হোম / আহতদের তালিকা / নূর মোহাম্মদ মিলন
নূর মোহাম্মদ মিলন

নূর মোহাম্মদ মিলন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : চাকরিজীবী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

নূর মোহাম্মদ মিলন ১৯৮৩ সালের ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলার নারায়ণগঞ্জ থানার কনাদারপাড় ইউনিয়নের সাহেবপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর থেকেই তিনি একটি মধ্যবিত্ত ও সৎ পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যেখানে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা ছিল প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। পারিবারিক জীবন নূর মোহাম্মদ মিলনের পিতা মৃত মুফিজুর রহমান ছিলেন একজন পরিশ্রমী কর্মজীবী মানুষ। তাঁর মা বিবি মরিয়ম (বয়স ৬৫) এক মমতাময়ী ও দৃঢ়চেতা নারী, যিনি সন্তানদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ,আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছেন। মিলনের সংসারে রয়েছে তাঁর দুই কন্যা। বড় মেয়ে নিশাদ নানজিবা (১৪), যিনি নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং ছোট মেয়ে নাজিবা নরজ (৮) তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাঁর ছোট ভাই সাইদুর রহমান (২৫) একজন চাকরি প্রত্যাশী এবং ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস (২১) অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এ পরিবারে মিলন একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তি, যিনি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে পরিবারের বন্ধনে স্থিতি এনেছেন।
কর্মজীবন নূর মোহাম্মদ মিলন একজন দায়িত্বশীল চাকরিজীবী। তিনি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক কোম্পানি ন্যাস্টলে কর্মরত আছেন। তাঁর পেশাগত জীবন যতটা সুশৃঙ্খল, ততটাই আদর্শনির্ভর। তিনি সততা, পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন এবং জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। সংগ্রামী জীবন ছোটবেলা থেকেই সমাজের অসংগতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিলনের মননে জন্ম নেয় এক তীব্র প্রতিক্রিয়া। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন এবং ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থানকে কখনো আড়াল করেননি। জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশের রাজপথে দাঁড়ান। ভয়, নিপীড়ন কিংবা রক্ত কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। তাঁর সংগ্রামী মনোভাব, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ আজ শুধু একটি প্রজন্মের নয়, ভবিষ্যতের বহু প্রজন্মের জন্যই প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মদান বাঙালির ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়ে যাবে। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ২০ জুলাই; এক রক্তাক্ত দুপুর, এক বিভীষিকাময় দিন। দেশজুড়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের জারি করা কারফিউয়ের মধ্যে গোটা জাতি যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছিল। রাজপথে ছিল উত্তাল জনতার ঢল, নির্যাতনের প্রতিবাদে দেশজুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছিল ক্ষোভের আগুন। ঠিক সে দিন, রাজধানীর কাজলা এলাকায় ন্যাসলে কোম্পানির দায়িত্বে থাকা নূর মোহাম্মদ মিলন সরকারি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেন। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন একজন খুনি পুলিশ গণবিক্ষোভের রোষানলে পড়ে নিহত হয় এবং জনগণ প্রতিক্রিয়ায় তার দেহ ঝুলিয়ে দেয়। এই দৃশ্য যেন ফ্যাসিবাদী সরকারের অহঙ্কারে এক চাবুক হয়ে আঘাত করে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে ধেয়ে আসে ভয়াল গুলির শব্দ। ভবনের ছাদ, সড়কের কোণ, জানালার ফাঁক- সবদিক থেকেই ছোঁড়া হচ্ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলি, যেন গোটা এলাকাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করার হুকুম ছিল তাদের কাছে। দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট। সময় যেন থেমে যায় হঠাৎ। এক নিখুঁত স্নাইপার গুলির শব্দে বিদীর্ণ হয় আকাশ। সেই গুলি নূর মোহাম্মদ মিলনের গলার এক পাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশে বেরিয়ে যায়- ফ্যাসিবাদের বারুদ যেন তার শরীর ছিঁড়ে তার সাহসকে লক্ষ্য করেই ছোঁড়া হয়। সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি; নির্বাক, নিস্তেজ। চারপাশে চিৎকার, হাহাকার। ছাত্র-জনতার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকের কণ্ঠে ভয় আর বিস্ময়-“এটা স্নাইপার শট। ১০০ মিটার দূর থেকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে।” অর্থাৎ এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যা চেষ্টা, যা ফ্যাসিবাদী সরকারের পোষা বাহিনী ঠাণ্ডা মাথায় চালিয়েছে, যেন একটি প্রতিবাদী কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে। এই ঘটনা শুধু একজন মানুষের ওপর গুলি চালানো নয়- এটি ছিল গোটা মুক্তিকামী জাতির বুকে স্নাইপার চালানো। নূর মোহাম্মদ মিলনের গুলিবিদ্ধ শরীর আজ সাক্ষ্য দেয় আওয়ামী সরকারের দমন-পীড়নের, বর্বরতার এবং মানবাধিকারের বিপর্যয়ের। তবুও সে দিন থেমে যায়নি আন্দোলন। কারণ একজন মিলনের রক্তে যে পতাকা উড়তে শুরু করেছিল, তা আর কোনো গুলিতেই নামিয়ে আনা যাবে না। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা ফ্যাসিবাদী সরকারের নৃশংস গুলিতে গলায় বিদ্ধ হয়ে যখন নূর মোহাম্মদ মিলন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, তখন আশপাশের ছাত্র-জনতা নিজের জীবনবাজি রেখে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ইম্পেরিয়েল রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। তার গলা দিয়ে অঝোরে রক্ত ঝরছিল, যেন প্রতিবাদের ভাষা রক্ত হয়ে ছুটে বেরোচ্ছে। চিকিৎসকরা মিলনের অবস্থা দেখে মুহূর্তেই বুঝে যান-এটা কোনো সাধারণ গুলির আঘাত নয়, এটা ছিল পরিকল্পিত, প্রাণঘাতী হামলা। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় রয়েল হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু চারদিক তখন ছিল অস্থির ও অ-নিরাপদ। গুলির আওয়াজ থামেনি, রাস্তাঘাটে ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ছায়া। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এত বড় পথে যাত্রা সম্ভব ছিল না। তাই বিকল্প পথ না দেখে রয়েল হাসপাতালেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।তার গলার দু’পাশে প্রায় ১৫টি সেলাই দেওয়া হয়। দিনগুলো কেটে যায় নিঃশব্দে- কারণ তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। তার কণ্ঠ, যেটি ছিল প্রতিবাদের প্রতীক, তখন ছিল স্তব্ধ। চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ছাত্র-জনতার ভালোবাসা এবং নিজের অদম্য মানসিক শক্তিতে মিলন ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগোতে থাকেন। তবু আজও সেই ক্ষতের শেষ হয়নি। তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন। ঘাড় এক পাশে ঘোরাতে পারেন না। তার চলাফেরা, জীবনযাপন ও কর্মক্ষমতায় সেই স্নাইপার গুলির প্রভাব এখনো স্পষ্ট। চিকিৎসা চলছে- শরীরের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বুলেট যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে মন ও মানসে, তারও। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। বর্তমান অবস্থা: তার গলার দুই পাশে প্রায় ১৫টি সেলাই দিতে হয়। তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তিনি ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে অগ্রসর হন। তবে এখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। বর্তমানে তিনি ঘাড় একপাশে ঘোরাতে পারেন না। তার চিকিৎসা এখনো চলমান রয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে নূর মোহাম্মদ মিলন
নাম : নূর মোহাম্মদ মিলন
জন্ম তারিখ : ০৮-০৩-১৯৮৩
জন্মস্থান : নারায়ণগঞ্জ সদর
পেশা : চাকরিজীবী
নিজ জেলা : নারায়ণগঞ্জ
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : ন্যাসলে কোম্পানী, ডেলিভারি সুপারভাইজার (ডিস্ট্রিবিউটারের)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সাহেবপাড়া, ইউনিয়ন: কান্দার পাড়, থানা: নারায়ণগঞ্জ, জেলা: নারায়ণগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা : পলাশপুর, দনিয়া, কদমতলী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত মফিজুর রহমান
পিতার পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : বিবি মরিয়ম মায়ের
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
মাসিক আয় : ২২০০০
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ির বিবরণ : টিনের বেড়া
সম্পদের পরিমাণ : ৬ গণ্ডা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
সন্তানদের নাম
১. নিশাদ নানজিবা, বয়স: ১৪ পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৯ম, সম্পর্ক: মেয়ে ২. নাজিবা নরজ, বয়স: ৮, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৩য়, সম্পর্ক : মেয়ে ভাই-বোনদের নাম
সাইদুর রহমান মিশুক ২৫, চাকরি, জান্নাতুল ফেরদস, ২১, অনার্স ২য়, ফেনী সরকারি কলেজ
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ী গ্যাসরোড এলাকায়
তারিখ ও সময় : ২০ জুলাই, দুপুর ১২:৪৫ মিনিট
আঘাতের ধরন : গলার এক পাশ দিয়ে রাইফেলের গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে চিকিৎসা : ইম্পেরিয়াল রয়েল হাসপাতাল, যাত্রাবাড়ি শনির আখড়া, ইবনে সিনা ধানমণ্ডি চিকিৎসার ব্যয় : ১ লাখ ৫০ হাজার

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍