হোম / আহতদের তালিকা / মো: আরিফ মিয়া
মো: আরিফ মিয়া

মো: আরিফ মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বৈষম্যহীন আগামীর স্বপ্নে আহত এক সবজি বিক্রেতার জীবনসংগ্রাম: আরিফ মিয়া
“আমার সন্তান মেধাবী হয়েও যদি ন্যায্য অধিকার না পায়, তবে তার পড়াশোনার সার্থকতা কোথায়?”—এই সাধারণ কিন্তু গভীর বোধ থেকেই ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজপথে নেমেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সন্তান মো. আরিফ মিয়া। ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করে নয় সদস্যের বিশাল পরিবারের ঘানি টানতেন তিনি। রাজনীতির মারপ্যাঁচ না বুঝলেও, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য একটি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন।

১৯ জুলাই দুপুর ২:৩০ মিনিটে রায়েরবাগ এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যৌথ হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজপথ। চোখের সামনে সহযোদ্ধাদের লুটিয়ে পড়তে দেখেও পিছু হটেননি আরিফ। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বুলেট তার ডান পায়ের হাঁটু বিদীর্ণ করে দেয়। মুগদা মেডিকেল হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলি বের করা হলেও, আরিফের সচল জীবন থমকে যায় সেখানেই।

অভাবের সংসারে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা চেপেছে তার কাঁধে। বর্তমানে তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, পিঠ ও কোমরের ব্যথায় ভারী কিছু বহন করা তার জন্য অসম্ভব। তার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম নিজস্ব ভ্যানটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে অর্থাভাবে। এখন অন্যের ভ্যান ভাড়া করে কোনোমতে টেনেটুনে দিন পার করছেন, যেখানে মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও নিচে নেমে এসেছে। ১০ ও ৬ বছর বয়সী দুই সন্তানের মাদ্রাসার খরচ আর পরিবারের অন্নসংস্থান করতে গিয়ে আরিফ এখন দিশেহারা।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

একজন সাধারণ সবজী বিক্রেতা হয়েও দেশের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা (ডান পায়ের হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ)
মো: আরিফ মিয়া
ক্রমিক : ০৭৪
আইডি : ঢাকা সিটি ০৭৪
জন্ম, পারিবারিক পটভূমি ও জীবিকা
মো: আরিফ মিয়া একজন সাধারণ মানুষ, যার জীবন শুরু হয়েছিল সরাইলের একটি শান্ত গ্রামে, টিঘর নামের এক অজপাড়াগাঁয়ে। জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে। তাঁর বাবা মো: মলাই মিয়া, বর্তমানে ৭০ বছরের এক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, সারা জীবন কষ্ট করে সংসার চালিয়েছেন। মা মাজেদা খাতুন, যিনি এখনও ৬৫ বছর বয়সে একটি সংসারের চালচিত্র ধরে রেখেছেন একজন গৃহিণী হিসেবে। আরিফ মিয়ার পরিবার কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল না।
নয় সদস্যের বিশাল পরিবারে তিন বোন: নাসিমা, শিরিনা এবং শাহিনা সকলেই গৃহিণী এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণি পেরিয়ে থেমে গেছে দারিদ্র্যের কাছে। স্ত্রী লিমা খাতুন, বয়স ৩০, একাধারে সন্তানদের লালনপালন ও সংসার দেখেন। সন্তান আরমান ও আরিয়ান, যথাক্রমে ১০ ও ৬ বছর বয়সী, পড়াশোনা করে ঢাকার একটি মাদরাসায়। যেখানে কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, নৈতিকতাও শেখানো হয়। এই সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য আরিফ মিয়া ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতেন। সকালে কারওয়ান বাজার থেকে শাকসবজি নিয়ে এসে বিকেলে অলিগলিতে ফেরি করে বিক্রি করতেন। এই কাজটাই ছিল তার জীবনের রুটিন, আয়ের প্রধান উৎস। মাসে গড়ে ১০ হাজার টাকার মতো আয় হতো, যার বেশিরভাগই সংসার খরচেই চলে যেত। একসময় তার নিজের একটি ভ্যান ছিল। সেই ভ্যানটি ছিল তার বাঁচার রসদ, মাথার ছায়া। সে ভ্যানটি আজ আর চালু নেই, নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ঘরের একপাশে। এখন তিনি একটি ভাড়া করা ভ্যানে করে কোনোরকমে পণ্য বিক্রি করেন, আয় আরও কমে গেছে। আন্দোলনের পটভূমি ও ১৯ জুলাইয়ের ঘটনা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ, বেকার তরুণ, অভিভাবক এবং শ্রমজীবী মানুষ একত্রিত হয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে একটি গণআন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থায় ন্যায়ভিত্তিক সংস্কার। এই আন্দোলনে শুধু ছাত্র-তরুণ নয়, সাধারণ মানুষও শামিল হয়। আরিফ মিয়া সেই মানুষদের একজন। তিনি বলেছিলেন, “যদি আমার সন্তান মেধায় ভালো ফল করে, তবু সরকারি চাকরি পায় না, তাহলে সে কিসের জন্য পড়বে?” এই চেতনা থেকেই তিনি ১৯ জুলাই ২০২৪, দুপুরে রায়েরবাগ এলাকায় একটি ছাত্র মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন। তখন মিছিলটি ক্রমে যাত্রাবাড়ী মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুপুর ২:৩০ মিনিটে হঠাৎ চারপাশ থেকে পুলিশ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যৌথ হামলা শুরু হয়। বেপরোয়া গুলিবর্ষণ, লাঠিচার্জ, গ্রেনেড সবকিছু মিলিয়ে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সে হামলায় তার চোখের সামনে পড়ে যান রোহান, নাইম, দিন মোহাম্মদ, জিহাদ, প্রান্ত এবং জাহাঙ্গীর, যারা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। আরিফ মিয়া তখন দিক-ভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পেছনে ফেরার সুযোগ না পেয়ে সামনে এগিয়ে গেলে আচমকা তার ডান পায়ের হাঁটুতে লাগে একটি গুলি। ব্যথায় চিৎকার করে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের কয়েকজন আন্দোলনকারী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
আহত হওয়ার বিবরণ ও চিকিৎসাজনিত যন্ত্রণা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আরিফ মিয়ার শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। মুগদা মেডিকেলে ভর্তি করা হলেও তিনি তখনই বুঝতে পারেন তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না। হাসপাতালে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুলি তার ডান পায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ হয়। হাঁটু থেকে অপারেশন করে গুলি অপসারণ করা হয়। তার পুরো শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা জানান, শারীরিকভাবে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেও, দীর্ঘমেয়াদী ভারী কোনো কাজ আর করতে পারবেন না। বিশেষ করে পিঠে ও কোমরে এখনো মাঝে মাঝে ব্যথা হয়, যা উঠানামা বা পণ্য টানার সময় অসহ্য যন্ত্রণায় পরিণত হয়। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে আরিফের পরিবারের ওপর নেমে আসে এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ওষুধ, স্যালাইন, ড্রেসিং, ফলোআপ ভিজিট, প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়, যা তিনি ধার-দেনা করে চালান। এখনো সেই দেনার বোঝা রয়ে গেছে।
দৈনন্দিন সংগ্রাম ও আর্থিক দুর্দশা বর্তমানে আরিফ মিয়া আগের মতো কাজ করতে পারেন না। যেদিন শরীর একটু ভালো থাকে, সেদিন তিনি সকালে হাটে যান, সবজি কিনে আনেন এবং ভাড়া করা ভ্যানে করে অলিতে-গলিতে ফেরি করেন। যেদিন ব্যথা বেশি হয় সেদিন ভ্যান নিয়ে বের হওয়া সম্ভব হয় না। রাস্তার ধারে বসে কোনোরকম সংসারের খরচটুকু উঠানোর চেষ্টা করেন। নিজস্ব যে ভ্যানটি ছিল, সেটি অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। সেটিকে ঠিক করাতে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকার মতো লাগবে, যা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মাসিক আয় এখন ১০ হাজার টাকার নিচে নেমে এসেছে। এই টাকায় সন্তানদের নিয়ে পরিবারের চাল-ডাল, চিকিৎসা খরচ চালানো অসম্ভব। অনেক সময় তিন বেলা খাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

এক নজরে মো: আরিফ মিয়া
নাম : মো: আরিফ মিয়া
জন্মতারিখ : ২৯/১/১৯৯২
জন্মস্থান : সরাইল
পেশা : সবজি বিক্রেতা
নিজ জেলা : বি-বাড়িয়া
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: টিঘর, থানা: সরাইল,
জেলা: বি-বাড়িয়া
বর্তমান ঠিকানা : ৫২/৬, মুজাহিদনগর (দোতালা মসজিদ রোড), রায়েরবাগ, কদমতলী, ঢাকা
পিতার নাম : মো: মলাই মিয়া, বয়স: ৭০ বছর
মাতার নাম : মাজেদা খাতুন, বয়স: ৬৫ বছর, পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : সবজি বিক্রি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৯ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ : বোন: ৩ জন ১. নাসিমা, বয়স: ৪৫ বছর, পেশা: গৃহিণী, শিক্ষাগত যোগ্যতা: পঞ্চম শ্রেণি ২. শিরিনা বয়স: ৪৩ বছর, পেশা: গৃহিণী, শিক্ষাগত যোগ্যতা: চতুর্থ শ্রেণি ৩. শাহিনা বয়স: ৪০ বছর, পেশা: গৃহিণী, শিক্ষাগত যোগ্যতা: চতুর্থ শ্রেণি

পরিবারের বিবরণ স্ত্রী: লিমা খাতুন, বয়স ৩০ বছর, পেশা: গৃহিণী সন্তানদের বিবরণ: ছেলে ২ জন ১. আরমান, বয়স: ১০ বছর, পেশা: ছাত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: মাদ্রাসাতুল কুরআন ওয়াসসুন্নাহ, ঢাকা ২. আরিয়ান, বয়স: ৬ বছর, পেশা: ছাত্র
আহত হওয়ার বিবরণ আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী
আহত হওয়ার সময় : ১৯/৭/২০২৪, দুপুর ২:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
আঘাতের ধরণ : ডান পায়ের হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍