হোম / আহতদের তালিকা / মো: রোমানুল ইসলাম
মো: রোমানুল ইসলাম

মো: রোমানুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাগেরহাটের শরণখোলার এক লড়াকু তরুণ মো: রোমানুল ইসলাম। ১৯৯৯ সালে জন্ম নেওয়া এই যুবক যখন বিদেশের মাটিতে ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই দেশের প্রয়োজনে রাজপথে নামার ডাক আসে। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশের গুলিতে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় রোমানুলের রঙিন পৃথিবী। অসংখ্য ছররা গুলিতে তার ডান চোখের রেটিনা ও কর্নিয়া ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; নিজ হাতে ঝুলে পড়া রেটিনা চেপে ধরে তাকে ছুটতে হয়েছিল হাসপাতালের পথে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে দুই দফা জটিল অস্ত্রোপচার হলেও রোমানুলের ডান চোখের দৃষ্টি আর ফিরে আসেনি। বর্তমানে দুটি বুলেট তার চোখের স্নায়ুর গভীরে আটকে আছে, যা অপসারণ করা অসম্ভব। বাম চোখেও তিনি ঝাপসা দেখেন। বাবা হারানো এই তরুণের কাঁধে ছিল বিধবা মা ও ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব। বেঙ্গল টিস্যুতে চাকরি এবং মধুর ব্যবসা করে যে সচ্ছলতার স্বপ্ন তিনি বুনেছিলেন, আজ তা অন্ধকারের অতলে। চিকিৎসার পেছনে প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ করে আজ তিনি নিঃস্ব ও কর্মহীন।

রোমানুল গর্ব করে বলেন, “অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াইনি, এটাই বড় তৃপ্তি।” তবে এই নীরব যোদ্ধার দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, মাসিক ওষুধের খরচ এবং তার পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তার এই আত্মত্যাগ যেন কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে না থাকে, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে যথাযথ পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি যেন আবারও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পান।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শরীরে অসংখ্য ছররা গুলি, ডান চোখ অন্ধত্ব বরণ, বাম চোখের দূরদৃষ্টি অস্বচ্ছ
“আন্দোলনের পূর্বে বিদেশে যাওয়ার প্রসেসিং শুরু করেছিলাম, আল্লাহ-তা’য়ালা হয়তো বা আমার বিদেশ গমন থেকে দেশের জন্য কিছু করাটাই নসিবে আত্মত্যাগ হিসেবে লিখেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, সেই মহান রবের শুকরিয়া।”- রোমানুল ইসলাম

মো: রোমানুল ইসলাম
ক্রমিক: ০৭৯
আইডি: ঢাকা সিটি ০৭৯
জন্ম, পরিবার ও জীবনের সূচনা মো: রোমানুল ইসলাম একটি নাম, যার সাথে আজ জড়িয়ে আছে প্রতিবাদের গল্প, ত্যাগের স্মৃতি, আর অন্ধকারে নিমজ্জিত এক দৃষ্টিহীন চোখের যন্ত্রণাময় বেঁচে থাকা। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৯ সালের ৫ জানুয়ারি, দক্ষিণাঞ্চলের নদীবিধৌত বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার উত্তর কদমতলা রায়েন্দা বাজার গ্রামে। তার জন্মস্থানটি সুন্দরবনের দ্বাররক্ষী একটি এলাকা যেখানে নদী, বন ও জীবন একত্রে মিশে থাকে।
তাঁর পিতা, মৃত বাতেন তালুকদার, ছিলেন একজন সহজ-সরল কাপড় ব্যবসায়ী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি একার পরিশ্রমে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর, সকাল ৬টা। একটি ক্ষণেই বদলে যায় রোমানের জীবনের গতি। তার পিতা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সে সময় রোমান মাত্র ১৯ বছরের তরুণ, জীবনের কঠিন বাস্তবতা তখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করেননি। কিন্তু সেই সকাল থেকেই তার কাঁধে ভর করে পুরো সংসারের দায়িত্ব। তার মা রহিমা বেগম একজন গৃহিণী, যিনি আজ ৪৫ বছর বয়সে বিধবা জীবনের ভার ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংগ্রামের পথে হাঁটছেন। ছোট ভাই ইমাম হাসান তখন এক বছরের শিশু। বর্তমানে তার বয়স আট বছর। গ্রামের নূরানি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। রোমানুলের পরিবাওে মাত্র ৩ জন সদস্য। বাসস্থান হিসেবে রয়েছে একটি টিনের ঘর, আর অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে মাত্র ২৬ শতক আবাদি জমি। এই জমিটিও গ্রামের নিয়মমাফিক মৌসুমি ফসল দিয়েই সীমিত কিছু আয় কওে থাকে। পিতার মৃত্যুতে কৃষিকাজও ব্যাহত হয়, ফলে সম্পূর্ণরূপে জীবিকানির্ভর হয়ে ওঠে রোমানুলের ওপর। শিক্ষা জীবনের শুরু হয় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ২০১৫ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। ২০১৭ সালে শরণখোলা সরকারি কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও মা তাকে কলেজে পড়িয়েছেন, এটি ছিল এক নিঃস্ব মা ও তার স্বপ্নবান ছেলের সম্মিলিত সংগ্রাম। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একজন স্বাবলম্বী তরুণ হয়ে দেশের বাইরে গিয়ে চাকরি করবেন, পরিবারকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেবেন। শিক্ষাজীবনের শেষে রোমান ঢাকায় চলে আসেন। প্রাথমিকভাবে মুগদা থানার মদিনাবাগ এলাকায় মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় উঠেন। দিনমজুর কিংবা ক্ষুদ্র চাকরি নয়, বরং তিনি আত্মমর্যাদায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই বেঙ্গল টিস্যু কারখানায় চাকরি নেন। পাশাপাশি ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে ‘সুন্দরবনের খাঁটি মধু’ বিভিন্ন দোকানে সরবরাহের একটি ক্ষুদ্র ব্যবসাও শুরু করেন। নিজের শ্রমে গড়ে তুলছিলেন এক স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ। এই তরুণের জীবনে তখন একদিকে নিজস্ব স্বাবলম্বিতা, অন্যদিকে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যোগাযোগ সবই প্রস্তুতির পথে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক কালো অধ্যায় এসে সব কিছু থামিয়ে দেয়। একজন পিতৃহীন, গ্রামের উঠোনে বেড়ে ওঠা, টিনের ঘরে ঘুমানো তরুণ যখন শহরে এসে নিজের পথ খুঁজে নিচ্ছিলেন, তখন তার ভাবনাতেই ছিল না যে, একদিন তাকে চোখ হারাতে হবে শুধু স্বৈরাচারী হাসিনার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়ানোর অপরাধে। আন্দোলন ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট একদা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণ আজ নিজ চোখে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন না। কিন্তু তার আত্মা দমে যায়নি। তিনি বলেন, “আমার চোখ গেছে, কিন্তু অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াইনি।” ২০২৪ সালের ২১ জুলাই। সময়টা তখন সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট। সূর্য তখন ঢাকার আকাশে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সে সময়ে ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচে রোমানের জীবনে ঘটে যায় এক বেদনাবিধুর ঘটনা। চিরদিনের জন্য তার জীবন থেকে সমস্ত আলো কেড়ে নেয়া হয়। সেদিন বাংলাদেশের রাজপথে চলছিল গণজাগরণ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ লড়াই। তরুণ-তরুণীরা, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক সবাই রাস্তায় নেমে এসেছিল আওয়ামী রেজিমের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য। কেউ এসেছিল বন্ধুদের ডাকে, কেউ এসেছিল হৃদয়ের তাড়নায়, কেউ বা এসেছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। রোমান এসেছিলেন তার তরুণ আত্মাকে সাড়া দিয়ে, তার দেশের মানুষের কষ্টের পাশে দাঁড়াতে। পুলিশের ছোড়া অসংখ্য ছররা গুলি ও অন্ধত্ব জীবনের করুণ কাহিনী কিন্তু কেউ জানত না এই সন্ধ্যা রোমানের জীবনে চিরতরে দৃষ্টিহীন এক অধ্যায় রচনা করবে। ফ্লাইওভারের নিচে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনের মধ্যমনি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রোমান। হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ছিল কেবল চোখে মুখে শঙ্কা আর প্রত্যয়। ঠিক সেই সময় পিশাচ হাসিনার সন্ত্রাস বাহিনী অর্থাৎ পুলিশ বাহিনী, আচমকা আন্দোলনকারীদের দিকে এগিয়ে আসে। তারা মুহূর্তের মধ্যেই গুলি চালাতে শুরু করে, যেন যুদ্ধক্ষেত্র। রোমান তখন সামনে দাঁড়িয়ে। তার দিকেই প্রথম ছররা গুলির বৃষ্টিপাত। রোমানের শরীরে অসংখ্য ছররা গুলি লাগে। একাধিক গুলি এসে সরাসরি তার মুখমণ্ডল লক্ষ্য করে আঘাত হানে। ডান চোখে গুলির আঘাতে কর্নিয়া ছিঁড়ে যায়, রেটিনা ছিঁড়ে ভিতর থেকে বাহিরের হয়ে পড়ে। সেই ভয়ংকর দৃশ্য আজও যে কেউ শুনলে শিউরে উঠবেন। তিনি নিজের হাতে ঝুলে পড়া রেটিনাটি চোখের ভেতরে ঠেলে রাখতে বাধ্য হন। নিজের চোখ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেন হাত দিয়ে চেপে ধরে। তখন ভয়, ব্যথা আর রক্তের মধ্যে একটাই চিন্তা বাঁচতে হবে, মরে গেলে তো কিছুই থাকবে না। এত রক্তক্ষরণের মাঝেও তার অবচেতন মন তাকে বলে, “এখনো দৌড়াও, এখনো সময় আছে।” রোমান তখন রক্তাক্ত শরীর নিয়ে দৌড় দেন। তার পাশে ছিলেন আরেক আন্দোলনকারী, তাঁর নামও ছিল ‘ইমাম হাসান’ নামটি তার ছোট ভাইয়ের নামের সঙ্গে মিলে যায়। ইমাম হাসান নামের এই সহযোদ্ধা তাকে ধরে দ্রুত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথে পুলিশের একটি দল তাদের আটক করে। আহত রোমান ও তার সহযোদ্ধার দিকে তাকিয়ে তারা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায় “তুমি কি কোনো সন্ত্রাসী? কোথা থেকে এসেছো?” এমনকি কিছু প্রশ্নে “ভারতীয় গোয়েন্দা” পরিচয়দানকারী কয়েকজনের উপস্থিতি তারা টের পান। রোমান তখনও অচেতন, কিন্তু ইমাম হাসান প্রতিবাদ করেন। রোমান তখন অস্পষ্ট গলায় শুধু বলেন, “আমাকে যেতে দিন, চোখটা বাঁচাতে হবে।” আল্লাহর অশেষ রহমতে এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছালে জরুরি বিভাগে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়, এবং তার চোখের অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে রেফার করে দেয়া হয়। চোখের এত বড় ট্রমা, এত তীব্র আঘাত। ডাক্তাররা অবাক হয়ে যান। ২১ জুলাই রাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করে। পরদিন ২২ জুলাই, প্রথম অপারেশনে তার চোখ থেকে একটি ছররা গুলি বের করা হয়। চোখে বিশেষ জেল ইনজেকশন দিয়ে লক সিস্টেমে একটি সীমিত সার্জারি করা হয়। এ অবস্থায় রোমান শয্যাশায়ী। চোখে ব্যান্ডেজ, শরীর ছররা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত, ব্যথা তাকে প্রতিটি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়ায়। আর্থিকভাবে তখন পরিবার সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। মা গ্রামে, ছোট ভাই স্কুলে। ঢাকায় একা রোমান একটি ভাড়া বাসায়। চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার সবই তার পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সংকটময় সময়ে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুগদা শাখা। রোমানের ঘটনা জানতে পেরে সিটি স্ক্যানসহ ব্যয়বহুল চেকআপের খরচ তারা উপহার দিয়ে পাশে দাঁড়ায়। ২৮ আগস্ট তাকে পুনরায় চক্ষু ইনস্টিটিউটে অপারেশন করা হয়। এবারের সার্জারি আরও জটিল। রেটিনা অপারেশন করা হয়। ডাক্তার জানান, দু’টি স্প্রীন্টার বুলেট চোখের ভেতরে স্থায়ীভাবে থেকে গেছে। তারা রেটিনা ভেদ করে নার্ভের পেছনে চলে গেছে, যেগুলো অপসারণ করা অসম্ভব। অর্থাৎ, রোমানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে গেছে। একটি চোখে চিরতরে অন্ধত্ব, অপর চোখে স্পষ্ট দেখতে না পারা এই হচ্ছে রাষ্ট্রের গুলির উপহার। চিকিৎসকেরা তাকে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ আবারও চেকআপে আসতে বলেন। সেদিন তার বাম চোখের দূরদৃষ্টি পরীক্ষার পর পাওয়ারযুক্ত গ্লাস পরার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এটিও সাময়িক চোখে সবসময় ঝাপসা, মাথাব্যথা, আলোতে অসহ্যতা এখন তার নিত্যসঙ্গী। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে। ঘুমের মধ্যে ঘাম ভিজে ওঠে, কানে বাজে গুলির শব্দ, আর চোখের ভিতর যেন এখনও রক্তের গন্ধ।
চিকিৎসা ও আর্থিক সংগ্রামের বিস্তারিত বিবরণ হাসপাতাল থেকে গ্রামের টিনের ঘর পর্যন্ত আর্তনাদের দীর্ঘপথ ২১ জুলাই ২০২৪ সালের সন্ধ্যায় ছররা গুলিতে চোখ হারানোর পর মো: রোমানুল ইসলামের জীবন যেন এক করুণ অধ্যায়ে প্রবেশ করে। চিকিৎসা শুরু হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এবং সেখান থেকে রেফার হয়ে পৌঁছান জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে, আগারগাঁও। চোখে রক্তাক্ত অবস্থা, কর্নিয়া ছিঁড়ে গেছে, রেটিনা ঝুলে আছে, রক্ত বন্ধ হচ্ছে না, ব্যথার সীমা নেই। একের পর এক চিকিৎসক এসে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। কেউ বলেন অবস্থা গুরুতর, কেউ বলেন দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এমতাবস্থায় চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন প্রথম ধাপে চোখ থেকে স্প্রিন্টার বের করে নরমালাইজেশন অপারেশন করতে হবে। ২২ জুলাই ২০২৪ প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। চোখে ইনজেকশন, চোখের লেন্সে জেল প্রবেশ করিয়ে ভেতরের ছিন্ন রেটিন সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া হয়। বের করা হয় একটি গুলি। কিন্তু এ অপারেশনের পরও চোখের অবস্থার উন্নতি হয় না। ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম, মাথা ঘোরা আর ধীরে ধীরে ডান চোখ সম্পূর্ণরূপে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। প্রথম অপারেশনের পরও তার অবস্থা উন্নত হয়নি বরং আরও জটিল হয়ে ওঠে। দুই সপ্তাহ ধরে চোখে ভীষণ যন্ত্রণা, চোখের আশপাশ ফুলে ওঠা, স্পর্শ করলেই কাঁপুনির মতো অনুভব এসব নিয়ে তিনি দিনে দিনে নিঃশেষ হতে থাকেন। কিন্তু অর্থ না থাকায় চিকিৎসা অব্যাহত রাখা ছিল অসম্ভব। এসময় তিনি বাড়ি ফেরেন না, কারণ ঢাকায় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু থাকতেন মদিনাবাগের এক বন্ধুর বাসায়, যেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও আর্থিক খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ওষুধ, ইনজেকশন, চশমা, চেকআপ প্রতিটি চিকিৎসা পদক্ষেপই ব্যয়বহুল। ২৮ আগস্ট ২০২৪ তাকে আবারও চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেদিন তার দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার হয় রেটিনা সার্জারি। ডাক্তাররা জানান, চোখের ভিতরে দু’টি ছররা গুলি এখনো রয়ে গেছে, যা অপসারণ করা সম্ভব নয়। গুলি দুটি চোখের নার্ভের গভীরে আটকে আছে যা বের করার চেষ্টা করলে সম্পূর্ণ চোখ নষ্ট হয়ে যাবে। তারপরও অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর চিকিৎসকরা তাকে জানান“আপনার ডান চোখে আর আলো আসবে না। তবে বাম চোখে যতটা সম্ভব দৃষ্টি রক্ষা করতে হবে।” চিকিৎসা খরচের বিবরণ ১. প্রথম অপারেশন (২২ জুলাই): ওটি চার্জ, ওষুধ, ইনজেকশন, নার্সিং সার্ভিসসহ আনুমানিক ৩৫,০০০ টাকা খরচ হয়। ২. দ্বিতীয় অপারেশন (২৮ আগস্ট): রেটিনা সার্জারি, সেলাইন, ইনজেকশন, ব্লাড টেস্টসহ প্রায় ৪৮,০০০ টাকা ব্যয় হয়। ৩. পরে ফলোআপ ও পাওয়ার গ্লাসসহ: ১০,০০০ টাকার বেশি ব্যয় হয়। মোট খরচ (প্রথম ধাপ): প্রায় ৯৩,০০০ টাকা। এই বিশাল পরিমাণ খরচ তিনি কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়া, সম্পূর্ণভাবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সংগঠনের সহযোগিতা, এবং ধারদেনার মাধ্যমে বহন করেছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল পরবর্তী ছয় মাস পর আবার চোখের অবস্থার এমআরআই ও ভিজ্যুয়াল টেস্ট করতে হবে। নতুন করে অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া হয়নি। তাই তার সামনে রয়েছে দীর্ঘ চিকিৎসার পথ, যার প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন টাকা, সময়, মনোবল। অর্থাভাবে রোমান বর্তমানে গ্রামে ফিরে গেছেন। মায়ের কাছে, ভাইয়ের কাছে। গ্রামের টিনের ঘরে শুয়ে চোখের ব্যান্ডেজ খুলে সামনে তাকালেই তার সামনে শুধুই অন্ধকার। তিনি এখন শারীরিকভাবেও দুর্বল, মাথাব্যথা লেগেই থাকে, চোখের আশপাশে ব্যথা হচ্ছে। চোখের যন্ত্রণা তার রাতে ঘুম ভেঙে দেয়। আলোতে তাকাতে পারেন না, বাইরে বেরোতে ভয় লাগে। তবে তার মন এখনো মরে যায়নি। তিনি নিয়মিত দোয়া করেন, যেন চোখের যন্ত্রণার বদলে অন্তত পরিবারটা বেঁচে থাকে। তিনি বলেন“আমার চোখের চিকিৎসা আর সম্ভব হচ্ছে না। আমি চাই, আমার ছোট ভাই যেন পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে। অন্তত আমার মা যেন আর কোনো রাতে আমার যন্ত্রণার চিৎকারে জেগে না ওঠেন।” মানসিক আঘাত একটা চোখ হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা শুধু শারীরিক নয়, তা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়। মো: রোমানুল ইসলামের কাছে এটি কেবল একটি অঙ্গ হারানো নয়, তার ভবিষ্যৎ, আত্ম-পরিচয়, আত্মসম্মান, বন্ধু-বান্ধব, সামাজিক সম্পর্ক, জীবনের স্বপ্ন সব কিছুর একসাথে ধসে পড়া। প্রস্তাবনা ১. নিয়মিত চোখের ফলোআপের জন্য অর্থ সহায়তা। ২. মাথাব্যথা ও চোখের ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে ওষুধের জন্য মাসিক ওষুধ ভাতা। ৩. তার গ্রামের বাড়িতে একটি পাকা ঘর তৈরি করে দেয়ার ব্যবস্থা। ৪. একটি বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা।
এক নজরে মো: রোমানুল ইসলাম
নাম : মো: রোমানুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ৫ জানুয়ারি ১৯৯৯
জন্মস্থান : রায়েন্দা বাজার শরণখোলা, বাগেরহাট
পূর্বের পেশা : চাকরি (বেঙ্গল টিস্যু কারখানা) ; ব্যবসা (সুন্দরবনের মধু বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ)
বর্তমানে কর্মহীন, ডান চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: উত্তর কদমতলা, রায়েন্দা বাজার, ইউনিয়ন: ৩নং রায়েন্দা, থানা: শরণখোলা, জেলা: বাগেরহাট বর্তমান ঠিকানা : মদিনাবাগ, থানা: মুগদা, জেলা: ঢাকা। (বর্তমানে অসুস্থতার কারণে গ্রামে ফিরে গিয়েছেন)
পিতা : মরহুম বাতেন তালুকদার,
মৃত্যুর তারিখ: ২ অক্টোবর ২০১৮, সকাল ৬.০০টা
মাতা : রহিমা বেগম, পেশা ও বয়স: গৃহিণী, বয়স ৪৫
শিক্ষাগত যোগ্যতা : এইচএসসি পাশ (২০১৭),
শরণখোলা সরকারি কলেজ, গ্রুপ: বিজনেস ম্যানেজমেন্ট
পরিবারের সদস্য : ৩ জন (মা, ছোট ভাই)
বাড়ি : টিনের বাড়ি সম্পদ : ২৬ শতক আবাদী জমি
ভাইয়ের নাম : ইমাম হাসান, বয়স ৮ বছর, ছাত্র, শ্রেণি ০২,
স্থানীয় নূরানী মাদরাসা আহত
বিবরণ আহত হওয়ার তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৪, সময়: সন্ধ্যা ০৬:৩০ মিনিট আহত হওয়ার স্থান : কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে, বিশ্ব রোড,
ঢাকা আক্রমণকারী : পুলিশ
আঘাতের ধরণ : শরীর অসংখ্য ছররা গুলি, ডান চোখ
অন্ধত্ববরণ, বাম চোখের দূর দৃষ্টি অস্বচ্ছ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍