হেলাল ভূঁইয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ব্যবসায়ী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাই বিপ্লবে পাশবিকতা ও বর্বর নির্যাতন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও প্রতিরোধের মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, জুলাই ২০২৪-এই মাসটি। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে যখন সাধারণ মানুষ, ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডাররা শুরু করে এক নারকীয় হামলা। আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হয় পাশবিকতা ও বর্বর নির্যাতন যা কল্পনাকেও হার মানায়। নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর সশস্ত্র হামলা, নারী শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন, বয়স্কদের গুলি করে ফেলা; সব মিলিয়ে একটি রাষ্ট্র যেন নিজেই তার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। যাদের হাতে থাকা উচিত ছিল সংবিধান, তাদের হাতে ছিল লাঠি, রাইফেল আর গুলির ট্রিগার। আন্দোলনের মিছিলে গুলি চালানো, নেতা কর্মীদের ধরে নিয়ে গিয়ে রাতভর অমানবিক নির্যাতন চালানো এমনকি হাসপাতাল থেকেও আহতদের তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
এই বর্বরতা ছিল পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যমূলক এবং নির্মম। এটি শুধু একটি আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা ছিল না, এটি ছিল মানুষের অধিকার, মত প্রকাশ ও স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যতই দমন-পীড়ন হোক; প্রতিরোধের আগুন কখনো নেভে না। জুলাইয়ের রক্তঝরা রাজপথ প্রমাণ করেছে, এই জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত করে না। হেলাল ভুঁইয়া: জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী যোদ্ধা জন্ম হেলাল ভুঁইয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার সোনাকান্দা ইউনিয়নের সোনাকান্দা গ্রামে। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক সময়ে, যখন এ ভূখণ্ডের মানুষ মুক্তির জন্য লড়ছিলো। দেশমাতৃকার মুক্তির ইতিহাসে যে বছরটি রক্ত ও বিজয়ের চিহ্ন বহন করে, সে বছরেই হেলাল ভূঁইয়ার জন্ম যেন এক প্রতীকী বার্তা ছিল-এই ভূমি একদিন তাকে সাহসের প্রতিমূর্তি হিসেবে গড়ে তুলবে। পারিবারিক জীবন হেলাল ভুঁইয়ার পিতা, মৃত গনি ভূঁইয়া ছিলেন একজন সাদামাটা কৃষক, যিনি সারা জীবন মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে সংসার চালিয়েছেন। কঠোর পরিশ্রম ও সততার যে নিদর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা হেলালের চরিত্র গঠনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মা, শামসুন্নাহার ছিলেন এক মমতাময়ী নারী, যিনি পরিবারে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করেছিলেন।
বর্তমানে তিনি আর জীবিত নন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা হেলালের মনে এক অমলিন ছাপ রেখে গেছে। হেলাল ভূঁইয়ার পরিবারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস তোহা অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত, আর ছেলেটিও পরিবারের আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনায় গড়ে উঠছে। কর্মজীবন জীবনের তাগিদে হেলাল ভূঁইয়া বেছে নিয়েছিলেন জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি শুধু আর্থিক সাফল্যে নিবদ্ধ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজের অসংগতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনুভব করতেন এক তীব্র প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবতেন তিনি গভীর মননে এবং ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থানকে তিনি কখনো আড়াল করেননি। তাঁর চিন্তা ও কাজের মধ্যে সমন্বয় ছিল বলেই তিনি সমাজে একজন নির্ভরযোগ্য, সচেতন এবং সদা জাগ্রত নাগরিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংগ্রামী জীবন জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি দেশের রাজপথে ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ভয়, নিপীড়ন, রক্ত কোনো কিছুই তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। যখন অনেকেই নিরাপত্তার খোঁজে গুটিয়ে নিচ্ছিলো নিজেদের, তখন হেলাল ভূঁইয়া বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রবীণ বয়সে এসেও তাঁর মনে ছিল এক যুবকের সাহস, এক মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের চেতনা। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেম কোনো বয়সের সীমানায় আবদ্ধ নয়। তাঁর সংগ্রামী জীবন শুধু একটি প্রজন্ম নয়, বহু প্রজন্মের জন্যই এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং দৃঢ়চেতা মানসিকতা বাঙালির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই আন্দোলনের এক বীরের কাছে শুনুন তার নিজস্ব জবানিতে আমি হেলাল ভূঁইয়া। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, জুমার নামাজের পর থেকেই আমি রায়েরবাগ এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। রাজপথে তখন গর্জে উঠছিলো এক ইতিহাস, এক গণজোয়ার। আমি বৃদ্ধ বয়সে শরীরের সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে নেমে পড়ি মাঠে, কারণ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল আমার নৈতিক দায়িত্ব। ছাত্রদের জন্য পানি সরবরাহ করছিলাম এবং রাস্তায় মাইকিং করে মানুষের অন্তর জাগিয়ে তুলছিলাম। চারপাশে তখন উত্তাল পরিবেশ, মানুষের চোখে ছিল আগুন আর বুকের ভেতর ছিল সাহসের বিস্ফোরণ। কিন্তু ৩ আগস্ট, সন্ধ্যা সাতটা। সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। হঠাৎ চারদিক থেকে পুলিশের দমন-পীড়ন শুরু হয়। নির্বিচারে গুলি ছোঁড়া হচ্ছিল। মানুষ আসে এক রাইফেলের গুলি। হাঁটুর নিচে গুলিটি বিঁধে এক পাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে। যেন একটা তাজা প্রাণকে ছিঁড়ে ফেলে দিলো এক নিষ্ঠুর বারুদের তাপ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ি আমি। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল আমার পায়ের নিচের জমিন। মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ থামছে না, সবাই বাঁচতে ব্যস্ত। আমি শুধু অনুভব করছিলাম, আমার শরীর নয়, যেন আমার মাতৃভূমির রক্ত ঝরছে সেই মুহূর্তে। কয়েক মুহূর্ত পর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। পরে কেউ একজন আমাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই গুলির শব্দ, সেই রক্তাক্ত মাটি, সেই অসহায় চিৎকার আজও আমার বুকের ভেতরে গুমরে কাঁদে। আমি এখনো সেই যন্ত্রণার ভার নিয়ে বেঁচে আছি, কিন্তু মাথা উঁচু করেই বাঁচছি কারণ জানি, এ রক্ত বৃথা যাবে না। আমি একজন প্রবীণ মানুষ হয়েও রাজপথে গিয়েছিলাম সত্যের পাশে দাঁড়াতে, আর সেই সত্যের জন্য রক্ত ঝরিয়েছি। যদি আবার ডাক পড়ে, আবারও যাবো কারণ দেশটা আমাদের, আর স্বাধীনতা কখনো নিঃশব্দে আসে না। আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। এই ক্ষত শুধু শরীরে নয়, আমার হৃদয়ে, আমার চেতনায়ও গেঁথে আছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরই আশপাশের ছাত্ররা আর দেরি করেনি। তারা আমার রক্তাক্ত শরীর টেনে তুলে দ্রুত নিয়ে যায় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। সেখানে আমাকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে তোলা হয়। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া হাঁটুর নিচের অংশে শুরু হয় অস্ত্রোপচার-রক্ত, সেলাই, ওষুধ আর যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অপারেশনের পর কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আমার পায়ের স্বাভাবিক শক্তি আজও ফিরে আসেনি। হাঁটতে পারি, কিন্তু আগের মতো নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন যন্ত্রণার শ্বাস ফেলে যায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। তখন আমি চিৎকার করে সবাইকে নিরাপদে সরে যেতে বলছিলাম। ঠিক সে মুহূর্তে, আমার দিকেই ধেয়ে ফ্যাসিবাদের বর্বরতা। এখনও নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছি। ডাক্তারদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী ফিজিওথেরাপি লাগবে, তবে আমি জানি, এই ক্ষত শুধু চিকিৎসা দিয়ে সারে না, এটা সারে বিচার ও প্রতিশোধের আগুনে। এই গুলির দাগ আমার জন্য গর্বের প্রতীক-আমি মাথা উঁচু করে বলতে পারি, আমি রক্ত দিয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, এক সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা ব্যবসায় সহায়তার মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে হেলাল ভূঁইয়া
নাম : হেলাল ভূঁইয়া
জন্ম তারিখ : ২৮-০২-১৯৭১
জন্মস্থান : মুরাদনগর, কুমিল্লা
পেশা : ব্যবসায়ী
নিজ জেলা : কুমিল্লা
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রামঃ সোনাকান্দা, ইউনিয়ন: সোনাকান্দা, থানা: মুরাদনগর, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : রহিম মার্কেট, কদমতলী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত গনি ভূঁইয়া পিতার
পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : শামসুন্নাহার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৮০
মাসিক আয় : ৫০০০
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: ব্যবসায়ী বাড়ির বিবরণ : সেমিপাকা সম্পদের পরিমাণ : ১ বিঘা পরিমাণ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
স্ত্রীর নাম : রোমা ইসলাম
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
সন্তানদের তথ্য
১. জান্নাতুল ফেরদৌস তোহা, বয়স: ২০ পেশাঃ অনার্স ১ম, গৃহিণী, সম্পর্ক : মেয়ে
২. মাহতাব নূর তাসিম, বয়স: ১৬ পেশাঃ ছাত্র, শ্রেণীঃ ৯ম, সম্পর্ক : ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার রায়েরবাগ, গ্যাস রোড আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা আহত হওয়ার সময় : ৩ আগস্ট, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিটের দিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা: আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি
এই বর্বরতা ছিল পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যমূলক এবং নির্মম। এটি শুধু একটি আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা ছিল না, এটি ছিল মানুষের অধিকার, মত প্রকাশ ও স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যতই দমন-পীড়ন হোক; প্রতিরোধের আগুন কখনো নেভে না। জুলাইয়ের রক্তঝরা রাজপথ প্রমাণ করেছে, এই জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত করে না। হেলাল ভুঁইয়া: জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী যোদ্ধা জন্ম হেলাল ভুঁইয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার সোনাকান্দা ইউনিয়নের সোনাকান্দা গ্রামে। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক সময়ে, যখন এ ভূখণ্ডের মানুষ মুক্তির জন্য লড়ছিলো। দেশমাতৃকার মুক্তির ইতিহাসে যে বছরটি রক্ত ও বিজয়ের চিহ্ন বহন করে, সে বছরেই হেলাল ভূঁইয়ার জন্ম যেন এক প্রতীকী বার্তা ছিল-এই ভূমি একদিন তাকে সাহসের প্রতিমূর্তি হিসেবে গড়ে তুলবে। পারিবারিক জীবন হেলাল ভুঁইয়ার পিতা, মৃত গনি ভূঁইয়া ছিলেন একজন সাদামাটা কৃষক, যিনি সারা জীবন মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে সংসার চালিয়েছেন। কঠোর পরিশ্রম ও সততার যে নিদর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা হেলালের চরিত্র গঠনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মা, শামসুন্নাহার ছিলেন এক মমতাময়ী নারী, যিনি পরিবারে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করেছিলেন।
বর্তমানে তিনি আর জীবিত নন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা হেলালের মনে এক অমলিন ছাপ রেখে গেছে। হেলাল ভূঁইয়ার পরিবারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস তোহা অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত, আর ছেলেটিও পরিবারের আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনায় গড়ে উঠছে। কর্মজীবন জীবনের তাগিদে হেলাল ভূঁইয়া বেছে নিয়েছিলেন জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি শুধু আর্থিক সাফল্যে নিবদ্ধ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজের অসংগতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনুভব করতেন এক তীব্র প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবতেন তিনি গভীর মননে এবং ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থানকে তিনি কখনো আড়াল করেননি। তাঁর চিন্তা ও কাজের মধ্যে সমন্বয় ছিল বলেই তিনি সমাজে একজন নির্ভরযোগ্য, সচেতন এবং সদা জাগ্রত নাগরিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংগ্রামী জীবন জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি দেশের রাজপথে ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ভয়, নিপীড়ন, রক্ত কোনো কিছুই তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। যখন অনেকেই নিরাপত্তার খোঁজে গুটিয়ে নিচ্ছিলো নিজেদের, তখন হেলাল ভূঁইয়া বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রবীণ বয়সে এসেও তাঁর মনে ছিল এক যুবকের সাহস, এক মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের চেতনা। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেম কোনো বয়সের সীমানায় আবদ্ধ নয়। তাঁর সংগ্রামী জীবন শুধু একটি প্রজন্ম নয়, বহু প্রজন্মের জন্যই এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং দৃঢ়চেতা মানসিকতা বাঙালির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই আন্দোলনের এক বীরের কাছে শুনুন তার নিজস্ব জবানিতে আমি হেলাল ভূঁইয়া। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, জুমার নামাজের পর থেকেই আমি রায়েরবাগ এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। রাজপথে তখন গর্জে উঠছিলো এক ইতিহাস, এক গণজোয়ার। আমি বৃদ্ধ বয়সে শরীরের সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে নেমে পড়ি মাঠে, কারণ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল আমার নৈতিক দায়িত্ব। ছাত্রদের জন্য পানি সরবরাহ করছিলাম এবং রাস্তায় মাইকিং করে মানুষের অন্তর জাগিয়ে তুলছিলাম। চারপাশে তখন উত্তাল পরিবেশ, মানুষের চোখে ছিল আগুন আর বুকের ভেতর ছিল সাহসের বিস্ফোরণ। কিন্তু ৩ আগস্ট, সন্ধ্যা সাতটা। সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। হঠাৎ চারদিক থেকে পুলিশের দমন-পীড়ন শুরু হয়। নির্বিচারে গুলি ছোঁড়া হচ্ছিল। মানুষ আসে এক রাইফেলের গুলি। হাঁটুর নিচে গুলিটি বিঁধে এক পাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে। যেন একটা তাজা প্রাণকে ছিঁড়ে ফেলে দিলো এক নিষ্ঠুর বারুদের তাপ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ি আমি। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল আমার পায়ের নিচের জমিন। মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ থামছে না, সবাই বাঁচতে ব্যস্ত। আমি শুধু অনুভব করছিলাম, আমার শরীর নয়, যেন আমার মাতৃভূমির রক্ত ঝরছে সেই মুহূর্তে। কয়েক মুহূর্ত পর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। পরে কেউ একজন আমাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই গুলির শব্দ, সেই রক্তাক্ত মাটি, সেই অসহায় চিৎকার আজও আমার বুকের ভেতরে গুমরে কাঁদে। আমি এখনো সেই যন্ত্রণার ভার নিয়ে বেঁচে আছি, কিন্তু মাথা উঁচু করেই বাঁচছি কারণ জানি, এ রক্ত বৃথা যাবে না। আমি একজন প্রবীণ মানুষ হয়েও রাজপথে গিয়েছিলাম সত্যের পাশে দাঁড়াতে, আর সেই সত্যের জন্য রক্ত ঝরিয়েছি। যদি আবার ডাক পড়ে, আবারও যাবো কারণ দেশটা আমাদের, আর স্বাধীনতা কখনো নিঃশব্দে আসে না। আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। এই ক্ষত শুধু শরীরে নয়, আমার হৃদয়ে, আমার চেতনায়ও গেঁথে আছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরই আশপাশের ছাত্ররা আর দেরি করেনি। তারা আমার রক্তাক্ত শরীর টেনে তুলে দ্রুত নিয়ে যায় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। সেখানে আমাকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে তোলা হয়। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া হাঁটুর নিচের অংশে শুরু হয় অস্ত্রোপচার-রক্ত, সেলাই, ওষুধ আর যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অপারেশনের পর কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আমার পায়ের স্বাভাবিক শক্তি আজও ফিরে আসেনি। হাঁটতে পারি, কিন্তু আগের মতো নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন যন্ত্রণার শ্বাস ফেলে যায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। তখন আমি চিৎকার করে সবাইকে নিরাপদে সরে যেতে বলছিলাম। ঠিক সে মুহূর্তে, আমার দিকেই ধেয়ে ফ্যাসিবাদের বর্বরতা। এখনও নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছি। ডাক্তারদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী ফিজিওথেরাপি লাগবে, তবে আমি জানি, এই ক্ষত শুধু চিকিৎসা দিয়ে সারে না, এটা সারে বিচার ও প্রতিশোধের আগুনে। এই গুলির দাগ আমার জন্য গর্বের প্রতীক-আমি মাথা উঁচু করে বলতে পারি, আমি রক্ত দিয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, এক সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা ব্যবসায় সহায়তার মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে হেলাল ভূঁইয়া
নাম : হেলাল ভূঁইয়া
জন্ম তারিখ : ২৮-০২-১৯৭১
জন্মস্থান : মুরাদনগর, কুমিল্লা
পেশা : ব্যবসায়ী
নিজ জেলা : কুমিল্লা
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রামঃ সোনাকান্দা, ইউনিয়ন: সোনাকান্দা, থানা: মুরাদনগর, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা : রহিম মার্কেট, কদমতলী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত গনি ভূঁইয়া পিতার
পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : শামসুন্নাহার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৮০
মাসিক আয় : ৫০০০
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: ব্যবসায়ী বাড়ির বিবরণ : সেমিপাকা সম্পদের পরিমাণ : ১ বিঘা পরিমাণ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
স্ত্রীর নাম : রোমা ইসলাম
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
সন্তানদের তথ্য
১. জান্নাতুল ফেরদৌস তোহা, বয়স: ২০ পেশাঃ অনার্স ১ম, গৃহিণী, সম্পর্ক : মেয়ে
২. মাহতাব নূর তাসিম, বয়স: ১৬ পেশাঃ ছাত্র, শ্রেণীঃ ৯ম, সম্পর্ক : ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার রায়েরবাগ, গ্যাস রোড আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা আহত হওয়ার সময় : ৩ আগস্ট, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিটের দিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা: আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍