হোম / আহতদের তালিকা / লাভলু
লাভলু

লাভলু

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

“আমি শুধু পানি দিতে এসেছিলাম!”—এক বুক হাহাকার আর দেশপ্রেম নিয়ে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই রাজপথে দাঁড়িয়ে এই আর্তনাদ করেছিলেন খুলনার রূপসার সন্তান মোঃ লাভলু। অভাবের তাড়নায় ছোটবেলায় ঢাকা আসা লাভলু রায়েরবাগ এলাকায় ভ্যান চালিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানের স্বপ্ন বুনে যাচ্ছিলেন। রাজনীতি না বুঝলেও, ছাত্রদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহমর্মিতা থেকে সেদিন বিকেলে তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পানি ও বিস্কুট নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন উত্তাল রায়েরবাগে।

বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে লাভলুর বাম পা বিদীর্ণ হয়ে যায়। রাজপথে লুটিয়ে পড়া লাভলুকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলেও, চরম অব্যবস্থাপনা আর ভিড়ের কারণে উপযুক্ত চিকিৎসা মেলেনি। এককালের কর্মঠ এই মানুষটি আজ পঙ্গুত্বের অভিশাপে শয্যাশায়ী। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধটুকুও কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি আজ অন্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ১৩ বছরের কিশোর ছেলে নাজমুলকে আজ কলম ছেড়ে জুতার কারখানায় শ্রম দিতে হচ্ছে। লাভলুর আহত হওয়ার কোনো ভিডিও বা ছবি নেই—কেবল এই একটি কারণে আজ তিনি সরকারি তালিকার বাইরে, কোনো সহায়তা বা স্বীকৃতি পাননি। যে দেশের ছাত্রদের তিনি পানি খাইয়ে তৃষ্ণা মেটাতেন, আজ সেই দেশের কাছেই তিনি এক উপেক্ষিত যোদ্ধা।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

নতুন স্বাধীনতা বিনির্মাণে একজন ভ্যান চালকের আত্মত্যাগ লাভলু

জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ
মোঃ লাভলুর জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে খুলনা জেলার রূপসা থানার কাইজদা ইউনিয়নের আইজগাতি পশ্চিমপাড়ায়। তার জন্ম হয়েছিল কৃষক পরিবারে। পিতা ফজলুল করিম ও মাতা ছাহেরা বেগম উভয়েই বর্তমানে প্রয়াত। ছেলেবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠেছেন লাভলু। পরিবারের অসচ্ছলতা তাকে লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। অল্প বয়সেই পেটের দায়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক অনির্বাণ সংগ্রামের জীবন। কঠিন বাস্তবতা তাকে তৈরি করেছে পরিশ্রমী, সহনশীল ও সংবেদনশীল একজন মানুষ হিসেবে।
পেশা ও জীবিকা ঢাকায় এসে লাভলু শুরুতে শ্রমজীবী হিসেবে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। শেষে থিতু হন ভ্যান চালানোর পেশায়। রায়েরবাগ এলাকার বাঁশপট্টিতে বসবাস করে প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়তেন রোজগারের আশায়। সারা দিনে গড়ে ৫০০-৬০০ টাকা আয় করতেন, যেখান থেকে সংসার চালানো এবং সন্তানদের পড়াশোনা করানো ছিল তার বড় সাফল্য। তবে করোনার পর ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ফলে এ আয়ে সংসার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও কোনোদিন পিছিয়ে যাননি। পরিবারই ছিল তার অনুপ্রেরণা। পরিবার ও সন্তানদের বর্তমান অবস্থা লাভলুর পরিবারে বর্তমানে ৫ জন সদস্য রয়েছে। বড় মেয়ে রাবেয়া একটি সমিতিতে চাকরি করে এবং এসএসসি পরীক্ষা দয়ে পাশ করেছে বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। ছোট ছেলে নাজমুল মাত্র ১৩ বছর বয়সেই জুতার কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। স্ত্রী অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। আগে এই পরিবারে রুটি-রুজির দায়িত্ব ছিল লাভলুর কাঁধে, কিন্তু এখন তার নিজের জন্যই রুটি জোটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এককালের কর্মঠ এই মানুষটি আজ ঘরে বসে থাকা এক আশ্রয়হীন অসহায় মানুষে পরিণত হয়েছেন। আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও তার ভূমিকা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে বৈষম্য ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, তখন সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে না থাকলেও মানবিক দিক থেকে নিজের জায়গা থেকে পাশে দাঁড়ান লাভলু। তিনি আন্দোলনরত ছাত্রদের জন্য পানি ও বিস্কুট নিয়ে গিয়েছিলেন। তার চোখে এই ছাত্ররাই ভবিষ্যতের আলো, দেশের পরিবর্তনের আশা। একজন ভ্যানচালক হয়েও তিনি যে হৃদয়ে কতটা উদার ছিলেন, সেটাই প্রমাণিত হয় তার এই সহমর্মিতার কাজে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াল মুহূর্ত ২০ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট। রায়েরবাগ এলাকায় আন্দোলনের সময় হঠাৎ করেই যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরু হয়। জনতা আতঙ্কে দিগি¦দিক ছোটে। তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে লাভলুর বাম পায়ে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আশেপাশের লোকজন প্রথমে ভয়ে এগিয়ে না এলেও পরে কয়েকজন এগিয়ে এসে তাকে টেনে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়। সে সময় তাঁর মুখে শুধু একটি কথা ছিল, “আমি শুধু পানি দিতে এসেছিলাম!” চিকিৎসা ব্যবস্থা ও দুর্দশা আহত লাভলুকে স্থানীয়রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে রোগীর ভিড়, নিরাপত্তার অভাব এবং জায়গার সংকুলান না থাকায়, কর্তব্যরতরা শুধু ব্যান্ডেজ করে বাসায় ফিরে যেতে বলেন। উন্নত চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ বা ভর্তি কোনো কিছুই করা হয়নি। ফলে ক্ষতস্থানটি সঠিকভাবে সেরে ওঠেনি। দরিদ্রতার কারণে তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যন্ত কিনতে পারেননি। বর্তমানে পায়ের সেই ক্ষত ও গুলির দাগ তার চলাফেরার স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দিয়েছে। বর্তমানে জীবনযাপন ও কর্মক্ষমতা লাভলু বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে কর্মক্ষম নন। পায়ে গুলির আঘাতের কারণে ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না, ফলে ভ্যান চালানো বা দৈহিক পরিশ্রমের কোনো কাজেই সে যেতে পারছে না। সংসারের ব্যয়ভার এখন স্ত্রী ও কিশোর ছেলের কাঁধে। নাজমুল, যার এখন স্কুলে থাকার কথা ছিল, সে আজ কারখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করছে। এই পরিবারটিকে এখন শুধুই টিকে থাকার জন্য লড়তে হচ্ছে। একটা সময়ে যে লাভলু ছিলেন পরিবারের চালিকাশক্তি, আজ তিনি নীরব, শয্যাশায়ী, ক্ষতবিক্ষত একজন অবহেলিত মানুষ। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব ঘটনার সময় কেউ ভিডিও বা ছবি ধারণ করেনি, তাই লাভলুর নাম সরকারি কোনো তালিকায় নেই। ফলে তিনি সরকারি সহায়তা, চিকিৎসাসেবা বা আর্থিক অনুদান কিছুই পাননি। প্রতিবেশীরা তার কষ্ট দেখলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। রাষ্ট্রও দেখেনি। অথচ একজন দরিদ্র নাগরিক যিনি রাজপথে কোনো অপরাধ না করেও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি এখন স্রেফ নথিভুক্ত না হওয়ার কারণে উপেক্ষিত। প্রস্তাবনা ১. উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: লাভলুর পায়ে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা হওয়ায় তার চলাফেরার সমস্যা রয়েছে। তাকে পুনরায় উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে, যাতে তিনি অন্তত স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন। এজন্য সরকারি উদ্যোগে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা করতে হবে। ২. আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ: একজন সাধারণ নাগরিক রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়েছেন। এই ঘটনায় লাভলুর পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে নগদ আর্থিক সহায়তা ও তার পরিবারের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি জানানো হচ্ছে। ৩. সন্তানের শিক্ষা সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা: রাবেয়া ও নাজমুলসহ তার সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা সমাজে টিকে থাকার শক্তি অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারটিকে খাদ্য সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

এক নজরে লাভলু
নাম : লাভলু
জন্ম তারিখ : ০২-০৪-১৯৭৯
জন্মস্থান : খুলনা পেশা : ভ্যান চালক
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: আইজগাতি পশ্চিম পাড়া, ইউনিয়ন : কাইজদা, থানা: রূপসা, জেলা : খুলনা
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা : রায়েরবাগ বাঁশপট্টি, থানা: কদমতলী, সিটি: ঢাকা দক্ষিণ, জেলা: ঢাকা

পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতা : মৃত ফজলুল করিম
মাতা : মৃত ছাহেরা মাসিক আয় : ৮০০০
আয়ের উৎস : স্ত্রী ও ছেলের মজুরি পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ ১. রাবেয়া, বয়স: ২২ বছর, পেশা: চাকরি (সমিতি) ২. নাজমুল, বয়স: ১৩ বছর, পেশা: শ্রমিক (জুতার কারখানা)
ঘটনার স্থান : রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪ বিকাল ৫:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী
আঘাতের ধরন : বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍