খলিল উল্যাহ রবিউল
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
“দেশের প্রয়োজনে যখন ছাত্ররা পথে নেমেছিল, একজন শ্রমিক হয়েও আমি ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আজ আমার শরীরে বিঁধে থাকা বুলেটগুলো সেই অন্যায়ের সাক্ষী চাঁদপুরের নদীবিধৌত জনপদের সন্তান, সাহসী গার্মেন্টস কর্মী খলিল উল্যাহ রবিউলের এই জীবনগাথা আজ জুলাই বিপ্লবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া রবিউল অভাবের সংসারে হাল ধরতে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেছিলেন। সামান্য আয়ে নিজের খরচ চালিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা আর ছোট ভাইবোনের স্বপ্ন বুনে যাচ্ছিলেন এই তরুণ।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক উত্তাল দিন। ঢাকার শনির আখড়া এলাকায় যখন ছাত্র-জনতার মিছিলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী চড়াও হয়, তখন রবিউল ন্যায়ের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই মিছিলে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট রবিউলের বুক, পিঠ, পা আর হাতে বিঁধে যায়। একশরও বেশি বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয় তার শরীর। রূপসী বাংলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে প্রায় ৫০টি বুলেট বের করা সম্ভব হলেও, অর্থের অভাবে বাকি ৫০টিরও বেশি বুলেট আজও তার শরীরের ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
চিকিৎসার ৭০ হাজার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তার নিঃস্ব পরিবার আজ ঋণের সাগরে নিমজ্জিত। শরীরের ভেতরে থাকা বুলেটের যন্ত্রণায় রবিউল আজ কর্মহীন। যে হাত দিয়ে তিনি গার্মেন্টসের সেলাই মেশিনে আগামীর স্বপ্ন বুনতেন, সেই হাত আজ যন্ত্রণায় অবশ। অভাবের তাড়নায় ছোট ভাইবোনের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। রবিউল আজ শুধু শারীরিক যন্ত্রণায় নয়, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম মানসিক উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক উত্তাল দিন। ঢাকার শনির আখড়া এলাকায় যখন ছাত্র-জনতার মিছিলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী চড়াও হয়, তখন রবিউল ন্যায়ের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই মিছিলে পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট রবিউলের বুক, পিঠ, পা আর হাতে বিঁধে যায়। একশরও বেশি বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয় তার শরীর। রূপসী বাংলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে প্রায় ৫০টি বুলেট বের করা সম্ভব হলেও, অর্থের অভাবে বাকি ৫০টিরও বেশি বুলেট আজও তার শরীরের ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
চিকিৎসার ৭০ হাজার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তার নিঃস্ব পরিবার আজ ঋণের সাগরে নিমজ্জিত। শরীরের ভেতরে থাকা বুলেটের যন্ত্রণায় রবিউল আজ কর্মহীন। যে হাত দিয়ে তিনি গার্মেন্টসের সেলাই মেশিনে আগামীর স্বপ্ন বুনতেন, সেই হাত আজ যন্ত্রণায় অবশ। অভাবের তাড়নায় ছোট ভাইবোনের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। রবিউল আজ শুধু শারীরিক যন্ত্রণায় নয়, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম মানসিক উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
চেতনায় স্বাধীনতার দীপ্ত আলো
খলিল উল্যাহ রবিউল ১৯৯৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার এক নদীবিধৌত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মেঘনা, পদ্মা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় অব¯ি’ত এই ঐতিহাসিক শহর চাঁদপুর তার শৈশবের আবেগ, শিকড় ও স্মৃতির স্থান। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীভিত্তিক জীবনধারা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির ছায়ায় তার বেড়ে ওঠা। খলিল উল্যাহর পরিবার ছিল সাধারণ ও সংগ্রামী। পিতা আবুল বাশার একজন কৃষক, যিনি নিজের ঘাম ঝরিয়ে সংসারের খরচ জুগিয়ে গেছেন। মায়ের কাঁধে ছিল গৃহ¯’ালির ভার। চার ভাইবোনের মধ্যে রবিউল তৃতীয় বড় বোন আকলিমা বিবাহিত। শৈশব থেকেই সংসারের অভাব-অনটন তার জীবনের এক অবি”েছদ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র্যের দেয়ালে আটকে না থেকে, খলিল উল্যাহ লেখাপড়া শেষে কর্মজীবনের খোঁজে ঢাকায় পাড়ি জমান।
রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে তিনি একজন গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মাসিক মাত্র কয়েক হাজার টাকার আয় দিয়ে তিনি নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করতেন। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারখানায় শ্রম দেওয়া, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, শ্রমজীবী মানুষের অবহেলা এই সবই তার জীবনের নিত্যসঙ্গী ছিল। তবুও তার মধ্যে ছিল এক অনমনীয় মনোবল ও সহিষ্ণুতা, যা তাকে প্রতিনিয়ত জীবনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। খলিল উল্যাহ রবিউলের জীবন কাহিনি নিছক একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের গল্প নয় এটি একজন সংগ্রামী যুবকের বাস্তব জীবনযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি। তার মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যেমন আছে সীমাহীন পরিশ্রম, তেমনি আছে মানুষের মতো বাঁচার অধিকার রক্ষার জন্য অব্যাহত লড়াই। এই লড়াই শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নয়, সম্মান, অধিকার ও স্বপ্নের জন্যও। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজের প্রান্তিক মানুষেরাও ইতিহাসের অংশ এবং তাদের প্রতিটি সংগ্রামই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের পাথেয়। পারিবারিক অবস্থা খলিল উল্যাহ রবিউলের পরিবার একটি স্বল্প-আয়ের, শ্রমজীবী পরিবার। তাঁর পিতা, আবুল বাশার, বয়স প্রায় ৫৫ বছর, পেশায় একজন কৃষিজীবী। সামান্য জমিতে মৌসুমভিত্তিক চাষাবাদ করে তিনি যেটুকু আয় করেন, তা দিয়ে পুরো পরিবারের খরচ মেটানো অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতি মাসে তাঁর গড় আয় প্রায় ৭,০০০ টাকা, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এক প্রকার অপ্রতুল। খলিল উল্যাহ চার ভাইবোনের মধ্যে একজন। বড় বোন আকলিমা খাতুন বিবাহিত; স্বামীও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী হওয়ায় তিনি নিজের সংসার নিয়েই হিমশিম খাচ্ছেন, পরিবারের আর্থিক সহায়তা দিতে পারেন না। ছোট বোন লাকি এখনো শিক্ষাজীবনে রয়েছে; পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়েও পরিবারকে নিয়মিত সংগ্রাম করতে হয়। ছোট ভাই হুমায়ুন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে খলিল উল্যাহর মতোই শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন যদিও কাজ করেন দুজন, কিন্তু দুজনেরই আয় নিতান্ত কম, এবং তা দিয়ে শুধু নিজেদের চলাই কঠিন। কনিষ্ঠ ভাই কাদের এখনো ছাত্র, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিবার দুশ্চিন্তায় রয়েছে, কারণ অর্থের অভাবে তার পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যেতে পারে। এই পরিবারে নেই কোনো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নেই জমিজমা বা সঞ্চয়। পিতা-মাতার বার্ধক্য, ভাইবোনের পড়াশোনা ও জীবনের দায়িত্ব সব মিলিয়ে খলিল উল্যাহ ছিলেন পরিবারের অন্যতম ভরসাস্থল। গার্মেন্টসে কঠোর পরিশ্রম করে যা আয় করতেন, তা তিনি পরিবারের পেছনে ব্যয় করতেন নিজের জন্য রাখতেন সামান্যই। অথচ সেই খলিল উল্যাহ আজ নিজেই আহত, কর্মক্ষমতা হারাতে বসেছেন।
অর্থনৈতিকভাবে এই পরিবার একেবারেই বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর খলিল উল্যাহর চিকিৎসা ব্যয় এবং কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি পরিবারটির সামনে এক নিদারুণ অন্ধকার ডেকে এনেছে। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন দেশজুড়ে ছাত্ররা কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে নেমেছিল, তখন সেই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ২০ জুলাই। সারাদেশের মত ঢাকাও উত্তাল হয়ে ওঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নামে পরিচিত এই বৃহত্তর ছাত্র-গণজাগরণে। ঠিক সেই সময়, ঢাকার শনির আখড়া এলাকা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন খলিল উল্যাহ রবিউল নামের এক তরুণ। তিনি শুধু একজন গার্মেন্টস শ্রমিকই ছিলেন না, বরং গণতন্ত্র, ন্যায্যতা ও সাম্যের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠ হিসেবে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্রদের পাশে। ২০ জুলাইয়ের সেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির সময়, কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং কিছু ক্ষেত্রে তাজা গুলির মাধ্যমে ছাত্র ও সংহতিশীল সাধারণ মানুষদের ওপর চালানো হয় দমনমূলক হামলা। এই হামলার শিকার হন খলিল উল্যাহ রবিউলও। পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট তার শরীরে প্রায় একশর বেশি স্থানে বিদ্ধ হয়। পায়ে, বুকে, পিঠে, হাতে শরীরের প্রায় প্রতিটি অংশে আঘাত লাগে। এমন ভয়াবহ আক্রমণে তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই মারাত্মক আঘাত শুধু তার শারীরিক অবস্থাকেই দুর্বল করে দেয়নি, বরং তার মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর ছাপ ফেলে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে আশপাশের আন্দোলনকারী ও পথচারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘসময় চিকিৎসাধীন থাকার পরও তার শরীরের বহু ক্ষতচিহ্ন থেকে যায় এবং এখনো সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। মাঝে মাঝেই সেই ভয়ানক মুহূর্তের কথা মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে, খলিল উল্যাহ রবিউলের ওপর চালানো এই হামলা ছিল রাষ্ট্রীয় দমননীতির একটি নিষ্ঠুর দৃষ্টান্ত। তার অপরাধ ছিল একটি ন্যায়সংগত দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ। অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো। কিন্তু বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী যেভাবে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে, তা প্রমাণ করে এই আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের দাবি ছিল না বরং এটি হয়ে উঠেছিল এক দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদের প্রতীক। খলিল উল্যাহ রবিউলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়,এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে কতটা নিষ্ঠুর বাধা আসতে পারে, আর সেই বাধা মোকাবেলায় সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ কেমন হতে পারে। তাঁর সংগ্রাম আজ ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা, প্রতিরোধের প্রতীক। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলি লাগার পরপরই মারাত্মক আহত অবস্থায় খলিল উল্যাহ রবিউলকে দ্রুত রূপসী বাংলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর শরীর ছিল রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত, তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করে তার শরীর থেকে প্রায় ৫০টি রাবার গুলি অপসারণ করেন। এটি ছিল একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রোপচার, যেখানে সময়ের প্রতিটি ক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুঃখজনকভাবে এখনো তার শরীরের বিভিন্ন অংশে রাবার গুলির টুকরো রয়ে গেছে, যেগুলো অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এসব অবশিষ্ট গুলি প্রতিনিয়ত তার শরীরে ব্যথা, অস্বস্তি এবং শারীরিক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। কখনো হঠাৎ জ্বর, কখনো ফুলে যাওয়া কোনো অঙ্গ, আবার কখনো গভীর ব্যথা এইসব শারীরিক কষ্ট তাকে প্রতিদিন যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড় করায়। গুলিগুলোর উপস্থিতি শুধু তার চলাফেরাকেই সীমাবদ্ধ করেনি, বরং স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্নকেও প্রায় মৃত করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসা ব্যয়ে প্রায় ৭০,০০০ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে, যা তার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বহন করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। পিতা একজন ক্ষুদ্র কৃষক এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্য ছিলেন খলিল উল্যাহ নিজেই। তাই এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা খরচ জোগাতে পরিবারকে ধার-দেনা ও সাহায্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। বর্তমানে অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় ফলো-আপ, ওষুধ, পুনর্বাসন থেরাপি কিংবা গুলিগুলো অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কিছুই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দিনদিন তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় খলিল উল্যাহর পুনরায় সুস্থভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা, শারীরিক পুনর্বাসন এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবন ও ভবিষ্যৎ আজ চিকিৎসা ও সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল এই কঠিন সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা তার পুনরুদ্ধারের একমাত্র আশ্রয়।
প্রস্তাবনা
১. খলিল উল্যাহ রবিউলের চিকিৎসার খরচ বহন করা।
২.পরিবারটির টিকে থাকার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। পরিশেষে, খলিল উল্যাহ রবিউল কেবল একজন আহত কিশোর নয়, বরং এই প্রজন্মের সাহসী কণ্ঠস্বর যিনি ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন এবং মূল্য চুকিয়েছেন রক্ত দিয়ে। আজ তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এক নজরে খলিল উল্যাহ রবিউল
নাম : খলিল উল্যাহ রবিউল
পিতা : আবুল বাশার,
বৃদ্ধ মাতা : আফরোজা বেগম,
বৃদ্ধ পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : শনির আখড়া,
ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর
খলিল উল্যাহ রবিউল ১৯৯৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার এক নদীবিধৌত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মেঘনা, পদ্মা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় অব¯ি’ত এই ঐতিহাসিক শহর চাঁদপুর তার শৈশবের আবেগ, শিকড় ও স্মৃতির স্থান। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীভিত্তিক জীবনধারা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির ছায়ায় তার বেড়ে ওঠা। খলিল উল্যাহর পরিবার ছিল সাধারণ ও সংগ্রামী। পিতা আবুল বাশার একজন কৃষক, যিনি নিজের ঘাম ঝরিয়ে সংসারের খরচ জুগিয়ে গেছেন। মায়ের কাঁধে ছিল গৃহ¯’ালির ভার। চার ভাইবোনের মধ্যে রবিউল তৃতীয় বড় বোন আকলিমা বিবাহিত। শৈশব থেকেই সংসারের অভাব-অনটন তার জীবনের এক অবি”েছদ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র্যের দেয়ালে আটকে না থেকে, খলিল উল্যাহ লেখাপড়া শেষে কর্মজীবনের খোঁজে ঢাকায় পাড়ি জমান।
রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে তিনি একজন গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মাসিক মাত্র কয়েক হাজার টাকার আয় দিয়ে তিনি নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করতেন। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারখানায় শ্রম দেওয়া, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, শ্রমজীবী মানুষের অবহেলা এই সবই তার জীবনের নিত্যসঙ্গী ছিল। তবুও তার মধ্যে ছিল এক অনমনীয় মনোবল ও সহিষ্ণুতা, যা তাকে প্রতিনিয়ত জীবনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। খলিল উল্যাহ রবিউলের জীবন কাহিনি নিছক একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের গল্প নয় এটি একজন সংগ্রামী যুবকের বাস্তব জীবনযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি। তার মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যেমন আছে সীমাহীন পরিশ্রম, তেমনি আছে মানুষের মতো বাঁচার অধিকার রক্ষার জন্য অব্যাহত লড়াই। এই লড়াই শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নয়, সম্মান, অধিকার ও স্বপ্নের জন্যও। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজের প্রান্তিক মানুষেরাও ইতিহাসের অংশ এবং তাদের প্রতিটি সংগ্রামই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের পাথেয়। পারিবারিক অবস্থা খলিল উল্যাহ রবিউলের পরিবার একটি স্বল্প-আয়ের, শ্রমজীবী পরিবার। তাঁর পিতা, আবুল বাশার, বয়স প্রায় ৫৫ বছর, পেশায় একজন কৃষিজীবী। সামান্য জমিতে মৌসুমভিত্তিক চাষাবাদ করে তিনি যেটুকু আয় করেন, তা দিয়ে পুরো পরিবারের খরচ মেটানো অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতি মাসে তাঁর গড় আয় প্রায় ৭,০০০ টাকা, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এক প্রকার অপ্রতুল। খলিল উল্যাহ চার ভাইবোনের মধ্যে একজন। বড় বোন আকলিমা খাতুন বিবাহিত; স্বামীও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী হওয়ায় তিনি নিজের সংসার নিয়েই হিমশিম খাচ্ছেন, পরিবারের আর্থিক সহায়তা দিতে পারেন না। ছোট বোন লাকি এখনো শিক্ষাজীবনে রয়েছে; পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়েও পরিবারকে নিয়মিত সংগ্রাম করতে হয়। ছোট ভাই হুমায়ুন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে খলিল উল্যাহর মতোই শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন যদিও কাজ করেন দুজন, কিন্তু দুজনেরই আয় নিতান্ত কম, এবং তা দিয়ে শুধু নিজেদের চলাই কঠিন। কনিষ্ঠ ভাই কাদের এখনো ছাত্র, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিবার দুশ্চিন্তায় রয়েছে, কারণ অর্থের অভাবে তার পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যেতে পারে। এই পরিবারে নেই কোনো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নেই জমিজমা বা সঞ্চয়। পিতা-মাতার বার্ধক্য, ভাইবোনের পড়াশোনা ও জীবনের দায়িত্ব সব মিলিয়ে খলিল উল্যাহ ছিলেন পরিবারের অন্যতম ভরসাস্থল। গার্মেন্টসে কঠোর পরিশ্রম করে যা আয় করতেন, তা তিনি পরিবারের পেছনে ব্যয় করতেন নিজের জন্য রাখতেন সামান্যই। অথচ সেই খলিল উল্যাহ আজ নিজেই আহত, কর্মক্ষমতা হারাতে বসেছেন।
অর্থনৈতিকভাবে এই পরিবার একেবারেই বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর খলিল উল্যাহর চিকিৎসা ব্যয় এবং কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি পরিবারটির সামনে এক নিদারুণ অন্ধকার ডেকে এনেছে। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন দেশজুড়ে ছাত্ররা কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে নেমেছিল, তখন সেই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ২০ জুলাই। সারাদেশের মত ঢাকাও উত্তাল হয়ে ওঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নামে পরিচিত এই বৃহত্তর ছাত্র-গণজাগরণে। ঠিক সেই সময়, ঢাকার শনির আখড়া এলাকা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন খলিল উল্যাহ রবিউল নামের এক তরুণ। তিনি শুধু একজন গার্মেন্টস শ্রমিকই ছিলেন না, বরং গণতন্ত্র, ন্যায্যতা ও সাম্যের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠ হিসেবে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্রদের পাশে। ২০ জুলাইয়ের সেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির সময়, কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং কিছু ক্ষেত্রে তাজা গুলির মাধ্যমে ছাত্র ও সংহতিশীল সাধারণ মানুষদের ওপর চালানো হয় দমনমূলক হামলা। এই হামলার শিকার হন খলিল উল্যাহ রবিউলও। পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট তার শরীরে প্রায় একশর বেশি স্থানে বিদ্ধ হয়। পায়ে, বুকে, পিঠে, হাতে শরীরের প্রায় প্রতিটি অংশে আঘাত লাগে। এমন ভয়াবহ আক্রমণে তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই মারাত্মক আঘাত শুধু তার শারীরিক অবস্থাকেই দুর্বল করে দেয়নি, বরং তার মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর ছাপ ফেলে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে আশপাশের আন্দোলনকারী ও পথচারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘসময় চিকিৎসাধীন থাকার পরও তার শরীরের বহু ক্ষতচিহ্ন থেকে যায় এবং এখনো সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। মাঝে মাঝেই সেই ভয়ানক মুহূর্তের কথা মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে, খলিল উল্যাহ রবিউলের ওপর চালানো এই হামলা ছিল রাষ্ট্রীয় দমননীতির একটি নিষ্ঠুর দৃষ্টান্ত। তার অপরাধ ছিল একটি ন্যায়সংগত দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ। অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো। কিন্তু বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী যেভাবে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে, তা প্রমাণ করে এই আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের দাবি ছিল না বরং এটি হয়ে উঠেছিল এক দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদের প্রতীক। খলিল উল্যাহ রবিউলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়,এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে কতটা নিষ্ঠুর বাধা আসতে পারে, আর সেই বাধা মোকাবেলায় সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ কেমন হতে পারে। তাঁর সংগ্রাম আজ ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা, প্রতিরোধের প্রতীক। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলি লাগার পরপরই মারাত্মক আহত অবস্থায় খলিল উল্যাহ রবিউলকে দ্রুত রূপসী বাংলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর শরীর ছিল রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত, তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করে তার শরীর থেকে প্রায় ৫০টি রাবার গুলি অপসারণ করেন। এটি ছিল একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রোপচার, যেখানে সময়ের প্রতিটি ক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুঃখজনকভাবে এখনো তার শরীরের বিভিন্ন অংশে রাবার গুলির টুকরো রয়ে গেছে, যেগুলো অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এসব অবশিষ্ট গুলি প্রতিনিয়ত তার শরীরে ব্যথা, অস্বস্তি এবং শারীরিক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। কখনো হঠাৎ জ্বর, কখনো ফুলে যাওয়া কোনো অঙ্গ, আবার কখনো গভীর ব্যথা এইসব শারীরিক কষ্ট তাকে প্রতিদিন যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড় করায়। গুলিগুলোর উপস্থিতি শুধু তার চলাফেরাকেই সীমাবদ্ধ করেনি, বরং স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্নকেও প্রায় মৃত করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসা ব্যয়ে প্রায় ৭০,০০০ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে, যা তার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বহন করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। পিতা একজন ক্ষুদ্র কৃষক এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্য ছিলেন খলিল উল্যাহ নিজেই। তাই এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা খরচ জোগাতে পরিবারকে ধার-দেনা ও সাহায্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। বর্তমানে অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় ফলো-আপ, ওষুধ, পুনর্বাসন থেরাপি কিংবা গুলিগুলো অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কিছুই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দিনদিন তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় খলিল উল্যাহর পুনরায় সুস্থভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা, শারীরিক পুনর্বাসন এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবন ও ভবিষ্যৎ আজ চিকিৎসা ও সহানুভূতির ওপর নির্ভরশীল এই কঠিন সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা তার পুনরুদ্ধারের একমাত্র আশ্রয়।
প্রস্তাবনা
১. খলিল উল্যাহ রবিউলের চিকিৎসার খরচ বহন করা।
২.পরিবারটির টিকে থাকার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। পরিশেষে, খলিল উল্যাহ রবিউল কেবল একজন আহত কিশোর নয়, বরং এই প্রজন্মের সাহসী কণ্ঠস্বর যিনি ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন এবং মূল্য চুকিয়েছেন রক্ত দিয়ে। আজ তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এক নজরে খলিল উল্যাহ রবিউল
নাম : খলিল উল্যাহ রবিউল
পিতা : আবুল বাশার,
বৃদ্ধ মাতা : আফরোজা বেগম,
বৃদ্ধ পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : শনির আখড়া,
ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍