হোম / আহতদের তালিকা / সাইফুল ইসলাম
সাইফুল ইসলাম

সাইফুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সাইফুল ইসলাম ২০০০ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় এক দরিদ্র কিন্তু পরিশ্রমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাস করেন।
তার বাবা মাহেব হোসেন জামাদার পেশায় রিকশাচালক এবং মা জয়গুন নেছা পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিন বোন, এক ভাই, বাবা-মা মোট ছয় সদস্যের এই পরিবার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই সংগ্রাম করে দিন কাটাচ্ছিল।

পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে বহু বছর ধরে সংসারের প্রধান দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন সাইফুল। নির্দিষ্ট চাকরি না থাকলেও তিনি দিনমজুরি, রিকশা চালানোসহ যেকোনো পরিশ্রমের কাজ করে পরিবারের খরচ চালিয়ে আসছিলেন। বাবা-মা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় ভাইবোনদের পড়ালেখা ও সংসারের অধিকাংশ ব্যয়ভার তার উপরই পড়েছিল।

সাইফুল ছিলেন সেই নিঃশব্দ সংগ্রামী তরুণদের একজন, যারা নিজের জীবনের কষ্ট ভুলে পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জুলাই অভ্যুত্থানে আহত এক বীরের গল্প
সাইফুল ইসলাম
ক্রমিক: ০০৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০০৮
জন্ম
সাইফুল ইসলাম ২০০০ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাস করছেন। তার বাবা মাহেব হোসেন জামাদার একজন রিকশাচালক এবং মা জয়গুন নেছা একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ছয় সদস্যের পরিবারটিতে তিন বোন, এক ভাই ও বাবা-মাকে নিয়ে তাদের। জীবন চলে সীমাহীন কষ্টে। সাইফুল পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে বহু বছর ধরে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তার কোনো নির্দিষ্ট চাকরি না থাকলেও সংসার চালাতে তিনি দিনমজুরী, রিকশা চালানোসহ যেকোনো পরিশ্রমের কাজ করতে পিছপা হননি। বাবা বয়সের ভারে এবং মা অসুস্থতার কারণে শ্রমে অক্ষম হওয়ায়, পরিবারের ভার প্রায় সম্পূর্ণভাবে সাইফুলের উপরেই পড়ে।
এই তরুণ প্রতিদিন জীবনযুদ্ধে লড়াই করেছেন কেবল নিজের নয়, বরং পুরো পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য। তার শ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধ একজন আদর্শ সন্তানের প্রতিচ্ছবি। সাইফুল ইসলাম হচ্ছেন সে সব নীরব সংগ্রামীদের একজন, যারা নিঃশব্দে সমাজের ভার বহন করে চলে।
পারিবারিক অবস্থা ও সংকট
সাইফুল ইসলাম ছিলেন ছয় সদস্যের পরিবারের প্রধান অবলম্বন। বাবা বয়সের ভারে পূর্ণ সময় কাজ করতে অক্ষম, আর মা পোশাক কারখানায় কাজ করলেও তিনিও নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। ছোট ভাই-বোনদের শিক্ষার খরচ এবং সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ভার দীর্ঘদিন ধরে সাইফুল একা বহন করে আসছিলেন। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তার কাজ করার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে গেছে। দৈহিক যন্ত্রণা ও দুর্বলতার কারণে তিনি আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারছেন না। এর ফলে পুরো পরিবার এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে।
সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও আর সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঔষধ, খাবার, বাসা ভাড়া এমনকি শিশুদের লেখাপড়ার খরচ পর্যন্ত মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে সাইফুল ও তার পরিবার কঠিন এক দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে পার হচ্ছে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, আয় বন্ধ, আর বেঁচে থাকার লড়াই প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সহায়তা না পেলে এই পরিবারটির সামনে নেমে আসবে অবর্ণনীয় দুর্দশা।
ঘটনার বিবরণ ও শারীরিক আঘাত
২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে দেশের শিক্ষার্থীরা কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে আসে। দেশজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, সেমিনার ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরে। শিক্ষার্থীরা বারবার শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, যাতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং একটি ন্যায্য, সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু এই অহিংস ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জবাবে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়ানক দমনমূলক। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের লক্ষ্য করে ছোড়া হতে থাকে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও কখনো কখনো তাজা গুলিও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর, আটক এবং এমনকি সরাসরি হামলা চালানো হয়। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, আন্দোলনকারীরা আত্মরক্ষায় বাধ্য হয়, ফলে আন্দোলন কিছু কিছু এলাকায় সহিংসতায় রূপ নেয়।
জুলাই মাসের ১৭ তারিখে এই আন্দোলনে যোগদান করেন সাইফুল ইসলাম। আন্দোলন চলাকালীন রাত ১০.৩০ টার দিকে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার পরপরই তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেয়া হলে, নার্সরা কেবল রক্তপাত বন্ধ করে পাঠিয়ে দেন। সেই দিন শহরে কারফিউ চলছিল, তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে রাত ১২টার দিকে ঢাকার রয়েল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কোনো ধরনের অবেদন (লোকাল অ্যানেসথেসিয়া) না দিয়েই তার শরীর থেকে গুলি বের করা হয় একটি রীতিমতো অমানবিক অভিজ্ঞতা। তবে গুলির অংশবিশেষ শরীরের ভিতরে রয়ে যায়, যেটি এখনও তার জন্য তীব্র শারীরিক সমস্যা তৈরি করছে। চিকিৎসকদের মতে, পুনরায় অপারেশন করে সেই বুলেটের অবশিষ্টাংশ না বের করলে তিনি স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারবেন না।
বর্তমানে তিনি দীর্ঘসময় বসে বা দাঁড়িয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না। এমনকি বেশি হাঁটা-চলাও করতে পারেন না। প্রতিদিনের জীবন তার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অথচ তিনি একজন পরিশ্রমী শ্রমজীবী মানুষ। এ দেহটাই ছিল তার পুঁজি।
চিকিৎসা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য
প্রথমে স্থানীয় ক্লিনিকে রক্তপাত বন্ধ করা হয়। এরপর রাতে রয়েল হাসপাতালে অপারেশন করে গুলি বের করা হয়। বর্তমানে তার শরীরে বুলেটের টুকরার কারণে তীব্র শারীরিক অসুবিধা হচ্ছে। তিনি সহজে বসতে বা হাঁটতে পারেন না। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় অপারেশন না করলে তার পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে তার এক লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে, যা মূলত নিজের সামান্য আয় ও ধার-দেনার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবারের আর্থিক সঙ্কটের কারণে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা আর সম্ভব হচ্ছে না।
প্রস্তাবনা
১. একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে উপকৃত হবে।
২. চিকিৎসার খরচ বহন করা।
৩. ইতিমধ্যে চিকিৎসা খরচ যা হয়েছে তাও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা।
পরিশেষে, সাইফুল ইসলাম একজন সংগ্রামী তরুণ, যার জীবনযাত্রা এবং পরিবার পরিচালনা ছিল নির্ভরশীল কেবল তার শ্রম ও শারীরিক সামর্থ্যের ওপর। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়ে আজ সে নিজেই পঙ্গুত্বের পথে। এ পরিস্থিতিতে তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব। সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পেলে তিনি আবারো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন, পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
এক নজরে সাইফুল ইসলাম
নাম: সাইফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ: ১২-১২-২০০০
পিতা: মাহেব হোসেন জামাদর
মাতা: জয়গুন নেছা
বোন: সালমা আক্তার, ৯ম শ্রেণি
বোন: সাদিয়া আক্তার, ৪র্থ শ্রেণি
বোন: তানজিলা, ৩য় শ্রেণি
পরিবারে সদস্য সংখ্যা: ৬ জন
বর্তমান ঠিকানা: যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: মেহেন্দীগঞ্জ, বরিশাল
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ১৭ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১০:৩০ টা
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ ও যুবলীগত
আহত হওয়ার স্থান: কদমতলী থানা মোড়, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍