হোম / আহতদের তালিকা / আজিম ফকির
আজিম ফকির

আজিম ফকির

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

“শৈশবে বাবা-মাকে হারিয়েছি, যৌবনে স্ত্রী ছেড়ে গেছে, আর এখন রাষ্ট্র কেড়ে নিল আমার সচল শরীর”—বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের সন্তান মো. আজিম ফকিরের জীবনকাহিনি যেন এক বিষাদসিন্ধু। ১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া আজিম ফকির অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসে ভ্যানে ফল বিক্রি ও দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে জীবন অতিবাহিত করছিলেন। ৪ বছর আগে স্ত্রী চলে যাওয়ার পর তিন সন্তান নানা বাড়িতে থাকলেও, সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্নে একাকী লড়ে যাচ্ছিলেন এই নিরন্তর শ্রমিক।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট; স্বৈরাচারের পলায়নের খবরে যখন সারা দেশ আনন্দ মিছিলে উদ্বেলিত, তখন কাজলা পেট্রোল পাম্প এলাকায় সেই উৎসবে শামিল হয়েছিলেন আজিম ফকির। বিকেল ৩:৩০ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশের অতর্কিত গুলিবর্ষণে তার শরীরের নিচের অংশ বিদীর্ণ হয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়া এই বয়োবৃদ্ধ শ্রমজীবী মানুষকে উপস্থিত জনতা উদ্ধার করে ক্লিনিকে নিয়ে যায়।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে আজিম ফকিরের জীবন বিষাদময় হয়ে উঠেছে। শরীরে গুলির ক্ষত ও তীব্র ব্যথার কারণে তিনি এখন আর ভারী কাজ করতে পারেন না। ১২ হাজার টাকার অনিয়মিত আয়ও এখন বন্ধের পথে। অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে না পেরে বর্তমানে তিনি প্রায় পঙ্গু অবস্থায় কুতুবখালী এলাকায় একাকী দিন কাটাচ্ছেন। যে বাবার উপার্জনে দাখিল পরীক্ষার্থী রাকিব কিংবা ছোট সুমাইয়ার পড়াশোনা চলার কথা ছিল, সেই বাবা আজ চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন। এই নিঃস্ব মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর মতো আজ কেউ নেই।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশের গুলিতে জীবন যখন থেমে যায়
মো: আজিম ফকির পেশা: দিনমজুর (পূর্বে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন)

মো: আজিম ফকির জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮০ সালের ৭ মে বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কদম রসূলের পাহার গ্রামে। ছয় বছর বয়সেই তিনি পিতৃহীন হন। তাঁর বাবা শামসুদ্দিন ফকির ছিলেন একজন কৃষক; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে গেছেন। পিতার মৃত্যুর পর মা হালিমা বেগমের আশ্রয়েই চলতে থাকে ছোট্ট আজিমের সংগ্রামী জীবন। কিন্তু সেই আশ্রয়টুকুও স্থায়ী হয়নি; মা মারা যান যখন আজিমের বয়স মাত্র ২৫। এরপর আর কেউ ছিল না যে তাঁর পাশে থাকবে। জীবনের কঠিন সময়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন নিজের অভিভাবক। লেখাপড়ার সুযোগ না হলেও মানুষের বাড়িতে কাজ করে, মাঝে মাঝে জাল বুনে, কখনো মাঠে-ঘাটে খেটে জীবিকা চালান। শৈশব থেকেই কষ্ট ছিল তাঁর সঙ্গী, যেন এই দুর্ভাগ্যই ছিল তাঁর নিয়তি।

পেশাগত জীবন ও শ্রমজীবী জীবনধারা আজিম ফকির পেশায় দিনমজুর। অনেক বছর ঢাকায় ভ্যানে করে ফল বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। পরে যখন বয়সের ভারে ও অসুস্থতায় এই কাজ চালানো সম্ভব হলো না, তখন মুটে-মজুরি করতে থাকেন। বর্তমানে কুতুবখালী এলাকার এক পানির পাম্পের পাশে থাকেন। তার প্রতিদিনের আয় খুবই অনিয়মিত। মাসিক গড়ে আয় ১২,০০০ টাকার মতো হয়। এই আয় দিয়ে একসময় তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে কষ্টের মধ্যে সংসার চালাতেন। কিন্তু ভাগ্য আবারও নির্মম হয়ে দাঁড়ায়। চার বছর আগে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। সংসার ভেঙে চৌচির হলেও তিনি সন্তানদের ভালোবাসা ভুলতে পারেননি।

পারিবারিক অবস্থা ও সন্তানদের জীবন আজিম ফকিরের সংসারে তিনটি সন্তান রয়েছে। দাখিল পরীক্ষার্থী রাকিব (১৬), অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সাকিব (১৪), এবং তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া (৯)। বাবার অব্যাহত সংগ্রামের মধ্যেও তিনি সন্তানদের শিক্ষিত করার চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু এখন তারা কেউই বাবার কাছে নেই। মা চলে যাওয়ার পর নানা বাড়িতে চলে যেতে হয় তাদের। বাবার কষ্ট, অপমান ও দারিদ্র্য যেন তাদের জীবন থেকেও হাসি কেড়ে নেয়। আজিম ফকির এখন একা। একাকিত্ব আর অক্ষমতা তাঁকে প্রতিনিয়ত ঘিরে ধরে। আন্দোলন ও আহত হওয়ার ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বিকেল ৩:৩০ মিনিটে, কাজলা পেট্রোল পাম্প এলাকায় খুনী হাসিনার পলায়নে নতুন বাংলাদেশ পাওয়ার খুশিতে আপামর জনতার সাথে আনন্দ মিছিলে যোগ দেন মো: আজিম ফকির। সাধারণ জনগণের সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী হঠাৎ চারদিক থেকে গুলি বর্ষন করে। পুলিশের এ হঠাৎ গুলিবর্ষণে বহু মানুষ আহত হন। তাঁদের একজন ছিলেন এই বয়োবৃদ্ধ শ্রমজীবী মানুষটি। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও তিনি গুলির শিকার হন। তাঁর শরীরের নিচের অংশে গুলি লাগে, সাথে সাথেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। উপস্থিত জনতা তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা ও বর্তমান অবস্থা প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও আর্থিক অনটনের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি আজিম ফকির। শরীরে এখনো অসংখ্য জটিলতা রয়ে গেছে। চলাফেরা করতে পারেন না ঠিকমতো, পায়ে ব্যাথা লেগেই থাকে, ভারী কাজ করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কোনো ধরনের সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাননি। চিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা আরও কমে আসছে। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য তিনি বর্তমানে সমাজের সহানুভূতির দিকে চেয়ে আছেন।

প্রস্তাবনা (সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য)
১. উন্নত চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার জন্য অনুদান প্রদান।
২. ভাড়া বাসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোর জন্য মাসিক ভাতা।
৩. সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা।
৪. পুনর্বাসনের জন্য টোকেন ব্যবসা বা ক্ষুদ্র দোকান করার পুঁজি প্রদান।

এক নজরে মো: আজিম ফকির
নাম : মো: আজিম ফকির
জন্ম তারিখ : ০৭-০৫-১৯৮০
জন্মস্থান : বাগেরহাট
পেশা : দিনমজুর (পূর্বে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন)
নিজ জেলা : বাগেরহাট
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কদমরসূলের পাহার, ইউনিয়ন: রামচন্দ্রপুর, থানা: মোড়লগঞ্জ, জেলা: বাগেরহাট
বর্তমান ঠিকানা : এলাকা: কুতুবখালী (পাম্পের পাশে), থানা: যাত্রাবাড়ী,
ঢাকা পরিবার সংক্রান্ত তথ্য পিতার নাম : শামসুদ্দিন ফকির (মৃত)
মায়ের নাম : হালিমা বেগম (মৃত)
মাসিক আয় : ১২,০০০
আয়ের উৎস : দিনমজুর পরিবারের
সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. নাম: রাকিব, বয়স: ১৬, শ্রেণি: দাখিল পরীক্ষার্থী ২. নাম: সাকিব, বয়স: ১৪, শ্রেণি: ৮ম ৩. নাম: সুমাইয়া, বয়স: ৯, শ্রেণি: ৩য়

ঘটনার স্থান : কাজলা পেট্রোল পাম্প এলাকা,
যাত্রাবাড়ী আহত হওয়ার সময় : ০৫/০৮/২০২৪, সময়: ৩:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
বিশেষ তথ্য ১. ৬ বছর বয়সে বাবা, ২৫ বছর বয়সে মা মারা যায়
২. স্ত্রী ৪ বছর আগে অন্যত্র বিয়ে করেছে
৩. সন্তানরা নানা বাড়িতে লালিত পালিত হচ্ছে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍