর্ঘ, ব্যয়বহুল, শারীরিক ও মানসিক কষ্টের এক লড়াই। কিন্তু সেই লড়াইয়ে সঙ্গী হতে হলে আমাদের সবার মানবিক হাত বাড়িয়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। রিয়াজের চোখ এখন শুধু তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি নয়, একটি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক। সে চোখের আলো ফিরিয়ে আনতে না পারলে, হারিয়ে যাবে কেবল একটি তরুণ নয়, হারিয়ে যাবে স্বপ্ন দেখার সাহস। বেঁচে থাকা মানেই লড়াই: রিয়াজের প্রতিদিনের যুদ্ধ বেঁচে থাকা অনেক সময় নিঃশ্বাস নেয়ার নাম নয়, বরং প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে নতুন যন্ত্রণাকে গ্রহণ করার নাম। মো. রিয়াজ মোরশেদ (অপু)-এর জীবনের আজকের বাস্তবতাও তেমনি একটা দেহ, যেটা ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে; এক মন, যেটা ক্লান্ত; আর একটা চোখ, যা নিভে গেছে, তবু প্রতিবাদের আগুন এখনও নিভেনি। চোখে ছররা গুলির সেই বিভীষিকাময় আঘাত তাঁর শরীরের চেহারা বদলে দিয়েছে আজ রিয়াজ শুধু একজন অন্ধ হতে বসা তরুণ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলায় লাঞ্ছিত এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি বর্তমানে পুরোপুরি বেকার। যে বয়সে তার হাতে থাকা উচিত ছিল একটি চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার, সে হাতে এখন হাসপাতালের পেসস্ক্রিপশন, ইনজেকশনের ডেট আর চোখে লালচে ব্যান্ডেজ। দিন আসে, দিন যায়, কিন্তু ঘরে কাজ নেই, আয় নেই। শুধু আছে অসীম চিন্তা—নিজের ভবিষ্যৎ, মা-বোনের মুখ আর চোখের ভেতরের থেমে থাকা আলো নিয়ে। রিয়াজের এক চোখ অন্ধ, অন্য চোখে রোদ পড়লে ব্যথা শুরু হয় সূর্যের আলো সহ্য করতে পারেন না। হাঁটতে বের হলে চোখ কুঁচকে যায়, মাথা ঘোরে। রাস্তার ধুলাবালি তাঁর জন্য বিষতুল্য কারণ চোখে ধুলো পড়লেই সংক্রমণ হতে পারে, যেটা ভবিষ্যতের অপারেশনের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। ডাক্তার কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। ধুলাবালি, তীব্র রোদ এবং দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার মতো কাজ রিয়াজের জন্য বিপজ্জনক। ফলে দৈহিক পরিশ্রমের যেকোনো কাজ, যেমন রিকশা চালানো, নির্মাণ শ্রমিকের কাজ, দোকানে খাটুনি দেয়া সবই তাঁর জন্য কার্যত অসম্ভব। অথচ সমাজ তাঁর কাজ চায়, পরিবার তাঁকে আশা করে, আর জীবন তাঁকে চাপে ফেলে। তিনি বারবার ভাবেন “আমি কি আর কোনদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবো না?” রিয়াজ এখন চায় একটি স্থায়ী, স্বাস্থ্যসম্মত কর্মসংস্থান। এমন একটি কাজ, যেখানে তাঁর দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচিত হবে, যেখানে তাঁর শরীরকে না পুড়িয়ে তাঁর মস্তিষ্ক ব্যবহার করা যাবে। হয়তো কোনো ডেস্কভিত্তিক কাজ, হয়তো ডাটা এন্ট্রি বা কল সেন্টারে একটি জায়গা যেখানে সূর্য কম থাকবে, ধুলাবালি হবে না আর প্রতিদিন লাঞ্ছনার বদলে মানুষের সম্মান থাকবে। তাঁর একান্ত চাওয়া, “আমি ভিক্ষা চাই না, সহানুভূতি চাই না আমি শুধু এমন একটা কাজ চাই, যেখানে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারি।” একটি কর্মসংস্থান শুধু অর্থ উপার্জনের বিষয় নয় রিয়াজের মতো একজন তরুণের জন্য এটা আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার লড়াই। নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্ব, নিজেকে সমাজের বোঝা নয়, একজন সচল নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার সংকল্প। আজ যদি আমরা তাঁর পাশে না দাঁড়াই, তবে এই রাষ্ট্র আরও একজন তরুণকে হারাবে একজন সংগ্রামী, স্বপ্নবাজ তরুণকে, যিনি গুলি খেয়েও মাথা নোয়াননি। বেঁচে থাকার এই লড়াইয়ে রিয়াজ যেন একা না থাকেন এই দাবিটাই এখন সময়ের কাছে সবচেয়ে জরুরি। রিয়াজের জীবনে বেঁচে থাকাটাই আজ এক রকমের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের অস্ত্র সাহস, ধৈর্য আর সমাজের মানুষের অনুপ্রেরণা। একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি রিয়াজ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। ছিলেন না কোনো সংগঠনের কর্মী। তিনি শুধু ছিলেন একজন তারুণ্যের প্রতিনিধি, একজন সচেতন নাগরিক যিনি বুঝতেন বৈষম্য আর নিপীড়নের দাঁতের কামড় ঠিক কতটা গভীর। অথচ এই রাষ্ট্র তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি, বরং অন্ধত্ব উপহার দিয়েছে। এই লেখাটি কেবল মো: রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)-এর জীবনী নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, একটি সরকারের অমানবিক নিষ্ঠুরতা এবং একটি তরুণের স্বপ্নভঙ্গের প্রামাণ্য দলিল। আজ, রিয়াজ তাঁর চোখের আলো ফেরাতে চায়, ফিরে পেতে চায় স্বাভাবিক জীবন এবং আশা করে একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার।

এক নজরে মো: রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)
নাম : মো: রিয়াজ মোর্শেদ (অপু)
জন্ম তারিখ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০০
জন্মস্থান : ঢাকা পূর্বের
পেশা : চাকরি,
ভিভো মোবাইল কোম্পানি ও গাড়ি চালক (বর্তমানে কর্মহীন)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মিজি বাড়ি, ইউনিয়ন: পক্ষিয়া, থানা: বোরহানউদ্দিন, জেলা: ভোলা
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: দক্ষিণ কুতুবখালী, ইউনিয়ন: ধনিয়া, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: সিরাজ হাওলাদার
মায়ের নাম : মিসেস ফিরোজা
পিতার পেশা : ড্রাইভার,
বয়স : ৫৫
মায়ের পেশা : গৃহিণী,
বয়স: ৪৮ মাসিক
আয় : ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং পরিবারের
সদস্য সংখ্যা : ৭ জন ভাই-বোনদের
বিবরণ ১. শারমিন জাহান সুলতানা,
বয়স: ৩১ বছর,
পেশা: গৃহিণী,
শিক্ষাগত যোগ্যতা: ৯ম শ্রেণি ২. নাসরিন জাহান তুলি, বয়স: ২৮, পেশা: গৃহিণী,
শিক্ষাগত যোগ্যতা: বিবিএ (অনার্স) ৩. সিমু জাহান সেতু, বয়স: ২১ বছর, পেশা: গৃহিণী, ৪. ফারাবি ইসলাম ইফাত, বয়স: ১৬ বছর পেশা: শিক্ষাগত যোগ্যতা: ষষ্ঠ
শ্রেণি আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী থানা সংলগ্ন (কাঁচাবাজারের সামনে আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪ (বৃহস্পতিবার)
আনুমানিক সন্ধ্যা ৭.০০-৭.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : পুলিশের ছররা গুলি এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍