হোম / আহতদের তালিকা / মো: সুজন
মো: সুজন

মো: সুজন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পলাশপুর, কদমতলী, ঢাকা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আহত দেহগুলো নুয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের স্পর্ধিত চেতনা জেগে আছে, জুলাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার পথ কখনো নিষ্কণ্টক নয়।

জন্ম পরিচয় ও জীবনের প্রেক্ষাপট নির্বাসিত আর্তির ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক সাহসী তরুণের নাম মো: সুজন। ২০০৮ সালের ২ এপ্রিল ঝাপসা ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে জন্ম নেন তিনি। জন্মের মুহূর্ত থেকেই জীবনের সঙ্গে তাঁর এক নিরব যুদ্ধ শুরু হয়। সুজনের জীবনের শুরু থেকেই ছিল কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। লেখাপড়ার স্বপ্ন চোখে থাকলেও তা অ-ধরাই থেকে যায়, কারণ তার শৈশবই কেটেছে পরিবারের ভরণপোষণের দায় কাঁধে তুলে নিয়ে। পেটের ক্ষুধা মেটাতে শিশুকালেই অটো চালানো শুরু করেন তিনি। ছোট্ট আয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ান, হয়ে ওঠেন ঘরের অন্যতম ভরসাস্থল। পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী ও ন্যায়ের পক্ষে সাহসিকতার সঙ্গে অবস্থান নেওয়া এ তরুণ ছিল পরিবারের জন্য আশার আলো।
সুজন শুধু একজন ছেলেই ছিলেন না, ছিলেন পরিবারের কাঁধে ভর দেওয়া এক আশ্রয়। প্রতিটি ভোরে তার চোখে ভেসে উঠত মা-বাবার ক্লান্ত মুখ আর ভাই-বোনদের অপূর্ণ চাহনির দৃশ্য। সেই দৃশ্যই হয়তো তাকে পরিণত করেছিল অসময়ে পরিণত এক জীবন্ত যোদ্ধায়। অভাবের মাঝেও সুজনের সততা, দায়বদ্ধতা ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে করে তুলেছিল একটি অনন্য চরিত্রে। এই অল্প বয়সেই যে সুজন জীবনকে বুঝেছিল গভীরভাবে, সে যেন শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও এক আলোর দিশারী। বাস্তবতা রূঢ় তাঁকে ভাঙতে পারেনি বরং গড়ে তুলেছে নতুন এক শক্তিময় চেতনায়। পারিবারিক অবস্থা পরিবারটি ছিল বৃহৎ মোট ১০ ভাই-বোন নিয়ে গঠিত এক বিশাল সংসার, যেখানে প্রতিদিনের রুটি রুজির সংগ্রামটাই যেন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। পিতা কালাম সরদার, বর্তমানে ৮০ বছরের এক অক্ষম বৃদ্ধ, যিনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন এবং শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। মাতা শেফালী বেগম, যিনি ৫০ বছর বয়সেও সন্তানদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে চলেছেন। অভাব আর প্রয়োজনের ক্লান্তিকর টানাপোড়েনের মাঝেও মা হিসেবে তার আত্মত্যাগ ছিল অদম্য। বর্তমানে সুজনের পরিবার দু:সময় পার করছে, এই দুঃসময় আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে সুজনের চিকিৎসাজনিত ব্যয়ের কারণে। পরিবারকে প্রায় ৪ লক্ষ টাকার ঋণে জর্জরিত হতে হয়েছে যা পরিশোধ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। মো: সুজনের গল্প কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও গণদমননীতির একটি করুণ প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন একজন নিষ্পাপ তরুণ, যিনি শুধু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু আজ তিনি শারীরিকভাবে পঙ্গু, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, আর তার পরিবার দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত।

ঘটনার বিবরণ কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্রসমাজ ২৪ সালের জুলাই জুড়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেয়। তারা মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, সেমিনার ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরে। যদিও এই আন্দোলন শুরুতে ছিল অহিংস, তবে বিভিন্ন স্থানে তা সহিংসতায় রূপ নেয়, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ও ছাত্রদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দিনটি ছিল
১৯ জুলাই,
সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকায় চলমান ছাত্র আন্দোলনে দৃপ্তকণ্ঠে অংশ নেন মো: সুজন। তার কণ্ঠে ছিল ন্যায়ের দাবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিচল প্রতিবাদের ভাষা। দেশের সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে সাহসের সঙ্গে শ্লোগান দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সে দিনটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এক ভয়ংকর, অমানবিক ঘটনার মাধ্যমে। সুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলনকারীদের দিকে গুলি চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রতিবাদকারীরা তখন আতঙ্কে পিছু হটছিল, ঠিক তখনই একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় সুজনের পিঠে। সেই গুলি তার শরীর ভেদ করে বাম পাশের পেট দিয়ে বেরিয়ে যায়, রক্তাক্ত করে দেয় চারপাশ। তৎক্ষণাৎ সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, অচেতন হয়ে যায়। এরপরের কিছুই তার মনে নেই। প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই একটি গুলিই যেন সবকিছু কেড়ে নেয় তার কাছ থেকে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কর্মক্ষমতা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন সবকিছুই থেমে যায় সেদিনের সেই নির্মম মুহূর্তে। সুজনের জীবনে নামে এক স্থায়ী অন্ধকার। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ ঘটনার পরপরই তার বড় ভাই ছুটে গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করেন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেদিনই তার জরুরি অপারেশন করা হয়। তিনি ৪ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন। এরপর কিছুটা অবস্থার উন্নতি দেখে তাকে বাড়িতে আনা হয়, কিন্তু সেখানে এক মাস থাকার পরও কোনো উন্নতি হয়নি। তার ক্ষতস্থানে মারাত্মক সংক্রমণ হয়, যা শারীরিক অবস্থা আরও ভয়াবহ করে তোলে। বর্তমানে তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এ চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থার বিবরণ আরও হৃদয়বিদারক: ১. খাদ্যনালী ছিঁড়ে গেছে, ফলে খাওয়া-দাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চরমভাবে বাধাগ্রস্ত।
২. বাম পা সম্পূর্ণ অবশ, চলাফেরার সক্ষমতা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে গেছেন। ৩. প্রস্রাব ও পায়খানা স্বাভাবিকভাবে করতে পারেন না। তার দেহে অটোমেটিক নিষ্কাশন হয়, যা তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম দুর্বল অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। এই বয়সে একজন কিশোরের যে স্বপ্ন থাকার কথা ছিল চলবে, শিখবে, পরিবারের পাশে দাঁড়াবে, তা আজ মারাত্মক চিকিৎসা সংকটের কষ্টময় বাস্তবতায় ডুবে গেছে। আর যে ছেলে রোজগারের জন্য রাস্তায় অটো চালাতো, সেই আজ হাসপাতালের বিছানায় পড়ে কেবল বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছে।
প্রস্তাবনা
১. একটা দোকানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে ২. সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ বহন করা যেতে পারে পরিশেষে, মো: সুজনের এই মুহূর্তে প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ। সুজনের পাশে দাঁড়ানো আমাদের শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সমাজবোধের বাস্তব পরীক্ষা।

এক নজরে মো: সুজন
নাম : মো: সুজন পিতা : কালাম সরদার, বয়স ৮০
মাতা : শেফালী বেগম, বয়স ৫৫
ভাইবোন : ১০ জন
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ১২ জন
ঠিকানা : পলাশপুর, কদমতলী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৪ জুলাই ২০২৪, সকাল ১০:১৫ মিনিট
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ মোড়, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍