মো: নজরুল
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হন দিনমজুর মো: নজরুল। রাজনীতিবিমুখ এই সাধারণ মানুষটি কেবল তিন সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে আহার জোগাতে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন। অতর্কিত গুলিবর্ষণে মারাত্মক আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বড় হাসপাতালগুলো তাকে ফিরিয়ে দেয়। ফলে সুচিকিৎসার অভাবে বর্তমানে তিনি গুরুতর শারীরিক ও স্নায়বিক জটিলতায় ভুগছেন।
পটুয়াখালীর গলাচিপার এই সংগ্রামী মানুষটি এখন কর্মহীন। দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনিতে গড়া শরীর আজ যন্ত্রণায় পর্যুদস্ত। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ঋণের বোঝা কাঁধে চেপেছে। রিকশা চালানোর শক্তি হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। তবুও দমে যাননি নজরুল; আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে তিনি একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্বপ্ন দেখেন। নজরুলের এই ত্যাগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র ও সমাজের আজ সময়ের দাবি—তার মতো নীরব যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
পটুয়াখালীর গলাচিপার এই সংগ্রামী মানুষটি এখন কর্মহীন। দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনিতে গড়া শরীর আজ যন্ত্রণায় পর্যুদস্ত। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ঋণের বোঝা কাঁধে চেপেছে। রিকশা চালানোর শক্তি হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। তবুও দমে যাননি নজরুল; আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে তিনি একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্বপ্ন দেখেন। নজরুলের এই ত্যাগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র ও সমাজের আজ সময়ের দাবি—তার মতো নীরব যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাইয়ের গুলিবিদ্ধ বুকগুলো বলছে ন্যায়বিচারের জন্য ব্যথাও এক সম্মান
জন্ম পরিচয়
মো: নজরুল, পিতা নূর মোহাম্মদ ও মাতা মিনারা বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার এক অতি সাধারণ, হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম থেকেই দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সীমাহীন প্রয়োজন তার নিত্য সঙ্গী। ক্ষুধা ও কষ্টকে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েই বড় হয়েছেন তিনি। কোনোদিন খেলাধুলা বা শৈশবের অবসর জীবনের স্বাদ পাননি নজরুল। তার ছোটবেলা কেটেছে সংসারের হাল ধরার প্রস্তুতি নিতে নিতেই।
বর্তমানে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনিরআখড়া এলাকায় বসবাস করছেন। জীবিকার তাগিদে বহু বছর ধরে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে চলেছেন। অতীতেও তার পেশা ছিল দিনমজুরির একঘেয়ে, কঠিন, কিন্তু জীবনের একমাত্র অবলম্বন। কখনো ভবনের ছাদে কাজ, কখনো বা মাটির নিচে ড্রেন নির্মাণ কোনো কাজকে তিনি অবহেলা করেননি। কারণ পরিবারকে বাঁচাতে তাকে প্রতিদিন লড়াই করতে হয়েছে কাঁধে তুলেই। পারিবারিক অবস্থা নজরুলের পরিবারে সদস্য সংখ্যা মোট ৫ জন। তিনি পাঁচ ভাই বোনের একজন হলেও, বড় সন্তান হওয়ায় দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। তার বাবা মা দ’ুজনেই বর্তমানে প্রবীণ এবং বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় ভুগছেন। অসুস্থ মা-বাবার সেবা, ওষুধপত্র, চলাফেরা সবকিছুর দায় আজও তাকেই নিতে হয়। নজরুল নিজেও একজন পিতা। তার রয়েছে তিনটি সন্তান, যাদের সবাই এখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং একেবারে তার উপর নির্ভরশীল। পড়ালেখা, খাবার, চিকিৎসা সবই বাবার কষ্টার্জিত শ্রমে নির্ভরশীল।
এই পরিবারে কোনো সঞ্চয় নেই, নেই জমিজমা কিংবা সহায়-সম্পত্তি। একটি দিন কাজ না করলে সেদিনের খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ চোখে স্বপ্ন আছে সন্তানদের মানুষ করার, তাদের একটি সম্মানজনক ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু প্রতিনিয়ত অর্থাভাব, চিকিৎসার ব্যয় ও ভাড়া বাড়ির চাপে সে স্বপ্নগুলোও দিনকে দিন ঝাপসা হয়ে আসে। নজরুলের জীবন কোনো সাধারণ জীবন নয়। এটি এক অসম লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি যেখানে প্রতিদিনই তাকে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। তার মতো মানুষরা সমাজে অনেক সময় চোখের আড়ালে থেকে যান, কিন্তু তারাই আসলে আমাদের সময়ের নীরব যোদ্ধা। দারিদ্র্যের অতল থেকে উঠে আসা এ মানুষটির জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবিকতার জায়গা এখনো কতটা প্রয়োজনীয় এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহায়তা কতটা জরুরি এসব পরিশ্রমী মানুষের জন্য। মো: নজরুলের মতো শ্রমজীবী মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আজ সময়ের দাবি। যাতে তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর এমন দুর্বিষহ না হয়, যাতে একদিন তার জীবন সংগ্রাম কেবল বেদনার গল্প না হয়ে আশার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ২০ জুলাই। দিনের শুরুটা ছিল মো: নজরুলের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক। জীবনের প্রতিটি দিনের মতোই ভোরবেলায় তিনি বের হয়েছিলেন রিকশা নিয়ে, যাত্রাবাড়ী থেকে যাত্রী পরিবহণের উদ্দেশ্যে। তিন সন্তান, প্রবীণ বাবা-মা আর স্ত্রী নিয়ে পাঁচজনের পরিবারটির ভরণ পোষণের দায় একমাত্র তারই কাঁধে। তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি রিকশা নিয়ে বের হন, যেন দিনের প্রথম যাত্রী পেয়ে কিছু আয় হতে পারে। কিন্তু সেদিনের সকালটা যে এতটা বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে তা কল্পনাও করেননি তিনি। যাত্রাবাড়ীর ধনিয়া কলেজের সামনে হঠাৎ করেই শুরু হয়ে যায় পুলিশের গুলিবর্ষণ। কোথাও কোনো আগাম সতর্কতা ছিল না, ছিল না কোনো ঘোষণা বা সতর্ক বার্তা। চারদিকে হুড়োহুড়ি, আতঙ্ক আর মানুষের চিৎকার। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই হঠাৎ একটি গুলি এসে আঘাত হানে নজরুলের শরীরে। নজরুল তখন রিকশার হ্যান্ডেল ধরে ছিলেন, গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু মুহূর্তেই তার হাত থেকে হ্যান্ডেল পড়ে যায়, আর শরীরের ভার সহ্য করতে না পেরে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে আতঙ্কিত মানুষ দৌঁড়াচ্ছে, কেউ তাকে সাহায্য করার সাহস পাচ্ছে না। তিনি তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার জামা-প্যান্ট। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য। তিনি পরে জানান, “আমি তো কোনো রাজনীতি করিনি। কোনো মিছিল, মিটিংয়ে যাইনি। শুধু আমার বাচ্চাদের মুখে দুটো ভাত তুলে দিতে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়লাম রাস্তায়।” তার কণ্ঠে ছিল অসহায়তা, অভিমান আর সীমাহীন কষ্ট। নজরুল সেই সময় কোনো আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন কেবল একজন খেটে খাওয়া মানুষ, যিনি রাস্তায় নেমেছিলেন তার পরিবারের জন্য রুটি-রুজির সন্ধানে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বাস্তবতায় তার মতো সাধারণ মানুষের জীবনও আজ নিরাপদ নয়। গুলি তার শরীরে লেগেছে, কিন্তু ক্ষতটা শুধু শারীরিক নয় এটা এক অসহনীয় মানসিক ও সামাজিক আঘাতও। এ ঘটনার পর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা কিংবা বিচার কোনোটাই পাননি তিনি এখনো। বর্তমানে তিনি রিকশা চালাতে পারেন না, আয় নেই, চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছেন না। পরিবারও একেবারে বিপর্যস্ত। ২০ জুলাইয়ের সেই সকাল নজরুলের জীবনে একটি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তিনি আর আগের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছেন না। তার মতো হাজারো দিনমজুর, যারা প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হন শুধু দু’মুঠো ভাতের আশায়, আজ তারা আতঙ্কে রয়েছেন। জানেন না রাস্তায় নামার পর তারা নিরাপদ থাকবেন কিনা।
এই ঘটনা আমাদের সমাজে ন্যায়বিচার, মানবতা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে। মো: নজরুলের কষ্ট শুধু তার একার নয় এটা একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এখন সময় তার পাশে দাঁড়ানোর, তার মতো নিরীহ মানুষের জন্য ন্যায় ও পুনর্বাসনের দাবি তোলার। চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পরই মো: নজরুলকে দ্রুত স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সে সময় রাজধানীর কোনো বড় হাসপাতাল তাকে ভর্তি নেয়নি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনকেন্দ্রিক চাপের কারণে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় একাধিক জায়গা থেকে। বাধ্য হয়ে নিজের সঞ্চয় ও কিছু সহানুভূতিশীল মানুষের সাহায্যে তিনি স্বল্পপরিসরে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
বর্তমানে নজরুল গুরুতর শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন। মাথা, পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের কারণে প্রতিদিনই তাকে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। আগের মতো আর রিকশা চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজ বন্ধ থাকায় সংসারে এসেছে চরম অনটন। চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যা তার মতো নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এক বিশাল বোঝা। ধার-দেনা করে কোনোভাবে চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা নেয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে তার জন্য এখন প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি ও স্নায়ুবিশেষজ্ঞের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। কিন্তু এসব চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় তা তার নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। পরিবার চালানো ও নিজের চিকিৎসা দুইয়ের ভার যেন একসাথে বহন করতে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছেন। তবে নজরুল এখনো হাল ছাড়েননি। তিনি জানান, “রিকশা চালাতে পারি না, কিন্তু যদি কেউ একটি অটোরিকশা কিনে দিতে পারেন, তাহলে হালকা কাজ করে আবার জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে পারতাম।” কাজ করার ইচ্ছা ও আত্মসম্মানবোধ আজও তাকে ধরে রেখেছে। সমাজ ও সহানুভূতিশীল মানুষের সহযোগিতা পেলে তিনি আবারও জীবন সংগ্রামে ফিরে আসতে চান।
একনজরে মো: নজরুল
নাম : মো: নজরুল
পিতা : নুর মোহাম্মদ
মাতা : মিনারা বেগম
ভাই : রিয়াজ
ছেলে : রাহাত
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনী
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী, দনিয়া কলেজের সামনে,
ঢাকা বর্তমান ঠিকানা : শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী,
ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : গলাচিপা, পটুয়াখালী
প্রস্তাবনা
১. নগদ অর্থ প্রদান করা
২. একটা অটোরিকশার ব্যাবস্থা কর
জন্ম পরিচয়
মো: নজরুল, পিতা নূর মোহাম্মদ ও মাতা মিনারা বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার এক অতি সাধারণ, হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম থেকেই দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সীমাহীন প্রয়োজন তার নিত্য সঙ্গী। ক্ষুধা ও কষ্টকে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েই বড় হয়েছেন তিনি। কোনোদিন খেলাধুলা বা শৈশবের অবসর জীবনের স্বাদ পাননি নজরুল। তার ছোটবেলা কেটেছে সংসারের হাল ধরার প্রস্তুতি নিতে নিতেই।
বর্তমানে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনিরআখড়া এলাকায় বসবাস করছেন। জীবিকার তাগিদে বহু বছর ধরে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে চলেছেন। অতীতেও তার পেশা ছিল দিনমজুরির একঘেয়ে, কঠিন, কিন্তু জীবনের একমাত্র অবলম্বন। কখনো ভবনের ছাদে কাজ, কখনো বা মাটির নিচে ড্রেন নির্মাণ কোনো কাজকে তিনি অবহেলা করেননি। কারণ পরিবারকে বাঁচাতে তাকে প্রতিদিন লড়াই করতে হয়েছে কাঁধে তুলেই। পারিবারিক অবস্থা নজরুলের পরিবারে সদস্য সংখ্যা মোট ৫ জন। তিনি পাঁচ ভাই বোনের একজন হলেও, বড় সন্তান হওয়ায় দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। তার বাবা মা দ’ুজনেই বর্তমানে প্রবীণ এবং বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় ভুগছেন। অসুস্থ মা-বাবার সেবা, ওষুধপত্র, চলাফেরা সবকিছুর দায় আজও তাকেই নিতে হয়। নজরুল নিজেও একজন পিতা। তার রয়েছে তিনটি সন্তান, যাদের সবাই এখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং একেবারে তার উপর নির্ভরশীল। পড়ালেখা, খাবার, চিকিৎসা সবই বাবার কষ্টার্জিত শ্রমে নির্ভরশীল।
এই পরিবারে কোনো সঞ্চয় নেই, নেই জমিজমা কিংবা সহায়-সম্পত্তি। একটি দিন কাজ না করলে সেদিনের খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ চোখে স্বপ্ন আছে সন্তানদের মানুষ করার, তাদের একটি সম্মানজনক ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু প্রতিনিয়ত অর্থাভাব, চিকিৎসার ব্যয় ও ভাড়া বাড়ির চাপে সে স্বপ্নগুলোও দিনকে দিন ঝাপসা হয়ে আসে। নজরুলের জীবন কোনো সাধারণ জীবন নয়। এটি এক অসম লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি যেখানে প্রতিদিনই তাকে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। তার মতো মানুষরা সমাজে অনেক সময় চোখের আড়ালে থেকে যান, কিন্তু তারাই আসলে আমাদের সময়ের নীরব যোদ্ধা। দারিদ্র্যের অতল থেকে উঠে আসা এ মানুষটির জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবিকতার জায়গা এখনো কতটা প্রয়োজনীয় এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহায়তা কতটা জরুরি এসব পরিশ্রমী মানুষের জন্য। মো: নজরুলের মতো শ্রমজীবী মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আজ সময়ের দাবি। যাতে তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর এমন দুর্বিষহ না হয়, যাতে একদিন তার জীবন সংগ্রাম কেবল বেদনার গল্প না হয়ে আশার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ২০ জুলাই। দিনের শুরুটা ছিল মো: নজরুলের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক। জীবনের প্রতিটি দিনের মতোই ভোরবেলায় তিনি বের হয়েছিলেন রিকশা নিয়ে, যাত্রাবাড়ী থেকে যাত্রী পরিবহণের উদ্দেশ্যে। তিন সন্তান, প্রবীণ বাবা-মা আর স্ত্রী নিয়ে পাঁচজনের পরিবারটির ভরণ পোষণের দায় একমাত্র তারই কাঁধে। তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি রিকশা নিয়ে বের হন, যেন দিনের প্রথম যাত্রী পেয়ে কিছু আয় হতে পারে। কিন্তু সেদিনের সকালটা যে এতটা বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে তা কল্পনাও করেননি তিনি। যাত্রাবাড়ীর ধনিয়া কলেজের সামনে হঠাৎ করেই শুরু হয়ে যায় পুলিশের গুলিবর্ষণ। কোথাও কোনো আগাম সতর্কতা ছিল না, ছিল না কোনো ঘোষণা বা সতর্ক বার্তা। চারদিকে হুড়োহুড়ি, আতঙ্ক আর মানুষের চিৎকার। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই হঠাৎ একটি গুলি এসে আঘাত হানে নজরুলের শরীরে। নজরুল তখন রিকশার হ্যান্ডেল ধরে ছিলেন, গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু মুহূর্তেই তার হাত থেকে হ্যান্ডেল পড়ে যায়, আর শরীরের ভার সহ্য করতে না পেরে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে আতঙ্কিত মানুষ দৌঁড়াচ্ছে, কেউ তাকে সাহায্য করার সাহস পাচ্ছে না। তিনি তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার জামা-প্যান্ট। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য। তিনি পরে জানান, “আমি তো কোনো রাজনীতি করিনি। কোনো মিছিল, মিটিংয়ে যাইনি। শুধু আমার বাচ্চাদের মুখে দুটো ভাত তুলে দিতে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়লাম রাস্তায়।” তার কণ্ঠে ছিল অসহায়তা, অভিমান আর সীমাহীন কষ্ট। নজরুল সেই সময় কোনো আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন কেবল একজন খেটে খাওয়া মানুষ, যিনি রাস্তায় নেমেছিলেন তার পরিবারের জন্য রুটি-রুজির সন্ধানে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বাস্তবতায় তার মতো সাধারণ মানুষের জীবনও আজ নিরাপদ নয়। গুলি তার শরীরে লেগেছে, কিন্তু ক্ষতটা শুধু শারীরিক নয় এটা এক অসহনীয় মানসিক ও সামাজিক আঘাতও। এ ঘটনার পর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা কিংবা বিচার কোনোটাই পাননি তিনি এখনো। বর্তমানে তিনি রিকশা চালাতে পারেন না, আয় নেই, চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছেন না। পরিবারও একেবারে বিপর্যস্ত। ২০ জুলাইয়ের সেই সকাল নজরুলের জীবনে একটি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তিনি আর আগের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছেন না। তার মতো হাজারো দিনমজুর, যারা প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হন শুধু দু’মুঠো ভাতের আশায়, আজ তারা আতঙ্কে রয়েছেন। জানেন না রাস্তায় নামার পর তারা নিরাপদ থাকবেন কিনা।
এই ঘটনা আমাদের সমাজে ন্যায়বিচার, মানবতা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে। মো: নজরুলের কষ্ট শুধু তার একার নয় এটা একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এখন সময় তার পাশে দাঁড়ানোর, তার মতো নিরীহ মানুষের জন্য ন্যায় ও পুনর্বাসনের দাবি তোলার। চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পরই মো: নজরুলকে দ্রুত স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সে সময় রাজধানীর কোনো বড় হাসপাতাল তাকে ভর্তি নেয়নি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনকেন্দ্রিক চাপের কারণে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় একাধিক জায়গা থেকে। বাধ্য হয়ে নিজের সঞ্চয় ও কিছু সহানুভূতিশীল মানুষের সাহায্যে তিনি স্বল্পপরিসরে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
বর্তমানে নজরুল গুরুতর শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন। মাথা, পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের কারণে প্রতিদিনই তাকে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। আগের মতো আর রিকশা চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজ বন্ধ থাকায় সংসারে এসেছে চরম অনটন। চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যা তার মতো নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এক বিশাল বোঝা। ধার-দেনা করে কোনোভাবে চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা নেয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে তার জন্য এখন প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি ও স্নায়ুবিশেষজ্ঞের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। কিন্তু এসব চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় তা তার নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। পরিবার চালানো ও নিজের চিকিৎসা দুইয়ের ভার যেন একসাথে বহন করতে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছেন। তবে নজরুল এখনো হাল ছাড়েননি। তিনি জানান, “রিকশা চালাতে পারি না, কিন্তু যদি কেউ একটি অটোরিকশা কিনে দিতে পারেন, তাহলে হালকা কাজ করে আবার জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে পারতাম।” কাজ করার ইচ্ছা ও আত্মসম্মানবোধ আজও তাকে ধরে রেখেছে। সমাজ ও সহানুভূতিশীল মানুষের সহযোগিতা পেলে তিনি আবারও জীবন সংগ্রামে ফিরে আসতে চান।
একনজরে মো: নজরুল
নাম : মো: নজরুল
পিতা : নুর মোহাম্মদ
মাতা : মিনারা বেগম
ভাই : রিয়াজ
ছেলে : রাহাত
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনী
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী, দনিয়া কলেজের সামনে,
ঢাকা বর্তমান ঠিকানা : শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী,
ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : গলাচিপা, পটুয়াখালী
প্রস্তাবনা
১. নগদ অর্থ প্রদান করা
২. একটা অটোরিকশার ব্যাবস্থা কর
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍