হোম / আহতদের তালিকা / মো: সোলাইমান
মো: সোলাইমান

মো: সোলাইমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম মো: সোলাইমান জন্মগ্রহণ করেন ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি, ঢাকা জেলার সায়েদাবাদ থানাধীন ৫৪ নং ওয়ার্ড, ফরিদাবাদ পূর্ব জুরাইনে। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে এক অদ্ভুত নির্ভীকতা ও ন্যায়ের প্রতি টান লক্ষ করা যেত। জন্মের পর থেকেই তাকে ঘিরে পরিবারে ছিল অপার ভালোবাসা, কিন্তু পারিবারিক ভাঙনের কারণে তার জীবনের পথচলা হয় সংগ্রামমুখর। পারিবারিক জীবন মো: সোলাইমানের পারিবারিক জীবন ছিল কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াইয়ের আরেক নাম। তার পিতা মো: মন্টু মিয়ার সঙ্গে মা রেখা বেগমের বিচ্ছেদ হয়। সেই থেকে মা-ই ছিলেন পরিবারের প্রধান অভিভাবক। রেখা বেগম একজন আদর্শবান ও মমতাময়ী নারী, যিনি সন্তানদের মধ্যে আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা ও সাহসিকতার বীজ বপন করেছিলেন। চার ভাই-বোনের সংসারে বড় বোন নাদিরা বিবাহিত, বড় ভাই ইয়াসিন একজন পরিশ্রমী শ্রমিক এবং ছোট ভাই নূর মোহাম্মদ হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
কর্ম জীবন সোলাইমান বর্তমানে রসুলবাগ হামিউস সুন্নাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। বয়স কম হলেও তার চিন্তা-চেতনায় ছিল ব্যতিক্রমী প্রজ্ঞা। সমাজের অনিয়ম, বৈষম্য ও জুলুম তার কিশোর মনকে প্রভাবিত করত। এ বয়সেই তিনি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন এবং স্বপ্ন দেখতেন একটি ন্যায্য ও মানবিক রাষ্ট্রের। সংগ্রামী জীবন জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন মো: সোলাইমান রাজপথে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ভয়, নিপীড়ন কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কাও তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। যখন অনেকেই পেছনে সরে গিয়েছিল, তখন এই ছোট্ট সাহসী সৈনিক বুক চিতিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা তাকে একটি প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলে। মো: সোলাইমানের সংগ্রামী জীবন কেবল তার সময়কেই আলোকিত করেনি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও হয়ে থাকবে প্রেরণার উৎস। এই কিশোর যোদ্ধার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে। একজন ছোট্ট সৈনিক, যে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে মুক্তির স্বপ্নে। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ ১৩ বছরের মো: সোলাইমানের উপর গুলিবর্ষণ : ফ্যাসিস্ট সরকারের মর্মান্তিক বর্বরতা ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার-জুমার নামাজের ঠিক পরপর।
রায়েরবাগ এলাকায় যখন ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারবিরোধী শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল, তখন তাদের কাতারে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ১৩ বছরের এক কিশোর মো: সোলাইমান। মাদ্রাসার ছাত্র সোলাইমান, বয়সে ছোট হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। সবার মতো সেও নেমেছিল রাস্তায়, অন্যায়ের প্রতিবাদে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পুলিশ বাহিনী তারুণ্যের কণ্ঠরোধে বরাবরের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশবিকভাবে। সেদিনও ব্যতিক্রম হয়নি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সোলাইমান পুলিশের গুলির আওতা থেকে সরে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে বর্বরতা শুরু হয়ে গেছে। প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে পুলিশের ছোড়া গুলির একটি এসে বিদ্ধ হয় তার ডান হাতের কনুইয়ে এক পাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে তাতেই শেষ নয়। সেই নিষ্ঠুরতার বলি হয় তার দুই পা। এক পায়ে গুলি মাংস ছিঁড়ে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। অপর পায়েও গুলির আঘাতে সে ছিটকে পড়ে যায় রক্তাক্ত অবস্থায়। আশপাশের জনগণ ছুটে এসে তাকে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়, তবে তার অবস্থা ছিল গুরুতর। মাত্র ১৩ বছরের এক কোমলমতি শিশুর ওপর এ ধরনের গুলিবর্ষণ ছিল রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের নগ্নতম রূপ। মো: সোলাইমানের রক্তাক্ত দেহ যেন সাক্ষ্য দেয়, এই সরকারের চোখে শিশু, কিশোর কিংবা নিরস্ত্র প্রতিবাদী কেউই নিরাপদ ছিল না। এই বর্বরতা শুধু একটি কিশোরের শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, বরং গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মো: সোলাইমানকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয় দ্রুততম সময়ে। সেখানে শুরু হয় তার বেঁচে থাকার জন্য এক ভয়ংকর সংগ্রাম। টানা তিন মাস হাসপাতালে ভর্তি থেকে তাকে মোকাবিলা করতে হয় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ডান হাত ও দুই পায়ে মোট চার বার অপারেশন করা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরেও তার শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেনি। তার ডান হাতের রগ ছিঁড়ে যাওয়ায় সেই হাতে এখন কোনো কাজের শক্তি নেই। আঙুলগুলো বিকল হয়ে গেছে এবং কয়েকটি নখ ও আঙুল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পায়ের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেখানে রিং পরানো হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও হাঁটার মতো শক্তি আর নেই। বর্তমানে মো: সোলাইমান সম্পূর্ণরূপে শয্যাশায়ী। দিন-রাত তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। চলাফেরা তো দূরের কথা, নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্যও তার নেই। এক সময়ের প্রাণোচ্ছল কিশোর এখন পরিণত হয়েছে এক নিস্তব্ধ যন্ত্রণার প্রতীকে। চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে তার প্রয়োজন আরও দুই থেকে তিন বছর তাও যদি উন্নততর চিকিৎসা, নিয়মিত থেরাপি ও পুনর্বাসনের সুযোগ সে পায়। বাস্তবতা হলো, এই বয়সেই মো: সোলাইমানের জীবন থমকে গেছে একটি রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হয়ে। তার শরীরের ক্ষত আজও রক্তাক্ত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
মো: সুলাইমানের পরিবারের অর্থনৈতিক করুণ অবস্থা মো: সুলাইমানের পরিবার চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। রাজধানীর এক অন্ধকারাচ্ছন্ন গলিতে অবস্থিত একটি ছোট ও জরাজীর্ণ ঘরই তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। সেখানে আলো-বাতাস ঢোকে না বললেই চলে। এই অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ ঘরেই সুলাইমান, তার মা, এবং তিন ভাইবোন মিলে পাঁচজন গাদাগাদি করে কোনো রকমে দিন পার করেন। পারিবারিক ভাঙনের যন্ত্রণা ও দারিদ্র্যের অভিশাপ একসাথে বয়ে বেড়াচ্ছে এই পরিবার। সুলাইমানের বাবা প্রায় দুই বছর আগে আরেকটি বিয়ে করে পরিবারকে পরিত্যাগ করেছেন। এরপর থেকে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের কোনো খোঁজখবর রাখেন না। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে একমাত্র মা রেখা বেগমের কাঁধে। তিনি অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এখানেই শেষ হয়নি। সর্বশেষ কুরবানির ঈদের সময়, মা রেখা বেগম তাদের ছোট ভাই নূর মোহাম্মদকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান,তারপর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। অবুঝ ও আহত সুলাইমান ও তার বড় ভাই ইয়াসিন যার বয়স ও মাত্র ১৬ বছর। সে দিনমজুরের কাজ করে তার ছোট ভাইকে সাহায্য করে যাচ্ছেন, কিন্তু সোলাইমান আজ পড়ে আছে ঘরের এক কোণে-নি:স্ব, একাকী ও নিরুপায় অবস্থায়।
এই পরিবারের নেই কোনো স্থায়ী আয়, নেই কোনো সহায়-সম্পদ। সহানুভূতির কিছু হাত বাড়লেও তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছায়নি সঠিক জায়গায়। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে একবার কিছু আর্থিক সহায়তা বরাদ্দ করা হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে যায়। অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে এক ব্যক্তি ভুয়া পরিচয়ে সুলাইমানের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ও তাদের বিশ্বাস অর্জন করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করে। সুলাইমানের পরিবারের এই অবর্ণনীয় দুরবস্থা কেবল একটি নিপীড়িত শিশুর নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার একটি করুণ দলিল।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, পায়ের থেকে পচে পচে পুঁজ পড়ে, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা ভাইকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে মো: সোলাইমান
নাম : মো: সুলাইমান
জন্ম তারিখ : ২৬-০১-২০১২
জন্মস্থান : সায়েদাবাদ, ঢাকা
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : ঢাকা
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : রসুলবাগ হামিউস সুন্নাহ মাদ্রাসা
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পুর্ব জুরাইন, ইউনিয়ন: ফরিদাবাদ, ৫৪ নং ওয়ার্ড, থানা: কদমতলী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মন্টু মিয়া
পিতার পেশা ও বয়স : তাদেরকে ফেলে চলে গেছেন কোন খোঁজ নেন না, ৪৬
মায়ের নাম : রেখা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় : ৫০০০
আয়ের উৎস : দিনমজুর
বাড়ির বিবরণ : ছোট্ট বাসা
সম্পদের পরিমাণ : নেই
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের নাম
১. ইয়াসিন, বয়স: ১৫ পেশা: ঝালাই কারখানার শ্রমিক সম্পর্ক : ভাই ২. নাদিরা, বয়স: ১৪ পেশা: বিবাহিত, সম্পর্ক : বোন
৩. নূর মোহাম্মদ, বয়স: ৭, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: হাফেজী, সম্পর্ক: ভাই

পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: শিক্ষার্থী আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪, সন্ধ্যা ৬ টার দিকে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍